বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল
খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ নভেম্বর ২০২৪
গত কয়েক মাস ধরেই বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র লামিন ইয়ামাল। মেসি-রোনালদোর যুগের শেষে কে ফুটবল বিশ্বের মহাতারকা হয়ে উঠবেন সেই প্রশ্নের উত্তর এতদিন যারা খুঁজতেন, সম্ভবত তারা তা পেয়ে গেছেন। ১৭ বছরের লামিন ইয়ামাল যে আগামী দিনে সিংহাসনে বসতে চলেছেন সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করার লোকের সংখ্যা খুবই কম। ইতোমধ্যেই বার্সেলোনা এফসি ও স্পেন জাতীয় দলের এই কিশোরকে ম্যারাডোনা ও মেসির সাথে তুলনা করা শুরু হয়ে গেছে।
সিনিয়র পর্যায়ের ফুটবলে আসার পর থেকেই একদিকে যেমন নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে যাচ্ছেন, পাশাপাশি দলের হয়েও পাচ্ছেন সাফল্যের ছোঁয়া। কম বয়সের ফুটবলার হিসেবে একের পর এক রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি ইয়ামাল ক্লাবের হয়ে এরই মধ্যে জিতেছেন লিগ শিরোপা আর জাতীয় দলের হয়ে জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ।
ইয়ামালের জাতীয় দলে অভিষেক ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। সেটি ছিল জর্জিয়ার বিপক্ষে ইউরো বাছাইপর্বের ম্যাচ। তখন তার বয়স ১৬ বছর ৫৭ দিন। প্রথম ম্যাচেই গোলের দেখা পান এবং স্পেনের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড় ও কম বয়সে গোল করার রেকর্ড গড়েন। তবে জাতীয় দলের হয়ে আলোচনায় এসেছেন এ বছরের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। হয়েছেন ইউরোর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়। বেশ কয়েকটি ম্যাচে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে নজর কেড়েছেন বিশ্বের। ইউরো ফুটবলের ইতিহাসেও সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড় ইয়ামাল।
১৭তম জন্মদিনের চারদিন আগে ইউরোর সেমিফাইনাল খেলতে নেমে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম বয়সি গোলস্কোরারের রেকর্ডও গড়েন এই কিশোর। সেদিন কিংবদন্তি ফুটবলার গ্যারি লিনেকার বলেছিলেন, ‘এক মহাতারকার জন্ম হলো’। এরপর ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্পেন জয় পেলে কমবয়সি ইউরো জয়ী ফুটবলারও হন তিনি।
বয়সের কারণে এবারের ইউরোতে লামিন বেশ আলোচনায় ছিলেন। মাঠে যেমন ছিলেন দারুণ পারফরম্যান্স দিয়ে, তেমনি মাঠের বাইরেও ছিলেন। ইউরোর স্বাগতিক দেশ জার্মানির আইন অনুযায়ী রাত ১১টার পর ১৮ বছরের কম বয়সি কোনো খেলোয়াড়কে কাজে নিয়োজিত রাখা দণ্ডনীয়। স্পেনের যেসব ম্যাচের শিডিউল ছিল স্থানীয় সময় রাত ৯টায় সেগুলোতে ইয়ামালকে মাঠে নামাতে তাই ঝামেলায় পড়ে টিম ম্যানেজমেন্ট।
গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচে ইয়ামালকে ৯০ মিনিটের আগেই মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। কারণ ৯০ মিনিট মাঠে থাকলে তাকে ম্যাচ পরবর্তী সাক্ষাৎকারে থাকতে হতে পারে, আর সেটি করতে গিয়ে রাত ১১টা পার হলে ৩০ হাজার ইউরো জরিমানা গুনতে হতো স্পেন দলকে। যে কারণে ফাইনাল ম্যাচেও শেষ বাঁশি বাজার কয়েক মিনিট আগে তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়।
ইয়ামাল মাঠে নজর কেড়েছেন তার দুর্দান্ত পাসিং সেন্স, ড্রিবলিং, গোলের সুযোগ তৈরির দক্ষতার জন্য। কোন সময় কোথায় দৌড় দিলে বলটা পাওয়া যাবে সেটি কীভাবে যেন তিনি আগেই টের পেয়ে যান। বামপায়ের দক্ষতার কারণে রাইট উইংয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তবে সেন্টার ফরোয়ার্ড কিংবা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলতে পারেন দারুণ।
