প্রকৃতির অলঙ্কার প্রজাপতি
ফিচার সাকী মাহবুব ফেব্রুয়ারি ২০২৫
প্রজাপতির প্রতিটি পাখা যেন একেকটি জীবন্ত ছবি। যে ছবি দেখে শিল্পী খুঁজে পান সুর। কবি খুঁজে পান কবিতা, সাহিত্যিক খুঁজে পান প্রাঞ্জল ভাষা। হালকা মৃদু বায়ুতে অবিরাম ছলাৎ ছলাৎ নৃত্যে তার বিরামহীন আনন্দ। দিনভর তপ্ততা, যানবাহন আর মানুষের কোলাহল সব বেকারার প্রজাপতির কাছে। প্রজাপতির এ রঙিন আবেদন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই কোনো প্রকৃতিপ্রেমীর।
প্রজাপতিই সবচেয়ে রঙিন ও স্পন্দনশীল পতঙ্গ। তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক প্রজাপতিকেই বলা হয় প্রকৃতির অলঙ্কার। প্রজাপতি দেখতে যেমন সুন্দর, এর জন্মের প্রক্রিয়াটিও তেমনি অদ্ভুত। এদের জন্ম ডিম থেকেই হয়, কিন্তু ডিম থেকে সরাসরি প্রজাপতি বের হয় না। প্রথমে শুঁয়োপোকা বা লার্ভা বের হয়, এরপর সেই শুঁয়োপোকা একসময় রূপান্তরিত হয় পিউপাতে তারপর অনিন্দ্য সুন্দর প্রজাপতিতে। মোট চারটি ধাপে প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন হয়। জীবন চক্রের এই নির্দিষ্ট সময় একেক প্রজাতির জন্য একেক রকম। শুঁয়োপোকারা মূলত গাছের পাতা খায়। আর পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি খায় ফুলের মধু। এভাবেই এরা জীবনের পথে এগিয়ে চলে।
প্রজাপতির মতো এত সুন্দর পতঙ্গ সম্ভবত পৃথিবীতে আর নেই। কল্পনায় যত রং আঁকা যায়, তত রঙেরই প্রজাপতি থাকা সম্ভব। ফুল থেকে ফুলে, সমতল কিংবা পাহাড়ে, ঝোপে ঝাড়ে, বাড়ির আঙিনায় গাছপালায়, নদীর কিনার থেকে গাছ পেরুনো উঁচুতে এদের হরদম ছুটে চলা। সবার মনে খুশির দোলা দিয়ে যায়। প্রজাপতি আকর্ষণীয় রঙের শীতল রক্তযুক্ত পতঙ্গ। সাধারণত প্রজাপতির শরীর লম্বাটে ও উজ্জ্বল হয়ে থাকে। উড়ে বেড়ায় দিনের বেলায়। তাপমাত্রা ৮২ থেকে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকলে প্রজাপতি খুব সহজেই চলাফেরা করতে পারে। প্রজাপতির ঘ্রাণ ও দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত প্রখর হয়। যা দিয়ে সে অনেক দূর থেকেই কাক্সিক্ষত ফুলের গন্ধ ও রং নিরূপণ করতে পারে। প্রজাপতি সাধারণত ১২টি গোত্রে বিভক্ত। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বাদে পৃথিবীর সবখানেই প্রজাপতি রয়েছে। বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রজাতির প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪০০টি বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি চিহ্নিত করা গেছে বলে জানা যায়।
প্রজাপতির পাখাগুলো আসলে এক ধরনের চিটিন নামক প্রোটিনের স্তর দিয়ে তৈরি হয়। যেগুলো তাদের উড়তে সহায়তা করে। স্বচ্ছ চিটিনের চারপাশে বেষ্টন করে থাকে হালকা তুলার মতো পদার্থ। তাই আলো পড়লেই প্রতিফলিত হয়ে বিভিন্ন রং ধারণ করে। বিভিন্ন জাতের ফুলের পরাগায়ন ও গাছের বংশবিস্তারে সাহায্য করে প্রজাপতি।
তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ফুলের রেণু, গাছের রস, পচা ফল, গোবর, পচনশীল মাংস অথবা ময়লায় দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা খনিজ পদার্থ। প্রজাপতি বিভিন্ন গাছের ফুলকে জড়িয়ে ধরে এর রস আস্বাদন করে থাকে।
এরা সাধারণত ঘণ্টায় ১২-১৫ মাইল বেগে উড়তে পারে। একটি প্রজাপতির আয়ু মোটামুটি ২ থেকে ৪ সপ্তাহ। এতটুকু সময়ের মধ্যে তারা শুধু দু’টি কাজই করে থাকে- খাওয়া এবং প্রজনন করা।
আমাদের দেশে যেসব প্রজাপতি দেখা যায় তার মধ্যে উদয়াবল্লী, সাত ডোরা, নীরদ সিন্ধু, মনমেঘা, কস্তুরী শার্দূল, নীল ডোরা, চোরকাঁটা কমলা, নীল পুনম, কমলা শিখীপর্ণ, বনবেদে, নাবিক, রাই নকশি, হেমশ্রভ্র, চৈতালি দূত, গোতুম, তিলাইয়া পঞ্চতিলা, তিন্নি, নীল বিজুড়ী, মলয় মসলা, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
প্রজাপতি দেখে প্রতিনিয়ত আমরা মুগ্ধ হলেও আমাদের ক’জনই বা তাদের সঠিক পরিচয় ও উপকারিতা সম্পর্কে জানি। প্রজাপতি হলো পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রাণ। প্রজাপতি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। অথচ আমরা সেই প্রজাপতি রক্ষার বিপরীতে ধ্বংস করছি।
নির্বিচারে গাছপালা কেটে ফেলছি, বনভূমি ধ্বংস করে বসতভিটা নির্মাণ করছি। এতে প্রজাপতি বাসস্থান হারাচ্ছে, বংশবিস্তার করতে পারছে না। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
যত বেশি গাছ হবে তত বেশি প্রজাপতি পাওয়া যাবে। তাই আমাদের সবার উচিত বেশি বেশি গাছ লাগানো। প্রজাপতির বিলুপ্তি ঠেকাতে বনাঞ্চল রক্ষা ও বনাঞ্চলে প্রজাপতি পার্ক তৈরির তাগিদ গবেষকদের। তাই সৌন্দর্যের প্রতীক প্রজাপতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে গণসচেতনতার বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন...