স্বাধীনতার কথা
বিশেষ রচনা ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ মার্চ ২০২৫
স্বাধীনভাবে চলতে চাই। মনের কথা বলতে চাই। ইচ্ছেমতো উড়তে চাই। নিরাপদে ঘুরতে চাই। কর্ম করে খেতে চাই। ন্যায্য পাওনা পেতে চাই। আসলে বাধা লড়তে পারি। লড়াই করে মরতে পারি। এর নামই তো স্বাধীনতা আন্দোলন। মুক্তির সংগ্রাম। এভাবেই এসেছিল আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস মানে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার দিন। এই দিনে আমরা গর্জে উঠেছিলাম বৈষম্যবিরোধী চেতনায়। ঘোষণা করেছিলাম স্বাধীনতার লড়াই। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম। মুক্তির চেতনায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তির জন্য সংগ্রাম করা মানুষের ফিতরাত। জন্মগত চেতনা। যখনই অধিকারে বাধা আসে তখনই বিগড়ে যায়। স্বাধীনতার জন্য চেষ্টা করে। অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে। হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। লড়াই করে। প্রতিরোধ গড়ে। বড়োদের মতো শিশুরাও লড়াই করে। কান্না করে হলেও নিজের পক্ষে রায় টেনে নেয়।
বাংলায় প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন বখতিয়ার। পুরো নাম ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি। এই তুর্কি বীর বাংলার মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করার জন্য লড়াই করেছিলেন। নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষেরা তার পক্ষ নিয়েছিল। তিনি বিজয়ী হয়েছেন লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে। সময়টি ছিল বারো শত চার সাল।
সেই থেকে এগিয়ে গেছে আমাদের স্বাধীনতার চর্চা। স্বাধীনভাবে পথ চলতে আমরা প্রথম বড়ো ধরনের ধাক্কা খাই ১৭৫৭ সালে। পলাশীর প্রান্তরে আসে সেই ধাক্কা। ইংরেজদের হাতে। মীর জাফরদের বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য আমরা স্বাধীনতা হারাই। নির্মমভাবে শহীদ হন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদদৌলা। সেই থেকে ইংরেজদের কাছে স্বাধীনতা হারালাম। আমাদের গোলাম বানিয়ে শাসন করলো ব্রিটিশরা। সেই গোলামি থেকে মুক্ত করতে লড়াই করেছেন মীর নিসার আলী তিতুমীর। তিনি বাঁশের কেল্লা গড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। অবশেষে তিনি শহীদ হয়েছেন। অমর হয়ে আছেন আমাদের সিপাহসালার।
হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজি থেকে শুরু করে নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, হাজী মুহম্মদ মহসীন, মন্নুজান প্রমুখের হাত ধরে আমরা আবার নতুন করে জেগে উঠি। লেখাপড়ার সুযোগ পাই। স্বাধীনতার পথে হাঁটতে শিখি।
স্বাধীনতার সূর্য উঠলো ১৯৪৭ সালে। আমরা আনন্দিত হলাম। ভাবলাম, আর পরাধীন থাকতে হবে না। বঞ্চিত হবো না। অধিকারের সবকিছু হাতের কাছেই পাবো। কিন্তু না। আবারো বৈষম্য। ভাষার জন্য লড়তে হলো। জীবন দিতে হলো। রক্ত দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায় করলাম। শহীদ হলেন আবুল বারাকাত, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার প্রমুখ।
অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই সংগ্রাম চলছেই। চলছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বৈষম্যহীন করার আন্দোলন। এই আন্দোলনের পথে কেটে গেল পঁচিশটি বছর।
১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর মরণপণ লড়াই এবং গণমানুষের আন্তরিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। অবশেষে বিজয় আসে ১৬ ডিসেম্বরে। উল্লাসে মেতে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ।
বিজয়ের এই উল্লাস খুব বেশি দিন থাকেনি। মুখের হাসি, হৃদয়ের উচ্ছ্বাস অচিরেই মিশে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়। স্বাধীনতা পরবর্তী পথের বাঁকে নতুন পথের মিলন ঘটে। অনেকেই সঠিক পথ চিনতে বিভ্রান্ত হন। তবুও পথের বাঁক-মোহনা পছন্দের স্থানে আড্ডা জমে। বাজার বসে। হৈচৈ হয়। নানা অস্থিরতায় এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যটা আকাশে জ¦লজ¦ল করছিল। কিন্তু ক্রমশ কালো মেঘ জমে বাংলাদেশের আকাশে। ঢেকে নেয় স্বাধীনতার সূর্য। কথা বলার অধিকার নেই। অধিকার নেই নিজের মতো করে জীবন পরিচালনার। শাসকগোষ্ঠীই হয়ে ওঠেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের স্বকীয়তা কেড়ে নেওয়া হয়। দুর্বৃত্তায়নের কালো থাবা বিস্তৃত হয় সবখানে। জীবন-জীবিকার চাবিকাঠি তারা নিজ হাতে তুলে নেয়। দেশের সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে জিম্মি। প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেওয়া হয়। গুম, খুন, হত্যা, গ্রেফতার নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো জাতি। শেখ হাসিনা স্বৈরাচারের আসন পেরিয়ে ফ্যাসিবাদের নেত্রী হয়ে ওঠেন।
দেড় দশকের এই কালো অধ্যায়ে মানুষ বঞ্চিত হয় ভোট এবং ভাতের অধিকার থেকে। বঞ্চনার চূড়ান্ত পর্বে অধিকারের কথা উচ্চারণ করে শিক্ষার্থীসমাজ। অধিকারের সাহসী উচ্চারণে বেপরোয়া হয়ে ওঠে শেখ হাসিনার প্রশাসন ও তার শাসকশ্রেণি। শুরু হয় জুলুম নির্যাতনের নতুন স্টাইল। চেতনার বুকে বুলেট বিদ্ধ করে তারা। শহীদ আবু সাঈদের স্বাধীনচেতা বুকের রক্ত ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে। জন্ম নেয় হাজারো আবু সাঈদ। বৈষম্য নিরসনে এক আওয়াজে মিলিত হয় সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। বুলেটের সামনে সাহসী বীরের বেশে এগিয়ে আসে মুগ্ধ-রায়হানরা। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এগিয়ে আসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্কুল, কলেজ মাদরাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন পরিণত হয় জনস্রােতে। রক্তের স্রােত আরো বেশি তীব্রতর হয়ে ওঠে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাদের পাশে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় কৃষক, শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, দোকানদার থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, পেশাজীবীসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ।
বাংলাদেশের সকল মুক্তিকামী মানুষ একদিকে। আরেক দিকে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ পেটোয়া বাহিনী। মুখোমুখি অবস্থানের শেষপর্বে শিক্ষার্থী-জনতার ঐতিহাসিক ঢলে ভেসে যায় ফ্যাসিবাদ। উপায়ান্তর না দেখে পার্শবর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন ফ্যাসিবাদের জননী শেখ হাসিনা। দুই হাজার চব্বিশের ছত্রিশে জুলাইয়ে সৃষ্টি হয় নতুন স্বাধীনতার আরেক ইতিহাস। এই ইতিহাস নতুন করে উনিশশো একাত্তরের উত্তাল দিনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় নতুন বাংলাদেশ গড়ার শাশ্বত অঙ্গীকারের কথা।
আরও পড়ুন...