স্বপ্নযাত্রার মধুর সমাপ্তি

খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ সেপ্টেম্বর ২০২৪

আর্জেন্টিনার পূর্বাঞ্চলীয় রোজারিও শহরটার সাথে তোমাদের পরিচয় আছে নিশ্চয়। লিওনেল মেসির শহর হিসেবে সারা দুনিয়ার মানুষ চেনে রোজারিওকে। সেই শহরেরই আরেক রাজপুত্রের গল্প জানাবো এবার। শৈশবে ছেলেটা ছিল দুরন্ত স্বভাবের। অতি চঞ্চল। দুষ্টুমিতে অস্থির হয়ে উঠে বাবা-মা একসময় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, ওর জন্মগত হরমোনের ত্রুটি রয়েছে। যার কারণে সারাদিন ছটফট করে। কয়লা শ্রমিক বাবা মিগুয়েলের জন্য এই চিকিৎসা করানোর মতো অর্থ ছিল না। পরে ডাক্তার একটা বুদ্ধি দিলেন। বললেন, ওকে এমন কোনো কাজে যুক্ত করে দিন যাতে পরিশ্রম করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। তাহলে দিনের বাকিটা সময় ধীর-স্থির থাকবে।

পরামর্শ মতো ছেলেকে একটি ফুটবল অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। প্রতিদিন মা সাইকেল চালিয়ে নয় কিলোমিটার দূরের অ্যাকাডেমিতে নিয়ে যেতেন ৩-৪ বছরের ছেলেকে। বাবা-মা ক্লান্ত করার জন্য ছেলেকে ফুটবলে দিলেও সে ফুটবলের প্রেমে পড়ে গেল। সারাদিন ফুটবল নিয়ে মেতে থাকার অভ্যাস শুরু হলো। যখনই সময় পেতো বাড়িতেও ফুটবল খেলতো। আবার বাবা-মাকেও কাজে সাহায্য করতো। সেই ছেলেটাই কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। বিশ^কাপসহ আর্জেন্টিনার হয়ে টানা চারটি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে ঝলমলে ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন। দারুণ এই গল্পটা আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড আনহেল ডি মারিয়ার।

স্থানীয় ক্লাবে প্র্যাকটিস শুরুর বছর খানেক পরেই প্রাচীন ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে ভর্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় ডি মারিয়াকে। নামকরা ক্লাব, তাই বাবা-মা রাজি হয়ে যান। এরপর শুরু হয় ফুটবল শেখা আর পেশাদার ফুটবলের প্রস্তুতি। কয়েক বছর পর ক্লাবের যুব দলে সুযোগ পান। ২০০৫ সালে ১৭ বছর বয়সে অভিষেক হয় রোজারিও সেন্ট্রালের সিনিয়র দলে। এক মৌসুম খেলেই জাতীয় দলের রাডারে ধরা পড়েন ডি মারিয়া। ২০০৭ সালে ডাক পান আর্জেন্টিনা যুব দলে।

শুরুতে মহাদেশিয় যুব টুর্নামেন্ট, এরপর কানাডায় অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপে মাঠে নামেন। যুব বিশ^কাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পথে তিন গোল করে অবদান রাখেন। পরের বছর সুযোগ পান আর্জেন্টিনার অলিম্পিক ফুটবল দলেও। ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তার একমাত্র গোলেই আর্জেন্টিনা ফুটবল দল জেতে টানা দ্বিতীয় অলিম্পিক গোল্ড মেডেল।

যুব বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দেখে নামিদামি কয়েকটি ক্লাব ডি মারিয়াকে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে ছিল ইংলিশ ক্লাব আর্সেনাল ও আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়র্স। ডি মারিয়ার ইচ্ছে ছিল ইউরোপের ক্লাবে খেলা। সমবয়সি ও একই শহরের লিওনেল মেসি ততদিনে বার্সেলোনা ক্লাবের হয়ে নাম করতে শুরু করেছেন। শেষ পর্যন্ত ভিসা জটিলতায় ইংল্যান্ডে যাওয়া না হলে ডি মারিয়া যোগ দেন পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকায়।

২০০৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক তার। ২০১০ বিশ^কাপের দলে তাকে ডাকেন কোচ ডিয়াগো ম্যারাডোনা। এরপর থেকে আর্জেন্টিনা দলের আক্রমণভাগের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন ডি মারিয়া। একই সাথে ক্লাব ক্যারিয়ারেও খেলতে থাকেন দুর্দান্ত। বিশ^কাপের পর তাকে ২৫ মিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে দলে ভেড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।

৫ বছরে রিয়ালের হয়ে একটি লা লিগা, একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ মোট ছয়টি শিরোপা জেতেন। ২০১৪-১৫ মৌসুমের শুরুতে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিলেও এক মৌসুম শেষে তাকে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। একটানা ২০২২ সাল পর্যন্ত খেলে পিএসজির হয়ে ৫টি লিগ শিরোপাসহ এক ডজনের বেশি শিরোপা জেতেন। এরপর এক বছর খেলেন ইতালীয় ক্লাব জুভেন্টাসে। ততদিনে বয়স অনেক দূর গড়িয়েছে। ইউরোপে নিজের প্রথম ক্লাব বেনফিকায় আবার ফিরে যান ২০২৩ সালে। এই ক্লাবটির হয়েই শেষ করতে চান পেশাদার ক্যারিয়ার।

ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু থেকেই প্রাপ্তির আনন্দে ভরপুর থাকলেও জাতীয় দলের হয়ে ছিল এক যুগের হতাশা। বারবার শিরোপার কাছে গিয়ে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ইনজুরিতে পড়েন। যে কারণে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও তার খেলা হয়নি শেষের দুটি ম্যাচ। ফাইনাল ম্যাচের আগে দলের চিকিৎসক জানিয়ে দেন, এই মুহূর্তে ডি মারিয়ার পক্ষে মাঠে নামা সম্ভব নয়। নামলে সেটি তাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারে। বহু বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার সুযোগ তখন আর্জেন্টিনার সামনে। এমন অবস্থায় ডি মারিয়া অস্থির হয়ে ওঠেন। ফাইনালের আগের রাতে ঘুমাতে পারেননি মোটেই। শেষ পর্যন্ত ভোরে হোটেলে কোচ আলেজান্দ্রে সাবেলার কক্ষে গিয়ে ডি মারিয়া জানান, পরিণতি যাই হোক তিনি ফাইনালে মাঠে নামতে প্রস্তুত।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ক্ষতি স্বীকার করেও তাকে মাঠে নামাননি কোচ। চাননি একজন তারকা খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাক। টেলিভিশনে সেই ম্যাচ যারা দেখেছে, তারা জানে সেদিন সাইড বেঞ্চে বসে ডি মারিয়া কতটা ছটফট করেছেন মাঠে নামার জন্য। গঞ্জালো হিগুইন যখন সহজ গোলের সুযোগ মিস করেন, তখন পারলে যেন দৌড়ে মাঠে নেমে যান! শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির দেওয়া গোলে বিশ^কাপ অধরাই থেকে যায় মেসি বাহিনীর।

ওই সময় আর্জেন্টিনায় বেশ সমালোচনা হয়েছিল ডি মারিয়াকে নিয়ে। কিছু মিডিয়া ও আবেগী সমর্থক দাবি করে, নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে ফাইনাল ও সেমিফাইনালে খেলেননি ডি মারিয়া। এই অপবাদে হতাশায় ভুগতে থাকেন তিনি। এক পর্যায়ে জাতীয় দলের হয়ে আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু যে মা ছোটোবেলা থেকে ডি মারিয়াকে ফুটবলার হতে উৎসাহ জুগিয়েছেন তিনি বাধা হয়ে দাঁড়ান। মায়ের বক্তব্য ছিল, এভাবে মাথা নিচু করে নয়, আমি চাই তুমি আর্জেন্টিনার হয়ে আবার খেলবে এবং মাথা উঁচু করেই একদিন বিদায় নেবে। 

এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার পরপর দুটি আসরে ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে একটি শিরোপা ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হয়। দু’টি আসরেই দলের হয়ে দারুণ খেলেছেন ডি মারিয়া। মেসির সাথে আক্রমণভাগে তার জুটি ছিল প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্কের; কিন্তু শেষটা সুন্দর হয়নি। ২০১৯ কোপায় সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার।

অবশেষে ২০২১ সালে ভাগ্য খোলে। আবার কোপার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। এবার ব্রাজিলের বিপক্ষে গোল করে দলকে দেন বহু বছরের অধরা শিরোপার স্বাদ। সেই সাথে নিজেও জেতেন জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম শিরোপা। লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারেও সেটি প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা।

এরপরের সময়টা স্বপ্নের মতো কেটেছে ডি মারিয়ার। ২০২২ সালে ফাইনালিসিমায় ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ইতালির মুখোমুখি হয় আমেরিকা অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ৩-০ গোলে জেতা সেই ম্যাচেও একটি গোল করেন ডি মারিয়া। এরপরই আসে ২০২২ কাতার বিশ^কাপ। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে একটি গোল করেন তিনি। এর মাধ্যমে পরপর তিনটি শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা এবং তিনটি ফাইনালেই গোল করেন এই সুপারস্টার।

চলতি বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালের আগেই ডি মারিয়া ঘোষণা দেন এটিই হবে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ ম্যাচ। ফাইনালের আগে লিওনেল মেসি জানিয়ে দেন- প্রিয় বন্ধুকে সম্মানজনক বিদায় জানাতে চান। তাই এই ম্যাচে ডি মারিয়ার জন্যই খেলতে নামবে আর্জেন্টিনা দল।

শেষ পর্যন্ত কোপার শিরোপা জিতে হাসিমুখেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিদায় জানিয়েছেন ডি মারিয়া। আর্জেন্টিনার হয়ে তিন বছরের মধ্যে চারটি শিরোপা জিতেছেন- এরপর আর কিই বা চাওয়ার থাকতে পারে! মায়ের কথা মতো মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছেন। এ যেন এক স্বপ্নযাত্রার মধুর সমাপ্তি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