শীতের দার্জিলিং অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি
ভ্রমণ সীমান্ত আকরাম জানুয়ারি ২০২৫
এপ্রিল ২০২৪। শীতের আমেজ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। রোজার ঈদের পরদিন আমাদের যাত্রা। এবারের যাত্রা ভারতের দর্শনীয় স্থান দার্জিলিং ও সিকিম। ‘চলো যাই বহুদূর ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলসে’র সাথে এবারের ভ্রমণটি আমরা বাই রোডেই করবো। আগে থেকেই যিধঃংধঢ়ঢ় গ্রুপে রাব্বির সাথে আমার পরিচয় হয়। যাত্রাপথে শাওন আর হিরার সাথে পরিচয় ঘটে। ভ্রমণে আমরা চারজনে একটা গ্রুপ করে নেই। গাড়ি শাঁ শাঁ করে চলছে গন্তব্য পানে। ভোর চারটায় পৌঁছি বুড়িমারীর চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারে। সেখানে সকাল পর্যন্ত সময় কাটাই।
সকালে ফ্রেশ হয়ে নাশতা সেরে বর্ডারে পৌঁছি। চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডারের অবস্থা খুবই নাজুক। ঈদের পরদিন হওয়ায় কয়েক হাজার যাত্রী বর্ডারে অবস্থান করছে। এপাশে একটা মাত্র কাউন্টার হওয়ায় আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এরকম বাজে অবস্থা আর কখনোই হয়নি। বর্ডারে ইমিগ্রেশন-এর কাজ শেষ করে রিজার্ভ গাড়ি করে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা হই। চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। পৌঁছাতে সময় লেগেছে দু’ ঘণ্টারও কিছু বেশি সময়। শিলিগুড়ি পৌঁছে সেখানে শের-ই-পাঞ্জাব হোটেলে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার গাড়িতে দার্জিলিং-এর উদ্দেশে রওনা হলাম। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং-এর দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তার কারণে সময় লেগেছে তিন ঘণ্টার মতো। রাস্তার দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম পরিবেশ মনোমুগ্ধকর আবহাওয়া আমাদের ক্লান্তি দূর করে দেয়। পাহাড়ি উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে গাড়ি চলছে লক্ষ্যপানে। রাত ৯টায় পৌঁছি দার্জিলিংয়ের লামা রোডে অবস্থিত হোটেল মারবেল ইন্টারন্যাশনালে। আমরা চারজন একটা রুমে উঠি। ফ্রেশ হয়ে পাশে অবস্থিত ইসলামিয়া হোটেলে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রামে যাই।
টাইগার হিল
পরদিন ভোর ৪টায় উঠে সবাই ঘুম ঘুম চোখেই তৈরি হয়ে নিলাম। আমাদের আজকের যাত্রার জন্য গাড়ি তার আগেই হোটেলের সামনে অপেক্ষমাণ। ৮ জনের সিটের গাড়িতে হিমেল ভাই, তিশা আপু, রিয়াজ আঙ্কেল ও আন্টিসহ আমাদের গাড়ি রওনা হলো দার্জিলিংয়ের প্রথম গন্তব্য টাইগার হিলের উদ্দেশে। দার্জিলিং শহর হতে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে এই টাইগার হিলের অবস্থান। দার্জিলিং বেড়াতে আসা পর্যটকদের পছন্দের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটিতে থাকে টাইগার হিল। ২,৫৯০ মিটার উচ্চতার এই পাহাড়ি চূড়া হতে দেখা যায় এভারেস্ট এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা, যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে। যথাসময়ে সেখানে গিয়ে দেখি সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে; আমরা অনেকটা পেছনেই গাড়ি হতে নেমে হেঁটে হেঁটে টাইগার হিলে গিয়ে দেখি চতুর্দিক এখনো কুয়াশায় ছেয়ে আছে। প্রচণ্ড শীতে এখানে তাপমাত্রা অনেক কম। কানটুপি, হাতমোজা, শীতের ভারী জামা-কাপড় পরিধান করতে হয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সবাই জবুথবু হয়ে আছি। ওপরে ওঠে দেখি স্তরে স্তরে সিঁড়ি সংবলিত গ্যালারিতে কয়েক হাজার দর্শনার্থীর উপস্থিতি। এখানে সূর্যোদয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার লালিমায় মাখা রূপ তো পরম আকাক্সক্ষার বস্তু পর্যটকদের জন্য। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে দক্ষিণের দিকে কার্শিয়াং শহর, তার কিছু দূরে তিস্তা, মহানন্দা, বালাসোন এবং মেচি নদী দেখা যায়। আমাদের মন্দ ভাগ্য, আকাশ পরিষ্কার না থাকায় সেদিন সূর্যোদয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার লালিমায় মাখা রূপ দেখতে পেলাম না। পাশেই নানান দোকানের পসরা সাজিয়ে বসিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। আমরা সবাই এক নেপালি ভদ্রমহিলার কাছ থেকে কফি পান করে কিছুটা উষ্ণতা উপলব্ধি করি।
