তিন দুরন্ত মিশন জঙ্গলবাড়ি
রহস্যভেদ রবিউল ইসলাম ফেব্রুয়ারি ২০২৫
(গত সংখ্যার পর)
তখনই লোকটা সাব্বিরকে পেছন দিক থেকে ডাক দিলো। ও কাছে এলে বললো, ‘এখান থেকে সোজা কিছু দূর হেঁটে গেলে একটি নদী। ওই নদীর ওপারে একটি বাড়ি আছে। ওটাকে চেয়ারম্যানের জঙ্গলবাড়ি বলে। সেখানে তোমার বন্ধু ও অন্যদের আটকে রেখেছে। তুমি একা কিছু করতে পারবে না। ওখানে চেয়ারম্যানের গুণ্ডারা আছে।’
সাব্বির লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, ‘আল্লাহ চাইলে আমি অবশ্যই ওদের উদ্ধার করতে পারবো। আপনি আপাতত এখানে থাকুন। আমি যেহেতু আপনাকে কথা দিয়েছি ছেড়ে দেবো, অবশ্যই ছেড়ে দেবো। আগে আমার বন্ধুদের উদ্ধার করে আনি। তারপর আপনাকে ছেড়ে দেবো।’
এই বলে সাব্বির আবার সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। লোকটি পেছন থেকে বারবার ওকে ডাকতে থাকে। কিন্তু সাব্বির সেদিকে কর্ণপাত করলো না। ও যাচ্ছে নদীর সন্ধানে। নদী পার হয়ে জঙ্গলবাড়ি। সেখানে থেকে কীভাবে বন্ধুদের উদ্ধার করা যায়, সেই চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
ভালো বন্ধুদের জন্য সব করা যায়। আর ও একটি ভালো কাজ করতে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ভালো কাজে আল্লাহ তায়ালা ওকে সাহায্য করবেন। সাব্বির হাঁটছে আর হাঁটছে। বারবার আল্লাহকে স্মরণ করছে। ওদিকে পেছনে কাতরাচ্ছে চেয়ারম্যানের সেই লোকটি। একবার যদি জঙ্গলবাড়িতে ঢোকা যায়, তাহলে চেয়ারম্যানের সব অপরাধ ফাঁস হয়ে যাবে। তার শাস্তি হবে। এই বন রক্ষা হবে, কেউ আর বনের গাছ কাটবে না। এলাকার মানুষ খুশি হবে।
সাব্বির উচ্চস্বরে বলে উঠলো, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে সাহায্য করুন।’
এগারো.
গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে আছে শাইক। ও কপালে বেশ চোট পেয়েছে। কতক্ষণ যে এখানে পড়ে ছিল নিজেও জানে না। কপালটা ফুলে গেছে। একবার হাত দিয়ে ব্যথায় কাঁতরে ওঠে।
‘আমি এখন কোথায় আছি?’ নিজেকে প্রশ্ন করে শাইক।
কিন্তু সেই প্রশ্ন যেন বনের গাছের সঙ্গে প্রতিধ্বনি হয়ে আবার ওর কানে ফিরে আসে। তারপর কানের মধ্যে বারবার বাজতে থাকে ‘আমি এখন কোথায় আছি।’ অসহ্য লাগছে শাইকের। এই রাতটা কেন এত দীর্ঘ হচ্ছে? শাইক জানে মানুষের কষ্টের সময়গুলো দীর্ঘ হয়। তবে ধৈর্য হারাতে নিষেধ করেছেন আল্লাহ তায়ালা। তাই এই মুহূর্তে ও একদমই ধৈর্য হারাচ্ছে না। বরং আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ আস্থা আছে ওর।
শাইক উঠে দাঁড়ালো। শুধু মাথায় নয় পায়েও ব্যথা পেয়েছে। দুই পা ব্যথায় টনটন করছে। অনেকক্ষণ হাঁটার কারণে পায়ে ব্যথা হয়েছে। মনে হচ্ছে দুই পায়ের ওজন কয়েক টন বেড়ে গেছে। এই মুহূর্তে শাইকের কাছে নিজের শরীরের চেয়ে দুই পায়ের ওজন বেশি মনে হচ্ছে।
কোনো রকমে টলতে টলতে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। আস্তে আস্তে গাছ কমে যাচ্ছে। বন হালকা হয়ে আসছে। ওর চোখেমুখে হাসি ফুটে ওঠে। মনে হচ্ছে শেষ পর্যন্ত বন থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। হঠাৎ ওর গায়ে শক্তি বেড়ে গেল। এবার দ্রুত হাঁটতে থাকে।
মাথার ওপর দিয়ে একটি পাখি উড়ে গেল। পাতাগুলো নড়ে উঠলো। প্রথমে ভয় পেল শাইক। কিন্তু পরে বুঝল সেখানে এক ঝাঁক পাখি বসে আছে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে পাখিগুলো নিজের বাসায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। ও আরও সামনে এগিয়ে যায়। তারপর যা দেখলো রীতিমতো অবাক হলো!
