শিশিরের পরীক্ষাভীতি

গল্প মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী ফেব্রুয়ারি ২০২৪

শান্ত কোমল স্বভাবের ছেলে শিশির। পাশের গ্রামের হেফজখানায় পড়ে সে। সতেরো পারার হাফেজ শিশির। সতেরো পারা পর্যন্ত শেষ করতে তার কোনো সমস্যা হয়নি। খুব সহজে  সকলের মন জয় করে মনোযোগী হয়ে পড়াশোনা করেছে। মাদরাসার মোহতামিম, হাফেজ সাহেবগণ তাকে খুব ভালোবাসেন। গ্রামের চাচা, মামা, ভাই সহপাঠী সকলের স্নেহভাজন হয়ে হৃদয়ে আসন করে নিয়েছে শিশির। আঠারো পারার নতুন সবক নেবে সে। আগামীকাল শুক্রবার, শুক্রবারে নিয়মিত বাড়িতে আসে শিশির। এ সপ্তাহে বাড়ি এসে তার মামাতো ভাই মুকুলের সাথে দেখা হলো। মুকুল তার মায়ের সাথে বেড়াতে এসেছে শিশিরদের বাড়িতে।

সে গ্রামের একমাত্র আলিয়া মাদরাসা, সেই মাদরাসার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। শিশিরের সাথে মাদরাসার অনেক সুনাম সুখ্যাতির  বর্ণনা করেছে। স্বাধীনতা দিবসের আনন্দের কথা, বার্ষিক শিক্ষা সফরের মজা, মাহফিলের আনন্দ ইত্যাদি ইত্যাদি। শিশিরকে তাদের মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার কথা বললো মুকুল। 

এই যে শিশিরের মাথায় ঘুণ পোকা ঢুকলো সেই থেকে তার আর হিফজ পড়া ভালো লাগছে না। অনেক টালবাহানা করে তার হাফেজ হওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। বাবা-মা-আত্মীয়-স্বজন কারো অনুরোধ না রেখে শিশির  বাড়িতে থাকতে শুরু করলো। এভাবে তিন মাস কেটে গেল। জানুয়ারি মাসে তার ইচ্ছার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভর্তি করা হলো মোহাম্মদনগর আলিয়া মাদরাসায়।

হাফিজি মাদরাসার মতো এখানে নেই নাজেরা বিভাগ, কেরাতখানা, হিফজ বিভাগ। নতুন পরিবেশে মিশে চলতে শিশিরের কোনো সমস্যা হলো না। তার মামাতো ভাই মুকুল আছে খুব সহজে তাদের সখ্য আরো ঘনিষ্ঠ হলো। সময় মাস গড়িয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার সময় আসলো। পরীক্ষার রুটিন পেয়ে গেল সকল ছাত্রছাত্রী। শিশিরের মাথায় এবার আরেক ভূতে ভর করলো। পড়াশোনা ভালো হয়নি। গত তিন বছর আগে সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পড়াকালীন সময়ে হিফজ ভর্তি হয়েছিল। তিন বছর পরে এই পরীক্ষানির্ভর পড়াশোনার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা তার পক্ষে কঠিন  মনে হচ্ছে। আগামী রোববার তাদের পরীক্ষা। কী করবে শিশির?

মাথায় নানান চিন্তা তার। হাত খরচের মতো টাকা নেই পকেটে। শুক্রবার বিকেলবেলা পলাশ স্যারের বাসায় গেল শিশির। পলাশ স্যার শিশিরকে ভরসা দিলেন পরীক্ষার সাহস জোগালেন। অনেক কথাবার্তা বললেন। পলাশ স্যার শিশিরের হাতে একটা পাঁচশত টাকার নোট দিলেন, বললেন দোকান থেকে একটা মার্কার আনতে। পলাশ স্যারের কাছে টাকা ভাঙতি না থাকায় পাঁচশত টাকার নোট দিলেন। টাকা নিয়ে শিশির মোল্লারহাটের দোকানে গেল।

কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল তবু শিশির ফিরে এলো না।

স্যার ভাবলেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে হয়তো কাল সকালে আসবে এই ভেবে তিনি বিচলিত হলেন না। রাত যখন দশটা বাজে শিশিরের বাবা পলাশ স্যারের কাছে ফোন দিলেন, শিশিরের খবর বলতে পারে কি না? স্যার বিকেলের কথা বললেন, তারপরে স্যারের বাসায় আসার কথা থাকলেও আর আসেনি। পলাশ স্যার শিশিরদের বাসায় গেলেন, দেখলেন বাড়ির সবার মাঝে হতাশা। শিশিরকে পাওয়া যাচ্ছে না! আত্মীয়-স্বজনের বাসায় দফায় দফায় ফোন করে খোঁজ পাওয়া গেল না। মসজিদের মাইকে প্রচার হলো। শিশিরের খোঁজ পেলে বাসার পৌঁছে দিলে রীতিমতো সম্মানিত করা হবে। চারিদিকে  ছোটাছুটি বেড়ে গেল। বেড়ে গেল পলাশ স্যারের টেনশন।

আবুল চাচা এই খবর শুনে চলে আসলো শিশিরদের বাসায়। তিনি বললেন সন্ধ্যার আগে বেলে ডাঙ্গা বাজারের কালীগঞ্জ রোডে তাকে দেখছিল। শুরু হলো মাইকিং।

একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি!

একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি!

আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নে প্রচার করা হলো। রেডিও নলতায় প্রচার হলো। পত্রিকায় শিশিরের ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি নিল তার পরিবার। এমন সময় শিশির তার মায়ের ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কথা বললো। 

- আম্মু আমি খুলনায়। আমাকে নিয়ে যাও।

ফোন রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো তানজিলা সিদ্দিকা। 

- খুলনায় কোথায় আছে শুনে নেওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল। 

ঐ নম্বরে ফোন দিয়ে জানা গেল এটা ফোনের দোকান। সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের পাশে। মোটরবাইক নিয়ে দ্রুত ছুটলেন শিশিরের মামা হাফিজ মাস্টার। তিন ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছালেন সোনাডাঙ্গায়। খুঁজে পেলেন চায়ের দোকানে শিশিরকে। কীভাবে এখানে আসলো এসব শোনার আগে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো হাফিজ মাস্টার। 

বাসায় ফিরে স্বাভাবিকভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলো কীভাবে সে খুলনায় গেল। কে তাকে সহযোগিতা করেছে।

সে বললো, বালিয়াডাঙ্গা বাজার থেকে একটা অচেনা লোক তাকে পাশে ডেকে একটা লজেন্স খেতে দিলো এরপর সে আর কিছুই বলতে পারে না কিছুই জানে না। এটুকু বলে শিশির তার মাকে বললো, আমি বসতে পারছি না আম্মা। আমাকে শোবার ব্যবস্থা করো আম্মা।

কোনো বিষক্রিয়া শরীরে আছে কি না সন্দেহ দূর করার জন্য হাফিজ মাস্টার সনজিব ডাক্তারকে ডাকলেন। ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন কোনো সমস্যা নেই। একটু দুর্বলতা আছে। দু’ চার দিনের মধ্যে সব কেটে যাবে। বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিলেন।

বেশ কিছু দিন কেটে গেল। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাও শেষ হলো। শিশির এখন পুরোপুরি সুস্থ। আবার মাদরাসায় যাওয়া শুরু করলো সে। দিন মাস সময় গড়িয়ে এবার বার্ষিক পরীক্ষার সময় সমাগত। আগামী তেরোই নভেম্বর থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। ক্লাসের চাপও একটু বেশি। প্রতিদিন শিক্ষকরা নতুন নতুন সাজেশন দিচ্ছেন। শিশিরের বাবার তদারকির কারণে সকল শিক্ষকমণ্ডলী শিশিরের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখে। তাকে সাহস জোগায়। বিশেষ যত্নের সাথে বাবা মা তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

অবশেষে বার্ষিক পরীক্ষার নির্ধারিত দিন চলে আসলো। 

আজ শনিবার। আগামীকাল শিশিরের বার্ষিক পরীক্ষা। আসরের নামাজ সে মোল্লারহাট বায়তুল মামুর জামে মসজিদে জামায়াতের সাথে পড়লো। নামাজ শেষে নানান ভাবনা বাসা বাঁধলো তার মাথায়। পরীক্ষা ভীতি নিয়ে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় পলাশ স্যারের মার্কার কেনার পাঁচশত টাকা দিয়ে খুলনায় গিয়েছিল সে।

