স্বপ্নের দেশ সোনার দেশ

ভ্রমণ জুলাই ২০১৫

মো: জিল্লুর রহমান#

বন্ধুরা,
নিশ্চয়ই তোমরা ভাবছো স্বপ্নের দেশ! সেটা আবার কেমন। বাস্তবে কি স্বপ্নের দেশ বলে পৃথিবীতে আদৌ কোনো দেশ আছে? তোমাদের ভাবনা যেমন, তেমনি আসলে স্বপ্নের দেশ বলে পৃথিবীতে কোনো দেশ নেই। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যাদের অতীত ও বর্তমান এক করলে স্বপ্নই মনে হবে। আর তেমনি এক দেশের গল্প তোমাদের আজ শোনাবো। শোনাবো কী, বলছি সরাসরি সেখানে ঘুরে এসে তার নানা জানা-অজানা তথ্যের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা তোমাদের জন্য লিখব ইনশাআল্লাহ। আর হ্যাঁ আজ আমি তোমাদের জন্য লিখতে বসেছি সেই স্বপ্নময় উন্নয়নের মডেল আধুনিক মালয়েশিয়ার কথা। দেশটির বর্তমান এই অভূতপূর্ব উন্নয়নের বর্ণনার আগে এর ইতিহাস সম্পর্কে তোমাদের কিঞ্চিৎ ধারণা দিতে চাই। মালয়েশিয়াকেও মূলত আমাদের দেশের মত ব্রিটিশরা শাসন করত অর্থাৎ এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশভুক্ত দেশ হিসেবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছিল। ১৯৫৭ সালের ৩১ শে আগস্ট এই দেশটি ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ১৯৪৮ সালে এই অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত হয় ফেডারেশন অব মালায়া। ১৯৬৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তর বোর্নিও, সারাওয়াক ও সিঙ্গাপুর নিয়ে গঠিত হয় মালায়া ইউনাইটেড, যেখান থেকে এ দেশটির নামকরণ করা হয় মালয়েশিয়া। অবশ্য এর মাত্র দুই বছর পরই ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার হয়ে আলাদা হয় এবং স্বাধীন মালয়েশিয়া তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। উঁচু-নিচু পাহাড়ঘেরা অসমতল এবং নানা ধর্ম-জাতি ও গোত্রের সমন্বয়ের এই দেশটি শুরুতে ছিল অত্যন্ত অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ এবং জাতি হিসেবে ছিল খুবই অলস প্রকৃতির।
sop2
বন্ধুরা,
এবার তোমাদের মনে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে জাগতেই পারে তাহলে এই পিছিয়ে পড়া জাতিকে এগিয়ে নিয়ে এলো কে ও কিভাবে এবং সেই স্বপ্নের উন্নয়নই বা কী? হ্যাঁ বন্ধুরা, এবার আমরা জানার চেষ্টা করব সেই জীবন্ত কিংবদন্তির কথা যার নির্মল নেতৃত্বে বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় জেগে উঠেছে ঘুমন্ত একটি জাতি। তোমরা অবশ্যই ইতোমধ্যে বুঝতে পেরেছ আমি কার কথা বলছিÑ তিনিই হলেন বর্তমান বিশ্বের সফলতম শাসক আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার, ইতিহাসের কিংবদন্তি স্বপ্নের দেশের মহানায়ক ড. মাহাথির  মোহাম্মদ। বন্ধুরা, তার জীবনচলার পথ কিন্তু ইতিহাসের সেইÑ ‘এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন’ গল্পের মতো এতটা সহজ ছিল না। বরং তাকে এই সুন্দর দেশটি গড়তে পাড়ি দিতে হয়েছে নানান চড়াই-উতরাই এবং মোকাবেলা করতে হয়েছে বিভিন্নমুখী চ্যালেঞ্জ এমনকি বরণ করতে হয়েছে কারাগারের বন্দিজীবন। এতকিছুর পরও তিনি কিন্তু থেমে থাকেননি, বরং তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তিনি একীভূত করেছেন দেশের বিভিন্ন ধর্মের, গোত্রের ও মতের মানুষকে, শিখিয়েছেন কিভাবে সব কিছু ভুলে গিয়ে দেশকে ভালোবাসতে হয় সেই মন্ত্র। বন্ধুরা, তোমাদেরও তার জীবন থেকে শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই আছে। বছরের পর বছর ধরে ড. মাহাথির মোহাম্মদ শুধু আধুনিক মালয়েশিয়াই গড়ে তোলেননি, ধীরে ধীরে তিনি নিজেকেও গড়ে