বাতাসিয়া লুপ
মন খারাপের আবহ নিয়েই গাড়িতে উঠতেই গাড়ি রওনা হলো পরবর্তী গন্তব্য, বাতাসিয়া লুপের উদ্দেশে। জলপাইগুড়ি-দার্জিলিংয়ের মাঝে চলমান টয়ট্রেন-এর খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। আর এই বাতাসিয়া লুপে এসে টয়ট্রেনগুলো বাঁক ঘুরে দিক পরিবর্তন করে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে চলে যায়। দার্জিলিং শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঘুম নামক রেলস্টেশন এবং এর সন্নিকটেই এই বাতাসিয়া লুপ-এর অবস্থান। ব্রিটিশ শাসন আমলে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য দার্জিলিংকে যখন বেছে নেয় তখন এই টয়ট্রেন এর স্থাপন করা হয়; যা এখন ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব হেরিটেজের অংশ। সেই টয়ট্রেন এর বাঁক নেওয়ার জায়গা এই বাতাসিয়া লুপ। বাতাসিয়া শব্দের অর্থ প্রবহমান বাতাসের জায়গা আর লুপ অর্থ বাঁকানো ঘের বা পথের বাঁক। এই বাতাসিয়া লুপ ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক স্থাপিত রেল লাইনের বাঁক যেখানে ১৯৮৭ সালে ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধে নিহত সৈন্যদের স্মৃতিতে একটি গোলাকার চত্বর নির্মাণ করা হয়। সারা বিশ্ব থেকে দার্জিলিংয়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এই বাতাসিয়া লুপে যখন টয় ট্রেনগুলো বাঁক নিয়ে চলে যায় তা অবলোকন করা।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে বাতাসিয়া লুপ থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়, বিশেষ করে বাতাসিয়া লুপের চত্বরের মাঝে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকের মূর্তিটির পেছনে কাঞ্চনজঙ্গার পটভূমি, অদ্ভুত সুন্দর একটি দৃশ্য। কিন্তু এখানেও মেঘ কুয়াশার দল আমাদের পিছু ছাড়লো না। গাড়ি হতে নেমে নিজেদের মতো করে ঘুরে দেখতে লাগলাম চারিপাশ। কেউ কেউ স্থানীয়দের পাহাড়ি পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছবি তুললো। এখান থেকে চারদিকের দার্জিলিং শহরের মনোরম ভিউ পাওয়া যায়।
টি-গার্ডেন
বাতাসিয়া লুপ থেকে দার্জিলিংয়ে আমাদের হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে দশটা নাগাদ আবার বের হয়ে এলাম দিনব্যাপী ভ্রমণের উদ্দেশ্যে, কিন্তু ততক্ষণে আকাশের কিছুটা পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। এরই মাঝে এগিয়ে চললাম দার্জিলিং এর বিখ্যাত চা বাগান (টি-গার্ডেন)-এর উদ্দ্যেশে। রক গার্ডেন যাওয়ার পথে এই চা বাগান অবস্থিত। উঁচু-নিচু বিস্তীর্ণ পাহাড়ে থরে থরে সাজানো চা বাগান। দূর থেকে মনে হবে সবুজ গালিচা বিছানো। মাঝে মধ্যেই ছবি তোলার কিছু অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট রয়েছে। আমরা একটা পয়েন্টে নেমে ছবি তুলে নিলাম। পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপলাবণ্যে ভরপুর চা বাগানের দৃশ্যাবলি ক্যামেরা বন্দি করে নিলাম। এখানে ঘণ্টাখানেক সয়ম কাটিয়ে রওনা হলাম পরবর্তী গন্তব্য রক গার্ডেনের উদ্দেশ্যে।
রক গার্ডেন
