লিথাল ১.০
সাইন্স ফিকশন মাহফুজুল হক রিফাত ডিসেম্বর ২০২৪
আমি আওসাফ মাহাথির। লোকে নামের পূর্বে বিজ্ঞানী লাগিয়ে ডাকলেও, এই বিজ্ঞানী উপাধি লাগানোর যোগ্যতা আমার নেই। আমি আত্মহত্যা করলে কখনোই কেউ জানতে পারতো না আমার জন্ম এই পৃথিবীর মানুষের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারতো। হয়তো প্রতিটা মানুষেরই জানা উচিত যে, বিষ তৈরির পূর্বে এর প্রতিষেধক নিয়ে ভাবা দরকার সবসময়। আমি চাই আমার এই পরিণতি থেকে সবাই শিক্ষা নিক। আমার এই বত্রিশ বছর বয়সি জীবনে অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করেছি রোবট তৈরির পরিকল্পনায়। নিজের স্ত্রী সন্তানের খেয়াল রাখার সময়ও ছিল না। আমার বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর আমার বাবা-মা দু’জনকেই হত্যা করা হয়েছিল। কে বা কেন তাদের হত্যা করেছে সেই রহস্যের সমাধান কীভাবে করবো সেটা এখনো জানি না।
তখন আমি আমার স্ত্রী মিনাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। মিনা সন্তানসম্ভবা ছিল। আর সেদিনই আমার মেয়ে ঝুলি এই পৃথিবীতে আসে। সুখবরটা বাবা-মাকে জানাতে প্রায় দৌড়ে বাড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু ভাবতেই পারিনি আমার জন্য এত বড়ো একটা বিস্ময় আর রক্ত শীতল করা মর্মান্তিক মুহূর্ত অপেক্ষা করবে। আমি দু-চোখে বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে আমার বাবা আর মায়ের প্রাণহীন দেহ দুটো। বুঝতে পেরেছিলাম যে, কিছুক্ষণের জন্য আমি হয়তো বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। হয়তো ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের ওপর কেউ হামলা করেছিল, সেটা বোঝা যাচ্ছিলো। আর অবাক করা বিষয়, দু’জনকেই গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। আমার অথবা আমার পরিবারের কারো যে এমন কোনো শত্রু থাকতে পারে সেটা অন্তত আমার জানা ছিল না। স্থানীয় পুলিশ তিন মাস তদন্ত চালানোর পরেও ব্যর্থ হয়ে এই কেইসের ফাইল বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে আমার জন্য সেদিনই দুটো সুসংবাদও ছিল। একটি হলো, আমি বাবা হয়েছিলাম। আর দ্বিতীয়টি হলো বুঝতে পেরেছিলাম যে সেদিনই প্রথমবারের মতো আমার তৈরি রোবট কমরেড ১.০ সচল হয়েছিল, তাও শুধু একবারের জন্য। কমরেডের আকৃতি ও ক্ষমতা সম্পর্কে সামান্য ধারণা দিয়ে রাখা ভালো। কমরেড দেখতে সাধারণত মানব আকৃতির। উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। কমরেডের আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো তার উন্নতমানের প্রসেসর। যার কারণে বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে সে অন্য সব রোবট থেকে এগিয়ে। পৃথিবীর যে-কোনো তথ্য কিংবা বিষয় সম্পর্কে সে মুহূর্তের মধ্যেই সকলের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। তাছাড়া কমরেডের চোখে মিনি হেক্সটন নামক এক জোড়া মাইক্রো ক্যামেরা ব্যবহার করেছি। যার রেজ্যুলেশন ৩৩৩ মেগাপিক্সেল। সে নিজের চোখ দিয়ে সামনের সকল কিছু স্ক্যান করে নিজেই ব্রাউজার থেকে সেটি সম্পর্কে জানতে পারে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই রোবট তার এক হাত দিয়েই সর্বোচ্চ এক হাজার কেজি ওজনের বস্তু বহন করতে সক্ষম। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন আমার আবিষ্কার কতটা ভয়াবহ হতে যাচ্ছিলো।
