যার যা আছে
গল্প এনায়েত রসুল সেপ্টেম্বর ২০২৫
ফুল সুন্দর, তাই কারো সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে মানুষ ফুলের কথা বলে। বলে, কারণ তারা ফুল দেখেছে-দেখে মুগ্ধ হয়েছে। কিন্তু তারা এখনও ঝিলমিলকে দেখেনি। যারা ঝিলমিলকে দেখেছে তারা বলে, ঝিলমিল ফুলের চেয়েও সুন্দর।
ঝিলমিল যে সুন্দর, তা ঝিলমিল নিজেও জানে। শুধু সৌন্দর্যে নয়, লেখাপড়াতেও ঝিলমিল ক্লাসের সেরা। প্রতি বছর ফার্স্ট হয়ে সে এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠছে। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাচ্ছে। ওর ব্যবহার ভালো। সবার দরকারে নিজের কাজ রেখে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সাহায্য-সহযোগিতা করে। এসব কারণে সবাই ওকে ভালোবাসে।
এই সুন্দর আর ভালো মনের অধিকারী ঝিলমিলের মনে একটা দুঃখ আছে-ঝিলমিলের কণ্ঠস্বরটা মিষ্টি নয়। সেই কণ্ঠস্বর একটু ভাঙা ভাঙা। একটু ফ্যাসফেসে। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঝিলমিল গান গাইতে পারে না। গান গাইতে চাইলেই একটা সংকোচ এসে ওর মনটাকে চুপসে দেয়।
ভোরের আকাশে সূর্য যখন উঁকি দেয় ঝিলমিল তখন বাগানে যায়। ফুলদের পাঁপড়ি ছুঁয়ে আদর করে। সবুজ ঘাসের ওপর বসে প্রজাপতি দেখে। নীল আকাশে পাখিদের ওড়াউড়ি দেখে আর দোয়েল-শ্যামার গান শোনে। তারপর মা যখন ঝিলমিলকে ডেকে পাঠান, ঝিলমিল তখন ছুটে গিয়ে পড়তে বসে। এভাবেই শুরু হয় ঝিলমিলের দিন।
যে বাগানে ঘুরে ঘুরে ঝিমিলের সকাল শুরু হয়, সে বাগানে একটা ঝাঁকড়া গাছ আছে-সবুজ পাতাওয়ালা ছাতিম গাছ। রোজ সকালে ন্যাড়া মাথা কালো কুচকুচে এক বিচ্ছিরি পাখি এসে সেই গাছে বসে। একবার তাকালে দ্বিতীয়বার আর তাকাতে ইচ্ছে হয় না সেই পাখিটার দিকে, এতই বিচ্ছিরি সে।
পাখিটা দেখতে তেমন ভালো না হলেও তার কণ্ঠস্বর অপূর্ব মিষ্টি। ছাতিম গাছের ডালে বসে সে মিষ্টি-মধুর সুরে গান গায়। সেই গান শুনে বাগানের গাছপালা, ফুল আর প্রজাপতিরা মুগ্ধ হয়। ঝিলমিল তন্ময় হয়ে সেই গান শোনে-শোনে আর নিজের কণ্ঠস্বরের কথা ভেবে দুঃখ পায়। ঝিলমিল ভাবে, আমার কণ্ঠস্বর যদি এমন মিষ্টি হতো, আমার গান শুনেও সবাই মুগ্ধ হতো।
দুই.
এক বিকেলে ছাদে বসে নীল আকাশ দেখছিল ঝিলমিল। সে সময় সেখানে এলো ওর মামাতো বোন ডোরা। এ কথা সে কথার পর ডোরা বলল, কাল আমার জন্মদিন। বান্ধবীরা আসবে। তুইও যাবি। সবাই মিলে মজা করব।
ঝিলমিল জিজ্ঞেস করল, কী কী করবে, কোনো প্ল্যান করেছ?
ডোরা বলল, প্ল্যান তো কতই করেছি। সবচে মজার প্ল্যান হলো, আমরা সবাই একটা একটা করে গান গাইব। আর সবার আগে গান গাইবি তুই।
: আমি?