ওর সামনে একটি নদী! এই বনের মধ্যে নদীও আছে? নিজেকে প্রশ্ন করে শাইক। অথচ আগে কখনো এই নদীর কথা শোনেনি ও। নদীটা খুব বেশি বড়ো না। চাঁদের আলোয় নদীর পানি ঝলমল করছে। যেন একটি রূপার প্লেট নদীর মাঝখানে বসানো আছে। আর তার চারপাশে পানি ঢেউ খেলছে। পাড়ে দাঁড়িয়ে নদীর সৌন্দর্য দেখছিল শাইক। ওর ক্লান্তি যেন একটু একটু করে কেটে যাচ্ছে। একবার মনে হলো নদীতে নেমে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকবে।
ও ধীরে ধীরে নদীর দিকে এগিয়ে যায়। একবার চোখ গেল নদীর ওপারে। সেখানে বেশ ঘন বন। কিন্তু মনে হচ্ছে একটি বাড়িও আছে। চাঁদের আলোয় আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। তাই নিশ্চিত হতে পারছে না। দেখার ভুলও হতে পারে। তাহলে ওই লোকটা এই নদী ও বাড়ির কথা বলেছিলেন। লোকটার কথা মনে পড়ে শাইকের। আবার মন খারাপ হলো ওর।
শাইক নদীতে নামলো। তবে হাঁটু পানির বেশি নামলো না। তারপর নদীর পানিতে মুখ ধুলো। পানি ছিটিয়ে সারা গায়ে মাখলো। তারপর আবার উঠে নদীর পাশে বসলো। আকাশটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু পাখি উড়তে শুরু করেছে। খাবারের সন্ধানে দূরে কোথাও ছুটে যাচ্ছে। ভোর হতে বেশি দেরি নেই। ফজরের সময় হয়ে আসছে মনে হলো।
নদীর পাড়ে বেশ বাতাস। সেই বাতাস শরীরে লাগলে শিহরিত হচ্ছে ও। ঘুমে শরীর এলিয়ে আসছে। কিন্তু এখন ঘুমানো যাবে না। বাড়ি ফিরতে হবে। নিশ্চয়ই মা-বাবা খুব চিন্তা করছে। সাব্বির ও রাকিব হয়তো ওকে খুঁজতে বের হয়েছে। না পেয়ে নিশ্চয়ই চিন্তায় ভেঙে পড়েছে। একসময় দুচোখ বুজে আসে শাইকের। নদীর পাড়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
বারো.
আজগর চেয়ারম্যান খুবই ভয়ংকর মানুষ। রাকিবকে এখানে ধরে না আনলে ও কখনোই আজগর চেয়ারম্যানের এই রূপ দেখতে পেতো না। এই জঙ্গলবাড়িতে এমন কোনো অপরাধ নেই যা আজগর চেয়ারম্যান করে না। সে মানুষ খুন করে, মানুষদের ধরে এনে পাচার করে, শিশু পাচার করে। জোর করে অন্যের জমি লিখে নেয়। কেউ রাজি না হলে তাকে এই জঙ্গলবাড়িতে ধরে আনে। তারপর সারারাত তার ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। রাকিব ছাড়াও এখানে আরও কয়েকজনকে ধরে এনেছে।
চেয়ারম্যানের সব অপরাধের কথা জানে বল্টু। সে-ই তার বাবাকে এসব অপরাধে সাহায্য করে। রাকিব অবাক হয়ে যাচ্ছে, এত কম বয়সে বল্টু কীভাবে এত বড়ো বড়ো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো। বল্টু এগিয়ে আসে রাকিবের দিকে।
বল্টু বললো, ‘কিরে রাকিব, তোরা তো তিন বন্ধু একসঙ্গে থাকিস! বাকি দু’জন কই?’
‘আমি জানি না। তবে দোয়া করি ওরা যেন নিরাপদে থাকে।’
‘তা ওরা তোকে বাঁচাতে আসবে না?’