কমরেডের প্রসেসরের মাধ্যমে আমার কম্পিউটার দিয়েই তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কমরেডকে তৈরির উদ্দেশ্য ছিল আমার বিশ্বস্ত একটা সঙ্গী পাওয়া। যে আমার কথায় পৃথিবীর সকল অসম্ভব কাজ করতেও প্রস্তুত থাকবে। বিশ্বকে আমার বিস্ময়কর আবিষ্কারটি দেখাতে চেয়েছিলাম। নিজেকে সব বিজ্ঞানীদের সেরা করে তোলাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। হয়তো এটাই আমার নিজের মধ্যে থাকা লোভ আর অহংকার। যা সবসময় মানুষের ধ্বংসের কারণ হয়। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হয়েছিল। একদিকে স্ত্রী-সন্তান, আর অন্যদিকে আমার মানসিক অবস্থা। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনি কীভাবে এইসব ঘটনা ঘটে গেল। কমরেডকে নিয়ে আমার আর কোনো চিন্তাভাবনা ছিল না। মেয়ে ঝুলিকে নিয়েই কাটতো আমার দিন। সময়ের সাথে ঝুলিও বড়ো হতে লাগলো। আমি কখনোই নিজের পরিবার নিয়ে ভাবতাম না। সবসময় এক রোবট নিয়েই পড়ে থাকতাম। এখন নিজের মেয়েটাকে দেখলে কেমন জানি একটা চোখের শান্তি পাওয়া যায়। যখন সে হামাগুড়ি দিয়ে আমার পায়ের কাছে এসে সামনের ছোট্ট দুটো দাঁত বের করে একটা হাসি দেয়। তখন মনে হয় আমার বুকে বুঝি জান্নাত নেমে এসেছে। ঝুলিকে এখন আমার থেকে এক মুহূর্তের জন্যও দূরে রাখা যায় না। শুনেছি মেয়েরা নাকি তার বাবাকেই বেশি ভালোবাসে। মায়া কি জিনিস সেটা হয়তো কমরেডকে নিয়ে পড়ে থাকলে কখনোই বুঝতাম না। তবে সারাদিন কর্মহীনভাবে বাড়িতে বসে থাকাটা আমার স্ত্রী মিনার কাছে একদম ভালো লাগতো না। আর লাগবেই বা কীভাবে? একটা মেয়ে শিক্ষকতা করে সংসার চলায়, আর তার স্বামী ঘরে বসে খায়, সেটা কার ভালো লাগবে? মিনার অনুরোধেই প্রায় দুই বছর পর আমি আবার কমরেডকে সচল করার পরিকল্পনা শুরু করলাম। আমার সায়েন্স ল্যাবটা আকারে বেশ বড়ো। ল্যাবের এক কোণায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কমরেড। আবছা আলোতে বেশ ভয়ংকর দেখাচ্ছে তাকে। আমি কমরেডের কাছে গিয়ে হঠাৎ ভিন্নরকম কিছু অনুভব করলাম। কমরেডের দেহে যেন এখনও প্রাণের সঞ্চার আছে। মনে হচ্ছিলো কিছুক্ষণ পূর্বেও হয়তো সে সচল ছিল। কিন্তু কেন এমন মনে হচ্ছে ঠিক বুঝলাম না। ধুলোবালি মুছে আবার কমরেডের পুনরায় সংস্কার শুরু করলাম। আমি পূর্বেই তার ব্যাটারি চার্জ হওয়ার জন্য সৌর প্যানেলের ব্যবহার করেছিলাম। অ্যাকচুয়েটরে কিছুটা ত্রুটি ছিল। যার কারণে সে নিজ পেশি নাড়াচড়া করতে পারতো না। আপাতত সংস্কারের ফলে নিশ্চিত হলাম হাত-পা নাড়ানোর জন্য কোনো সমস্যা হবে না এবার। সেন্সরের ব্যাপারটাও সামান্য পরিবর্তন করলাম। আশা করি এখন তার মধ্যে কিছুটা হলেও মানুষের মতো অনুভূতির সৃষ্টি হবে। কমরেডের দেহে পুনরায় টাইটানিয়াম ধাতুর ব্যবহার করলাম যেন সহজে তাকে ধ্বংস করা না যায়। তাকে অগ্নিনির্বাপকের কাজসহ সকল প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ আমাদের