নব চেতনায় নতুন বিজয়

প্রচ্ছদ রচনা আবরার আবেদীন ডিসেম্বর ২০২৪

‘বিজয়’ আমাদের প্রিয় শব্দ, কিন্তু ‘পরাজয়’ নয়। তবে বিজয় আপনাতেই এসে হাজির হয়ে যায় না, বিজয় অর্জন করতে হয়। এখানে পরীক্ষার বিষয় আছে, পরিশ্রমের বিষয় আছে। ভোর থেকেই এই পরীক্ষাটা শুরু হয়ে যায়। আমরা সবাই কি সূর্যের আগে জাগতে পারি? এখানেও জয়-পরাজয়ের একটি বিষয় আছে। যারা সূর্যের আগে জাগতে পারে, তারা ভোরের ঠাণ্ডা বাতাসের স্পর্শ পায়। ভোরের লালিমায় আকাশটা কতই না সুন্দর। লাল সূর্যটা যখন আকাশে উদিত হয়, তখন পাখিরা আর নীড়ে থাকে না। উড়ে উড়ে গান গেয়ে স্বাগত জানায় নতুন দিনকে। প্রকৃতিতে তখন এক আনন্দমেলা। তবে সবাই এই আনন্দমেলায় শরিক হতে পারে না। আলস্য এখানে বাধা। আলস্যকে পরাজিত করতে না পারলে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে জীবনের নানা কাজে। আসলে প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধু হতে হলে আমাদের জাগতে হবে, জাগতে হবে যথাসময়ে। এই কথাটাই বলে গেছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
আমি হবো সকাল বেলার পাখি,
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি।
সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,
‘হয়নি সকাল, ঘুমো এখন’- মা বলবেন রেগে।
বলব আমি, ‘আলসে মেয়ে! ঘুমিয়ে তুমি থাকো,
হয়নি সকাল- তাই বলে কি সকাল হবে নাকো!’
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে।
এই কবিতাটি শুধু ছোটদের নয়, বড়োদেরও অনেক প্রিয়। কবি এখানে ফুল-পাখির কথা বলেছেন, বলেছেন শিশুদের আকাক্সক্ষার কথাও। এখানে পাওয়া যায় পথের দিশা। আমাদের জাতীয় কবি আলসেদের ঘুম ভাঙাতে জাগরণের গান গেয়েছেন, কবিতা লিখেছেন। আমাদের দেশের মানুষ জাগতে ভালোবাসে। তারা জেগেছিল বলেই তো আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে পেরেছি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন দেশ। বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা এখন আমাদের হাতে।
বন্ধুরা, প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমরা পালন করে থাকি মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের কথা বলতে গেলে চলে আসে বিজয়-সংগ্রামের কথা। আর আমাদের বিজয়-সংগ্রাম মানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। পাকিস্তানের স্বৈরশাসকরা এই জনপদের মানুষের ভোটের রায়কে মেনে নিতে চায়নি। তারা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, দেশ শাসনের অধিকারকে পদদলিত করতে চেয়েছে। ফ্যাসিস্ট শাসক অস্ত্রের ভাষায় জনপদের মানুষকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু জাগ্রত জনতাকে তারা রুখতে পারেনি। জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ হয় শত্রুমুক্ত। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করি বিজয় দিবস হিসেবে।
মানুষ স্বাধীন থাকতে চায়, তাই স্বাধীন দেশ তার কাম্য। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীন দেশের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। বিজয়ের এই দিনে সবাই মন খুলে কথা বলতে চায়। কথা বলতে চায় শিশু-কিশোররাও। কবি তাদের মনের কথা তুলে ধরেছেন কবিতায়-
বিজয় আমার দেশের মাটি
বিজয় গোলার ধান,
বিজয় আমার দোয়েল পাখি
মিষ্টি মধুর গান।

বিজয় আমার মায়ের ভাষা
বিজয় মুক্ত হাসি,
বর্ণমালার পাতায় পাতায়
বিজয় রাশি রাশি।

