মাছের পেটে চল্লিশ দিন
গল্প এস.এম রুহুল আমীন জানুয়ারি ২০১০
বনু ইসরাইলের বংশধর, মহান আল্লাহর একজন নবী। নাম হযরত ইউনূস ইবন মাত্তা। মাত্তা ছিলেন হযরত ইউনূস (আ)-এর মায়ের নাম। যেমন ছিলেন হযরত মূসা ইবনে মারইয়াম। মানে দু’জনই ছিলেন মায়ের নামে পরিচিত। হযরত ইউনূস (আ)-এর তিনটি নাম কুরআনুল কারীমে এসেছে- ইউনূস, জুননূন ও আসহাবুল হুওত।
তিনি আল্লাহর পয়গাম নিয়ে আসলেন বর্তমান ইরাকের মসুল এলাকায়। নিনেভাবাসীদের কাছে, নিনেভা নামের গুরুত্বপূর্ণ এ শহরটির অবস্থান ছিল বিখ্যাত টাইগ্রিস নদীর তীরে। নিনেভাবাসীরা ছিল কাফির ও মুশরিক, অস্বীকার করতো আল্লাহকে। তারা অসংখ্য দেবদেবী ও মূর্তির পূজা করতো। হযরত ইউনুস (আ) রিসালাতের দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করলেন। নিনেভাবাসীদের আহ্বান জানালেন। লা-শরীক এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য। অনুরোধ করলেন ছেড়ে দিতে মূর্তিপূজা।
হযরত ইউনুস (আ) দীনের দাওয়াত দিয়েই যাচ্ছেন। থোড়াই কেয়ার নিনেভাবাসীর। নবীর কথা তারা শুনতেও চায় না, মানা তো দূরের কথা। কাজ খুব একটা হলো না, নিনেভাবাসী প্রত্যাখান করলো হযরত ইউনুসের (আ) দাওয়াত। তারা আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করলো। তাঁকে মিথ্যাবাদীর তকমা দিয়ে মিথ্যুক বানিয়ে দিলো নিমিষেই। আল্লাহর নবী হলেন মিথ্যাবাদী। তাকে বানানো হলো বাপ-দাদাদের ধর্মের বিরোধিতাকারীও।
জাতির লোকদের অবাধ্য কার্যকলাপে বিরক্ত হলেন হযরত ইউনূস (আ)। আল্লাহর নবী তাদের আল্লাহর আজাবের ভয় দেখালেন। হঠকারী জাতি ভয় না পেয়ে আজাব চাইলো। আল্লাহর নবী হলেন হতভম্ব ও কিছুটা ধৈর্যহারা। আল্লাহর নির্দেশনা ছাড়াই তিনি ঘোষণা করলেন, “আমার প্রিয় জাতির লোকেরা, হে নিনেভাবাসী! তোমাদের কাজের ফল তোমরা পাবে। সহসাই বুঝবে মজা! মুখোমুখি হবে ভয়াবহ আজাবের। অপেক্ষা করো এ আজাব আসবে আগামী তিন দিনের মধ্যে।”
এক দিন গেল, দু’দিন গেল। বিপদ আসছে না নিনেভাবাসীদের ওপর। চিন্তায় অস্থির হলেন হযরত ইউনূস (আ)। বিচলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি নিজে নিজেই। হিজরত করে চলে যাবেন অন্য কোথাও। আসন্ন বিপদ ভেবে ও লোক লজ্জার ভয়ে। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই তিনি এলাকা ছাড়লেন অতিসংগোপনে ও চুপিসারে।
এক লক্ষ বা তার চেয়ে বেশি নিনেভায় বসবাসকারী লোক। নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে বেরিয়ে এলো ময়দানে। পথে প্রান্তরে খুঁজলেন তাদের নবী হযরত ইউনূস (আ) কে। কোথাও পেল না তারা তাদের নবীকে। ঈমান না আনলে কী হবে? তারা জানতেন আল্লাহর শক্তির কথা। অনুশোচনা করে তারা বিনয়ের সাথে করলো মহান আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও খাঁটি তাওবাহ। সবাই আনলো এক আল্লাহর ওপর ঈমান।
আল্লাহর কাছে ওয়াদা করলো, হে আল্লাহ! আমরা ঈমান আনলাম। অনুগ্রহ করে আমাদের ক্ষমা করুন। আমরা আর মূর্তিপূজা করবো না। করবো না আপনার সাথে অন্য কারো শিরক। করবো না আর নবীর বিরোধিতাও। আসন্ন বিপদ থেকে আমাদের নাজাত দিন। মহান আল্লাহর দয়া হলো। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ার সগর ও গফুরুর রহীম। মহান আল্লাহ মাফ করলেন তাদের। অবকাশ দিলেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার। কোনো আজাব তাদের পাকড়াও করলো না। আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেল নিনেভাবাসীরা।
