মগজের মৃত্যু
গল্প জুবায়ের হুসাইন সেপ্টেম্বর ২০২৫
মেয়েটা ছোটোকাল থেকেই বেশ মেধাবী। পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়েও বেশ আগ্রহ ওর। বিশেষ করে ছবি আঁকতে ও দারুণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। যেকোনো বিষয়ের স্কেচ সে নিমেষেই এঁকে ফেলতে পারে।
তিন ভাইবোনের মাঝে ওর অবস্থান দ্বিতীয়। সে কারণে বড়ো বোনের বেশ আদরের। আর ছোটো ভাইটি ওদের দুই বোনের যেন চোখের মণি!
‘আব্বা, আজকে আমার জন্য একটা ড্রয়িং খাতা আর রংতুলি কিনে আনবে।’ আব্বুর কানে কানে বলে মেয়েটি।
আব্বু বারান্দার কাঠের চেয়ারটাতে বসে নিচু হয়ে চামড়ার স্যান্ডেল পরছিলেন। সোজা হয়ে মেয়ের কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই আনব, নাঈমা মা। তবে ক্লাসের পড়া ফাঁকি দিয়ে কিন্তু আঁকাআঁকি করা যাবে না। তাহলে আম্মু খুব বকবে।’
‘সে ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো আব্বু।’ বাবাকে কথা দিলো নাঈমা। ‘আমার জন্য তোমাকে কখনোই আম্মুর কাছে নালিশ শুনতে হবে না।’
‘আমি তা জানি মা।’ মেয়ের মাথার চুলে নিজের হাতের লম্বা আঙুলগুলো চালিয়ে ইলিবিলি কেটে দিলেন বাবা। তারপর বিদায় নিয়ে চললেন নিজের কর্মস্থলের উদ্দেশে।
নাঈমার বাবা পল্লিচিকিৎসক। বাজারে তার একটি ডিসপেনসারি কাম ওষুধের দোকান আছে। গ্রামের অসচ্ছল মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি শুধু ওষুধের দাম নিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
সারাদিন নাঈমার মনটা পুলকে টুনটুনি ছানার মতো ফুড়–ত ফুড়–ত করে উড়তে থাকে। আব্বু রাতে বাড়ি ফেরার সময় ড্রয়িং খাতা আর রংতুলি নিয়ে আসবেন। ও তখন মনের মতো করে আঁকাআঁকি করতে পারবে। ক্লাসের বান্ধবীদেরও বলতে পারবে যে, ওর রংতুলি আছে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে। মায়ের মাথায় তখন অন্য একটা চিন্তা খেলে যায়। এই তল্লাটে তার এই মেজো মেয়ের মতো মেধাবী ছাত্রী আর একটাও নেই। মায়ের ধারণা, গ্রামে থাকলে মেয়ের মেধার যথার্থ বিকাশ ঘটবে না। তাকে উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে।
অনেক ভেবে স্থির করলেন, মেয়েকে নিয়ে শহরে যেতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় ঢাকার কোনো নামি স্কুলে ভর্তি করাতে পারলে। স্বামীর সাথে এ নিয়ে আলোচনা করলেন। স্বামী প্রথমটায় রাজি হলেন না নিজের আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে। শেষে স্ত্রীর পীড়াপীড়ি আর যুক্তি বিশেষ করে মেয়ের মেধার কাছে হার মানলেন।
এরপর থেকে নাঈমারা রাজধানীর উত্তরায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করল। বড়ো বোন এবং ওকে মাইলস্টোন স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো।
পড়ালেখায় আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে নাঈমা। কিন্তু ওর আঁকিবুঁকিও থেমে থাকেনি।
নাঈমা এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। বিজ্ঞান বিভাগে এমনিতেই পড়ালেখার চাপ বেশি থাকে। হায়ার ম্যাথ ওর ফেভারিট সাবজেক্ট। স্কুলের স্যার-ম্যাডামদেরও তাক লেগে যায় ওর ম্যাথের প্রতি দখল দেখে। তবে বায়োলজিতেও ওর আগ্রহের কমতি নেই। বিশেষ করে প্রাণীবিষয়ক চ্যাপ্টারগুলো ওকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
মা-বাবা ওকে ঘিরে নানান স্বপ্ন বুনতে থাকেন। সেজন্য খরচের দিকে তাকান না। যখন যেটা প্রয়োজন সাধ্যমতো মেটানোর চেষ্টা করেন। বাবা তো শহর-গ্রাম করেই কাটিয়ে দিতে থাকেন দিনগুলো।