তুলেছিলেন। যে কোনো কাজের আগে পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া জরুরি সেটা তিনি নিয়েছিলেন অনেক আগে থেকেই। তার জীবনের একটি মজাদার অথচ অত্যন্ত শিক্ষণীয় গল্পটি তোমাদের জীবনেও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শৈশবে তিনি কুকুরকে ভীষণ ভয় পেতেন। পথে কোনো কুকুর দেখলে ভয়ে দৌড়াতে শুরু করতেন। এই ভয় তাকে অস্থির করে তুলতো। প্রচন্ড ভয় পেয়ে একদিন তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি আর ভয় পাবেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন যখনই কুকুর দেখবেন উল্টো তিনি চোখ রাঙিয়ে ও বড় বড় করে কুকুরের দিকে তাকাবেন এবং দেখবেন সে কী করে। তার এই কৌশল কাজে দিলো। সেই থেকে মাহাথিরকে দেখে কুকুরই লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেত। এই শিক্ষা তিনি বাকি জীবনের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন। কোনো সমস্যা এলে তা থেকে পালিয়ে না গিয়ে তাকে মোকাবেলা করা, সমস্যার আসল কারণ খুঁজে বের করা তার স্বভাবে পরিণত হয় এবং এই কৌশলই তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় সাফল্যের সুউচ্চ চূড়ায়।
তিনিই প্রথম দেশে চৎড়ঃড়হ ঝধমধ নামে গাড়ি তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় তিনি জাপানের মিটসুবিশি কোম্পানি থেকে গাড়ি কিনতে গিয়ে নিজেই ট্রাক ও অ্যাম্বুল্যান্স চালিয়ে পরীক্ষা করেন। তিনি একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট এবং অনেক সময় তিনি নিজেই নিজের প্লেন চালিয়েছেন। অফিসের কম্পিউটারে তিনি দেশের সব প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজেই সংরক্ষণ করতেন। ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে তার সফলতার অন্য গোপন তথ্য হলো সবক্ষেত্রে তার সময়ানুবর্তিতা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রসিদ্ধ টাইম ম্যাগাজিন একবার মাহাথিরের পরপর পাঁচ দিনের অফিসে প্রবেশ করার সময়ের রেকর্ড প্রকাশ করে। তিনি উক্ত পাঁচ দিন অফিসে প্রবেশ করেছিলেন যথাক্রমে ৭.৫৭, ৭.৫৬, ৭.৫৭, ৭.৫৯ এবং ৭.৫৭ মিনিটে। অর্থাৎ তিনি কখনোই অফিস টাইম ৮টার পর নয় বরং কয়েক মিনিট আগেই সবসময় অফিসে প্রবেশ করতেন।
sop3
বন্ধুরা,
আগেই বলেছি ৬০-এর দশকের মালয়েশিয়া ছিল দারিদ্র্য আর অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি দেশের নাম। তখন এ দেশটির অবস্থান ছিল বাংলাদেশের চেয়ে অনেক নিচে। ৮০-এর দশকে মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড. মাহাথির মোহাম্মদ আমাদের রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কাছে দেশের উন্নয়নকাজের জন্য লোকবল চেয়ে অনুরোধ করলে তিনি তা বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ সেই সময় কিছু কৃষিজমি ছাড়া পাম বাগান আর পাহাড় ও জঙ্গলে ভরা মালয়েশিয়ায় এ দেশের জনশক্তি প্রেরণ করতে চাননি। কিন্তু থেমে থাকেনি মাহাথিরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি। তিনি তামিল জনশক্তি আমদানি করে তার উন্নয়নকাজ পরিচালনা করেন। যে কারণে মালয়েশিয়ার মোট জনশক্তির ৬.