সাডেন ক্লিক

সাইন্স ফিকশন লামিসা সানজানা ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা বেশ মজার একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় যদি তাতে মজার উপাদান খুঁজে নেওয়া যায়। রুহি বিজ্ঞান পড়তে একদম ভালোবাসতো না। তবে তার একজন শিক্ষক বিজ্ঞানের সেই মজার উপাদানটি ধরিয়ে দেয়। তাই নিয়ে পড়ে আছে রুহি বিগত পাঁচ বছর যাবৎ। ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্স চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরিচিত। কোয়ান্টাম মেকানিক্স রুহির পছন্দের বিষয়। তা-ই নিয়ে কাজ করছে বিগত দুই বছর। ঘুম, খাওয়াদাওয়া, পরিবার, বিশেষ কেউ...কিছুই তার জীবনে ঠিকঠাকভাবে নেই। আছে শুধু ল্যাব, কোড আর প্রবলেম। এসব নিয়েই যাচ্ছে সময়। এমনও সময় যায় যখন রাতে ল্যাবেই ঘুমিয়ে পড়ে রুহি।

আজও তাই। রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে। ল্যাবের জানালা সাধারণত খোলা থাকে না তবে আজ হয়তো বাতাসেই খুলে গেছে। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা এসে পড়ছে রুহির মুখের ওপর। রুহির ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে উঠে জানালা বন্ধ করলো। হাতের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো চারটা বাজে। বাইরে তাকিয়ে দেখলো বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু সে অবাক হলো আকাশের দিকে তাকিয়ে। আকাশ অন্ধকার না। নীল-বেগুনি মিলিয়ে একটা বিকেলের আকাশের রং ধারণ করেছে। অদ্ভুত ব্যাপার! এত সময় সে কখনো ঘুমায়নি। আজ এত সময় ধরে ঘুমালো সে। নিজেই অবাক হয়ে আধো ঘুমে বেরিয়ে গেল ল্যাব থেকে। ল্যাবের গেট খুলে দেওয়ালে হাত রাখতেই আবার চমকে উঠলো। ল্যাবের বাইরের দেওয়াল, করিডোর, রুমগুলো ধুলোবালি দিয়ে ঘেরা। জানালাগুলোর কাঁচ ভাঙ্গা। দরজাগুলো পোকা খাওয়া। গতকালও তো সব ঠিক ছিল; কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কী হলো?

হঠাৎ মনে হলো, এই সময়ে তো প্রফেসররা অফিসে থাকেন। তারা ঠিক আছেন কি না? রুহি অফিসের দিকে এগিয়ে গেল। অফিসে ঢুকতেই তার কপাল কুঁচকে গেল। অফিসে কেউ নেই বরং অফিস কেমন বদলে গেছে। ডান দিকের জানালাটা বালু সিমেন্টের দেওয়াল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রফেসরদের আলমারিটাও নেই। চেয়ার-টেবিলে ধুলো জমা। যেন অনেক দিন কেউ এখানে আসেনি। সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। এক রাতের ভেতর কী হলো এমন! কোনো ঝড়-তুফান আসেনি তো আবার? না কি ভূমিকম্পে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে? কী হয়েছে গতকাল রাতে?

চারপাশের এই অস্বাভাবিক সব দেখে চিন্তিত রুহি। পায়ের পাশে নরম কিছু অনুভব করলো। নিচে তাকাতেই চিৎকার করে লাফ দিয়ে উঠলো। তার চিৎকারে পায়ের কাছের ইঁদুরটাও ভয়ে দৌড় দিলো। হাফ ছেড়ে যেন বাঁচলো সে। ইঁদুরটা চলে যেতেই ছোট শ্বাস ফেললো রুহি। কী হলো? সবাই কোথায় গেল? ভাবতে ভাবতে আনমনে রুহি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। নামতে নামতে আবার চোখ আটকে গেল তার। গোল সিড়ির মাঝখান থেকে একটা বিশাল গাছ ছাদ পর্যন্ত চলে গেছে। গাছটার ডালপালা ছড়িয়ে গেছে সিঁড়ির আশেপাশে। দেখে মনে হচ্ছে যেন শত বছরের পুরোনো কোনো বটবৃক্ষ, হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল যখন এই সিঁড়ি দিয়ে সে আসলো তখন তো এই গাছ ছিল না। এবার একটু একটু ভয় হচ্ছে তার। মরেটরে যায়নি তো সে! নিজের হাত চেপে দেখলো, নাহ হাত তো তার হাতের মতোই। আর মরলে কি আর এখানে থাকতো? ঘুমের ঘোর কি কাটেনি এখনো? সে দুহাত দিয়ে দুচোখ ডলে ভালো মতো দেখলো। এবারও একই রকম সব। সে হাত বাড়িয়ে গাছটা ছুঁয়ে দেখলো সত্যিকারের গাছ কি না। হাত নিজের পর্যন্ত ফিরিয়ে এনে সে ঢোক গিললো। কী হচ্ছে? রাতে কিছু হয়েছে কী? রাতের কফির মধ্যে কিছু ছিল না তো? 