চা বাগান থেকে বের হয়ে আরো কিছুক্ষণ সামনে এগুলোই দূর থেকে চোখে পড়বে রক গার্ডেন। দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদের পর্যটন বিভাগ নির্মাণ করে এই রক গার্ডেন। দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ঘুম স্টেশনের পূর্বে ডানদিকে মোড় নিয়ে এই রক গার্ডেনের অবস্থান। এটি মূলত একটি পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝরনাধারাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পিকনিক স্পট। পাহাড়ের গা বেয়ে যে পথে জলধারা নেমে এসেছে সেখানে অনেক পাথুরে পথের চারিধারা বাগান এবং বসার জায়গা, ছোট ছোট সেতু জুড়ে ঝরনার দু’পাশে যাতায়াতের রাস্তা এবং কিছু কৃত্রিম সজ্জা এই জায়গাটিকে দিয়েছে অন্যরকম একটা ইমেজ যা খুব সহজেই এখানে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকতেই পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের বুক বেয়ে পাথরের পথ বেয়ে নেমে আসা ঝরনার রূপে সত্যিই মুগ্ধ হলাম। একেবারে ঝরনার পাদদেশে কৃত্রিম বিশাল এক পদ্মফুল এবং তাকে ঘিরে গোলাকারের চত্বর মতো জায়গায় বেশ কিছু বসার জন্য ধাতব বেঞ্চ রাখা আছে। সেখানে থেকে দু’পাশ দিয়ে ঝরনার চলার পথ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে; পর্যটকের দল সেই পথে ছুটে চলেছে। আমি গিয়ে বেঞ্চিতে বসে পড়লাম, ঝরনার কলকল ধ্বনি এই নিশ্চুপ পাহাড়ি উপত্যকার নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে অদ্ভুত এক সুরেলা ঝংকার তৈরি করে চলেছে; অনেকটা সময় বসে রইলাম একাকী, দলের সবাই তখন ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। তখন শীতের আরামদায়ক রোদের ঝিলিক কিছুটা উষ্ণতা দিলো। অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে আমরা রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্যে।
হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট
হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট দার্জিলিংয়ের ক্যাম্পাসটি দার্জিলিং চিড়িয়াখানার সাথে একই স্থানে অবস্থিত। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯মে তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি মাউন্ট এভারেস্ট বিজয়ের পরপর ১৯৫৪ সালের ৪ নভেম্বর ভারতের দার্জিলিং-এ পর্বতারোহণকে জনপ্রিয় করতে প্রতিষ্ঠিত হয় হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্রুর উদ্যোগে এবং বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ের তত্ত্বাবধানে মূলত প্রতিষ্ঠা পায় এই ইনস্টিটিউট; যার প্রথম প্রশিক্ষণ পরিচালক ছিলেন তেনজিং নোরগে। প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট পর্বতারোহী এবং পর্বতারোহণের অন্যতম প্রচারক মেজর জয়াল। তিনি এই ইনস্টিটিউটকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। মূলত তাঁর দৌলতেই এই পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বাইরেও। এখানে নিয়মিত অ্যাডভেঞ্চার, বেসিক এবং উন্নত মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সগুলি পরিচালিত হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার প্রশিক্ষণার্থী এখান হতে পর্বতারোহণের নানান কোর্সে অংশগ্রহণ করে প্রশিক্ষিত হয়েছেন পর্বতারোহণে।
এইচ এম আই দার্জিলিংয়ের প্রবেশমুখেই রয়েছে ছোট্ট একটি বৌদ্ধস্তুপা, এর বাইরের অংশে ভ্রমণার্থীদের জন্য নানান পর্বতারোহণের অ্যাক্টিভিটি করার সুযোগ রয়েছে। এখান থেকে ওপরের দিকে উঠে গেলে ইনস্টিটিউটের মিউজিয়াম রয়েছে। তার বাইরের দিকে একটি মডেল পর্বতের ওপর পতাকা হাতে তেনজিং নরগে শেরপা দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্যাচু রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লক্ষ ভ্রমণার্থী এখানে বেড়াতে আসেন। এই ইনস্টিটিউট-এর মিউজিয়ামে পর্বতারোহণের নানান চিত্র, মডেল, পুস্তক-এর সাথে হিমালয়ের জীবন এবং সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত নানান জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে ভেতরটা। মিউজিয়ামের বাইরে একটি ক্যাফেটেরিয়া রেস্টুরেন্ট রয়েছে। রয়েছে হ্যান্ডিক্রাফটস এবং সুভেনিয়র-এর দোকান। ভবনের ওপরতলায় ট্রেনিং কোর্সের নানান ক্লাসসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলে এখানের ভবনগুলোতে।