৭% ভাগ ভারতীয় যাদের অধিকাংশই ভারতীয় তামিল। একই সময়ে মালয়েশিয়া শিক্ষা-দীক্ষায়ও ছিল আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, যে কারণে সেই সময় অনেক মালয় ছাত্রকে দেখা গেছে ঢাকা, বুয়েট ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। বন্ধুরা, বুঝতেই পারছো সেই মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ আর এখনকার মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ কত তফাত। এখন আমাদের দেশের জনশক্তি মালয়েশিয়া যেতে কত বৈধ-অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চেষ্টা করছে। আর লেখাপড়া, সেখানেও মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে অনেক এগিয়ে। আমাদের দেশের হাজার হাজার ছাত্র এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে কোন দেশের যদি টেকসই উন্নয়ন করতে হয় তবে সবার আগে সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ চর্চা আবশ্যক, আর মালয়েশিয়া সেই কাজটিই অত্যন্ত সুনিপুণতার সাথে সম্পন্ন করেছে। যে কারণে এমন সময় ছিল যখন মালয়েশিয়া থেকে যুবকরা পশ্চিমা পৃথিবীতে উচ্চশিক্ষা বা কাজের জন্য পাড়ি জমাতো আর আজ সেই মালয়েশিয়াতেই সারা পৃথিবী থেকে জমায়েত হচ্ছে কেউবা বিনিয়োগের নেশায়, কেউবা নিরাপদ সেকেন্ড হোম গড়ার আশায়।
মাত্র ২২ বছরের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়াকে ছবির মতো স্বপ্নের দেশ হিসেবে সাজিয়েছেন। কুয়ালালামপুর কসমোপলিটন সিটি, পুত্রজায়া সিটি, মালাকা সিটি, জুহুর বারু, শাহ আলম শিল্প এলাকা, পর্যটন কেন্দ্র লংকাভি, পেনাং, সাবাহ, সারওয়াকা, কোটাকিনা বালু তথা দেশের ১৩টি অঞ্চলকে তৈরি করেছেন স্বপ্নের রাজপুরীতে। ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ইঞ্চিতে রয়েছে যতেœর ছোঁয়া। বিশ্বের আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর অন্যতম পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, চতুর্থ বৃহৎ কমিউনিকেশন টাওয়ার, কে এল টাওয়ার (৪২১ মিটার) অবস্থিত কুয়ালালামপুরেই। ছবির মতো শহর পুত্রাজায়া যা কিনা সে দেশের প্রশাসনিক রাজধানী। ১৪ মাইল সমতল ভূমির ওপর নির্মিত কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের অন্যতম সর্বাধুনিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত। বন্ধুরা, সব থেকে মজার ব্যাপার হলো মালয়েশিয়া যেন পুরা দেশটাকেই একটা দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছে।
১৯৮১ সালে ড. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৮৫ সালে তিনি মালয়েশিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ লংকাভিকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন করলে কেউই তার প্রস্তাবে সাড়া দেননি বরং বলেছিলেন দুর্গম এই দ্বীপে কিছু করা মানেই সরকারের টাকা নষ্ট করা। সকল বাধা উপেক্ষা করে সেদিন তিনি এই দ্বীপকে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং অবাক ব্যাপার হলো এই লংকাভিই এখন মালয়েশিয়ার ১ নম্বর পর্যটন কেন্দ্র। এখানে বর্তমান প্রায় ৭৫ হাজার লোক বাস করে যাদের প্রধান জীবিকার্জনের মাধ্যম হলো পর্যটন। মালয়েশিয়ার মূল ভূখন্ড থেকে মালাক্কা প্রণালী দ্বারা বিচ্ছিন্নœ যদিও তা প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রিজ দ্বারা মূল ভূখন্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, পেনাং অথবা পারলিস থেকে ফেরিতে করে এই লংকাভি যেতে প্রায় আড়াই ঘন্টা সময় লাগে। ফাইভ স্টার হোটেল থেকে শুরু করে ক্যাবল কার, স্পিডবোট, ফ্লাইংবোট ইত্যাদির মাধ্যমে উপভোগের সকল উপকরণ দিয়ে সাজানো এই দ্বীপটি। এ ছাড়া পেনাং শহরটি সমুদ্রসৈকত ও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে এক অসাধারণ দর্শনীয় নগরীতে পরিণত করেছে। কুয়ালালামপুর থেকে মাত্র ১ ঘন্টার দূরত্বে অন্য একটি অসাধারণ পর্যটন কেন্দ্র হলো গেন্টিং ও