অজানা অচেনা মানুষ তাকে লজেন্স খাইয়ে অচেতন করে নিয়ে যাবার ঘটনা ছিলো সম্পূর্ণ নাটক। পরীক্ষা ভীতির কারণে এই ছাড়া আর কোনো পথ সে আবিষ্কার করতে পারেনি। তার এই ঘটনায় কত ভোগান্তি হলো পলাশ স্যারের, তার মামা হাফিজ মাস্টারের। বাবা মা’র বেড়েছিল কত পেরেশানি! এসব ভাবতে ভাবতে সময় পার হয়ে যায় শিশিরের। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। একটু পরে সূর্য ডুবে যাবে। যা করার তাকে করতে হবে দ্রুত, তা না হলে রাতে তাকে একটা উল্লেখযোগ্য সময় বাবা-মায়ের পাশে বসে আগামী কালকের পরীক্ষার জন্য বই নিয়ে বসে থাকতে হবে। পড়ার ভান করতে হবে, সেটা বড়ো কষ্টকর। ভাবা চিন্তার সময় শেষ, পরীক্ষা ঝামেলায় যাবা যাবে না। গফফার মেম্বরের দোকান থেকে একটা নতুন ব্লেড কিনলো শিশির। 

এবার মোহাম্মদ চাচাদের পরিত্যক্ত পাচিলের ধারে লুকিয়ে মাগরিবের নামাজের জামায়াত শুরু হলে সাথে সাথে শিশির সেই নতুন ব্লেড দিয়ে তার ডানহাতের কবজিতে ব্লেড দাবিয়ে দিয়ে পোঁচ টানলো! 

- কী সর্বনাশ!

ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। তার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি গভীর হয়ে জখম হলো তার হাত। 

লুঙ্গি দিয়ে চেপে ধরে চিৎকার করতে করতে বাড়ির ভেতর চলে গেল। তার চিৎকারে মা দ্রুত এসে যা দেখলো তাতে স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। কান্নাকাটির রোল পড়ে গেল বাড়িতে। মাগরিবের নামাজ শেষ হতে না হতেই বাড়িতে হুলস্থুল কাণ্ড শুরু হলো।

শিশিরের বাবা মসজিদ থেকে এসে এই দৃশ্য দেখে রীতিমতো ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন। ডাক্তার ডাকা হলো। ডাক্তার আসলো তাদের বাড়িতে, সাতটি সেলাই দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো শিশিরের ডানহাতে। 

কীভাবে তার হাত কাটলো জিজ্ঞেস করলেন শিশিরের মামা হাফিজ মাস্টার। 

খুব ঠাণ্ডা ক্ষীণ স্বরে বললো, মাসুদ!

- তাহলে মাসুদ তার হাত কেটে দিয়েছে? 

শিশিরকে অনেকভাবে জিজ্ঞাসা করলেও সে আর কিছুই বলেনি।

রাতে শিশিরের বাবা ও মামা হাফিজ মাস্টার মাসুদদের বাসায় গেলেন। মাসুদের বাবা একজন রাজমিস্ত্রি। মাসুদের আম্মা তাদের বসতে দিলেন। হাফিজ মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, মাসুদ কই?

মাসুদের আম্মা বললেন, ও ওর বাবার সাথে একটু আগে সাতক্ষীরা থেকে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি এসেছে। ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসেছে, কাল ওদের বার্ষিক পরীক্ষা। ডেকে দেবো? 

- না, থা...ক, ডাকার দরকার নেই।

- তা আপনারা কী মনে করে আসলেন? 

হাফিজ মাস্টার বললেন, আমরা এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই একটু আসলাম। ভালো থাকেন বলে বারান্দা থেকে নেমে পড়লেন।

হাফিজ মাস্টার আর শিশিরের বাবার আর বুঝতে বাকি থাকলো না ঘটনার ঘনঘটা কী। তারা নীরবে বাসায় ফিরলেন। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো, সবাই নতুন ক্লাসে উত্তীর্ণ হয়ে নতুন বইয়ের গন্ধে সরবপাঠে মুখরিত। 

আর শিশির তার ডানহাতের ক্ষত নিয়ে বিব্রত!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