দুর্দান্ত প্রতিভাবান ইয়ামালের জন্ম (১৩.০৭.২০০৭) স্পেনে হলেও তার শেকড় মরক্কোর। উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশটি থেকে তার বাবা মুনির নাসরাউয়ি স্পেনে অভিবাসী হন। পেশায় তিনি ছিলেন রংমিস্ত্রি। ইয়ামালের মা শেইলা ইবানা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে স্পেনে আসেন। স্পেনের বার্সেলোনা নগরীতে এই দম্পতির সংসারে জন্ম ইয়ামালের। তার বয়স যখন তিন বছর তখন মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ইয়ামাল পালাক্রমে মা-বাবা দু’জনের কাছেই থাকতেন ছোটবেলায়। তবে তিনি বাবা, নাকি মায়ের ধর্ম পালন করেন সেটি কখনো প্রকাশ করেননি। বার্সেলোনার একটি অনুন্নত এলাকায় বেড়ে উঠেছেন তিনি।
মাত্র চার বছর বয়সে স্থানীয় একটি অ্যাকাডেমিতে ফুটবলের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ইয়ামালের। শুরু থেকেই তার মধ্যে সহজাত প্রতিভা ছিল। যে কারণে ছয় বছর বয়সের সময় চোখে পড়েন এফসি বার্সেলোনা স্কাউটদের। ক্লাবের অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে ভর্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় ইয়ামালকে। বিশে^র যে-কোনো প্রান্তের শিশুদের জন্য এই অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হতে পারাটা স্বপ্নের মতো। ইয়ামাল লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠেন এবং অ্যাকাডেমির বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলতে থাকেন।
২০২২ সালে তার ওপর নজর পড়ে বার্সেলোনা মূল দলের কোচ জাভি হার্নান্দেজের। বয়স তখন ১৫। ওই বয়সেই তাকে সিনিয়র দলের সাথে ট্রেনিং করার সুযোগ দেন জাভি। কোচের যেন আর তর সইছিল না, পরের বছর ক্লাবের বি টিমে একটি ম্যাচ খেলার পরেই মূল দলের হয়ে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয় ইয়ামালকে। সেই থেকে শুরু হয় পেশাদার ফুটবলার হিসেবে যাত্রা। ক্যারিয়ারের শুরুতেই লা লিগা ও ইউরো জেতায় আত্মবিশ্বাস হয়তো আরো বেড়ে যাবে এই কিশোরের। যেটি তার মহাতারকা হয়ে ওঠার পথকে আরো মসৃণ করতে পারে।
সেই ছবির গল্প
এ বছরের ইউরো টুর্নামেন্ট চলার সময় লামিন ইয়ামান ও লিওনেল মেসির একটি ছবি অনলাইন দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়। ৬ মাস বয়সি ইয়ামাল ও ২০ বছর বয়সি মেসির ছবি। একটি গামলায় শিশু ইয়ামালকে গোসল করাচ্ছিলেন মেসি। সারা বিশ্ব যখন মেসির সাথে ইয়ামালের তুলনা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ছবিটি প্রকাশ করা হলে শুরুতে অনেকেই সেটিকে ‘ফেক’ হিসেবে ধারণা করেন; কিন্তু ছবিটি আসল।
একটি ছবিতে শিশু ইয়ামালের পাশে তার মাকেও দেখা যায়। ২০০৭ সালে বার্সেলোনার মাঠ ক্যাম্প ন্যুর ভিজিটরস লকার রুমে আয়োজন করা ফটোশুটে মেসির সঙ্গে শিশু ইয়ামালের সেই ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দিয়ারিও স্পোর্ত’ এবং ইউনিসেফের পরিচালনায় দাতব্য কাজের অংশ হিসেবে ক্যালেন্ডারের জন্য বার্সার খেলোয়াড়েরা বেশ কয়েকটি শিশুর সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন। লটারির মাধ্যমে ওই শিশুদের বাছাই করা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে সেদিন শিশু ইয়ামালের ছবি তোলার পালা আসে মেসির সাথে।
ইয়ামালের বাবা প্রথম এই ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন। ইয়ামাল জানিয়েছেন, ছবিগুলো এত দিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। লুকিয়ে না রাখলে বার্সেলোনা কিংবদন্তি মেসির সঙ্গে তার তুলনা উঠত আরো আগেই। আর সেটি তার ক্যারিয়ারে জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারতো।
ইয়ামাল বলেছেন, ছবিগুলো যখন তোলা হয়েছে, তখন মেসিকে চেনার বয়স হয়নি আমার; কিন্তু বাবা ছবিগুলো সংগ্রহ করে রেখেছিলেন, কখনো প্রকাশ করেননি। কারণ মেসির সঙ্গে তুলনা হোক সেটা আমরা চাইনি।
কিন্তু সেই তুলনা আর আটকে রাখা যায়নি। ইয়ামাল মাঠে জাদু দেখানো শুরু করার পরই তাকে মেসির সাথে তুলনা করা শুরু হয়। এখন অনেকেই তাকে আগামী দিনের মেসি হিসেবে সাব্যস্ত করছেন।
আরও পড়ুন...