‘ওরা যদি জানতে পারে, আমি এখানে আছি। তাহলে অবশ্যই আসবে।’
‘ওরা কোনোভাবেই জানবে না। আসলে কেউ জানেই না এই বনের মধ্যে একটা বাড়ি আছে।’
বল্টুর কথায় রাকিবের খুব রাগ হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই। ওর হাত দুটো বাঁধা।
বল্টু আবার বললো, ‘তোর কি মনে হয়, তুই এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারবি?’
‘বাঁচানোর মালিক তো আল্লাহ, তাই তিনি চাইলে অবশ্যই পারবো।’
‘তোর এই কথার সঙ্গে আমি শততাগ একমত। তবে আমার মনে হয় তুই এখান থেকে আর ফিরে যেতে পারবি না।’
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। তারপর বললো, ‘আচ্ছা বল্টু, তুই তো জানিস এগুলো অন্যায় কাজ। এগুলো অপরাধ, তাহলে কেন অপরাধ করছিস?’
বল্টু কী যেন ভাবলো। তারপর বললো, ‘জানি তো। এগুলোই তো আব্বুর ব্যবসা। তাই আমাকে দেখতে হয়।’
তখনই সেখানে চেয়ারম্যান চলে আসে। তারপর রাকিবকে বললো, ‘কী ব্যাপার বিচ্ছু ছেলে! তুই আমার ছেলেকে খুব জ্ঞান দিচ্ছিস মনে হচ্ছে?’
চেয়ারম্যানের কথায় রাকিব কোনো উত্তর দিলো না। তারপর চেয়ারম্যান কাকে যেন ফোন করে। আর ফোনে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শুরু করে। চেয়ারম্যান বললো, ‘আমি কোনো অজুহাত শুনতে চাই না। কালকের মধ্যে আমার অস্ত্রের চালান ঢাকার হাজারীবাগে পৌঁছে দিতে হবে।’
চেয়ারম্যানের কথা শুনে রাকিব নিশ্চিত হলো সে অস্ত্রের ব্যবসাও করে। তার মানে বল্টুর কথা হয় তো ঠিক। এখান থেকে জীবিত ফেরা খুব সহজ হবে না। কারণ এ ধরনের অপরাধীরা সাধারণত কোনো প্রমাণ রাখতে চায় না। তবুও মনোবল হারায় না রাকিব। ওর বিশ্বাস আল্লাহ নিশ্চয়ই ওকে সাহায্য করবেন। শাইক ও সাব্বির এই জঙ্গলবাড়ির খোঁজ পেয়ে যাবে।
রাকিব উঠে দাঁড়ালো। তারপর চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। ও বোঝার চেষ্টা করলো, এখানে আসলে চেয়ারম্যানের কতজন লোক আছে। দেখে মনে হলো, বল্টু ও চেয়ারম্যানসহ পাঁচ থেকে ছয়জনের মতো লোক আছে। আর রাকিবসহ আরও কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়েছে। তার মধ্যে দু’জন হলো ওদের স্কুলের দশম শ্রেণির আতিক ভাই ও ইকবাল ভাই। শাইক বা সাব্বির চলে এলে একটু কৌশলী হলে এদের জব্দ করা সম্ভব।
এরপর চেয়ারম্যান একজনের দিকে এগিয়ে যায়। তাকে একটি পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাকে চেয়ারম্যান বললো, ‘তুই উত্তরপাড়ার জমিটা লিখে দিলি না কেন?’
‘দেখুন, ওটা আমার শেষ সম্বল। তাই দিতে পারবো না।’
‘কিন্তু, আমি তো তোকে টাকা দিতাম।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি যা দাম বলেছেন, তা তো ওই জমির চার ভাগের একভাগ বলেছেন।’
এ কথা শুনে চেয়ারম্যান রেগে গেল, ‘তুই মুখে মুখে তর্ক করছিস। তুই জানিস না আমার কথাই শেষ কথা। আমার ওই জমিটা লাগবে।’
লোকটি আবার বললো, ‘ওই জমিটা আমি দেবো না।’
চেয়ারম্যান লোকটির দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তার গলা চেপে ধরলো। লোকটির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে বারবার গো গো শব্দ করছে। কিন্তু চেয়ারম্যান তাকে ছাড়ছে না।
চেয়ারম্যান বললো, ‘জমিটা আমাকে লিখে না দিলে এখানেই গলাটিপে মেরে ফেলে দেবো।’ বলেই চেয়ারম্যান লোকটির গলা থেকে হাত সরিয়ে নিলো।
পিলারে বাঁধা লোকটি এক গ্লাস পানি চাইলেন। চেয়ারম্যান বললো, ‘তুই জমি লিখে না দিলে কোনো পানি হবে না।’
জীবন বাঁচাতে লোকটি বললো, ‘ঠিক আছে আমি জমি আপনাকে দিয়ে দেবো। আমাকে এক গ্লাস পানি দিন।’
এরপর তাকে এক গ্লাস পানি দিলো চেয়ারম্যানের লোক। লোকটি ঢকঢক করে পানি খেয়ে যেন একটি স্বস্তি পেল।
এত সময় দাঁড়িয়ে এসব দেখছিল রাকিব। ভয়ে রাকিবের গলা শুকিয়ে গেছে। ও যতটা মনে করেছিল, তার চেয়েও ভয়ংকর এই চেয়ারম্যান। রাকিব শান্ত ছেলের মতো আবার ওর জায়গায় গিয়ে বসলো। আর ভাবতে থাকে কীভাবে এখান থেকে নিজে উদ্ধার হওয়া যাবে এবং অন্যদের উদ্ধার করা যাবে।
রাকিব ভাবছে, অন্যদের হয় তো শত্রুতা বা অন্য কোনো কারণে চেয়ারম্যান ধরে এনেছে। কিন্তু আতিক ও ইকবাল ভাইকে ধরে আনার কারণ কী? তারা কি চেয়ারম্যানের এসব অপরাধের ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছিল?