এখান থেকে কিছুটা পথ সামনে গেলেই দেখা মিলবে ঞবহুরহম জড়পশ-এর। ছোট্ট একটি পাহাড়ে দড়ি বেয়ে পাহাড়ে ওঠা যায়। পর্বতারোহীরা কীভাবে পর্বতে আরোহণ করে তার ডামি নমুনা বলা যায়। জনপ্রতি ১০০ রুপি করে দিতে হয়। আমাদের দলের অনেকেই ওপরে উঠলেও আমার তেমন একটা আগ্রহ হয়নি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য দার্জিলিংয়ের ‘পিস প্যাগোডা’র উদ্দেশ্যে।
পিস প্যাগোডা
আমরা দার্জিলিং-এর পিস প্যাগোডায় পৌঁছানোর পর অনেকেই ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরা নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। অনেকেই পিস প্যাগোডাকে বৌদ্ধদের তীর্থস্থান মনে করলেও এটি মূলত বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার সন্ধানে সকল জাতি ও ধর্মের লোকদের একত্রিত করতে ডিজাইন করা হয়েছে, যার মূল মন্ত্র ‘বিশ্বশান্তি’।
দার্জিলিংয়ের পিস প্যাগোডাটির ভিত্তিপ্রস্তর ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে হলেও এর নির্মাণ শুরু হয় আরো অনেক বছর পরে। ১৯৯০-এর শুরুতে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ৩৬ মাসে সম্পন্ন হয় এবং ১৯৯২ সালের ১ নভেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এই প্যাগোডার উচ্চতা ৯৪ ফুট এবং প্রস্থে প্রায় ৭৫ ফুট। দার্জিলিং শহরের ভেতরেই ‘জালাপাহাড়’-এ অবস্থিত এই প্যাগোডা আমাদের হোটেল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে ছিল।
মানবতা এবং বিশ্ব শান্তিতে অহিংসার প্রতীক এই প্যাগোডায় প্রবেশের মুখে রয়েছে রাজকীয় সিংহের ভাস্কর্য। এখানে প্যাগোডার পাশেই রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির; এখানে বৌদ্ধের মূর্তির ছাড়াও নিচিদাতসু ফুজির ছবি রয়েছে। প্যাগোডার ভেতরে গৌতম বুদ্ধের চার আসনের মূর্তি দেখতে পাবেন। এখানে নানান শিল্পকর্ম রয়েছে যেগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গৌতম বুদ্ধের জীবন কাহিনী। বৌদ্ধ পূর্ণিমায় এই প্যাগোডা সংলগ্ন মন্দিরে উৎসবমুখর পরিবেশে বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম এই শুভ দিনটি উদযাপন করা হয়। সেখানে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে, ছবি তুলে আমরা সবাই রওনা দিলাম হোটেলের উদ্দেশে।
দার্জিলিং মল
হোটেলে ফিরে দুপুরের খাবারের পর আমরা কিছুটা অলস সময় কাটিয়ে বিকেলে বের হলাম দার্জিলিং মল এবং আশপাশের এলাকাটা ঘুরে দেখতে। বিকেলের গোমড়া মুখো আকাশের মেঘলা আবহে আমরা দার্জিলিং এর রাস্তাঘাট, মল চত্বর, দেখে সন্ধ্যার পর ফিরলাম। রাতের আলোকসজ্জার কারণে মলটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। শীতবস্ত্র আর আসবাবপত্রের বাহারি শপ। রয়েছে মজাদার নানান স্বাদের খাবারের দোকান। তিশা আপু দার্জিলিংয়ের বিখ্যাত মোমো খাওয়ালেন আমাদের। লোকজন কেনাকাটায় ব্যস্ত। আমিও এক হাজার রুপি দিয়ে একটি শীতের জ্যাকেট কিনে নিলাম। কেনাকাটা শেষে কয়েকজন চলে যাই ভারতের বিখ্যাত দার্জিলিংয়ের ট্রয়ট্রেন স্টেশনে। আমি পাশের চক মার্কেটে গিয়ে ভারতের সিম সংগ্রহ করে নিলাম। পরদিন আমাদের যাত্রা দার্জিলিং থেকে গ্যাংটকের উদ্দেশে। তাই সময় ক্ষেপণ না করে হোটেলে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে বিশ্রামে যাই।
পাহাড়ি জনপদ, চা বাগান আর ট্রয়ট্রেনের নগরী দার্জিলিং শহরটি পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয়। আঁকা-বাঁকা রাস্তা, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে দালান-কোঠা, শপিং মল, দোকানপাট ইত্যাদি। বহুজাতিক সম্প্রীতি, নানামুখী সংস্কৃতি আর বিস্তীর্ণ পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপলাবণ্যে ভরপুর দৃশ্যাবলি প্রশান্তি দেবে পর্যটকদের। দার্জিলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্যের হাতছানি, এই যেন বিপণ্ণ মননে স্বপ্নের শিহরণ।
আরও পড়ুন...