নাঈমার মনের মাঝে একটা সুপ্ত ইচ্ছা ডালপালা মেলতে থাকে। ও বড়ো হয়ে ডাক্তার হবে। তবে বর্তমানের ডাক্তারদের মতো ডাক্তার ও হতে চায় না। ওর ইচ্ছা-ডাক্তারিটাকে শুধুমাত্র পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। বরং মানবসেবার একটা মাধ্যম হিসেবে নিতে চায়।
এই তো, আর মাত্র কয়েকটা ক্লাস পার করতে পারলেই মেডিকেলে ভর্তি হতে পারবে। তারপর ডাক্তার হয়ে বেরিয়ে এসে শুরু করবে ওর মিশন।
ভাবতেই বুকটা ফুলে ওঠে। ফুসফুস ভরে দম নেয়। আনন্দের শীতল একটা শিহরন ওর শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠানামা করে।
ওর স্কুলের স্যার-ম্যাডাম এবং বান্ধবীরাও জেনে যায় ওর স্বপ্নের ব্যাপারে। সেজন্য তারাও বেশ সহায়তা করে।
একদিন তো পাশের একটি স্টুডিওতে গিয়ে ডাক্তারের ড্রেস পরে একটা ছবিও তুলে আনে। সেটা ওর আম্মু যত্ন করে তোলে রেখেছেন।
প্রাইভেট পড়ে সবেমাত্র বাসায় ঢুকেছে নাঈমা। তক্ষুনি শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। আর দুটো মিনিট দেরি করলেই ভিজে যেতে হতো।
আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল নাঈমা।
আজই জানতে পারল যে, বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে। আর তা ছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইয়া ও আপুরা কী নিয়ে যেন আন্দোলন করছে। টিভিতে কিছু কিছু নিউজ হচ্ছে সেসব নিয়ে। নিজের পড়ালেখার চাপ আর এসব কারণে অন্য কোনো দিকে খেয়াল রাখা হয়ে ওঠেনি। আর তা ছাড়া এখন তো কখন কোনো কাল আসে যায় তা বোঝা যায় না। গ্রামে কিছুটা আন্দাজ করা গেলেও শহরে সেটা সম্ভব হয় না। পরিবেশের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে বিগত বছরগুলোতে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নাঈমা ও ওর বান্ধবীরা। পক্ষে-বিপক্ষে নানান যুক্তি তুলে ধরে।
তবে ওরা সবাই একমত হয় যে, ভাইয়া-আপুদের আন্দোলনটা যৌক্তিক। সরকারি চাকরিতে কোটার নামে যে বৈষম্য করা হয়, সেটা সবার জন্যই খারাপ। প্রকৃত মেধাবীদের মূল্যায়ন সেখানে হয় না। কাজেই এই কোটাব্যবস্থা বাতিল হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সরকার তা কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না। বরং শক্ত হাতে দমন করার পথে হাঁটতে থাকে। আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে আটকাতে কূটকৌশল গ্রহণ করে। তাদেরকে নানান দুষ্ট বিশেষণে ভূষিত করতে থাকে। কখনো নাশকতাকারী, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতিকারী ট্যাগ লাগিয়ে তাদেরকে সমাজের কাছে দোষী হিসেবে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। ন্যায্য দাবিকে দেশের ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে ব্যাপক প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হয় না। শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির প্রতি অটল। প্রয়োজনে রক্ত ঝরাবে, যদি লাগে জীবন দেবে-কিন্তু দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরবে না।
সারা দেশ এবার নড়ে ওঠে। তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাড়তে থাকে সমর্থন।
অন্যদিকে স্বৈরাচারী সরকারও বেছে নেয় নিষ্ঠুরতার চরম পন্থা। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে দেয়। সাথে লেলিয়ে দেয় পোষা গুণ্ডাবাহিনীকে।
ব্যস, শুরু হয়ে যায় সংঘর্ষ। আহত হতে থাকে শিক্ষার্থীরা।
‘আমাদের কিছু একটা করা উচিত।’ টিফিন পিরিয়ডে হঠাৎ বলে ওঠে আনিসা।
নাঈমা বলে, ‘কিন্তু কী করব আমরা? আমার তো মাথায়ই ঢুকছে না সরকার কেন এই যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিচ্ছে না!’