তেরো.
সাব্বির হাঁটছে। লোকটি বলেছে সামনে একটি নদী আছে। ওই নদীর ওপারে একটি বাড়ি। নাম জঙ্গলবাড়ি। সেই বাড়িতে আটকা আছে রাকিব।
সাব্বির খুব দ্রুত হাঁটতে থাকে। যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো নদী পাওয়া যাবে, ততক্ষণ সাব্বির থামবে না। বনের ঘাসগুলো ভিজে গেছে। গাছের পাতা থেকেও টুপটুপ করে শিশির ঝরে পড়ছে। ভালোই লাগছে ওর। একবার মুখটা তুলে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। তার মানে ধীরে ধীরে ভোর হয়ে আসবে। কত রাত হলো তা সাব্বির জানে না। তবে এটা বুঝতে পারছে রাত আর বেশি বাকি নেই। আবার যা করার রাতের মধ্যে করতে হবে। না হলে দেরি হয়ে যাবে। রাকিবের জীবনে বড়ো কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, আর ভাবতে পারছে না সাব্বির।
ও যত দ্রুত হাঁটতে চাচ্ছে, কিন্তু পা তত দ্রুত সাড়া দিচ্ছে না। পা জোড়া অবশ হয়ে আসছে। কম তো ধকল গেল না পায়ের ওপর দিয়ে। সেই সন্ধ্যা থেকে শুরু। আর এখনো চলছে। তবুও থামা যাবে না। ওকে হাঁটতেই হবে, দরকার হলে দৌড়াতে হবে।
হঠাৎ করেই ওর পা আটকে গেল কোনো কিছুতে। কোনোভাবেই পা টেনে তুলতে পারছে না। গায়ের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে। কিন্তু পা আর ওঠে না। বুঝতে পারছে না কিসের সঙ্গে পা আটকালো। সাব্বির বসলো। তারপর বোঝার চেষ্টা করলো কী হয়েছে। না তেমন কিছু হয়নি। একটি শক্ত লতা ওর পায়ের সঙ্গে পেঁচিয়ে গেছে। তাই পা নাড়াতে পারছে না। ও হাত দিয়ে লতা ছাড়াতে শুরু করে। কিন্তু যতটা সহজ মনে করেছিল ততটা সহজ হচ্ছে না। বেশ শক্ত লতা।
ও দুই হাত দিয়ে লতাটাকে ধরে। তারপর গায়ের সব শক্তি দিয়ে দিলো টান। সঙ্গে সঙ্গে লতাটা ছিঁড়ে যায়। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে আলহামদুল্লিাহ।
বেশ ক্লান্ত লাগছে। কিছুক্ষণ সেখানে বসলো। মনে পড়লো শাইকের কথা, মনে পড়লো রাকিবের কথা।
আবার উঠে দাঁড়ালো সাব্বির। তারপর সোজা হাঁটতে থাকে। ধীরে ধীরে বন কমে আসছে। ও আরও সামনে গেল। তারপর চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। ওর সামনে নদী, এই সেই নদী। ও আরেকটু সামনে গিয়ে ওপারে তাকায়। হ্যাঁ সত্যিই ওপারে একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। ওটাই তাহলে চেয়ারম্যানের জঙ্গলবাড়ি।
সাব্বির নদীতে নামতে থাকে। একটু গিয়ে ও থমকে দাঁড়ায়। নদীর পাড়ে কে যেন পড়ে আছে। ভয় করে সাব্বিরের, চেয়ারম্যানের লোক নয় তো! বিসমিল্লাহ বলে সেদিকে এগিয়ে গেল সাব্বির। এবার যা দেখলো তাতে ওর দুচোখে পানি চলে এলো। এই পানি কান্নার নয়, এই পানি অবশ্যই আনন্দের।
নদীর পাড়ে পড়ে আছে ওর বন্ধু শাইক। ও দৌড়ে গিয়ে শাইককে ডেকে তোলে। তারপর ওকে জড়িয়ে ধরে।
শাইক বললো, ‘তুই এখানে কীভাবে এলি? আর রাকিব কই?’
