মঙ্গলগ্রহে বরফ

বিজ্ঞান শিহাব উদ্দীন ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীরা শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে মঙ্গলের ভূমিতে প্রচুর খালের মতো জায়গা দেখতে পান। ধারণা করা হয় সেগুলো মঙ্গলের খাল। প্রাকৃতিকভাবেই পানির প্রবাহে নদীর সৃষ্টি হয়। পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বা সুবিধামতো ব্যবহারের জন্য নিজেদের প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে খনন করা হয় খাল। বিজ্ঞানীদের অনেকেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, মঙ্গলগ্রহে প্রাণী আছে এবং তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পৃথিবীর মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। 

১৯৬৪ সালে যখন আমেরিকান মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দ্বিতীয় মঙ্গল মিশন ম্যারিনার-৪ মঙ্গলগ্রহের চারপাশে ঘুরে প্রথম মঙ্গলের ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়, তখন মঙ্গলের ব্যাপারে মানুষের ধারণা বদলে যায়। 

বাস্তবে মঙ্গলে কোনো খালের অস্তিত্ব নেই। পৃথিবী থেকে দেখে যেগুলোকে খাল বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেগুলো লম্বা শুকনা ভূমি, যেখানে কোনো পানি নেই।

মঙ্গল মিশনগুলোর মাধ্যমে মঙ্গলগ্রহের অসংখ্য ছবি এবং তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। মঙ্গলগ্রহের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ও বায়ুচাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ধারণা পেয়েছেন। মঙ্গলের বায়ুচাপ মাত্র ৬.১ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপকে আমরা হিসাবের সুবিধার্থে ১ অ্যাটমোস্ফেরিক প্রেসার একক ধরে থাকি। সে হিসাবে মঙ্গলের গড় বায়ুচাপ হলো পৃথিবীর বায়ুচাপের এক হাজার ভাগের ছয় ভাগ মাত্র। মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। 

শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় পানি বরফ হয়ে যায়। সেখানে শূন্য ডিগ্রিরও ৬৩ ডিগ্রি নিচে কোনো তরল পানি থাকতে পারে না। তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পরিবর্তনের সঙ্গে পানির তিন অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর এক বায়ুমণ্ডলীয় চাপে শূন্য ডিগ্রি থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি তরল আকারে থাকে, ১০০ ডিগ্রির ওপরে গেলে পানি বাষ্পে বা বায়বীয় অবস্থায় চলে যায়, আর শূন্য ডিগ্রির নিচে গেলে পানি বরফ বা কঠিন অবস্থায় চলে যায়। বায়ুর চাপ কমে ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি একই সঙ্গে কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় অবস্থায় থাকতে পারে। এই অবস্থাকে পানির ট্রিপল পয়েন্ট বলা হয়। 

মঙ্গলগ্রহের বায়ুচাপ পানির ট্রিপল পয়েন্টের বায়ুচাপের সমান। এই ধারণার প্রেক্ষিতে মঙ্গলে পানির অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা সফল হন।

বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় অনেকটা এগিয়ে যান মঙ্গলে পানির সন্ধান পাবার মাধ্যমে। এতদিন চেষ্টার পর তারা প্রথম মঙ্গলের বিষুবরেখার অনেক কাছে বরফের আকারে পানির সন্ধান পেয়েছেন। এর আগে তাদের ধারণা ছিল, পাতলা বায়ুমণ্ডল ও তীব্র সূর্যালোকের কারণে সেখানে বরফের স্তর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

মঙ্গলগ্রহে পানির অস্তিত্বের ব্যাপারে আগেই জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। এক গবেষণায় জানা গেছে, লাল এই গ্রহের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরিতে বরফের আকারে পানি রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ টন। মঙ্গলগ্রহের সবচেয়ে উঁচু আগ্নেয়গিরি অলিম্পাস মনসের ওপরে এই বরফের সন্ধান এই গ্রহে বিরল কিন্তু সক্রিয় জলচক্রের উপস্থিতি নির্দেশ করে।