মানবজীবন চাইলেই খুব সহজ করতে পারতাম এই রোবটের মাধ্যমে। দীর্ঘ ছয় মাস চেষ্টার ফলে আমি চূড়ান্তভাবে কমরেডকে সচল করতে সক্ষম হলাম। মনে হয়েছিল আজকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষ। আমার সফলতা যে এত দ্রুত হবে ভাবতেই পারিনি। কমরেড হয়ে উঠলো পৃথিবীর সবচেয়ে মজবুত, কার্যকারী এবং বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একটি রোবট। ভেবেছিলাম কমরেডকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহারযোগ্য করার পরই তাকে সকলের সামনে প্রদর্শন করবো। কিন্তু কখনো ভাবতেই পারিনি, আমি যে কত বড়ো ভুল করে ফেলেছি।
আসলে যেই পৃথিবীতে স্বয়ং সৃষ্টির সেরা জীব তার সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রতারণা করে, সেখানে আমার তৈরি লোহার যন্ত্র কমরেড ১.০ তো শুধু মাত্র রোবটই।
নিজের তৈরি একটা রোবটকে বিশ্বাস করেছিলাম আমি। যাইহোক মূল ঘটনায় আসা যাক। আজ সকাল নয়টা বিশ মিনিট সময়ের ঘটনা। আমি, মিনা এবং ঝুলি টেবিলে বসে সকালের নাস্তা করছিলাম। কমরেড আমার কম্পিউটার ল্যাবে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রোদ থেকে নিজেকে চার্জ করছিল। কমরেডকে একদিন চার্জ করা হলে সর্বোচ্চ দশ দিন সে খুব ভালোভাবে ব্যাকআপ দিতে পারে। ঝুলি আমাদের পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আমার সায়েন্স ল্যাবের দিকে যাচ্ছে। ল্যাবের দরজাটা খোলা। ঝুলির কারণেই ল্যাবের সকল ক্ষতিকর পদার্থ সাবধানে রাখা আছে। ঝুলি এখন নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এখনো মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না। ঝুলির সায়েন্স ল্যাবে যাওয়া দেখে মিনাকে বললাম, যাও ওকে নিয়ে আসো। মিনা উঠতে উঠতেই হঠাৎ কমরেডের সচল হওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। কিন্তু ঝুলি তো তাকে সচল করতে পারবে না।
ঝুলির উচ্চতা এমনও না যে, কমরেডের ঘাড়ের কাছের সুইচ চাপতে পারবে। যদিও কমরেডের সাথে ঝুলি কয়েকদিন খেলা করেছে। কিন্তু আজকে কী হলো? হঠাৎ করেই ঝুলি চিৎকার দিয়ে উঠলো। যতটুকু বুঝলাম আমার মেয়ে জীবনের প্রথমবার বাবা শব্দটা উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছে। দ্রুত দৌড়ে আমার সায়েন্স ল্যাবে গিয়ে যা দেখলাম সেটা মনে হলে এখনও গা শিউরে ওঠে। আমার মেয়ে ঝুলির গলা চেপে ধরে আছে আমারই তৈরি দানব কমরেড ১.০। ঝুলির দেহটা মাটি থেকে দুই ফুট ওপরে। তার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা তার দেহের সমগ্র শক্তি দিয়ে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই হাত যে কমরেডের। যেই হাত চাইলেই এক হাজার কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে। মিনা দৌড়ে গিয়ে ঝুলিকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি বারবার কমান্ড দিয়ে যাচ্ছিলাম যে, কমরেড ওকে ছেড়ে দাও, ওকে ছেড়ে দাও। কিন্তু না, কমরেড আমার কথা শুনছেই না। কিছুতেই ঝুলিকে মুক্ত করাতে পারছি না। কমরেডের ঘাড়ের কাছে সুইচটা অফ করার জন্য সামনে এগিয়ে যেতে, অন্য এক হাত দিয়ে সে আমাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ঝুলির