সে ভ্রান্তি, ভয় সবকিছু নিয়ে বড্ড অস্বস্তি বোধ করছে। তবে তার মাথা এখনো ঠাণ্ডা। 

‘ফিজিক্স পড়তে হলে ধৈর্য রাখতে হয়’ মা এই কথাটা প্রায়ই বলতেন। অবশ্য পড়তে গিয়ে মায়ের কথাটা প্রমাণও হয়েছে বেশ কয়েকবার। মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব সমস্যার সমাধান করতে পারার দক্ষতা রুহির আছে।

সে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো, ‘কেউ আছেন? কেউ কি আছেন আশেপাশে? দারোয়ান কাকা...’

কোনো শব্দ নেই। মেইন গেট থেকে বের হয়ে দেখলো, পুরো এলাকাজুড়ে দূর দূর পর্যন্ত কেউ নেই। বরং অনেক কিছু পরিবর্তন লাগছে। যেন অচেনা কোনো জায়গায় এসে পৌঁছে গেছে সে। সবকিছু বদলে গেছে। ওহ আল্লাহ! চারপাশের বিল্ডিং, মানুষজন, সুপার শপ, সবকিছু কোথায় চলে গেল? রুহি ভয়ে ছুটোছুটি করে আশেপাশে খুঁজতে লাগলো। চিৎকার করেতে লাগলো, ‘হ্যালো, কেউ আছেন? আশেপাশে কেউ আছেন? কী হয়েছিল? হেল্প.. হেল্প .. হেল্প মি প্লিজ।’

কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে। কোথায় গেল সব? ভয়ে চোখ ভেসে আসছে অশ্রু। দুহাতে সে মাথা চেপে ধরে মাঝ রাস্তায় বসে পড়লো।

মনে হচ্ছে চারিদিকে ধু ধু মাঠ আর তার মাঝে একটা ভাঙ্গাচোরা বিল্ডিংয়ের সামনে একটা রাস্তা। কী অদ্ভুত! 

হঠাৎ মাথায় এলো, কোনো স্বপ্ন নয় তো? সে দুহাতে চোখে ভাসা পানি মুছলো। নিজের মাথায় জোরে জোরে দুটো বাড়ি দিয়ে দেখলো, যদি ঘুম ভাঙ্গে। তাতেও কোনো লাভ হলো না। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। কী করবে কিছুই মাথায় আসছে না। কী হচ্ছে? সবাই কোথায় গেল? সব এমন কেন লাগছে? যেন শতাধিক পুরোনো কোনো জায়গা। চারপাশটা ভালো করে দেখছে সে। একটা কিছু ইঙ্গিত যদি পাওয়া যায়।

হঠাৎ দূরে ঝাপসা কিছু তার চোখে পড়লো। আর কিছুই মাথায় এলো না। সে উঠে দাঁড়ালো। কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড় দিলো সেদিকে। যেমন মরুভূমিতে ক্লান্ত পথিক মরীচিকা দেখে দৌড়ায়। সে জানে না সেখানে কী অপেক্ষা করছে তার জন্য। পথও ফুরোয় না। সে দৌড়ে চলেছে।