ক্যামেরন হাইল্যান্ড। সারা বছরজুড়েই এখানে শীত থাকে। পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায় ফাইভ স্টার হোটেলসহ বিভিন্ন বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে এটিকে পরিণত করা হয়েছে অন্যতম এক দর্শনীয় স্থানে। প্রায় সব সময়ই এখানে স্থাপনাসমূহ মেঘমালা দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। শত শত ক্যাবল কারের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী সেখানে ভিড় জমান নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। মেঘাচ্ছন্ন জংগলের মধ্য দিয়ে ক্যাবল কারে চড়ার বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে ওখানে। মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম এই ক্যাবল কার ভ্রমণে আছে একটি ক্যাসিনো, ইনডোর-আউটডোর কৌতুক মঞ্চ আর ছোটখাটো অনেক রেস্টুরেন্ট। এ ছাড়া সানওয়ে লাগুন, পেটালিং জায়া যেখানে পুরো পরিবার নিয়েই বাঁধভাঙা আমোদে মেতে উঠা যায়। সব ধরনের খেলার মাঠ, কৃত্রিম হ্রদ, নানা ধরনের জলযান, সব রকমের খেলনা, বক্তৃতা মঞ্চ, সুইমিং পুল, ওয়াটার পার্কসহ উপভোগের সকল ধরনের ব্যবন্থা রয়েছে পার্কগুলোতে। পর্যটন, শিক্ষা আর বাসযোগ্য সুন্দর আবাসের আকর্ষণের মাধ্যমেই মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস্ পরিণত হয়েছে পর্যটক বহনে এশিয়ার অন্যতম ব্যবসাসফল এয়ারলাইনস্।ে
মালয়েশিয়ার যোগাযোগব্যবস্থা এবং এর সাথে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দেশটিকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায় যা কিনা তাদের ১৯৯৬-২০২০Ñ এই ২৪ বছর মেয়াদি মাল্টিমিডিয়া সুপার কোরিডোর প্রতিষ্ঠা পরিকল্পনার অংশ। বিমানবন্দরের ইমগ্রেশন কাউন্টার থেকে শুরু করে ট্রেন বাস সকল যায়গায় ডিজিটাল সুবিধার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কোথাও কোনো এতটুকু বিশৃঙ্খলা নেই, সবাই যে যার মত কাজে ব্যস্ত। দূর অথবা নিকট কোন বাসে ড্রাইভার ছাড়া দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই ব্যবস্থাপনার জন্য। বড় বড় শহরের প্রতিটি বাস বা ট্রেন স্টেশনগুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে। তিনটি পদ্ধতিতে ট্রেন যোগাযোগ স্থাপিত। রাজধানী শহরের মধ্যে খুব কাছাকাছি যোগাযোগের জন্য প্রতি ৩ মিনিট পরপর গড়হড় জধরষ যা ওভার ওয়ে দিয়ে যাতায়াত করে এবং এর প্রতিটি স্টেশনও সেইভাবে সাজানো। রাজধানীর আশপাশে যোগাযোগের জন্য খজঞ যেটি অটোমেশন পদ্ধতিতে খুব দ্রুততার সাথে চলে। এটি কখনো আন্ডারগ্রাউন্ড আবার কোথাও ওভার ওয়ে দিয়ে যাতায়াত করে এমনকি সুউচ্চ কেএল টাওয়ারের নিচ দিয়ে এর লাইন চলে গেছে। ইন্টারসিটি যোগাযোগের জন্য কঞগ ব্যবস্থা যা ইলেকট্রিসিটির মাধ্যমে চলে। তোমরা জেনে আশ্চর্য হবে যে, প্রতিটি গণপরিবহন এমনকি এর স্টেশন পর্যন্ত সব কিছুই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এ ছাড়াও চোখধাঁধানো নজরকাড়া সব শপিংমল যা আধুনিক সকল সুবিধা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম শপিংমল মিড ভ্যালি, প্যাভিলিয়ন, ইউএন সেন্ট্রাল আধুনা প্রযুক্তির সকল উপকরণে সাজানো এই মলগুলোও পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম বিনোদন ও বিপণন কেন্দ্র।
sop4
বন্ধুরা,