দেহ নাড়াচড়া কমে আসতে লাগলো। তার দেহটা স্থির হয়ে গেল। আমার ঝুলির নাক দিয়ে টপ টপ করে রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। এক পর্যায়ে কমরেডের হাত ঝুলির গলা থেকে নেমে আসলো। ঝুলির দেহ ঠাণ্ডা হয়ে আছে। হৃৎস্পন্দনও থেমে গেছে। কখনোই ভাবিনি নিজের মেয়েকে এই অবস্থায় দেখবো। আমি ঝুলিকে কোলে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। বুকে বারবার চাপ দিয়ে হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এবার ঘটলো আরেক ঘটনা। মেয়ের এই অবস্থা দেখে মিনা স্তব্ধ মূর্তির মতো হয়ে গিয়েছিল। হয়তো সেও বুঝে গিয়েছে যে আমাদের ঝুলি আর বেঁচে নেই। আমি ঝুলিকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, খেয়ালই করিনি এবার কমরেড মিনার গলা চেপে ধরেছে। তার গলায় ধরেই হাঁটতে হাঁটতে ল্যাব থেকে বাইরে নিয়ে গেল কমরেড। এবং বারবার উচ্চারণ করতে লাগলো, “I Will destroy this mankind” আমি ঝুলিকে রেখে কমরেডের পিছু ছুটলাম মিনাকে ছাড়ানোর জন্য। কিন্তু আমার জানা আছে কমরেডকে কমান্ড দিয়ে কোনোকিছু না শোনাতে পারলে তাকে ধ্বংস করা ছাড়া আর একটাই পথ আছে। আর সেটি হলো- কম্পিউটার ল্যাবে গিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি কমরেড এটাও পারবে যে, সে তার চোখ দিয়ে স্ক্যান করে মানুষের মনের কথা বুঝে ফেলতে পারে। এটা কীভাবে সম্ভব? মিনাকে ছুড়ে ফেলে দিলো অনেক দূরে। কমরেড আমাকে কম্পিউটার ল্যাবে যাওয়া থেকে বিরত করার চেষ্টায় লাগলো। আর কিছুদূর যেতে পারলেই আমি সফল হতো পারতাম। কিন্তু কমরেড আমার বুক বরাবর ধরে অন্যদিকে ছুড়ে মারলো। আমার বুকের পাঁজরের হাড় যে কয়েকটা ভেঙে গেছে সেটা তখনই বুঝেছিলাম। মিনার দেহটা অনেক দূরে পড়ে আছে। দেহে যে প্রাণ নেই সেটাও বোঝা যাচ্ছে।
কমরেড এবার আমাকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে আসছে। আমি চিৎকার করে বলেছিলাম, ঈড়সৎধফব ংঃড়ঢ় হড়.ি জবাবে কমরেড যা উত্তর দিয়েছিল, সেটা শুনে আমি বিস্ময়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। কমরেড ভয়ার্ত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিল, “I’m not comrade, Call me Lethal 1.0.” লিথাল অর্থ প্রাণঘাতী। তাকে আমি সঙ্গী ভেবে নাম দিয়েছিলাম কমরেড ১.০। কিন্তু দিন শেষে সে একটা প্রাণঘাতী রোবটেই পরিণত হলো। তাই এখন থেকে আমিও তাকে লিথাল ১.০ই নামকরণ করলাম।
জানি লিথাল একটি দানবে পরিণত হয়েছে। তার অস্তিত্ব মানবজাতির জন্য কতটা ভয়ংকর হবে সেটা ভেবেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। তাকে ধ্বংস করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার কাছে। আর তাকে ধ্বংস করতে হলে আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে।
