রকেট পাখি

চিত্র-বিচিত্র শাহীনুর রহমান জুন ২০২৪

পৃথিবীতে অসংখ্য শিকারি প্রাণী আছে। পাখিদের মধ্যে আছে বিভিন্ন প্রজাতির ঈগল ও ফ্যালকন। পেরেগ্রিন ফ্যালকন তেমন একটি শিকারি পাখি। পাখিটি তার গতির কারণে পরিচিত। পেরেগ্রিন ফ্যালকন ঘণ্টায় ৩৯০ কিলোমিটার বেগে শিকারকে আক্রমণ করে। একে রকেট পাখিও বলা হয়। এর গতি এতটাই বেশি যে, চোখের পলকে শিকারকে আক্রমণ করতে পারে।

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই দেখা যায় পেরেগ্রিন পাখির। এরা সাধারণত উপকূলে এবং জনবিরল নদীর তীরে অবস্থান করে।

এটিই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দ্রুততম প্রাণী। স্থলজ পরিবেশের দ্রুতগামী প্রাণী চিতা ঘণ্টায় ১১২ কিলোমিটার বেগে চলে। পেরেগ্রিন পাখি চিতার চেয়ে চার গুণ বেশি গতিতে চলে।

পেরেগ্রিন পাখির শিকার করার দৃশ্য খালি চোখে দেখতে পাওয়া খুব কঠিন। তবে ভিডিওর মাধ্যমে ধীর গতিতে দেখা যায়। 

পাখিটির শরীরের সামনের অংশ সাদা আর পেছনের অংশ নীল ও বাদামী। পাখিটির মাথার রং কালো। এটি ডাক হক নামেও পরিচিত। এর বিশেষ দিক হলো পুরুষ পেরিগ্রিন ফ্যালকন আকারে স্ত্রীর চেয়ে ছোটো। এই পাখিটি ১৩ থেকে ২৩ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে। ডানা ২৯-৪৭ ইঞ্চি লম্বা। একটি স্ত্রী পেরেগ্রিন ফ্যালকনের ওজন ১.৫ কেজি হয়। পুরুষের ওজন হয় ১ কেজি। এই প্রজাতির পাখি পৃথিবীর শীতলতম স্থানে বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু পাখিটি সর্বত্র বেঁচে থাকতে পারে।

পেরেগ্রিন সমান্তরালভাবে উড়ে শিকার করতে পারে না। ওপর থেকে ডাইভের সময় পাখিটি নিজ শরীরকে তীরের ফলার মতো বানিয়ে ফেলে। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি গতিবেগ নিয়ে খাবার শিকার করে।

প্রচণ্ড উচ্চতায় সর্বোচ্চ গতিতে উড়ে যাওয়ার সময়ে এদের নাকের মধ্য দিয়ে যে গতিতে বাতাস প্রবেশ করে, সেটা এদের ফুসফুস ব্লাষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু তাদের নাকের ঠিক ভেতরিভাগে হাড়ের একটা ট্যাপ দেওয়া রয়েছে। যে ট্যাপের সাহায্যে বাতাসের তীব্র গতিকে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে নিজেদের ফুসফুস তথা জীবন রক্ষা হয়।

ঠিক একই টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে বিমানের ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে। বাতাসের তীব্র প্রেশার হতে বিমানের ইঞ্জিনকে সুরক্ষিত রাখতে প্যারোগ্রীন ফ্যালকন টেকনলজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই পাখির খেলা দেখানো হয়। আরব শেখদের কাছে ফ্যালকনের কদর সবচেয়ে বেশি। ফ্যালকন দিয়ে তারা রাজকীয় শিকারে বের হয় প্রতি মৌসুমেই।

জানা যায় তুখোড় এই পাখিটিকে এক সময় বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উনিশ শতকে উত্তর আমেরিকায় ফসলের জমিতে ব্যবহার শুরু হয় একধরনের কীটনাশক ডিডিটি। মূলত ফসলের পোকামাকড় দমন করাই ছিল লক্ষ্য। তবে এর প্রভাবে পেরেগ্রিন পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। পেরেগ্রিনের প্রধান খাবার ছোটো পাখি। শস্যক্ষেতের পোকাখেকো পাখির ওপর ডিডিটির প্রভাব কম হলেও পাখিখেকো পেরেগ্রিনের ওপর তীব্র প্রভাব পড়ে। এর ফলে পাখির ডিমের আবরণ পাতলা হয়ে যায় এবং ডিমে তা দেওয়ার সময় ডিম ভেঙে যায়। ফলে উত্তর আমেরিকাসহ পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে এই পাখির সংখ্যা কমতে থাকে। 

বিজ্ঞানীরা পাখিটিকে সংরক্ষণের চেষ্টা শুরু করেন। পেরেগ্রিন ফান্ড নামের একটি সংগঠন গঠিত হয় ১৯৭০ সালে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাখিটির গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭২ সালে ডিডিটি নিষিদ্ধ করে। সংগঠনটির সহায়তায় প্রকৃতিতে ছাড়া হয় প্রায় চার হাজার পাখি। আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করে পেরেগ্রিন নামের এই পাখিটি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