মহাকাশে ভয়েজার ওয়ান

বিজ্ঞান সরকার হুমায়ুন ফেব্রুয়ারি ২০২৫

‘ভয়েজার ওয়ান’ এখন আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে, পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মাইল (২৪ বিলিয়ন কিলোমিটার) দূরে রয়েছে। যতো দূরেই থাকুক না কেন- তবুও এর টিকে থাকা মানুষের জন্য একটি আনন্দময় আবেগপূর্ণ পরিতৃপ্তি। নাসার ভয়েজার মিশন ১৯৭০-এর দশকে চালু হয়েছিল। ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২ যথাক্রমে ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭ এবং ২০ আগস্ট, ১৯৭৭ তারিখে মহাকাশে অভিযান শুরু করেছিল। আজ এটি ইতিহাস তৈরি করেছে। কারণ, এটি নতুন করে বিজ্ঞান কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। এই আকাশযান দু’টি ৭০-এর দশক থেকে কেবল মহাকাশে টিকে আছে না, বরং অন্য যে কোনো মহাকাশযানের তুলনায় আরও ভালো অবস্থায় আছে।

নাসার ভয়েজার মিশনে ছিল দু’টি ভিন্ন মহাকাশযান, ভয়েজার-১ এবং ভয়েজার-২; প্রায় ৫০ বছর আগে এরা মহাকাশে যাত্রা করেছিল। উৎক্ষেপণের পরের দশকগুলোতে এই জুটি আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস এবং নেপচুনে একটি সফল অভিযান চালায়। এই যমজ জুটি পরে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে প্রবেশ করে। সৌরজগৎ ছাড়িয়ে এরা গভীর মহাশূন্যের বাইরের স্থান পাড়ি দিয়ে অসীম মহাকাশ জগৎ চষে বেড়াচ্ছে। প্রশান্ত মনে বিশাল আকাশপানে তাকালে আবছা আলো ছায়ায় নীলাভ জোনাক-জ্বলা যেসব তারকারাজি কল্পজগতে দোলা দেয়; তাদেরই প্রতিরূপ যেন আমাদের ভয়েজার জুটি। অগণিত গ্যালাক্সি-নীহারিকা তারা-নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং উল্কা-গ্রহানু নিয়ে এই বিপুল আয়তনের দুনিয়া। এরই বুকে প্রাণের খোঁজে অনুসন্ধানরত আমাদের ভয়েজার ওয়ান। মহান আল্লাহ এক রহস্যময় রং মাখিয়ে তাঁর মহাশূন্যতার রাজত্বকে যেন সাজিয়ে রেখেছে এক অজানা রহস্যে। এই অজানাকে জানার আগ্রহ মানব মনের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহর দুনিয়াকে জানতে এই সীমাহীন আঙিনার যতই গভীরে ভয়েজার জুটি প্রবেশ করছে; মানুষের অনুসন্ধিৎসু মনে ততই বাড়ছে কৌতূহলী প্রশ্ন আর যতকাল এই ভয়েজার মহাকাশযান জুটি মহাকাশে থাকবে ততকাল এদের সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল ফুরোবে না। কেননা, নাসার বিজ্ঞানীরা প্রতিটি নভোযানে দুই কপি করে ‘সোনালি রেকর্ড’ যুক্ত করে দিয়েছেন। একটি রেকর্ডে আছে তিমির আওয়াজ থেকে শুরু করে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর কান্নার শব্দসহ পৃথিবীর জীবজন্তুর নানা ধরনের ধ্বনির আওয়াজ। আরেকটি রেকর্ডে ৫৫টি ভাষায় স্বাগত জানিয়ে বলা হচ্ছে ‘এই অনন্ত দুনিয়ায় কোথাও কি কেউ আছ?’

আমাদের জন্য এটা একটি গর্বের বিষয়- এই আহ্বানের কথামালায় আমাদের বাংলা ভাষাও রয়েছে। মহাজাগতিক কোনো প্রাণী যদি থেকে থাকে; একদিন হয়তো তারা এসব রেকর্ডের কথা ও ধ্বনির মর্মোদ্ধার করতে পারবে। রেকর্ড দুটি বেজেই চলেছে; অন্তত একশ কোটি বছর ধরে বেজে চলার কথা। প্রতিটি মহাকাশযানে তিনটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর দিয়ে সজ্জিত। ভয়েজারের জেনারেটরগুলো মিশনটিকে আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আমরা জানি না এটি থামবে কোথায় বা কার হাতে! মানবজাতি চিরকাল থাকবে না! কিন্তু আমরা বিলুপ্ত হওয়ার পরেও ভয়েজারের কারণে থেকে যাবে সেই মানুষের ভালোবাসার বিশ্বাসটুকু। কোনো সভ্যতা যদি সত্যিই খুঁজে পায় এই ডিস্ক, তবে জানতে পারবে মানব সভ্যতার ইতিহাস। হয়তো বিলিয়ন বছর পরে এই ডিস্ক বুদ্ধিমান কোনো সভ্য জাতির হাতে পৌঁছুবে। হয়তো তারা ডিকোড করবে; তবে একটি ব্যাপার নিশ্চিত! আমাদের এই আটশো কোটি মানুষের অস্তিত্বের কথা তারা না জানলেও হয়তো ক্রন্দনরত শিশুর কণ্ঠ শুনে বুঝতে পারবে মানুষের জন্মের ইতিহাস। 

আশা করি, ভয়েজার ওয়ান একদিন সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক তথ্য; ভিনগ্রহে প্রাণের খবর পৃথিবীতে নিশ্চয়ই মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্যমালা। তাতে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। একটা প্রশ্নের উত্তর না মিলতেই নতুন করে দানা বাঁধছে হাজারো প্রশ্নের। এতে করে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে বিজ্ঞান সম্পর্কীয় আমাদের স্বতঃসিদ্ধ ধ্যান-ধারণা।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