আপাতত আমি আমার সায়েন্স ল্যাবে যেতে পারলেও বাঁচা সম্ভব। লিথাল তার লোহার শক্ত হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আমি হামাগুড়ি দিয়ে সায়েন্স ল্যাবের দিকে যেতে লাগলাম। লিথালের চলন গতি এতটাও দ্রুত নয়। তাই আমি সায়েন্স ল্যাবে এসে দরজা দিতে সক্ষম হলাম। লিথাল চাইলে এই ঘর নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিতে পারবে। কেবল মাত্র আমার এই সায়েন্স ল্যাবটা ছাড়া। আমার সায়েন্স ল্যাবের দেওয়াল ও দরজা লিথালের দেহ থেকে ছয়গুণ বেশি মজবুত। এর কারণ এটা আমার তৈরি হাইকোপ্লেন দ্বারা গঠিত। আমার তৈরি অ্যান্টি হাইকোপ্লেন ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি এখনো আবিষ্কার হয়নি যা হাইকোপ্লেনকে ধ্বংস করতে পারবে।
ঝুলির নিথর দেহটার দিকে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি সে আবার আমাকে বাবা বলে ডাক দেবে। আমার জন্যই আজ আমার স্ত্রী আর মেয়ের মৃত্যু হলো। কীভাবে আমি নিজেকে ক্ষমা করবো?
মানুষ রোবট সৃষ্টি করে মানুষের গোলামি করার জন্য। কিন্তু সেই রোবটই যখন রাজত্বের চিন্তা করে তখন তো এর দায়ভার রোবটের স্রষ্টারই নিতে হবে। লিথাল তার স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আজ বুঝলাম সৃষ্টিকর্তা কেন তার সাথে প্রতারণাকারী এবং তাঁকে অস্বীকারকারীকে কখনোই ক্ষমা করবেন না ।
লিথাল তার দুটো হাত দিয়ে বারবার আমার ল্যাবের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে আর বলছে “Open the door.”
আমি বুঝে উঠতে পারছি না কীভাবে তাকে ধ্বংস করবো। তার সামনে গিয়ে লড়াই করা কিছুতেই সম্ভব না। আমি শুধু বোকার মতো লিথাল-কে উন্নতই করেছি। কখনো ভাবিনি তাকে ধ্বংস করতে হলে কী করতে হবে। তার দুর্বলতা আমার কম্পিউটার। কিন্তু সে আমাকে কম্পিউটার ল্যাবে যেতে দেবে না কিছুতেই। তাছাড়া তার দেহের সুইচটা অফ করতে পারলে তাকে থামানো যেত। কিন্তু ব্যাপারটা এখন এমন হয়েছে যে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মেয়েটার দেহের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা পরিকল্পনা মাথায় এলো। যদি আমার তৈরি বিস্ফোরণ “মেগাব্লাস্ট” দিয়ে সম্পূর্ণ ঘরটা ধ্বংস করে দেই তাহলে কেমন হয়? কিন্তু না, লিথালের দেহ টাইটানিয়াম দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ তাকে ধ্বংস করতে হলে ১৯৪১ কেলভিন তাপমাত্রা লাগবে। আর আমার তৈরি মেগাব্লাস্ট সর্বোচ্চ ১২৫০ কেলভিন তাপ উৎপন্ন করতে পারবে। এই পরিকল্পনা বাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমাকে যেভাবেই হোক কম্পিউটার ল্যাবে যেতেই হবে। অন্যদিকে লিথাল আর কোনো শব্দই করছে না। এবার সে কি করতে যাচ্ছে কে জানে। বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে সে সত্যি অকল্পনীয় হয়ে উঠেছে। নিজ স্রষ্টার সাথেই যুদ্ধে নেমেছে সে। আর আমি বোকার মতো কিছুই করতে পারছি না? হঠাৎ মনে হলো লিথাল মিনা এবং ঝুলি দু’জনকেই গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। যেমনটা আমার বাবা-মায়ের সাথে ঘটেছিল। কিন্তু তখন তো লিথাল একবারই সচল হয়েছিল। নাকি আমি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সে পরিপূর্ণভাবে সচল হয়েছিল? কিন্তু তখনো তো আমি তার “ম্যানিপুলেশন” ঠিক করিনি যে, সে নিজে হেঁটে এসে এই কাজে করতে পারবে।
বুকের ব্যথাটা তীব্র হতে লাগলো। নিজেকে জায়গা থেকে নাড়াতেই পারছি না। যেভাবেই হোক নিজেকে সুস্থ করে তুলতে হবে। বুকের পাঁজরের কয়েকটা হাড় যে ভেঙে গেছে বুঝতে পারছি।