ক্লান্ত হয়ে আসছে পুরো শরীর। পায়ের গতি ধীর হতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে ইচ্ছেশক্তি একটু অবকাশ যেন চাইলো। অবশেষে সে একটু থেমে দাঁড়ালো। পিছু ফিরে তাকাতেই দেখলো সে অনেক দূর চলে এসেছে; তবুও সেই ঝাপসা বস্তুটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। সে হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা আকাশের দিকে করলো। দুচোখ খুলতেই অবাক হয়ে গেল। মধ্য দুপুরের মতো রোদ। মাথার ওপর এত উত্তাপ নিয়ে ছুটতে ছুটতে তার তৃষ্ণা পেয়েছে। হঠাৎ তার মনে পড়লো বৃষ্টির ফোঁটা চোখের পড়তেই ঘুম ভেঙেছিল কিছুক্ষণ আগে। এত তাড়াতাড়ি এই সময়ের পরিবর্তন কীভাবে ঘটলো! এত দ্রুত সময় ফুরিয়ে গেল? মনে হচ্ছে যেন কয়েক মিনিট আগেই তার ঘুম ভাঙলো। এত দ্রুত সময়ের এমন পরিবর্তন অস্বাভাবিক। 

সে নিজের চোখে গত কিছু মিনিটে যা যা দেখলো তার কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না। কেমন একটা ঘোরে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার। সব অদ্ভুত, বিচলিত! নিজের ওপরেও তার বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে ঘুমেই আছে, স্বপ্ন দেখছে। মানসিকভাবে সে খানিকটা দুর্বল হয়ে গেলেও থামেনি। ধীরে ধীরে আগে বাড়তে থাকলো। ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে থাকলো। 

ফিজিক্সের কোনো সমস্যা যখন সে সমাধান করতে না পারে তখন সবকিছুর শুরু থেকে শুরু করে। সে এখনো সবকিছুর শুরু থেকে ভাবতে লাগলো আর হাঁটতে লাগলো। সবগুলো ঘটনা শুরু থেকে প্লে করলো। 

তার ঘুম ভাঙ্গলো, ঘড়ি দেখলো, ল্যাব থেকে বেরোলো.... হঠাৎ থমকে গেল রুহি। একজন বুড়ো লোক, একটা বাক্সের মতো কিছু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুহি তার কাছে গেল। বিশাল দেহি এক লোক, ঝোলার মতো বিশাল পোশাক পরা, মাথায় একটা টুপি, মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি, রাগি চেহারা। রুহি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনি এখানে থাকেন?’

লোকটা ইশারা দিয়ে বোঝালো সে কথা বলতে পারে না এবং সে এইখানে থাকে না। রুহি আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘এখানে কোনো মানুষ নেই কেন?’ উত্তরে লোকটা হাত নেড়ে বোঝালো, সে জানে না।

‘এই জায়গাটার নাম কী জানেন?’

লোকটা রুহির পাশের বিলবোর্ডের দিকে ইশারা করলো। রুহি পাশের বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল। চোখের সামনে অন্ধকার ছেয়ে গেল ক্ষণিকের জন্য।

বিলবোর্ডে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা ‘সরকার কর্তৃক পরিত্যক্ত সম্পত্তি’। কীভাবে সম্ভব? একরাতে সব গায়েব কীভাবে হয়ে যায়? পরিত্যক্ত হয়ে যায় কী করে? কিছু একটা ঘটছে। সে জানে না। সে লোকটাকে জিজ্ঞেস করবে ভেবে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলো, লোকটা নেই। এত দ্রুত লোকটা কোথায় চলে গেল? মনে আর একটুও সাহস নেই। তাহলে কি ভূত বলে সত্যি কিছু আছে? চারপাশ ভালোভাবে দেখলো রুহি। কিছুই পেল না। কী হচ্ছে এসব? সে এখন কী করবে? যাও একটা মানুষের সন্ধান পেল তাও আবার হারিয়ে গেল। বিলবোর্ডের দিকে আবার তাকালো রুহি। সেখানে অদ্ভুত একটা লোগো দেখতে পেল। বিলবোর্ডে লোগো থাকাটা সাধারণ হলেও লোগোতে অক্ষর লেখা না চিহ্ন কিছুই বুঝতে পারছে না। সে হতাশ, ক্লান্ত এবং বিভ্রান্ত হয়ে ইউনিভার্সিটির বিল্ডিংয়ের দিকে এগোতে লাগলো। মাথা নিচু করে সে হাঁটছে। এই দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়ার শক্তি নেই। তবুও যাচ্ছে তার কোথাও তো ঠাই নিতে হবে। আশেপাশে কী আছে? কোন বিপদ তার অপেক্ষায় আছে কে জানে। পুরো শরীর ঝিমিয়ে গেছে তবুও সে হাঁটছে। হঠাৎ করে শীতল বাতাসে তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। হঠাৎ এত হিম ধরা বাতাস কোথা থেকে আসছে? উত্তপ্ত রোদে পোড়া দেহে এই আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে এখন আর অদ্ভুত লাগছে না তার কাছে। বরং ভালোই লাগছে। 

মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। কী হচ্ছে তার সাথে? এই রাস্তায় মানুষ গিজগিজ করছিল গতকালকেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই রাস্তায় কোনো মানুষই নেই? কী হয়েছিল গতরাতে?

একটু আগেও যে হাওয়া ভালো লাগছিল এখন হাড় কাঁপানো শীত লাগছে। সে থমকে দাঁড়ালো এবার। আকাশ থেকে বরফ পড়ছে। বরফ! হোয়াট দ্যা হেল! এখন না রোদ ছিল? ওয়েট, এখানে বরফ কীভাবে পড়তে পারে? 

জীবনেও যে আকাশ ভেঙ্গে বরফ পড়তে দেখেনি, সে হঠাৎ বরফ পড়তে দেখলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। কিন্তু রুহির রাগ লাগছে। প্রচণ্ড রাগ। দাঁত কিটকিট করছে সে রাগে। একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিয়ে ফের হাঁটবে কি না রাগে সে ফেঁটে পড়ছে। তার ওপর সাথে শীতের কাপড় নেই। এত শীত!

‘ইয়া আল্লাহ! কী দেখছি এসব! সে মাথা উচুঁ করে আকাশের দিকে তাকাতেই আবার হতবাক হয়ে গেল। রাত হয়ে গেছে। এবার রাগের মাত্রা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। নিজের মাথায় দুহাত দিয়ে চুলগুলো টেনে ধরলো আর পুরো দেহের সব জোর দিয়ে চিৎকার করে বসে পড়লো। রুহি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। তার হাত-পা কাঁপতে লাগলো।

মানুষের মস্তিষ্ক যখন কোনো কারণে ক্লান্ত হয়ে যায় তখন অনেক কাছের মানুষদের কথা মনে পড়ে, মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষাদ জেগে ওঠে। সে সময় হরমোনাল কারণেই নানান আবেগের সঞ্চার ঘটে। ঠিক তেমনি হলো রুহির সাথে। 

রুহির মায়ের নাম ছিল তুলি। সে-ও ফিজিক্স পড়তে ভালোবাসতো। বাবা যখন তাদের ছেড়ে চলে যান অন্য শহরে, তখন তুলি রুহিকে নিয়ে অনেক ঘুরতে বের হতো। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেখানে ছোট ছোট ঘটনার মাঝের বিজ্ঞানের গল্প শোনাতো। ছোটবেলায় এসব কল্পনার অংশ ছিল। বড়ো হতে হতে অনেক কিছু বদলে যায়। ম্যাথের জটিল সূত্র মনে রাখার চেয়ে বেশি ভালো লাগতো বন্ধুদের সাথে পিকনিক। এভাবে ছোট ছোট ব্যাপারে মায়ের সাথে ঝগড়া আর দূরত্ব সময়ের স্রােতে বেড়ে যেতে লাগলো। এতটাই বেড়ে গেল যে মায়ের ব্রেন ক্যান্সার কখন লাস্ট স্টেজে চলে গেছে তা সম্পর্কে কোনো ধারনাই ছিল না রুহির। মায়ের মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়া রুহিকে রঞ্জন স্যার আবার উঠে দাঁড়াতে শেখালেন। বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে শেখালেন। রঞ্জন স্যারের হাত ধরে অনেক দূর হাঁটার পর স্যারের ছায়াটাও মাথার ওপর থেকে চলে যায়। স্যার বলতেন, ‘সৃষ্টিকর্তার চেয়ে বড়ো বিজ্ঞানী আর কেউ নন। তাঁর সৃষ্টি করা সবকিছুই বিজ্ঞান। আর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ডিভাইস হচ্ছে মানুষ।’ 

রুহি জিজ্ঞেস করতো, ‘মানুষ কীভাবে স্যার?’

