ব্লু ইউনিভার্স
সাইন্স ফিকশন মুশফিকুর রহমান তামিম আগস্ট ২০২৪
প্রতি রাতেই নিজ ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় মগ্ন থাকেন প্রফেসর আজিম উদ্দিন। নিজের ছোট্ট পরিবারটা নিয়ে খুব সুখেই ছিলেন। একটা কার অ্যাক্সিডেন্ট ছিনিয়ে নিয়েছিল তার পুরো পরিবার।
পরিবার হারানোর শোকে কাতর থেকে পাথর হয়ে একাকিত্বকে বেছে নেন তিনি। নিজেকে লুকিয়ে নেন লোকালয়ের আড়ালে।
এই এলাকাটা খুব নির্জন। চারপাশে ঘন গাছপালায় ঘেরা বাড়িটি। ফাঁকা বাড়িটি ভিনগ্রহীদের সাথে যোগাযোগের পারফেক্ট জায়গা।
পরিবার হারিয়ে আজিম সাহেব যখন ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এলিয়েন আবিষ্কার করবেন। পূর্বপুরুষদের সব ল্যান্ড প্রপার্টি বিক্রি করে এই ফাঁকা বাড়িতেই তৈরি করেছেন আধুনিক ল্যাবরেটরি।
তার আড়াই বছরের পরিশ্রম বৃথা যায়নি। গত সপ্তাহে ছাদের বেতার তরঙ্গের ভেতর দিয়ে স্পেস থেকে কিছু অদ্ভুত মিউজিক এসেছিল তার কম্পিউটারে। যেই শব্দগুলো তিনি তার রেকর্ডারে রেকর্ড করেছিলেন।
সেই থেকে প্রতিদিন রাতে তিনি কিছু মিউজিক শুনেন। মাঝে মাঝে কথাবার্তাও শোনা যায়। আজিম সাহেব যার কিছুই বুঝতে পারেন না। তিনি ভাষাগুলো রেকর্ড করে বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ করেন। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায় না।
গত রাতে প্রফেসর আজিম সাহেব নিত্যদিনের মতোই ল্যাবরেটরিতে বসে ছিলেন। হঠাৎ জানালায় চোখ পড়তেই দেখতে পেলেন বাইরে নীল আলোকরশ্মি দেখা যাচ্ছে, সাথে সেই অদ্ভুত শব্দ যা তিনি গত সাতদিন ধরে কম্পিউটারে শুনতে পাচ্ছিলেন।
ড্রয়ার থেকে রিভলভারটা বের করে গুলি লোড করে নিলেন। ল্যাব থেকে বেরুতেই বেল বেজে ওঠে। হৃদস্পন্দন বেড়ে চলছে। কাঁপা পায়ে এগিয়ে দরজা খুলে দিলেন। মুহূর্তেই নীল রঙের একটা জন্তু ঝাঁপিয়ে পড়লো আজিমের বুকের ওপর। রিভলভারটা ছিটকে দূরে পড়লো। প্রফেসর আজিম আন্দাজ করে বুঝলেন তার থেকে রিভলভারের দূরত্ব পাঁচ ফুটের কম হবে না।
জন্তুটা তার গলা টিপে ধরার আগেই বুকপকেট থেকে সিরিঞ্জ বের করে পুশ করে দিলেন জন্তুটার ঘাড়ে। বেহুঁশ হয়ে গেল জন্তুটা। এক লাফে রিভলভারটা তুলে নিয়ে দাঁড়ালেন। তখনও দীর্ঘশ্বাস চলছে তার। সমস্ত শরীর থরথরিয়ে কাঁপছে।
জন্তুটাকে খতিয়ে দেখতে লাগলেন আজিম। দেখতে হুবহু মানুষের মতো। কিন্তু চামড়া পুরো নীল, চোখগুলোও নীলকান্ত মণির মতো জ্বলজ্বলে।
নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। জন্তুটার কিছু চামড়া তুলে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে চলে গেলেন আজিম।
একি! এটা মানুষের চামড়া! এর চামড়াটা সত্যিই নীল।
এতক্ষণে নীল জন্তুটার জ্ঞান ফিরেছে। সে নিজেকে একটা বদ্ধ লোহার ঘরে চেয়ারের সাথে বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করলো।
একটা পাসওয়ার্ড চেপে আজিম দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। আজিম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হু আর ইউ?’