তৎক্ষণাৎ আমার বন্ধু এবং মিনার ভাই প্রক্টরের দেওয়া “অ্যানালজেসিক্লাট” নামক ব্যথানাশক ট্যাবলেটের কথা মনে পড়ল। এটি শুধু ব্যথানাশক নয়। এটি মুহূর্তের মধ্যে দেহের ক্ষত সারিয়ে তুলে সাধারণ অবস্থায় নিয়ে যেতে সক্ষম। তাছাড়া প্রায় দুই ঘণ্টা এটি মানবদেহে শক্তি জোগান দিতে সক্ষম। ট্যাবলেটটা খাওয়ার পর এর উপকারিতার পাশাপাশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটাও টের পেলাম। দেহে প্রচুর পরিমাণের চুলকানি অনুভব করলাম। তবে যাই হোক, ব্যথাটা একেবারেই নেই হয়ে গেছে এটাই আসল। ঝুলির দেহটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ভাবছিলাম এখন কি লিথাল শান্ত হয়ে গেছে? আমি কি কম্পিউটার ল্যাবে যেতে পারবো?
কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে খুব বড়োসড়ো একটা বৈদ্যুতিক শক খেয়ে দেওয়াল থেকে প্রায় দশ ফিট দূরে গিয়ে পড়লাম আমি। ঝুলির দেহটা দূরে ছিটকে পড়েছে। হঠাৎ কেন এত বড়ো বৈদ্যুতিক শক খেলাম বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো। বাইরে প্রচুর শব্দ শুনতে লাগলাম। শব্দটা অনেকটা আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়ানোর মতো। তার মানে কি বিদ্যুৎ সংযোগে সমস্যা হচ্ছে?
সমস্যা না কি লিথাল আবার কোনো পরিকল্পনা করেছে? দেওয়াল থেকে বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার মানে সমগ্র ঘরে বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়েছে। তাহলে কি সে সমগ্র ঘরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছে? বাইরে থেকে পোড়া দুর্গন্ধ আসছে। সর্বনাশ! তার মানে সমগ্র ঘরে আগুন লাগার সম্ভাবনা আছে। আর আমার কম্পিউটার ল্যাবও যে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রইল না। কিন্তু কম্পিউটার পুড়ে গেলে আমি লিথালকে থামাবো কীভাবে? লিথাল যেভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, তার চার্জ শেষ হওয়ার আশা বাদ দেওয়াই ভালো। সে চাইছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে সমগ্র ঘরসহ আমাকে ধ্বংস করতে। শত চিন্তার মধ্যেও আমার মাথায় একটা জিনিস বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। লিথাল প্রত্যেকটা মানুষকেই গলাটিপে হত্যা করেছে। তার প্রসেসরে মানুষ হত্যা সম্পর্কে কী ধারণা আছে সেটা আমি জানি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, সে জানে মানুষকে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা খুবই সহজ। আমার ধারণামতে এখন আমি যদি লিথালের মুখোমুখি হই, তাহলে আমাকে হত্যার জন্য সে আমার গলায় চেপে ধরতে পারে। আর এটা হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ।