হযরত ইউনূস (আ) লজ্জা আর ভয়ে আল্লাহর হুকুম ছাড়াই আবার দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন। যাবেন দেশ ছেড়ে কোনো ভিন দেশে। চললেন আল্লাহর নবী অচিন কোনো দূর দেশে। সামনে ফোরাত নদী, উঠে পড়লেন যাত্রী বোঝাই একটি বড়ো জাহাজে।
দেখা দিলো চরম বিপত্তি! ঢেউয়ের দোলায় দুলছে জাহাজ, মাঝ নদীতে জাহাজ আর চলে না। শুরু হলো ঝড় তুফান, টলমল অবস্থা। মনে হচ্ছিলো যাত্রী একজন বেশি, জাহাজটি ডুবু ডুবু ভাব প্রায়। যাত্রীদের বিশ^াস ছিল মালিকের অবাধ্য কোনো লোক থাকলে জাহাজের এমনটি হতে পারে। আর তাকে জাহাজ থেকে ফেলে দিলেই রক্ষা পাবে অন্য যাত্রীরা। জাহাজের যাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিলো, একজন যাত্রী ফেলে দেবেন তারা নদীতে। কিন্তু কাকে? কাকে ফেলে দেবে নদীতে? ভেবে পায় না যাত্রীরা, কী করবে তারা? পরস্পরকে জিজ্ঞেস করতেই অকপটে হযরত ইউনূস (আ) স্বীকার করলেন। সব ঘটনা খুলে বললেন, বললেন সত্য কথা। কারণ নবীরা তো কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না।
তার কথায় অবাক হলো সবাই। তারপরও তাদের মন সায় দিলো না হযরত ইউনূস (আ) কে নদীতে ফেলে দিতে। সর্বশেষ একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা। করা হবে লটারি, লটারিতে যার নাম উঠবে তাকেই ফেলে দেওয়া হবে নদীতে। জাহাজ করা হবে বিপদমুক্ত, জাহাজ পৌঁছাবে তার আপন গন্তব্যে। কথা অনুযায়ী কাজ, করা হলো লটারি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! লটারিতে নাম উঠে এলো হযরত ইউনূসের (আ)। এভাবে নাম আসলো পরপর তিনবার। এবার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পালা। সবাই এগিয়ে এলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত ইউনূস (আ)-কে ফেলে দেওয়া হলো জাহাজ থেকে মাঝ নদীতে।
কুল কিনারাহীন নদীতে অনিশ্চিত জীবনে পড়লেন হযরত ইউনুস (আ)। ঢেউয়ের দোলায় হাবুডুবু খাচ্ছেন তিনি মাঝ দরিয়ায়। জাহাজ চলে গেল যথারীতি গন্তব্যে। ইউনূস (আ) কে আল্লাহ পাকড়াও করলেন। গিলে ফেললো তিমি প্রজাতির এক বিশাল আকৃতির মাছ। আল্লাহর নির্দেশে সে মাছটি এসেছিলো বাহরি আখযার বা সবুজ সাগর থেকে। আল্লাহর নবীর বুঝতে আর বাকি রইলো না। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া হিজরতের ফল, আল্লাহর পরীক্ষা ছাড়া এটি আর কিছু নয়। মাছের পেটে যাওয়ার কারণেই তাঁর উপাধি হলো যুননুন বা সাহিবুল হুওত, মানে মাছওয়ালা।
মজার ব্যাপার হলো আল্লাহর স্মরণ থেকে কখনো গাফিল ছিলেন না হযরত ইউনূস (আ)। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একজন এবং তাঁর মনোনীত নবী। যারা চলে আল্লাহর পথে, বলে ইসলামের কথা। ঘোষণা করে আল্লাহর পবিত্রতম মহিমা। আল্লাহকে স্মরণ করে সুখে কিংবা দুঃখে। মাছের পেটে অনুশোচনা আর অনুতাপে জ্বলতে লাগলেন হযরত ইউনুস (আ)। মনের কোণে ভেসে উঠলো অপরাধবোধ। আল্লাহর নির্দেশ ছাড়াই আজাবের ঘোষণা ও বিনা অনুমতিতে হিজরত বা দেশ ত্যাগ।