এ বিষয়ে ন্যাচার জিওসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, মঙ্গলগ্রহের ঠাণ্ডা ঋতুতে প্রতিদিন সকালে কয়েক ঘণ্টার জন্য থারসিস আগ্নেয়গিরি অঞ্চলের প্রাচীন ক্যালডেরাসে তুষারপাত হয়। মঙ্গলপৃষ্ঠ থেকে আর্দ্র বাতাস আগ্নেয়গিরির ঢালে পৌঁছায়। যখন এই বাতাস ঠাণ্ডা ক্যালডেরাসে পৌঁছায়, তখন এটি ঘনীভূত হয় এবং তুষারপাতের সৃষ্টি করে। এর ফলে তৈরি বরফের পাতলা স্তরটি মঙ্গলগ্রহের অনেক বড়ো এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা দেখে অনুমান করা যায়, সেখানে প্রায় দেড় লাখ টন পানি থাকতে পারে, যা পৃথিবীর ৬০টি বড়ো সুইমিং পুলের পানির সমান। 

তারা ধারণা করছেন, সেখানে আগে বৃষ্টি হয়েছিল এবং সম্ভবত তুষারপাতও হয়েছিল। তারপরই এই বরফ ক্যালডেরাসে জমা হয়।

মঙ্গলগ্রহের ভূমিতে অসংখ্য নদী-নালা হ্রদের চিহ্ন রয়েছে, যা কালের আবর্তনে শুকিয়ে গেছে। ভূমির এসব গঠন তরল পানিপ্রবাহের প্রমাণ বহন করছে।

নাসার বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহের পাথরের নিচে তরল পানির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন। এই গবেষণা প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স নামে একটি বিজ্ঞান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৮ সালে নাসার ইনসাইট ল্যান্ডার মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠে অবতরণ করে। এই ল্যান্ডারের সিসমোমিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে মঙ্গলের ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয় এবং তার বিশ্লেষণে পাওয়া যায় যে মঙ্গলের পৃষ্ঠের নিচে, প্রায় ৬ থেকে ১২ মাইল গভীরে, তরল পানি রয়েছে।

এর আগেও মঙ্গলে পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও সেটা বরফ বা বাষ্প আকারে ছিল। এবার প্রথমবারের মতো মঙ্গলের গভীরে তরল পানির সন্ধান পাওয়া গেল। এটি বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড়ো আবিষ্কার। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল মাঙ্গা এই গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক।

তবে মঙ্গলগ্রহের ভূমির উপরিস্তরে এখন কোনো তরল পানি নেই। প্রমাণ পাওয়া গেছে, মঙ্গলের ধূলি বা রেগোলিথের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রচুর বরফ জমে আছে। রেগোলিথের মাঝে মধ্যে এই রন্ধ্র বা ছিদ্রগুলো তৈরি হয়েছে জমাট কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ড্রাই আইস থেকে। শীতকালে ড্রাই আইসের পর সামান্য ধূলি পড়লে তা আটকে যায় সেখানে। শীতের শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাষ্পীভূত হয়ে যায়। তখন অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ধুলা বা রেগোলিথের আস্তরণ ভূমিতে রয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে এক মিটারেরও বেশি পুরু রেগোলিথের স্তর জমা হয়েছে ভূমির ওপর। এই ছিদ্রগুলোর মধ্যে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প জমে বরফ হয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে।

মার্স এক্সপ্লোরেশান রোভার ও মার্স এক্সপ্রেস অরবিটার মঙ্গলের ভূমিতে প্রচুর রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করেছে, যেগুলোর মধ্যে আছে বিভিন্ন লবণ, সালফেট, ক্লোরেট ইত্যাদি। ভূমির স্তরের ঠিক নিচে যে জমাট পানি আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সে পানিতে লবণ ও সালফেট মিশে থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি। ফলে মঙ্গলের পানি হবে লবণাক্ত। 

সাধারণ পানি শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় বরফে পরিণত হয়। কিন্তু লবণাক্ত পানি বরফে পরিণত হতে তাপমাত্রা আরও অনেক কম হতে হয়। -২১ ডিগ্রি তাপমাত্রায় লবণাক্ত পানি জমাট বেঁধে যায়। মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই তাপমাত্রায় লবণাক্ত পানি জমাট বেঁধে বরফ হয়ে আছে মঙ্গলের ভূস্তরের ঠিক নিচে। এই আবিষ্কার আমাদের মঙ্গলগ্রহের চমকপ্রদ অজানা তথ্যের দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