বিজয় আমার এই পতাকা
লাল সবুজে গড়া,
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
এই পতাকাই ওড়া।
বিজয় আমার দীপ্ত শপথ
দেশ ও জাতির জন্য,
বিজয় পরাগ ছড়াবো আজ
হবো আমি ধন্য।
বিজয় দিবসে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার শপথ নেওয়া হয়েছে। এটাই তো স্বাভাবিক। দেশকে দেশের মানুষকে ভালোবাসলে কাজ করতে হয়। কারণ দেশপ্রেমের কথা সত্য হয়ে ওঠে কাজের মাধ্যমেই। আমাদের সামনে অনেক কাজ। আমাদের সমস্যা আছে, আছে সম্ভাবনাও। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও আমরা উন্নত দেশের কাতারে শামিল হতে পারিনি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতেও আমরা অনেক পিছিয়ে। এসব বিষয়ে বড়োরা কাজ করছেন, তবে ছোটদেরও কিছু করণীয় আছে। ছোটদের মূল কাজটা হলো নিজকে গড়ে তোলা। কিন্তু নিজকে গড়ে তুলতে হলে তো প্রয়োজন সঠিক পরিবেশ, প্রয়োজন মানবাধিকার। সব শাসক তা দিতে চায় না। যারা সবসময় ক্ষমতায় থাকতে চায়, তারা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে চায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। দমন-অবদমন, চাতুর্য, লুণ্ঠন তাদের বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তান আমলে এই বৈশিষ্ট্য দেখেছি, স্বাধীন বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি সেই বৈশিষ্ট্য। ফলে কাক্সিক্ষত সমাজ ও দেশ আমরা পাইনি। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা দীর্ঘদিন ধরেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের এই লড়াই চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এই লড়াইয়ে হতাহত হয় হাজারো ছাত্র-জনতা। শহীদ হয় শিশু-কিশোররাও। অবশেষে ৫ আগস্ট পতন হয় ফ্যাসিস্ট সরকারের। 
২০২৪ সালের জুলাই মাসটা বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে বিবেচিত হবে। অবশ্য এর সাথে আগস্ট মাসের পাঁচটি দিনও যোগ করতে হয়। তাহলে জুলাইয়ের ৩১ দিন ও আগস্টের পাঁচ দিন যোগ করলে হবে ৩৬ দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জনগণকে সাথে নিয়ে এই ৩৬ দিন সৃষ্টি করেছে অবাক করা এক গণ-অভ্যুত্থান। যার ফলে দেশের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যেতে হলো। স্বৈরশাসকদের পরিণতি এমনই হয়। প্রশ্ন জাগে, এত স্বল্প সময়ে অর্থাৎ মাত্র ৩৬ দিনে কী করে এমন পরিণতি হলো? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর কারণ হলো- দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন, ব্যাপক দুর্নীতি এবং শেষের ৩৬ দিনে অবদমন ও হত্যার মাধ্যমে ‘রেডলাইন ক্রস’। রেডলাইন ক্রসের বড়ো চিত্র হলো নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। গুলিতে শুধু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা মারা যাননি; মারা গেছেন পথচারী, হকার, দোকানদার, রিকশাচালক, শ্রমিক, এমন কি ছাদে কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিশুরা পর্যন্ত। নির্বিচারে ছররা গুলি মেরে সাধারণ মানুষের বুক ঝাঁঝরা করা কিংবা চোখ নষ্ট করে দেওয়া ঔপনিবেশিক দখলদার বাহিনীর কাজ হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এমন কাজ কী করে করে? এসবই হয়েছে ফ্যাসিস্ট অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। সাথে যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাও। দেশের সংবিধান কিংবা আইন এমন বল প্রয়োগের অনুমতি দেয় না। এটি রেডলাইন ক্রসের এক নির্মম উদাহরণ।
শিশুরা সব দেশেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। শিশুর নিরাপত্তা সবার আগে। প্রত্যেক পরিবারে একটি বংশ-বৃক্ষ থাকে। সেই বৃক্ষের সবচাইতে প্রিয় ফুলটি হলো শিশু। শিশু হাসলে পুরো পরিবার হাসে, শিশু কাঁদলে পুরো পরিবার কাঁদে। সেই শিশুরাই জুলাই হত্যাকাণ্ডে নির্মমভাবে প্রাণ হারালো। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে জুলাই সহিংসতায় অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুদের মৃত্যুতে উদ্বেগ জানিয়ে ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা বলেছেন, শিশুদের সবসময় সুরক্ষিত রাখতে হবে। এটা সবার দায়িত্ব। তিনি আরো বলেন, অনেক শিশু আহত হয়েছে এবং অনেককে আটক করা হয়েছে। শিশুদের মৃত্যু ভয়ানক ক্ষতি। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ইউনিসেফ। ইউনিসেফ তো শিশুদের সুরক্ষার কথা বললো, শিশুদের মৃত্যু এক ভয়ানক ক্ষতি। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকার কি তা উপলব্ধি করে? ওরাতো ক্ষমতার মোহ ও দম্ভে অন্ধ থাকে। ফ্যাসিস্ট শাসনে শিশুরা বেড়ে ওঠার কাক্সিক্ষত পরিবেশ পায় না। ওদের শাসনে ছোট-বড়ো কেউই ভালো থাকে না। তাইতো আমরা দেখলাম ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। নতুন বাংলাদেশে আবার নব-চেতনায় পালিত হবে ‘বৈষম্যহীন বিজয় দিবস’। বিজয়ের পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ থাকবো পুরো জাতি।
আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