মায়মুনা বলল, ‘এই সরকার তো মানুষের কোনো ন্যায্য দাবিই মেনে নিতে চায় না। তারা যেন পণ করেছে যে, মানুষের যেগুলোতে ভালো হয়, সেগুলো তারা করবে না।’
জবাবে আনিসা বলল, ‘আমার ভাইয়া বলে, এই সরকার তো মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেনি। তাই মানুষের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্বই নেই। তারা যা করছে সব নিজেদের জন্য। সেজন্য তাদের কোনো সমালোচনাই তারা মেনে নিতে পারে না। নানান ঘৃণ্য পন্থায় সেগুলো দমন করে চলেছে।’
‘তোমার ভাইয়া ঠিকই বলেছে।’ বলল নাঈমা। ‘আমার সেজো মামা অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছেন। এলাকার হাইস্কুলে তিনি শিক্ষকতার জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলেন। অন্য যারা অ্যাপ্লাই করেছিল, তাদের চেয়ে মামার রেজাল্ট ছিল ভালো। বলা যায়, তিনিই ছিলেন ওই পদের যোগ্য। কিন্তু তাকে নেওয়া হয়নি। বরং নেওয়া হয় অন্য একজনকে। যার রেজাল্ট ছিল সিজিপিএ ৩.০৫। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ওই ছেলেটা সরকারি দলের যে ছাত্রসংগঠন আছে, তার একজন পাতি নেতা।’
নাঈমার সাথে যেন সুর মিলিয়ে বলল আনিসা, ‘এজন্যই তো বলছি আমাদেরও কিছু করা দরকার। আমরাও যে ভালো রেজাল্ট করে কোনো ভালো জায়গায় ঢুকতে পারব না, এটা তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। শোনো তোমরা, আমাদের আশেপাশের স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাও এই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছে। আমাদেরও উচিত সেটা করা।’ বলে বান্ধবীদের মুখের দিকে পালাক্রমে তাকাতে থাকে আনিসা।
‘আমার মেজো ভাইয়া কিন্তু আন্দোলনের সাথেই আছে।’ বলল মায়মুনা।
‘এটা তো খুবই ভালো খবর!’ প্রায় একসাথে বলে উঠল আনিসা ও নাঈমা।
‘ভাইয়া বলেছে,’ বলে চলল মায়মুনা। ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। স্বৈরশাসককে আর ছেড়ে দেওয়া হবে না। অগণিত মানুষ হত্যা করেছে তারা। গুম করেছে শত শত ভাইবোনকে। মামলা দিয়ে ঘরছাড়া করেছে অসংখ্য মানুষকে। ভাইয়া আমাকে বলেছে, এই দেশের মানুষের প্রতি এই সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। যেহেতু জনগণের ভোটের মাধ্যমে তারা নির্বাচিত হয়ে আসেনি, আসলে মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে তারা থোরাই কেয়ার করে, সেজন্য দেশবাসীর ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাদের নেই। স্বজনপ্রীতি আর দলীয় লোকজনের যাতে ভালো হয়, সেটাতেই তাদের যত মনোযোগ।’
‘তুমি তো পুরোপুরি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মতো কথা বলছ, মায়মুনা!’ নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বলে উঠল নাঈমা।
‘যাহ্! কী যে বলো!’ লজ্জা পেল মায়মুনা।
‘যেটা সত্যি, আমি কিন্তু সেটাই বলেছি।’ নিজের কথার সমর্থনে আবার বলল নাঈমা। ‘তবে আমি এটা বিশ্বাস করি যে, এই দেশ আর দেশের বঞ্চিত মানুষের প্রতি আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। এটা আমাদের ঈমানি দায়িত্বও বটে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা না করার সঙ্গে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমানের স্তর কম বেশির তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন তা তার হাত দিয়ে বাধা দেয়। আর যদি হাত দিয়ে বাধা দিতে না পারে তবে যেন মুখ দিয়ে বাধা দেয়। আর যদি মুখ দিয়ে বাধা দিতে না পারে, তবে যে অন্তর দিয়ে বাধা দেয়। এটি হলো দুর্বল ঈমানের পরিচয়। মানে ঈমানের দুর্বলতম স্তর। এই সুন্দর হাদিসটি মুসলিম শরিফে আছে।’
নাঈমা থামতেই আনিসা জিজ্ঞেস করল, ‘হাত ও মুখ দিয়ে বাধা দেওয়া তো বুঝলাম, কিন্তু অন্তর দিয়ে কীভাবে বাধা দেবো?’
