মহাকালের সাক্ষী ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ
প্রতিবেদন আবদুস সালাম ফেব্রুয়ারি ২০২৫
মানব মন তখনি বিস্ময়াভিভূত হয়, যখন তার কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়। নওগাঁয়ের মান্দা উপজেলার ঐতিহাসিক কুসুম্বা শাহি জামে মসজিদটি সে রকমই এক অমর কীর্তি। পাঁচ টাকার নোটে যে মসজিদটি আমাদের নিত্য দিন নজর কাড়ে।
৯১০ হিজরিতে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। আজ থেকে ৫১২ বছর পূর্বে। দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে চলে এর নির্মাণকাজ। কেন এত দীর্ঘ সময় লেগেছিল, সেটা এর শৈল্পিক নির্মাণশৈলী দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ইবনে মোজাফফর হোসেন শাহের আমলে স্থপতি সোলায়মান মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।
সুলতানের স্ত্রীর নাম কুসুম বিবি। স্ত্রীকে অত্র এলাকায় রেখে সুলতান চলে যান রাজ্য শাসনে। মানুষ ভালোবেসে এলাকার নাম দেয় কুসুমবাগ। কালক্রমে কুসুমবাগ ‘কুসুম্বা’ নাম ধারণ করে। এমনটাই জানান মসজিদের বর্তমান খতিব মাওলানা মোস্তফা আলী।
মসজিদের স্থাপত্যশৈলী এতটাই নিখুঁত; যা দর্শনার্থীদের নির্বাক করে দেয়। কেউ কেউ তো বিশ্বাসই করতে চায় না এটি মানুষের কাজ। গ্রামীণ সরল জীবনের মানুষদের জোরালো বিশ্বাস এটি জিন জাতির কাজ। মানুষের পক্ষে এ কাজ সাধ্যাতীত। কেনই বা তারা এমন ধারণা করবেন না! এই তো সেদিন ‘কেনজি হান্ডা’ নামের এক জাপানিজ এটির নির্মাণ দেখে রীতিমতো হতবাক। তার মন্তব্য ‘আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে তো প্রযুক্তি এতো এগিয়ে ছিল না। এরপরও কীভাবে পাথরগুলো এত সুনিপুণভাবে স্থাপন করা হয়েছে!’
মসজিদটি কালো পাথরে তৈরি। তবে ইটের ব্যবহারও রয়েছে। পাথরগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে দেখে আপনাতেই প্রশ্ন জাগে, দীর্ঘ সময় পরেও কীভাবে স্ব-স্থানে বহাল-তবিয়তে আছে; কোনোরূপ ক্লান্তি ছাড়াই!
মসজিদে ঢোকার পর ডান দিকে তাকালেই নজরে আসে কাজির মঞ্চ। একসময়ে মসজিদকে কেন্দ্র করেই যে মুসলিম সমাজের যাবতীয় কার্যক্রম আবর্তিত হতো, তার উজ্জ্বল নমুনা এই কাজির মঞ্চ।
মসজিদটির প্রধান আকর্ষণ দক্ষ শিল্পীর হাতে সুনিপুণভাবে পাথরে খোদাই করে নানা চিত্রকর্মের সমন্বয়ে তৈরি করা মেহরাব। মোট তিনটি মেহরাব রয়েছে। মাঝ বরাবর একটি, বাম পাশে একটি এবং ডান পাশে কাজি যেখানে বসে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, ঠিক তার পেছনে একটি। তখনকার দিনে আজকের মতো ক্যামেরার ব্যবহার ছিল না। বিচারাসনে বসার পর সাংবাদিকরা কারুকাজ খচিত মেহরাব ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে বিচারকের ছবি তুলবেন এমন আশা স্থপতি সোলায়মানের ছিল না। কিন্তু তাই বলে তো শানশওকতের কমতি রাখা যায় না! তৎকালের উত্তম রুচিবোধের উৎকৃষ্ট নমুনা হতে পারে এই শিল্পকর্ম।
১৯০৪ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের মূল গম্বুজটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থায় থাকার ফলে মূল গম্বুজের সাথে আরও দু’টি গম্বুজে ফাটল ধরে। ১৯৬৪ সালে এটির সংস্কার করা হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার ঐতিহাসিক খাল খনন কার্যক্রম উপলক্ষ্যে নওগাঁতে আসেন। কুসুম্বা মসজিদ পরিদর্শনকালে এর নির্মাণ কৌশল তাকে চমৎকৃত করে; বিশেষ করে এর মেহরাব। ফলে প্রথমবারের মতো ১৯৭৮ সালে পাঁচ টাকার নোটে মসজিদের মেহরাবটি যুক্ত হয়। পরে ২০১১ সালে মেহরাবের পরিবর্তে মসজিদের পূর্ণাঙ্গ ছবিটি যুক্ত করা হয়।
ইতিহাস বিকৃতির এই কালে কুসুম্বা শাহি মসজিদ বাদ যাবে কেন? মসজিদে ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে মসজিদ পরিচিতির জায়গায় লেখা ১৯৭২ সালে পাঁচ টাকার নোটে মসজিদটি যুক্ত করা হয়। যা সত্য নয়।
মসজিদের সাথেই রয়েছে ৭৭ একর জমির উপর সুবিশাল দীঘি। এটি মসজিদ তৈরির সময়-ই খনন করা হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তৎকালের প্রায় সবগুলো মসজিদের সাথেই এমন পুকুর বা দীঘি রয়েছে। জনসাধারণের বৃহৎ কল্যাণের কথা চিন্তা করেই এগুলো খনন করা হতো।
বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি এবং মনোবাসনা পূরণে মানত করা সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আজ থেকে বছর বিশেক আগে মানতকারীগণ মসজিদের সামনের এ দীঘিতে মানতের জন্য আনা নজরানা ফেলে যেতো। সে নজরানা ফকির কাঙালরা নিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটাতো। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। নজরানার জন্য আনা ডিম, হাঁস-মুরগি বা অন্য কোনো জিনিস মসজিদ কর্তৃপক্ষ নিলামে তুলে বিক্রি করে। বিক্রীত সে অর্থ দিয়ে মসজিদ পরিচালনা করা হয়। এ রীতি এখনো বর্তমান।
ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ নিয়ে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এই মসজিদে। পূর্বপুরুষদের তৈরি অমর কীর্তি দেখে মুগ্ধতার আবেশ নিয়ে ফিরে যান আপন নীড়ে।
আরও পড়ুন...