লোকটা কিছু না বলে মাথা নিচু করে মেঝেতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে।
হঠাৎ বৈদ্যুতিক শকে লোকটা প্রকৃতিস্থ হয়। চোখ তুলে দেখে প্রফেসর আজিম হাতে ইলেকট্রিক ক্যাবল নিয়ে ক্রুর হাসছেন। আজিম তাকে পুনরায় শক লাগাতে যাবে তখনই লোকটা বলে ওঠে, ‘নো-নো-নো।’
আজিম চেয়ার টেনে নীল বর্ণের লোকটার মুখোমুখি বসে। লোকটা ইংরেজিতে বলতে শুরু করলো, ‘আমাকে জানতে হলে আপনাকে আজ থেকে ৫০ বছর পেছনে যেতে হবে।
আমি নাসার স্পেস-ক্রাফটের ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে যোগদান করি। অনেক বছর আমি নাসায় ছিলাম। কিন্তু আমার আবিষ্কারের নেশা আমাকে থেমে থাকতে দেয়নি।’
‘কী রকম আবিষ্কার?’
‘আমি বিশ্বাস করতাম স্পেসে এলিয়েন নামক এক প্রকার প্রাণী আছে। তাই এলিয়েন আবিষ্কারই ছিল আমার মিশন এবং ভিশন। ৭ ডিসেম্বর ১৯৭২। আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে। পুরো পৃথিবী জানে নাসার শেষ মুন মিশন অ্যাপোলো-১৭ তে তিনজন এস্ট্রোনট ছিল- ইউজিন সার্নিন, ইভান ও স্মিথ।’
‘আলবাৎ। এরাই তো ছিল!’
‘একদম না। সেদিন তিনজন নয় চারজন ছিল ওই স্পেসশিপে। আর সেই চার নম্বর ব্যক্তিটি ছিলাম স্বয়ং আমি ইঞ্জিনিয়ার স্টিফেন। স্পেস যাত্রার আগের দিন একটা স্পেস-স্যুট চুরি করে নিয়েছিলাম। পরদিন স্পেসশিপটার ইঞ্জিন চেক করতে গিয়ে সেখানেই লুকিয়ে ছিলাম।
ছয় দিন পর বাংলাদেশি সময় রাত একটা ত্রিশ মিনিটে চাঁদে ল্যান্ড করে অ্যাপোলো -১৭। রোনাল্ড ইভানের কাজ ছিল স্পেস ক্রাফটে থেকেই সকল কন্ট্রোল সঞ্চালন করা। লুনার ল্যান্ডার করে যখন সার্নিন ও স্মিথ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিল, আমিও তাদের অগোচরেই চাঁদের মাটিতে নেমে লা-পাত্তা হয়ে গিয়েছিলাম। আর তারা প্রায় ১২ দিন চাঁদে কাটিয়েছিল এবং নানান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট করে অবশেষে ২০ ডিসেম্বর তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে।
কিন্তু আমার কাজ তখনও সমাপ্ত হয়নি। আমি বিভিন্ন স্যাম্পল কালেক্ট করার জন্য চাঁদের নানা স্থানে ঘুরতে থাকি। এক পর্যায়ে টাউরা স্যালিটারভ্যালি নামক স্থানে চলে আসি।
হঠাৎ সেখানে একটা উল্কাপিণ্ড আঘাত হানে। মুহূর্তেই উল্কার আঘাতে ছিটকে স্পেসে উড়তে লাগলাম আমি। আমার অক্সিজেন মাস্কটা ছিঁড়ে যাবার ফলে এক প্রকার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।
তখন চাঁদের পাশ দিয়েই নিজ কক্ষপথ অতিক্রম করছিল একটা উপগ্রহ- ব্লু ইউনিভার্স। আমি আছড়ে পড়লাম ব্লু ইউনিভার্সের পৃষ্ঠে। কী অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি! কতো বিচিত্র গাছগাছালি! সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে সেখানকার অধিবাসীরা। নিজেদের কাছে তারা হেলাস নামে পরিচিত।
যা-ই হোক, আমার জ্ঞান ফেরার পরপরই দেখলাম আমি হেলাস রাজার সামনে জড়োসড়ো পড়ে আছি। হাত পা একপ্রকার ইলেকট্রিক লেজার দিয়ে মোড়ানো। হেলাসরাজ আমার সম্পূর্ণ বায়োডাটা, মিশন সম্পর্কে অবহিত হয়ে আমাকে ব্লু ইউনিভার্সের সায়েন্টিস্ট স্যার স্কুইজির নিকট পাঠিয়ে দেয় এক্সপেরিমেন্টের জন্য।’
‘স্কুইজি!’