হাসল নাঈমা। বলল, ‘অন্তর দিয়ে বাধা দেওয়া অর্থ হচ্ছে মনে মনে ঘৃণা করা। মানে মনের মধ্যে এ কথা গেঁথে নেওয়া যে, এগুলো অন্যায়। সুযোগ পেলে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করব না।’
‘কতই-না সুন্দর আমাদের নবীর কথাগুলো!’ মায়মুনার চোখমুখ চকচক করে উঠল।
‘আমাদের নবীর আরও অনেক সুন্দর সুন্দর হাদিস আছে। তোমরা যদি চাও এক এক করে সেসব শোনাব তোমাদের।’ নাঈমাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে। ‘আব্বু বলেছেন ভালো কথা ও কাজগুলো শুধুমাত্র নিজের মধ্যেই আটকে রাখা যাবে না। সেগুলো অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে অনেক লাভ হবে। সমাজে ভালো কাজের প্রসার ঘটবে। আর পরকালে তো নেকির পাল্লা ভারী অবস্থায় আল্লাহর দরবারে যাওয়ার সুযোগ হবে।’
‘তোমার শেষের কথাটা বুঝতে পারলাম না।’ প্রশ্ন করল আনিসা।
‘সেটাই তো বলতে চাচ্ছি আমি।’ জবাবে বলল নাঈমা। ‘তুমি যদি কোনো ভালো জ্ঞান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দাও এবং কোনো একজন মানুষও যদি সেটা আমল করা আরম্ভ করে, তাহলে সে সেসব ভালো আমলের জন্য যে সওয়াব পাবে, তার সমপরিমাণ সওয়াব তোমার আমলনামায়ও যোগ হবে। আর এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, তার সওয়াব কিছুমাত্র কম হবে না। এভাবে তার আমলের দ্বারা যত মানুষ উপকৃত হবে, সেই সমস্ত মানুষের সওয়াবের সমান সওয়াব তোমার আমলনামায় যোগ হতে থাকবে।’
টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় আলোচনা আর এগোয় না সেদিন। একটু পর রসায়নের ম্যাডাম প্রবেশ করেন ক্লাসরুমে।
জুলাইয়ের চৌদ্দ তারিখের পর ছাত্রদের আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এবার শুধু ঢাকা না, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে সে আন্দোলনের স্রােত। পাশাপাশি চলতে থাকে সরকারের নানান রকম দমন-পীড়ন।
ষোলো তারিখে প্রথম খুন ঝরে। সেদিন রংপুরে পুলিশের সরাসরি গুলিতে প্রাণ হারায় ইংরেজির মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ। দরিদ্র পিতা-মাতার আশার আলো নিভে গেল মুহূর্তেই।
এবার ফুঁসে উঠল সমগ্র দেশ। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল সর্বস্তরের জনগণ।
নাঈমাদের স্কুলে ক্লাস হচ্ছে না। বাড়িতে বসেই কাটিয়ে দিতে হচ্ছে সময়গুলো। এ সময়গুলো নাঈমা ছবি এঁকে, কাগজে বিভিন্ন স্লোগান লিখে কাটিয়ে দিতে লাগল। সেগুলোর কোনো কোনোটা ফেসবুকে পোস্টও দিলো।
আঠারো জুলাই রাজধানীর উত্তরায় পুলিশের গুলিতে প্রায় ৩০ জন ছাত্র-জনতা মারা যান। ওইদিন রাতে নাঈমা আন্দোলনের পোস্টার আঁকছিল, আর মায়ের সঙ্গে গল্প করছিল। একপর্যায়ে মাকে বলে, ‘আম্মু, ধরো আমি যদি আন্দোলনে গিয়ে মারা যাই, তুমি মানুষকে কী বলবা?’ মাকে জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে আবার নিজেই বলে ওঠে, ‘বলবা যে শহীদ হয়েছে। আমার মেয়ে শহীদ হয়েছে।’
কী চমৎকার কথা! কতই-না বলিষ্ঠ ও সাহসী উচ্চারণ! সশরীরে আন্দোলনের কাতারে শামিল হতে না পারলেও অন্তরে যে সর্বক্ষণ আন্দোলনের সাথেই আছে, এই কথাগুলো থেকে তা সহজেই বুঝে নেওয়া যায়।
‘অমন কথা বলে না মা!’ আম্মু বলেন। তার গলাটা কেমন কেঁপে ওঠে। ‘তুমি যে আমাদের নয়নের মণি! কত আশা তোমাকে নিয়ে তোমার বাবার! তোমার কিছু হয়ে গেলে লোকটা বাঁচবেন না।’ অজানা আশঙ্কায় শরীরের মধ্যে একটা শিহরন খেলে গেল।
‘তুমি কি চাও না মা তোমার মেয়ে ন্যায়ের পথে থাকুক?’ প্রশ্ন করে বসে নাঈমা। ‘ন্যায়ের পথে থেকে জীবন দেওয়া তো গর্বের ব্যাপার! সবার ভাগ্যে কি সেটা জোটে?’