যে দেশে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের বাসিন্দাদের বাস বা পর্যটকদের এত আনাগোনা সেই দেশে নিজেদের সংস্কৃতি বা ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচার পালনে কিন্তু কোনোটাই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেটি আরো সহজ করে তুলেছে। মানুষের কল্যাণই যে ইসলামের মূল লক্ষ্য সেটি মালয়েশিয়া সরকারই সরকারিভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছে। যেমন ধর, বড় বড় বিপণন কেন্দ্র (শপিং মল), স্টেশন বা বাজার অথবা মানুষের আনাগোনা যেখানে বেশি সেখানে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস নিশ্চিত করা হয়েছে। একটি হলো গোসল বা প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য বাথরুম যা ২৪ ঘন্টা অত্যন্ত ঝকঝকে পরিষ্কার করে রাখা হয়, মালয়েশিয়ান ভাষায় এটাকে বলা হয় ঞঅঘউঅঝ, এমনকি বড় বড় স্থাপনার প্রতিটি ফ্লোরে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে। অপরটি হলো নামাজঘর। মালয়েশিয়ান ভাষায় এটাকে বলা হয় ঝটজঅট। তোমরা জেনে আনন্দিত হবে, সেটা হলো প্রতিটি ঝটজঅট বা নামাজঘর পরিষ্কার করার জন্য সার্বক্ষণিক একজন থাকে এবং সেখানে লুঙ্গি ও গামছা পর্যন্ত থাকে। কারণ কোন কারণে যদি কারো অপবিত্রতার কারণে নামাজে সমস্যা হয় তাহলে সে গোসল করে ওই লুঙ্গি পরে নামাজ আদায় শেষে আবার তার পোশাক পরে চলে আসতে পারে অথবা শহরে অনেক যুবক শর্টস্ পরে বিভিন্ন যায়গায় যায় সেই অবস্থায় সে লুঙ্গি পরে নামাজ পড়ে আসতে পারবে। অর্থাৎ সবকিছুই অত্যন্ত গোছানো ও পরিকল্পিতভাবে পরিপাটি করে সাজানো। ছোট্ট কিন্তু শিক্ষণীয় একটি অভিজ্ঞতা তোমাদের শোনাই। একদিন মাগরিবের সময় কাজাং এলাকার একটি শপিং মলের নামাজঘরে নামাজ পড়তে গেলাম আজানের বেশ কিছুক্ষণ পর এবং গিয়ে দেখলাম মূল জামাত শেষ হয়ে গেছে কিন্তু বাইরে তখনো অনেক মানুষ নামাজের অপেক্ষায়। অপেক্ষারতদের সাথে আমরাও ভেতরে প্রবেশ করলাম। একজন যুবকের ইমামতিতে নামাজ আদায় করলাম। অত্যন্ত চমৎকার তেলাওয়াত। কিছুক্ষণ ভেতরে অপেক্ষা করলাম, দেখলাম একটার পর একটা জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এর প্রতিটিতেই যুবকই ইমামতি করছেন। পরে একজনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানালেন তাদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই কুরআন সহিহভাবে পড়ার তাগিদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক উভয়পক্ষ থেকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। এ ছাড়াও সামাজিক সংস্কৃতি হিসেবে প্রায় সব মেয়েই মাথায় হিজাব পরিধান করে যা এক ধরনের সামাজিক রীতি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

বন্ধুরা,
হাজারো পৃষ্ঠা লিখে মালয়েশিয়ার এই উন্নয়নের কাহিনী শেষ করা যাবে না। এভাবেই আধুনিক অর্থনীতির প্রযুক্তিনির্ভরতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের দেশপ্রেম ও স্বকীয়তাকে সমুন্নত রেখে মালয়েশিয়া বিশ্বঅর্থনীতি ও উন্নয়নে নিজের নামকে বড় করে তুলেছে। অথচ এ সুযোগটা গ্রহণ করতে পারতো বা পারে অমিত সম্ভাবনাময় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও। কিন্তু মালয়েশিয়ার সাথে আমাদের মূল পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছে একটি যোগ্য নেতৃত্ব একজন ড. মাহাথির মোহাম্মদ। আমরা নিশ্চিতভাবেই আশাবাদী ইনশাআল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকেই আগামী দিনে বেরিয়ে আসবে এমন একজন মাহাথির যার পরিকল্পিত ও যোগ্য নেতৃত্বে সকল ভেদাভেদ ভুলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও পরিণত হবে বিশ্বের রোল মডেলে।
                        
আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