‘হ্যাঁ, ডক্টর স্কুইজি। তখন থেকে আমি সেখানেই বন্দি জীবন পার করছি। তারা আমাকে পৃথিবীর আবহাওয়া- জলবায়ু, মানুষের বৈশিষ্ট্য, চলাফেরা, জীবনধারণ, খাদ্য ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ; তথা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আটকে রেখেছিল। আর আমি ব্লু ইউনিভার্সের আবহাওয়া এবং সেখানকার খাদ্য গ্রহণের ফলে আমার চামড়া পুরো নীল হয়ে গেছে।’
কথাগুলো শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীল বর্ণের লোকটা। টেবিলে থাকা জগ থেকে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি ঢেলে খেয়ে নেয়। অমনি মাথা ঝিনঝিন করে ওঠে তার। কারণটা বুঝতে বেগ পেতে হলো না তার। এটা ব্লু ইউনিভার্স নয়, পৃথিবীর পানি ছিল। আবারো চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয়।
প্রফেসর আজিম জিজ্ঞেস করেন, ‘হঠাৎ আপনাকে পৃথিবীতে পাঠানোর কারণ কী?’
‘সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। ব্লু ইউনিভার্সের সাথে পৃথিবীর সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, যা আপনার ছাদে লাগানো আছে। আর আপনার ঘরে আসার কারণ হচ্ছে...’
‘জানি আমি। ছাদে শুধু অ্যান্টেনাটাই আছে। আর মেইন কন্ট্রোলার তো আমার কম্পিউটারে। কিন্তু আমি কিছুতেই সেটা হতে দেবো না।’
‘সেটা অলরেডি হয়ে গেছে।’
প্রফেসর আজিম হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে?’
‘আমি আপনার ছাদের অ্যান্টেনায়...’
কথা সম্পূর্ণ করার আগেই গলা আটকে আসে নীল বর্ণের লোকটার। চেয়ারে ঝুঁকে পড়ে। চক্ষুদ্বয় জুড়িয়ে আসে। প্রফেসর আজিম হাতের শিরা চেক করেন, নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে গেছে।
লোকটা মারা গেল না তো! বুঝতে বেগ পেতে হলো না পৃথিবীর পানি পান করাই লোকটার মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ।
দৌড়ে ছাদে চলে গেলেন প্রফেসর আজিম। দেখলেন তার অ্যান্টেনায় অচেনা কোনো ডিভাইস যুক্ত করা। যার সাহায্যে কেউ তার কম্পিউটার হ্যাক করে নিয়েছে।
জলজ্যান্ত একটা লাশ নিয়ে কী করবেন এখন? কেউ জেনে গেলে কী হবে? ব্লু ইউনিভার্স থেকে কি তার ওপর হামলা করা হবে? নানান প্রশ্নে নিজেকে ধিক্কার জানাতে থাকেন প্রফেসর আজিম।
কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর ৬ষ্ঠ স্থান অধিকারী
সায়েন্স ফিকশন
আরও পড়ুন...