স্যার বলতেন, ‘মানুষের ব্রেন পারবে না এমন কিছুই নেই। এতটা বিজ্ঞানভিত্তিক কাজ করে এই ব্রেন, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। এই যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে দুই কদম এগোতে আমার এক মিনিটও লাগবে না। কিন্তু এই একই কাজ যখন একটা রোবটকে করতে বলবে তখন তার অনেক অঙ্ক কষতে হবে, মাপ-জোক করতে হবে। তাহলে বোঝো, এই ব্রেন কত সক্ষম। ব্রেন এমন এক ইঞ্জিন যাকে যত বেশি পরিশ্রম করাবে ততবেশি কাজ করে দিতে পারবে। ব্রেনকে কাজে লাগানো শিখতে হবে রুহি।’

স্যারের বলা অনেক কথাই রুহির জীবনে অনেক উন্নতির কারণ হয়েছে। আর মায়ের ভালোবাসাকে নিজের ভালোবাসায় পরিণত করতে সে লেগে পড়েছিল।

এই মুহূর্তে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। চোখে ভিজে গেছে। হাতে এতটা শক্তি নেই যে দুহাত দিয়ে চোখ মুছবে। ক্ষীণ শব্দে সে বলছে, ‘মা...মা।’ অঝোরে কান্নার পর রঞ্জন স্যারের একটা কথা হঠাৎ মাথায় বাজতে শুরু করলো, ‘ব্রেনকে যত বেশি পরিশ্রম করাবে সে ততো কাজ করে দিতে পারবে।’

স্যারের এই কথা তার কানে বারবার বাজতে লাগলো। সে উঠে দাঁড়ালো। আবার হাঁটতে শুরু করলো। আকাশ ভেঙ্গে আবার বৃষ্টি পড়তে লাগলো। কিন্তু এবার আর রুহিকে হতবাক করতে পারলো না। বিগত কিছু সময়ে আবহাওয়ার যথেষ্ট পরিবর্তন সে দেখেছে। এখন তাকে এগুলো প্রভাবিত করছে না। অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তা দিয়ে সে হেঁটে যাচ্ছে। হেঁটে যেতে যেতে দূর থেকে আলোর দেখা পেল। ইউনিভার্সিটির মেইন গেটে দুটো সোলার লাইট আছে। সেই লাইট জ্বলছে। সে গতিবেগ বাড়িয়ে দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল গেটের সামনে। হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন। এখন অনেকটুকু শান্তি অনুভব করছে রুহি। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় সে দেখছে না। বাইরে কিছু নেই। তার থেকে ভালো সে তার ল্যাবে ফিরে গিয়ে সন্ধান করার চেষ্টা করুক যদি কোনো উপায় বেরিয়ে আসে!

সে ল্যাবের ভেতরে গেল। ল্যাবের ভেতর ঢুকতে তার মনে পড়লো, ল্যাব তো ঠিক তেমনি আছে যেমন সে দেখেছিল। তবে ল্যাবের বাইরেই সব এমন পরিবর্তন কেন হলো? তার মানে যা হয়েছে ল্যাবের বাইরে হয়েছে। হঠাৎ মনে পড়লো তার মোবাইলটা না ছিল টেবিলে? সে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলো মোবাইলটা জায়গা মতোই আছে। কিন্তু মোবাইল সুইচড অফ। সে তো মোবাইল অফ করেনি! যাই হোক সে মোবাইল অন করলো। তার মোবাইলে কোনো সিগন্যাল দেখাচ্ছে না। তবুও সে কন্ট্যাক্ট থেকে প্রথম নম্বরটা ডায়াল করল। কিন্তু কলটা গেল না। সিগন্যাল না থাকা সত্ত্বেও কি ম্যাসেজ যাবে? প্রশ্ন আছে কিন্তু চেষ্টা তাকে করতেই হবে। সে সোবহান স্যারের নম্বরে একটা ম্যাসেজ লিখলো, ‘স্যার আমি আটকে গেছি। কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না। হেল্প লাগবে স্যার, প্লিজ।’ ম্যাসেজটা গেল না। বরং উলটো মোবাইল অফ হয়ে গেল। ধ্যাত!

