স্বর্ণশহর
বিজ্ঞান আবুল হোসেন সেপ্টেম্বর ২০২৪
মিসরের দক্ষিণাঞ্চলে মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া তিন হাজার বছরের পুরোনো এক সোনার শহরের খোঁজ পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। লুক্সরের পশ্চিম তীরে এটির অবস্থান। এটি এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া মিসরের সবচেয়ে বড়ো প্রাচীন শহর, যা আতেন নামে পরিচিত ছিল।
এই শহর সেই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো শহর ছিল। কায়রো শহর থেকে কিছুটা দক্ষিণে বালির নিচে প্রায় অবিকৃত অবস্থাতেই উদ্ধার হয়েছে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ।
বলা হয়, স¤্রাট তৃতীয় আমেনহোতেপ আতেন নামের হারানো শহরটি গড়ে তুলেছিলেন। মিসরের অষ্টাদশ রাজবংশের নবম রাজা ছিলেন তৃতীয় আমেনহোতেপ। খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৫৩ থেকে ১৩৯১ পর্যন্ত তিনি মিসর শাসন করেন। তার শাসনামলের সবচেয়ে বড়ো প্রশাসনিক ও শৈল্পিক বসতি ছিল এই স্বর্ণ শহর।
ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপের এটি এমন একটি শহর, যা আকারে এবং জৌলুসে সেই সময়ের সমস্ত শহরকেই হার মানায়। ঐতিহাসিকরা বেশ কিছু নথিতে সেই শহরের কথা জানতে পারলেও তার সন্ধান পাননি এতদিন ধরে। প্রায় ২০০ বছর ধরে অনুসন্ধানের পর অবশেষে সেই শহরের সন্ধান পেলেন ঐতিহাসিকরা।
ধারণা করা হয় ইউফেট্রাস নদী থেকে সুদান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল স¤্রাট তৃতীয় আমেনহোতেপের রাজত্ব। প্রায় চার দশক ধরে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন।
এক শতাব্দী আগে হাওয়ার্ড কার্টারের নেতৃত্বে তুতেনখামেনের সমাধি উদ্ধার মিসর গবেষণার সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার হলে এটি নিঃসন্দেহে দ্বিতীয়। এমনটাই জানাচ্ছেন হাওয়াস।
জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসরীয় বিদ্যার অধ্যাপক বেটসি ব্রিয়ান বলেন, “এই নিখোঁজ শহরটির অনুসন্ধান তুতেনখামেনের সমাধির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটি প্রাচীন মিসরের জীবনযাপন সম্পর্কে আমাদের বিরল ধারণা দিতে সক্ষম হবে।”
২০২০ সালের শুরুতে ফারাও তৃতীয় রামশের কীর্তি অনুসন্ধানের জন্য খননকার্য চালাচ্ছিলেন একদল প্রত্নতাত্ত্বিক। মিসরের নানা প্রাচীন লিপিতে এই শহরের কথা ঐতিহাসিকরা জানতে পেরেছিলেন আগেই। খননকার্য যত বাড়তে থাকে, ততই ঐতিহাসিকরা আশ^স্ত হতে থাকেন এই আবিষ্কারের বিষয়ে।
প্রত্নতাত্ত্বিক জাহি হাওয়াস বলেন, “মিসরের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় সময় অষ্টাদশ সা¤্রাজ্যের সময়। ফারাও তৃতীয় আমেনহোতেপের রাজত্বে মিসর তখন সমসাময়িক সমস্ত সভ্যতাকে টেক্কা দিতে প্রস্তুত। আর সেই কীর্তিকে চিরস্থায়ী করতেই এক বিরাট শহর তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। মিসরের ইতিহাসে এই শহর ‘সোনার শহর’ নামে পরিচিত।”
এতদিন পর্যন্ত ঐতিহাসিকদের কাছে এই শহর নিয়ে প্রায় কোনো তথ্যই ছিল না। শুধু এই শহর নয়, আমেনহোতেপের রাজত্বের সময় মিসরের সংস্কৃতির সামান্যই আভাস পাওয়া যায়। তার নাতি নাবালক ফারাও তুতেনখামেনের বিষয়ে অবশ্য বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। তার বেশির ভাগটাই হাওয়ার্ড কার্টারের অনুসন্ধানের সূত্র ধরে। তুতেনখামেন নিজেও এই শহরে রাজত্ব করেছেন। তবে সেই সময়ের ইতিহাস এখনও রহস্যে ঢাকা।
শহরটিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন মিসরবাসী। একটি ছিল প্রশাসনিক অঞ্চল। অন্য একটিতে থাকতেন দাস ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষরা। আর তৃতীয় অঞ্চলটি জুড়ে ছিল কারখানা ও কৃষিজমি। এছাড়াও একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে ছিল মাংস সংরক্ষণের কেন্দ্র।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা ইতোমধ্যে আবিষ্কার করেছেন বেশ কিছু খাবার পাত্র ও অন্যান্য মৃৎসামগ্রী। প্রতিটা পাত্রে ভিন্ন ভিন্ন খাবার পরিবেশন করা হতো। সেইসব খাদ্যাভ্যাস সম্বন্ধে আরও বিশদ জানার জন্য গবেষণা চলছে পরীক্ষাগারে।
ইতিহাসের দিক থেকে তো বটেই, ইজিপ্টের অর্থনীতিতেও এই আবিষ্কার বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। এই সময় নতুন আবিষ্কৃত এই প্রত্নক্ষেত্র বহু মানুষকে আকর্ষণ করবে বলে আশাবাদী মিসর সরকার।
এটিকে অসাধারণ আবিষ্কার বলে আখ্যায়িত করেছেন মিসর বিদ্যার গবেষকরা। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বর্ষের শিক্ষার্থী পাওলো কার্টাগেনা বলেন, “প্রাচীন মিসরের জীবন সংস্কৃতি কেমন ছিল, তা জানতে এই আবিষ্কার থেকে আমরা তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা পাবো।”
সেখানে খুঁজে পাওয়া গয়না, রঙিন তৈজসপত্র এবং কাদামাটির ইট প্রভৃতি নিয়ে আরও বিশদ গবেষণা চালাচ্ছেন গবেষকরা। শহরটি আমাদের সে সময়ের ফারাও রাজাদের আলিশান অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়।
আরও পড়ুন...