: হ্যাঁ, তুই। কারণ তুই আমার একমাত্র প্রিয় বোন। তাই তোকেই সবার আগে গান গাওয়ার সুযোগ দেবো আমি।
এটা যার জন্যই গর্বের অফার হোক, ঝিলমিলের জন্য নয়। বরং সবার আগে গান গাইতে হবে শুনে ঝিলমিলের বুকের ভেতর ধক্ করে উঠল। যা বিচ্ছিরি কণ্ঠস্বর ওর। সবার সামনে গান গাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।
ঝিলমিল বলল, ডোরা আপু, আমি ফাংশনে যাব। তবে গান গাইতে পারব না।
ডোরা বলল, পারব না বললে চলবে না ঝিলি। গান তোকে গাইতেই হবে।
: না আপু, গান আমি গাইব না।
গান গাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঝিলমিল ওর অন্য যোগ্যতার কথা জানাল। কিন্তু সেই প্রস্তাবকে পরোয়া না করে ডোরা বলল, শোন ঝিলি, তোর কোনো অজুহাত আমি শুনব না। গান তোকে গাইতেই হবে। বড়ো বোন হিসেবে এ আমার আদেশ।
অনেক কষ্ট করে প্রায় অস্ফুট স্বরে ঝিলমিল বলল, আচ্ছা।
আচ্ছা বলার পর থেকে ঝিলমিল চিন্তার সমুদ্রে ডুবে গেল। সেই চিন্তা ঝিলমিলের সারা রাতের ঘুম কেড়ে নিল। ঝিলমিল ভাবল, কেন যে আমার কণ্ঠস্বরটা এমন হলো! সবাই মিষ্টি কণ্ঠে গান গাইবে। সেই গান শুনে সবাই প্রশংসা করবে। হাততালি দেবে। আর আমার গান শুনে শ্রোতারা বিরক্ত হবে। ব্যাঙকণ্ঠী-কাককণ্ঠী বলে মুখ টিপে হাসবে। এ অপমান আমি সইতে পারব না। আমার কান্না পাবে। তা দেখে সবাই আবার হাসবে। আহারে, আমার ভাগ্যটাই খারাপ!
তিন.
রোজ সকালে সূর্য ওঠার পরপরই ঝিলমিল যেমন বাগানে যায়, আজও গেল। তারপর গিয়ে বসল ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা ছাতিম গাছের নিচে। অনেক আগেই কালো পাখিটা সেই গাছের ডালে এসে বসেছিল। ঝিলমিলকে দেখে কালো পাখি খুব খুশি হলো। সে বলল, ও ঝিলমিল, তুমি এসেছ তাহলে? তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এত দেরি করলে কেন?
ঝিলমিল বলল, আজ আমার মন খারাপ। তাই আসতে দেরি হলো। তুমি কেমন আছ, কালো পাখি?
বিচ্ছিরি চেহারার কালো পাখি বলল, আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। আর আজ আমার মনটাও ভালো আছে। তাই মন খুলে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। গান শুনবে? বলো, গাইব একটা নতুন গান?
ঝিলমিলের মন খারাপ ছিল। তাই গম্ভীর কণ্ঠে বলল, মন ভালো করার মতো গান জানা থাকলে গাও। নইলে গেয়ো না। অন্য গান শোনার ইচ্ছে নেই।
কালো পাখি বলল, অন্য গান তোমাকে শোনাবও না। এমন গান শোনাব, যে গান শুনলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে। তো আমি গান গাইছি, তুমি মন দিয়ে শোনো।
এ কথা বলে কালো পাখি তার মিষ্টি সুরে গান ধরল:
মন আমার নাচে আজ
প্রাণ ভরা খুশিতে-
আল্লাহর গুণগান
আয় তোরা গাবি কে...
একটা গান শেষ করে আরেকটি গান গাইল কালো পাখি। সেই গান শেষ হলে ধরল অন্য একটি গান। এমন করে মন মাতানো সুরে অনেকগুলো গান গাইল কালো পাখি। গানে গানে অনেকটা সময় কেটে যাবার পর কালো পাখির মনে একটা প্রশ্ন জাগল। সে ভাবল, এই যে আমি গান গেয়ে যাচ্ছি, ঝিলমিল তো কোনো গানের প্রশংসা করছে না! তাহলে কি গানগুলো ঝিলমিলের ভালো লাগছে না? নাকি মন দিয়ে সে শুনছেই না?
চোখ বন্ধ করে গান গাইছিল কালো পাখি। এবার সে চোখ খুলে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। তখন দেখতে পেল, আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে ঝিলমিল। ওর মুখটাকে শুকনো দেখাচ্ছে!
ঝিলমিল রোজই বাগানে আসে। তখন সে মুগ্ধ হয়ে কালো পাখির গান শোনে। প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়ায়। পাপড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফুলদের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু আজকের মতো কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে না। মন খারাপের কথা বলেছিল ঝিলমিল। কিন্তু কেন ওর মন খারাপ?
দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে কালো পাখির মনও খারাপ হলো। সে তখন জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে, ঝিলমিল সোনা? চুপটি করে বসে আছ কেন?
আকাশ থেকে চোখ ফিরিয়ে ঝিলমিল বলল, তোমাকে তো বলেছি, আমার মন ভালো নেই। ভয়ে বুক দুরুদুরু করে কাঁপছে। কী যে আমার কপালে আছে, আল্লাহই জানেন।
কালো পাখি জিজ্ঞেস করল, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? কার ভয়ে বুক কাঁপছে? মায়ের ভয়ে? মা বকেছেন?