কী করবে? কী করবে? পায়চারি করতে লাগলো রুহি। চিন্তায় মাথা ভন ভন করছে। কখনও সে ঠোঁট কামড়াচ্ছে আবার কখনো নখ। হঠাৎ মনে হলো ল্যাবে তো ওয়াইফাই আছে। ওয়াইফাই থাকলে গুগল করা যেতে পারে বা ফেইসবুকে ম্যাসেজ করা যেতে পারে।

কেন যে মোবাইলে ওয়াইফাইটা চেক করলো না। হয়তো চিন্তার কারণে মাথাটা ঠিকভাবে কাজ করছে না। তাকে আরো শান্ত হয়ে ভাবতে হবে।

ওয়াইফাই কম্পিউটারের সাথে কানেক্ট আছে কি না তা দেখার জন্য কম্পিউটারের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই কিছু অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলো রুহি। গত রাতে সে কোডিং-এর কাজ করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে একটা মেশিন বানানোর চেষ্টা করছে। সেই মেশিনের জন্য প্রায় দুবছর যাবৎ কাজ করছে। আর গত আট নয় মাস থেকে মেশিনটা যেন কাজ করে সেজন্য নানান কোড নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছিল। তার প্রফেসররা তো এমনও বলেছে এটা একটা ইম্পসিবল এক্সপেরিমেন্ট। তবুও সে থেমে যায়নি। আর কাল রাতে কিছু একটা পেয়েছিল যা হয়তো সব সমস্যার সমাধান করে দিতো। কোড সে লিখেছিল। কিন্তু সে এন্টার বাটনে ক্লিক করেছিল কি না মনে করতে পারছে না। ক্লিক করে ফেলেনি তো! সে চেয়ার টেনে বসলো। মনিটরে মেশিনের কিছু কার্যক্রমের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ রেকর্ড দেখাচ্ছে। কেন? কোনো গন্ডগোল হয়নি তো? কী হয়েছে খুঁজতে লাগলো রুহি।  কম্পিউটারের স্ক্রিনে এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো।

তার চোখ পড়লো জানালার দিকে। সে হতবাক হয়ে চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গেল জানালার কাছে। চোখের সামনে যা দেখছে তা বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তার চোখের সামনে একটা ইউএফও-এর মতো একটা উড়োযান আকাশ থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। সে এপাশ-ওপাশ দেখার চেষ্টা করছে আর তখনি ভেতর থেকে অদ্ভুত একটা কিছু বের হয়ে এলো। রুহি চোখ ছোট ছোট করে চোখের ফোকাস বাড়িয়ে দেখলো সেই অদ্ভুত জিনিসটা একটা রোবটের মতো। পেছনে তার কম্পিউটার থেকে টু টু করে শব্দ এলো। সে দৌড়ে গেল কম্পিউটারের কাছে। রেকর্ডারের মধ্যে নির্দিষ্ট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডে অচেনা ডিভাইস খুঁজে পাওয়ায় শব্দ করছে। রুহি শব্দটা বন্ধ করার জন্য স্পিকার অফ করে দিলো। বাইরের রোবটটা কার, এখানে আসার উদ্দেশ্য কী, কোনো ক্ষতিকারক অস্ত্র আছে না কি সেসব না জেনে তাদের নিকটে যাওয়া বিপজ্জনক হবে। তাই যাচাই করার জন্য সে আবার জানালার কাছে গিয়ে দেখলো, একটা নয় দুটো নয় কয়েকটা রোবট সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তারা একে অন্যের সাথে কোনো একভাবে কথা বলছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। রুহি এটুক তো বুঝে গেছে যে এই রোবটগুলোর সাথে এই জায়গাটা পরিত্যাক্ত হওয়ার পেছনে কোনো সম্পর্ক রয়েছে। এই রোবটগুলো আবার মানুষদের ক্ষতি করেনি তো! এদের পাঠালোই বা কে? এরা কি রোবটই? এলিয়েন নয় তো? নাহ কম্পিউটার বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কে জানে কম্পিউটারের সিগন্যাল যদি তারা পেয়ে যায়। আর এখানে এসে ক্ষতি করে! নানান প্রশ্নের সমাধান খুঁজে না পেলেও বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে রুহি কম্পিউটার অফ করে দিলো। কিন্তু কম্পিউটারের সিগন্যাল পেয়ে রোবটগুলো এখানে এসেছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ কাল রাত থেকেই তো কম্পিউটারটা অন করা। এতক্ষণ বাদে তারা কেন আসলো? আগেই তো আসতে পারতো।