আল্লাহর নবী তাই রুজু হলেন আল্লাহরই দিকে। স্বীকার করলেন অপরাধের কথা। ঘোষণা করতে থাকলেন আল্লাহর প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমার কথা। ‘লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমিন।’ হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ বা রক্ষাকর্তা নেই! পাক-পবিত্র আপনার সত্তা! অবশ্যই আমি অপরাধী, জুলম করেছি নিজের ওপর নিজেই। মাছের পেটের গভীর অন্ধকার থেকেই মহান আল্লাহর প্রশংসা। আল্লাহর নবীর রোনাজারি ও আকুতি পৌঁছলো মহামহিম আল্লাহর দরবারে, আরশে আযীমে। তাওবাহ কবুল করলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। পরম ক্ষমাশীল মহান আল্লাহ তায়ালা মার্জনা করলেন, তার প্রিয় নবী হযরত ইউনূসকে (আ)। এক দিন আর দুদিন নয়, টানা চল্লিশ দিন পর।
আল্লাহর নির্দেশে মাছ ফেলে দিলো হযরত ইউনূস (আ) কে তার পেট থেকে। হযরত ইউনূস (আ) ছিলেন অত্যন্ত রুগ্ন ও দুর্বল অবস্থায়। গাছ পালা ও তৃণ লতাহীন এক বিরাণ ভূমিতে। যেখানে খাওয়ার মতো ছিল না কোনো শস্য। ছিল না কোনো গাছ ছায়া দেওয়ার মতো। মহান আল্লাহর ইশারায় জন্মালো সামান্যতম সবুজের সমারোহ, সেখানে উৎপন্ন হলো এক লতানো গাছ। দেখতে অবিকল লাউ গাছের মতো। যার পাতা দিতো ছায়া। ফল যোগাতো আহার। মিটাতো পানীয়ের প্রয়োজনীয়তা। গাছের ছায়া, খাদ্য ও পানীয়ে সতেজ হলেন হযরত ইউনূস (আ)। আস্তে আস্তে হয়ে উঠলেন সুস্থ, শরীরে পেলেন শক্তি।
শারীরিক শক্তি অর্জনের পর আল্লাহর নির্দেশ আসলো। মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে আবার পাঠালেন, নিনেভাবাসীর কাছে। নিনেভায় বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল এক লক্ষ বা তার অধিক। তিনি গেলেন, দীনের দাওয়াত দিলেন। অবাক হলেন হযরত ইউনূস (আ)। নিনেভাবাসী সবাই এখন মুসলিম। তারা পাকা ঈমানদার। কারণ তারা নবীর অনুপস্থিতে গজবের ভয়ে তাওবাহ করেছিল। আর আল্লাহ তাদের তাওবাহ কবুল করেছিলেন।
আল কুরআনে হযরত ইউনুস (আ)-এর নামে রয়েছে একটি সূরা। নবীর নামটি কুরআনে এসেছে ছয় বার, তবে সরাসরি এসেছে চার বার। দু’বার এসেছে মাছওয়ালা হিসেবে। যেসব জায়গায় এসেছে সেগুলো হলো, সূরা আন নিসার একশত তেষট্টি নম্বর আয়াত। সূরা আল আনআমের ছিয়াশি, সূরা ইউনূসের আটানব্বই, সূরা আসসাফফাতের একশত উনচল্লিশ এবং সূরা আল কলমের আট চল্লিশ এবং বিশেষভাবে সূরা আল আম্বিয়ার সাতাশি ও আটাশি নম্বর আয়াতে।
মহান আল্লাহ এখানে বলেন, ‘‘সে মাছওয়ালা নবী ইউনূসের কথা স্মরণ করো, যাকে আমি দয়া করেছিলাম। যখন সে রাগ হয়ে জাতির লোকদের থেকে চলে গিয়েছিল এ ভেবে যে, আমি তাকে পাকড়াও করবো না। অবশেষে আমি তাকে পাকড়াও করলাম। পরিশেষে সে রাতের, পানির নিচের এবং মাছের পেটের এ ত্রিবিধ তিমির অন্ধকার থেকে আমাকে ডাকলো। হে আমার আল্লাহ! আপনি ব্যতীত এ মহাবিপদ থেকে উদ্ধারকারী আর দ্বিতীয় কোনো ইলাহ বা মালিক ও ত্রাণকর্তা নেই। আপনি মহাপবিত্র; আর আমি অবশ্যই নিজের প্রতি অবিচারকারী জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছি।
তখন আমি তার আবেদনে সাড়া দিয়ে তার দোয়া কবুল করলাম। ত্রিবিধ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যে দুশ্চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছিল তা থেকে তাকে মুক্তি দিলাম। আর আমার একনিষ্ট মুমিন বান্দাগণ বিপদে পড়ে যখন আমাকে ডাকে, তখন আমরা এভাবেই তাদের নাজাত বা মুক্তি দিয়ে থাকি।’’
এভাবেই মহান আল্লাহ কিছু দিন টিকিয়ে রাখলেন নিনেভাবাসীকে। ইতিহাস হয়ে থাকলো তারা অনন্য জাতি হিসেবে। অধৈর্য ও অন্যায়ের শিক্ষা পেল বিশ্ববাসী। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা পাওয়ার উপায়ও জানা হলো আমাদের। কোনো কারণে ভুল করলে অথবা ভুল হলে ক্ষমা চাইতে হবে আল্লাহর কাছেই।
আরও পড়ুন...