আম্মু এবার কোনো জবাব দিতে পারেন না। মেয়ের কথাগুলো খণ্ডানোর কোনো ভাষা আপাতত তার মুখে আসে না। মেয়ের কথা তিনি কীভাবে ফেলে দেবেন?
পঁচিশ তারিখ নাঈমার জন্মদিন। প্রতি বছর ওই দিন ওর বড়ো বোন ওর জন্য গিফট কিনে আনে। আর প্রতিবারই নাঈমা অবাক হয়ে যায় যে, আপা কীভাবে জানল ওই জিনিসটাই তার ওই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন!
‘আচ্ছা আপা,’ আপাকে জিজ্ঞেস করল নাঈমা। ‘এবার জন্মদিনে আমাকে কী গিফট দেবে তুমি?’
আপা মুচকি হাসল। বলল, ‘সেটা তো এখনই বলা যাবে না নাঈমা।’
‘বলো না আপা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।’ জোরাজুরি করতে থাকে নাঈমা।
‘আচ্ছা তুমিই বলো, এবার জন্মদিনে তোমার কী চায়?’ পালটা প্রশ্ন করল আপা।
থুতনি আর চোয়ালে আঙুল বুলিয়ে ভাবতে লাগল নাঈমা। অনেক ভাবার পর বলল, ‘নাহ্! আমি কিছু বলব না। তুমি যেটা দেবে সেটাই আমার জন্য সেরা উপহার। প্রতিবারই তো আমার বেস্ট চাওয়াটাই দাও। এবারও সেটা দেবে, আমি কনফার্ম।’
হেসে দেয় দুইবোন। নির্মল সে হাসি পুরো ঘরে খুশির পরশ বুলিয়ে দেয়।
সে রাতটা নাঈমার কাছে বেশ দীর্ঘ মনে হয়। ঘুম আসতে চাচ্ছে না কিছুতেই। নানান চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকার আর তার পেটোয়া বাহিনীর ওপর তীব্র ঘৃণা হচ্ছে। ইশ্! ও-ও যদি যেতে পারত মিছিলে! গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিতে পারত যদি তাহলে কতই-না ভালো হতো। কত স্লোগান যে ওর ছোট্ট মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে!
পরদিন নাঈমাদের বাসার একটু দূরে উত্তরা আধুনিক মেডিকেলের সামনে ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশ ও তাদের সহযোগী ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুণ্ডাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও কিছু পুলিশ আশপাশের গলিতে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আশাপাশটা। চিল্লাচিল্লি আর মুহুর্মূহু গুলির শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে আকাশ। টিয়ারশেলের ছোঁয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছে চারপাশ।
তখন আনুমানিক বিকাল চারটা।
নাঈমা তার রুমে বসে ‘বয়কট ছাত্রলীগ’, ‘কোটা সংস্কার চাই’সহ নানা স্লোগানে রঙিন কালিতে প্রতিবাদী পোস্টার আঁকছিল। ঠিক তখনই বাসার সামনে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেল। দৌড়ে বারান্দায় গেল দেখতে।
দেখল, বাসার ঠিক নিচে আন্দোলনকারীদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়ছে পুলিশ।
নাঈমা তার হাতে থাকা মোবাইল ফোনটার ভিডিও অন করে দিলো। মোবাইলের ক্যামেরার ফোকাস নিচের দিকে তাক করতেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল পুলিশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
নাঈমার মাথার একপাশ দিয়ে তপ্ত বুলেটটি ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। মাথার খুলি ফেটে গিয়ে মেঝেতে ছিটিয়ে পড়ল ওর মগজ। মুখ দিয়ে শুধু একটাই শব্দ বের করতে পারল, ‘মা...আ...!’
তীক্ষè মেধা আর সাহস ও অন্যায়ের প্রতিবাদে ঠাসা মগজটা মুহূর্তেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল।
নাঈমা ঝাপসা চোখে দেখল, আম্মু, আপা এবং আশপাশের ফ্ল্যাট ও নিচে থাকা ছাত্ররা ছুটে এসে ওর নিথর দেহটা ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে নাঈমার। নিরেট শূন্যতা নেমে আসে চারপাশে। নিজেকে বেশ হালকা মনে হতে থাকে। শূন্যে ভাসতে থাকে যেন ও। তবে দেহ বা অন্য কিছুর উপস্থিতি টের পায় না।
আরও পড়ুন...