এতগুলো রোবট একটা স্পেসশিপের মতো উড়োযানে ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না রুহি। ২০২৩ সালের মধ্যে এখন পর্যন্ত এই মডেলের এতগুলো রোবট কেউ বানায়নি। দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক হাই টেক মডেলের যন্ত্র এগুলো। এখনো এতটা উন্নত হয়নি আমাদের টেকনোলজি। এ নিয়ে পরে ভাবা যাবে, এদের সম্পর্কে ধারণা পাওয়া না অব্দি এদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা লাগবে। তাই ল্যাবের বাকি মেশিনগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে জানালার পাশে লুকিয়ে বসে আছে রুহি। জানালার পাশে বসে অনেক অদ্ভুত জিনিস দেখার সুযোগ হলো রুহির। রোবটগুলোর চোখে স্ক্যানার লাগানো। হয়তো তারা চোখ দিয়ে এলাকাটা স্ক্যান করবে। স্ক্যান করার সময় চোখ থেকে বেগুনি রশ্মি বের হচ্ছে। হয়তো এই বেগুনি রশ্মি মানুষ গুম করে দিতে পারে বা মেরেও ফেলতে পারে। এগুলো কি দেখছে সে!

ঘণ্টাখানিক পর্যবেক্ষণ করার পর উড়োযানটা চলে গেল। রুহি পর্দার আড়াল থেকে বাইরে বের হয়ে এলো। বিপদের আশঙ্কা নেই অনুমান করে সে বিল্ডিংয়ের বাইরে বের হলো। তার জানা মতে যে-কোনো উড়োযান জমিতে চিহ্ন ছেড়ে যায়। কিন্তু এই উড়যানটার কোনো চিহ্ন নেই।

হতাশার নিঃশ্বাসের সাথে সে ভেতরে ফিরতে গিয়ে তার মাথায় এলো অফিসটা যাচাই করে দেখি। যদি কিছু পাওয়া যায়। চেয়ারম্যান স্যারের অফিস নিচ তলাতেই। তাই সে সবার প্রথমে চেয়ারম্যান স্যারের অফিসেই গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দাঁড়াতেই টেবিলের ওপরে রাখা ফটোফ্রেমে মায়ের সাথে নিজের ছবি দেখে সে থমকে যায় কিছু মুহূর্তের জন্য। রুমের চারপাশে তাকিয়ে দেখলো এখানে অধিকাংশ জিনিস তার নিজের এবং কিছু জিনিস এমনও আছে যা তার নিজের পছন্দের সাথে মিলে যাচ্ছে। মায়ের দেওয়া হাত ঘড়িটা টেবিলে রাখা। স্যারের দেওয়া বইটা বুকশেলফের একদম ওপরে রাখা। দেরি না করে টেবিলের ড্রয়ার খুললো। একটা ডায়েরি পেল রুহি। প্রথম পাতায় নাম লেখা ‘রুহি তুলি মজুমদার’।

তাহলে কি সে টাইম ট্র্যাভেল করেছে? না কি অন্য টাইম ডাইমেনশনে আর এই সময় অনুযায়ী সে এখানের চেয়ারম্যান? 

সে অবাক হয়ে চেয়ারে বসে পড়লো। ডায়েরির ওপরের নামটা তার চোখ কেঁড়ে নিলো। মায়ের সাথে নাম মিলিয়ে নিজের নাম লেখার বেশ শখ ছিল রুহির। তবে বাবার নামেই যে অফিসিয়াল কাগজপত্রগুলো করা যা আর পরিবর্তন করা হয়নি। তাই কখনো মায়ের নামে নিজের পরিচয় দেওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। নিজের নামটা ডায়েরিতে দেখে অনেক কিছু যেন বুঝতে শুরু করলো সে। চোখ ভিজে গেল। কিছুক্ষণ নামে হাত বুলিয়ে ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রেখে সে পুরো রুমের সব কিছুই যাচাই করলো এবং বেশ কিছু জিনিস স্পষ্ট হতে থাকলো। হয়তো কোনো এক টাইম ডাইমেনশনে কিংবা ভবিষ্যতে এটা তার নিজের রুম। এখানে সে কাজ করতো। কিন্তু সে এই টাইম ডাইমেনশনে পৌঁছালো কীভাবে? আশেপাশের কেউ আবার নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে টাইম লুপ ক্রিয়েট করেনি তো? যাতে সে ফেঁসে গেছে? এমন হলে তো সেই এই এলাকার বেশ কিছু মানুষ হয়তো টাইম লুপে আটকে গেছে। এখন থেকে বের হতে হবে। সে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে ল্যাবে ফিরে গেল। 

কম্পিউটার অন করলো। হঠাৎ তখন মনে পড়লো সবকিছু। সেদিন রাতে সে যখন কোডিং করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে তখন হয়তো তার হাত লেগে এন্টার বাটনে ক্লিক হয়ে যায়। 

সে রেকর্ড ব্যাকআপ চেক করতে লাগলো। হ্যাঁ, ঠিক সিগন্যাল আছে। তার মানে তার এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল! খুশিতে চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠলো রুহি, ‘ইয়েস!’

পরক্ষণেই মনে পড়লো তার মানে তার তৈরি করা টাইম ট্রান্সপোর্টেশন মেশিন কাজ করছে। তাহলে এটা হয়তো টাইম লুপ নয়। অন্য কেউ এখানে আটকে নেই। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো। সে এই মেশিনের কারণে হয়তো ফিউচারে চলে এসেছে। তাহলে এটা কত সাল? গুগল করা যাবে কী? না কি আগে ফেরার কাজ করবে?

নাহ আগে দেখে নেওয়া দরকার। সে কম্পিউটার দিয়ে গুগল করে দেখলো সে ২০৬০ সালে আছে। কিন্তু গুগলের সবকিছু প্রতি সেকেন্ডে পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন এক সেকেন্ডের মধ্যে গুগল ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলে যাচ্ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রুহি এবার বুঝতে পারলো আবহাওয়ার পরিবর্তন, লোকটার হারিয়ে যাওয়া, এত লম্বা পথ, আর গুগলের পরিবর্তনের পেছনের রহস্য। এটা তার ঠিক করা লাগবে। সময়ের এইরূপ পরিবর্তন নিয়ে তাকে কাজ করতে হবে। দেখতে হবে, বুঝতে হবে।

তাহলে কি ২০২৩ সালে সব থেমে আছে? আগে ২০২৩ সালে ফিরে যেতে হবে। সে দেরি না করে কোডিং করতে শুরু করলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সময় হয়ে গেল বাড়ি ফেরার। শুধুমাত্র একটা বাটনে ক্লিক করার দেরি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে রুহি জানালার দিকে তাকালো। ডায়েরিটা হাতে চেপে ধরলো। মুখে একটা মলিন হাসি দিয়ে বলল, ‘প্রথমে কঠিন অনুভূত হলেও ভালো সময় কাটলো।’

এবং ক্লিক। বাইরে থেকে শব্দ শোনা যাচ্ছে। ল্যাবের গেট খুলে বেরিয়ে এলো রুহি। দরজার বাইরে জুনিয়র স্টুডেন্ট বিজন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফাইল হাতে নিয়ে।

‘মিস রুহি, আমরা তৃতীয়বারের মতো হাইটেক S04 রবো মডেল বানাতে অক্ষম হয়ে গেলাম। We are sorry.’

রুহি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হাইটেক S04 রবো মডেল!

কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর নির্বাচিত সায়েন্স ফিকশন

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