ঝিলমিল বলল, না না, মা বকেননি। মা আমাকে বকেন না। আমি ভয় পাচ্ছি গান গাওয়াকে।
: বুঝলাম না।
: আমি বুঝিয়ে বলছি। আমার মামাতো বোন ডোরা আপুর জন্মদিনের ফাংশনে আমাকে গান গাইতে হবে। সেই ভয়ে বুক কাঁপছে।
ঝিলমিলের কথা শুনে ওর দিকে অবাক চোখে তাকাল কালো পাখি। সে বলল, গান গাইতে তো সবাই ভালোবাসে। তোমার বুক কাঁপছে কেন? তোমার সমস্যাটা কী, বুঝিয়ে বলো।
ঝিলমিল বলল, তুমি তো জানো আমার কণ্ঠটা একটু ইয়ে ইয়ে। মানে ভাঙা ভাঙা। এমন কণ্ঠে গান গাওয়া যায়, বলো? আমি বলেছি গান গাইতে পারব না। কিন্তু ডোরা আপু ছাড়বেন না। তিনি বায়না ধরেছেন, তার বার্থডে পার্টিতে আমাকে গান গাইতেই হবে। আমি এখন কী করব, বলো ভাই কালো পাখি?
কালো পাখি বলল, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করো তো আমি বলব-সব ভয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তুমি গান গাইবে। এ নিয়ে এত টেনশন করছ কেন?
ঝিলমিলের রাগ হলো কালো পাখির কথা শুনে-পাখিটা বোকা নাকি?
ঝিলমিল ভাবল, আসলে পাখিটা ওর সমস্যার কারণ বুঝতেই পারেনি। ওকে আরও ভালো করে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন ঝিলমিল ভয় পাচ্ছে।
এ কথা ভেবে ঝিলমিল বলল, তোমাকে আমি সব বুঝিয়ে বলছি। তার আগে বলো, মানুষ গান শোনে কেন?
কালো পাখি বলল, মনকে ভালো লাগায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য।
ঝিলমিল বলল, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এবার বলো, কারো বেসুরো গান কি শ্রোতাদের ভালো লাগে?
কালো পাখি ডানে-বামে মাথা নেড়ে বলল, না, বেসুরো গান কোনো শ্রোতারই ভালো লাগে না। সবাই মিষ্টি কণ্ঠের গান শুনতে চায়।
ঝিলমিল বলল, ঠিক বলেছ। আমিও তাই জানি। আর এ কথাও জানি, আল্লাহ আমাকে গান গাওয়ার মতো মিষ্টি কণ্ঠ দেননি। তাই আমার মনে খুব দুঃখ।
কালো পাখি বলল, তুমি শুধু শুধুই দুঃখ পাচ্ছ ঝিলমিল। তোমার কণ্ঠস্বর হয়তো সুরেলা নয়, কিন্তু তুমি তো দেখতে সুন্দর। আর লেখাপড়ায়ও ভালো। আল্লাহ তোমাকে রূপ দিয়েছেন, বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়েছেন। সুন্দর মন দিয়েছেন। সবার ভালোবাসা পাচ্ছ। শুধু কণ্ঠটা তেমন শ্রুতিমধুর নয়। অন্যদিকে আমার কথা ভেবে দেখো, আল্লাহ আমাকে কণ্ঠ দিয়েছেন অথচ চোখ জুড়ানো রূপ দেননি। সবাই আমার গান শুনে প্রশংসা করে। কিন্তু কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। আমার একটা নাম আছে। কিন্তু কেউ সে নামে ডাকে না-ডাকে কালো পাখি। তবুও আমার মনে কোনো দুঃখ নেই।
: দুঃখ নেই? তোমার দিকে কেউ ফিরে তাকায় না, কালো পাখি বলে ডাকে, তবু তোমার মনে দুঃখ নেই! কেন দুঃখ নেই, কালো পাখি?
অবাক চোখ দুটি তুলে ঝিলমিল কালো পাখির দিকে তাকাল। কালো পাখি বলল, দুঃখ নেই, কারণ আমি অকৃতজ্ঞ নই। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তাকে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আমি আমার এই রূপ নিয়েও সন্তুষ্ট। তাই আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। তুমি যদি তোমার কণ্ঠস্বর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারো, তবে তোমার মনেও কোনো দুঃখ থাকবে না।
কালো পাখির কথাটাকে শুধু নতুনই মনে হলো না, অর্থপূর্ণও মনে হলো ঝিলমিলের কাছে। ঝিলমিল বুঝতে পারল, কালো পাখি ঠিক কথাই বলেছে। সবার সবকিছু থাকতে হবে-এমন কোনো কথা নেই। এই যে ঝিলমিল দেখতে এত সুন্দর, লেখাপড়ায় এত ভালো, সবাই তো তেমন নয়। ওর ক্লাসমেটরাই একেক জন একেক রকম। গায়ের রং আর কণ্ঠস্বরও হাজার রকম। কিন্তু তা নিয়ে তো কেউ মন খারাপ করে না। সবাই তা খুশিমনে মেনে নিয়েছে। তাহলে ঝিলমিলের কণ্ঠস্বরটা একটু অন্যরকম, ঝিলমিলই-বা তা মেনে নেবে না কেন? মেনে নিলেই মনে কোনো দুঃখ থাকবে না।
এ কথা ভেবে ঝিলমিল কালো পাখিকে বলল, তুমি ঠিক কথাই বলেছ। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তা নিয়েই তার সন্তুষ্ট থাকা উচিত। এখন থেকে আমিও আমার কণ্ঠস্বর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব আর নিঃসংকোচে গান গাইব। আমার মনে তখন কোনো দুঃখ থাকবে না।
আরও পড়ুন...