দীর্ঘসময় পরিকল্পনা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম হয় বাঁচবো, না হয় মরবো। লিথালের মুখোমুখি লড়বোই আমি। আর নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে নিজের গলাকেই ব্যবহার করবো। ট্র্যাকিওস্টোমি পদ্ধতি সম্পর্কে এবং অপারেশন সম্পর্কে আমার ধারণা আগে থেকেই ছিল। তবে ভয় হচ্ছে এটা নিজের সাথে করা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে সেটা নিয়ে। বেশিক্ষণ ভাবতে পারলাম না। গলার নিচের দিকে এক অংশে ইনজেকশন এর মাধ্যমে অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করলাম যেন কিছুক্ষণের জন্য জায়গাটা অবশ হয়ে থাকে। গলার নিচের অংশে শ্বাসনালিতে ছিদ্র করে আমার ফার্স্ট এইড বক্স এ থাকা একটা পাইপ স্থাপন করার মাধ্যমে জরুরি মুহূর্তে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা করলাম। অর্থাৎ লিথাল আমার গলায় চেপে ধরলেও নাক ও মুখের পরিবর্তে নিঃশ্বাসের জন্য আমি গলার অংশ ব্যবহার করে বেঁচে থাকতে পারবো।
নিজের দেহের একটা অংশ নিজে কেটে কোনোকিছু করা অবশ্যই খুব বিশ্রী দেখায়। নিজের গলায় অপারেশন চালানোর পর আবারো একটি “অ্যানালজেসিক্লান্ট” ট্যাবলেট খেয়ে নিলাম।
বাইরের শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে আরও কিছুক্ষণ আগেই। অর্থাৎ লিথাল আপাতত বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ করা বন্ধ করেছে। দরজার কাছে গিয়ে লিথালের পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। আমার সায়েন্স ল্যাবের দরজা বিদ্যুৎ পরিবাহী নয়। তাই হাত দিয়েই খুলে সামনে এগিয়ে গেলাম।
লিথাল তার ভয়ংকর চেহারা নিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার উচ্চারণ করতে লাগলো “ও রিষষ ফবংঃৎড়ু ঃযরং সধহশরহফ” আমি নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। লিথাল বিশ্রী একটা শব্দ করে তার ডান হাতটা আমার গলার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আমি অল্পের জন্য পাশ কাটিয়ে দূরে সরে গেলাম। লিথালের প্রধান সুইচটা একদম তার ঘাড়ের কাছে। যেই গেলাম তাকে স্পর্শ করতে, তার দেহের তাপ এতটাই মারাত্মক ছিল যে আমি পারলাম না হাতটা ছুঁয়াতেই। এবার লিথাল আমার চোখের পলকেই ডান হাতটা ঘুরিয়ে আমার গলার একটু ওপরের অংশে চেপে ধরলো। এই তীব্র অসহনীয় তাপে আমার গলার চামড়া যেন পুড়ে যাচ্ছিলো। লিথালের দেহে এই পরিমাণের তাপ কি বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণের ফলে হয়েছে? তার শক্ত হাতের চাপ আমার গলায় আর সহ্য করার মতো নয়। চোখ দুটো যেন সত্যিই বাইরে বেরিয়ে যাবে। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। বুঝতে পারছিলাম আমার ঝুলি কতটা কষ্ট সহ্য করেছে। বাঁ-হাতে গলার পাইপটার মুখ উন্মুক্ত করে দিলাম। আপাতত বেঁচে আছি আমি। কিন্তু এই তীব্র আগুনের ন্যায় তাপে হয়তো আমার গলাটা এক্ষুনি গালে দুভাগ হয়ে যাবে। আমি এখনো বেঁচে আছি এটাতে লিথাল হয়তো অবাক হচ্ছে। গলায় আরো বেশি চাপ অনুভব করলাম। আমাকে তার আরো কাছে নিয়ে গেল। এবার সেই সুবর্ণ সুযোগটা পেলাম, যেটির জন্য প্রথম থেকেই অপেক্ষা করছিলাম আমি। ডান হাতটা দিয়ে লিথালের ঘাড়ের কাছের সুইচটা চেপে বন্ধ করে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে বিকট একটা বীভৎস শব্দ করে লিথাল অচল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কিন্তু এটা কী হচ্ছে? লিথালের বুকের কাছে একটা ডিসপ্লেতে ভেসে উঠেছে একটি লেখা। যা ছিল, “Explosion activated” 5 seconds left.
