মৃৎশিল্প বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম
বিবিধ সাকী মাহবুব অক্টোবর ২০২৪
পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। বাঙালি জাতিও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের নিজস্ব যেসব ঐতিহ্য রয়েছে, তার মধ্যে মৃৎশিল্প অন্যতম। মৃৎশিল্প আমাদের ঐতিহ্য ও গর্বের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। সেই আদিকাল হতেই মৃৎশিল্প বাঙালি ঐতিহ্যের স্বর্ণোজ্জ্বল স্বাক্ষর। মৃৎশিল্প শব্দটি “মৃৎ” ও “শিল্প” এ দু’টি শব্দ দ্বারা গঠিত। মৃৎ শব্দের অর্থ মাটি, আর শিল্প শব্দের অর্থ নির্মাণ কৌশল বা চারুকলা। অর্থাৎ যখন কোনো কিছু সুন্দর করে আঁকি, সুন্দর করে বানাই, সুন্দর করে গাই তখন তা হয় শিল্প। শিল্পের এ কাজকে বলা হয় শিল্পকলা। আর মাটির তৈরি শিল্পকর্মকে আমরা বলি মাটির শিল্প বা মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। তবে সব মাটি দিয়ে এ কাজ হয় না। দোআঁশ মাটি তেমন আঠালো নয়, আর বেলে মাটি ঝরঝরে তাই এগুলো দিয়ে মাটির শিল্প হয় না। মৃৎশিল্পের জন্য প্রয়োজন এঁটেল মাটি। এঁটেল মাটি বেশ আঠালো। আবার এঁটেল মাটি হলেই যে তা দিয়ে শিল্পের কাজ করা যাবে, তাও নয়। এর জন্য প্রয়োজন যত্ন আর শ্রম। প্রয়োজন হাতের নৈপুণ্য ও কারিগরি বিদ্যা। পাশাপাশি প্রয়োজন কিছু ছোটখাটো যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। এই যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের মধ্যে অন্যতম হলো একটা কাঠের চাকা। এই চাকায় নরম মাটির তাল লাগিয়ে নানা আকারের মাটির পাত্র ও জিনিস তৈরি করেন কুমোরেরা। মৃৎশিল্পের মূল কারিগর হলেন আমাদের দেশের কুমোর সম্প্রদায়। যুগ যুগ ধরে কুমোরেরা বংশ পরম্পরায় তৈরি করে আসছে বিভিন্ন রকম মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্পের মধ্যে রয়েছে মাটির কলস, হাঁড়ি, সরা, বাসনকোসন, পেয়ালা, সরাই, মটকা, জ্বলা, পিঠা তৈরির বিভিন্ন ছাঁচ ইত্যাদি। এছাড়া কুমোরেরা তৈরি করে আসছেন উৎসব পার্বণের জন্য নানা রঙের বাহারি মাটির জিনিস ও তৈজসপত্র। হাঁড়ি, কলসি ছাড়াও বাংলাদেশে একসময় গড়ে উঠেছিল পোড়ামাটির ফলকের সুন্দর কাজ। এর অন্য নাম টেরাকোটা। এই টেরাকোটা বাংলার অনেক পুরোনো শিল্প। নকশা করা মাটির ফলক ইটের মতো পুড়িয়ে তৈরি করা হতো এই টেরাকোটা। শালবন বিহার, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুরের বৌদ্ধস্তূপ ও দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরে এই টেরাকোটার কাজ রয়েছে। তাছাড়া বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদে, বাঘা মসজিদ, খানজাহান আলী মসজিদ, তারা মসজিদ, বিনত বিবির মসজিদে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির অপূর্ব সুন্দর কাজ। পোড়ামাটির এই ফলক বাংলার প্রাচীন মৃৎশিল্প।
ইদানীং যদিও প্রাচীন আমলের মতো ও রকম টেরাকোটা হচ্ছে না, তবে পোড়ামাটির বর্ণিল নকশার কদর বেড়েছে। বড়ো বড়ো কর্পোরেট অফিস, সরকারি-বেসরকারি অফিসের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন রকম নকশা করা মাটির ফলক ব্যবহৃত হচ্ছে। মৃৎশিল্পের এই কাজ এদেশে শুরু হয়েছে হাজার বছর আগে। এই শিল্প আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। মৃৎশিল্পে মিশে আছে গ্রামীণ বাংলার হাসি-কান্না, সুখ দুঃখের ইতিহাস। মৃৎশিল্পীরা তাদের এই শৈল্পিক প্রতিভার ওপর ভিত্তি করে একসময় শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলেন। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে মৃৎশিল্পের বিকল্প পথ সে সময় ছিল না।
কুমার পাড়ার মেয়েরা ব্যস্ততায় দম ফেলার সময় পেতো না। কাঁচা মাটির গন্ধ ভেসে আসতো চারদিক থেকে। হাট-বাজারে তৈজসপত্রের চাহিদা ছিল প্রচুর। বর্তমানে মৃৎশিল্প কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে টিকতে না পেরে অনেকেই এ পেশা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। বেছে নিচ্ছেন ভিন্ন পেশা।
প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক, স্টিল, মেলামাইন, চীনামাটি, সিলভারসহ বিভিন্ন ধরনের পদার্থের তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, খেলনা, সৌখিন জিনিসপত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ধ্বংসের মুখে এই প্রাচীন মৃৎশিল্প। তবে কেউ কেউ বাপ-দাদার স্মৃতি হিসেবে এখনো ধরে রেখেছেন এই পেশা।
আজকাল বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ মেলায় ঘুরতে গেলে দেখা মেলে পোড়ামাটির নানাবিধ কাজ, গৃহস্থালির নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, শো-পিসসহ অসংখ্য তৈজসপত্র।
তাছাড়া মৃৎশিল্প জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘরে দেখা যায় সে সময়ের বাংলার কুমার পাড়ার চিত্র।
মাটির নান্দনিক কারুকাজ ও বাহারি নকশার কারণে এ শিল্পের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি-বেসরকারি হস্তক্ষেপ, নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে অচিরেই আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে এক সময়ের অর্থনীতির চালিকা শক্তি মৃৎশিল্প।
আরও পড়ুন...