তার মানে কি আর পাঁচ সেকেন্ড পর বিস্ফোরণ ঘটবে? কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু তো আমি কখনোই সেট করিনি। তাহলে কি লিথাল ১.০ নিজেই নিজেকে সংস্কার করেছে এভাবে? আধুনিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট বলে কি সে নিজেই নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে?
কোনোকিছু ভাববার পূর্বেই আমি দৌড়ে সায়েন্স ল্যাবে এসে দরজা লাগিয়ে দিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ আর উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পনের মতো কাঁপুনি দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটলো। সায়েন্স ল্যাবে শুধু পড়ে রইলাম আমি আর আমার ঝুলির দেহটা। জানার খুব আগ্রহ হয়েছিল- আমার তৈরি লিথাল কেন আমার সাথেই এমন করলো।
পরিবেশ শান্ত হলে, আমি আবার বাইরে আসি লিথালকে পর্যবেক্ষণ করতে। দরজার পাশে আমার স্ত্রী মিনার দেহটা পড়ে আছে। শুধু তার কঙ্কালটাই বোঝা যাচ্ছে। আমার জন্য আজ দুইটা জীবন শেষ হয়ে গেল। স্ত্রীর দেহটা একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে খুব বেশি ইচ্ছে করছিল। কারণ বেঁচে থাকতে আমি কখনোই তাকে ভালোবাসা দিতে পারলাম না। বলতে পারলাম না যে তোমাকে খুব ভালোবাসি মিনা। আমার জন্যই তার মৃত্যু হলো। লিথালও পড়ে আছে পাশেই। এই বিস্ফোরণে তার দেহের কোনো ক্ষতিই হয়নি। তবে সে পরিপূর্ণভাবে এখন অচল। আমি তার দেহ থেকে মাথাটা খুলে ল্যাবে নিয়ে আসলাম এটা দেখার জন্য যে এত কিছুর পেছনে ভুলটা কী ছিল আমার।
কিন্তু হঠাৎ পাশ থেকে বাবা বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো ঝুলি। এটা কীভাবে সম্ভব? আমার রক্ত হিম শীতল হয়ে গেল বাবা ডাকটা শুনে। দৌড়ে গিয়ে ঝুলিকে কোলে নিয়ে আমার চেয়ারে রাখলাম। হৃৎস্পন্দন চলছে, মুখটাও সামান্য নাড়াচ্ছে সে। অক্সিজেন মাস্ক তার মুখে লাগিয়ে দিলাম। বুঝতে পারলাম, যখন আমরা দু’জনই বৈদ্যুতিক শক খেয়ে ছিটকে পড়েছিলাম। ঠিক তখনি ঝুলির হৃৎপিণ্ডও আবার কাজ করতে শুরু করেছিল। ঝুলির পায়ের কাছে নিজের মাথাটা রেখে শুধু একবার বললাম মা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমার জন্য আজ তোমার এই অবস্থা। দুটো কারণে এখনও বেঁচে আছি।
প্রথমটা হলো আমার মেয়ে ঝুলি এখনও বেঁচে আছে। আর দ্বিতীয়টা হলো, আমার তৈরি রোবট কমরেড ১.০-এর মাথায় যেই প্রসেসরটা পেয়েছি, সেটি মোটেও আমার তৈরি প্রসেসর নয়। এই প্রসেসরটি “Blind Soul” নামক একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। যার কারণে সে কমরেড ১.০ থেকে লিথাল ১.০ তে পরিণত হলো। কিন্তু এই Blind soul প্রতিষ্ঠানটা কীসের?
আর আমার রোবটেই বা এই প্রসেসর এলো কোথা থেকে?
কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর দশম স্থান অধিকারী সায়েন্স ফিকশন
আরও পড়ুন...