সাব্বির বললো, ‘তোকে খুঁজতে বনে ঢুকি। তারপর অনেক ঘটনা। একের পর এক বিপদ। কিন্তু তুই এখানে কেন?’
‘পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর কত যে ভয়ংকর ঘটনা ঘটলো। সব পরে বলবো। কিন্তু রাকিব কই?’
‘রাকিবকে এই বন থেকে চেয়ারম্যানের লোক ধরে নিয়ে গেছে। আমি কোনোরকমে পালিয়েছি।’
‘কোথায় নিয়ে গেছে?’
‘নদীর ওপারে ওই যে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। ওটা চেয়ারম্যানের জঙ্গলবাড়ি। রাকিবকে ওখানে আটকে রেখেছে।’
‘তাহলে এখনি চল ওপারে। হাতে সময় কম। ফজরের সময় হয়ে আসছে। যা করার ফজরের আগে করতে হবে।’
তারপর দুই ক্লান্ত বন্ধু ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে কোনো নৌকা নেই। ওপারে একটি মাত্র নৌকা দেখা যাচ্ছে। ওরা বুঝতে পারলো, এখানে শুধু একটি নৌকা ব্যবহার করা হয়।
হঠাৎ সাব্বির বললো, ‘দেখ দেখ, রাকিবের জুতো না?’
শাইক জুতো জোড়া হাতে তুলে নিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ, এতো রাকিবের জুতো। তার মানে রাকিব ওই বাড়িতেই আছে।’
‘কিন্তু এখানে তো কোনো নৌকা নেই, আমরা পার হবো কীভাবে?’
‘দেখ আমাদের সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। নদীটা খুব বড়ো না। তাই আমরা সাঁতরে পার হতে পারবো।’
‘এত খুব ভয়ংকর কথা। যদি নদীতে কোনো কুমির থাকে?’
‘বন্ধুর জন্য এটুকু ঝুঁকি নিতে হবে। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। দেখিস আমরা পারবো ইনশাআল্লাহ।’
তারপর সাব্বিরও বললো, ‘ইনশাআল্লাহ।’
দুই বন্ধু আস্তে আস্তে নদীতে নামলো। ওরা যতটা ভেবেছিল এই নদী ততটা ভয়ংকর না। কিছুদূর হেঁটে পার হতে পারল। আবার কিছুদূর সাঁতার কেটে। এভাবে ওরা কিছু সময়ের মধ্যে ওপারে পৌঁছে গেল।
ওপারে গিয়ে ওরা আগে নৌকাটি আলাদা জায়গায় সরিয়ে রাখলো। যেন সহজে কেউ পালাতে না পারে। এরপর ওরা নদীর ওপারে উঠলো। বনের মধ্যে বাড়িটি দূর থেকে দেখতে পারছে। সেখানে হারিকেনের আলো জ্বলছে।
সাব্বির ও শাইক খুব সাবধানে বাড়িটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এত আস্তে পা ফেলছে যেন কোনো শব্দ না হয়। ওরা জঙ্গলবাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছে ভেতরে কতজন আছে। কিন্তু কোনোকিছুই বুঝতে পারছে না।
তখই জঙ্গলবাড়ির ভিতর থেকে দু’জন ওদের দিকে আসতে থাকে। ওরা খুব সাবধানে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। লোক দু’জন ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
সাব্বির ও শাইক তাদের অনুসরণ করতে শুরু করে। তাদের চেহারা বেশ ভয়ংকর। তাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র নেই বলে মনে হচ্ছে। ওরা পিছু পিছু হাঁটছে। সুযোগ পেলেই আক্রমণ করবে। বেশ কিছুটা পথ চলে এসেছে ওরা।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ওপর আক্রমণ করে বসে সাব্বির ও শাইক। হঠাৎ আক্রমণে কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে চেয়ারম্যানের দুই লোক। সেই সুযোগ আবার আক্রমণ করে সাব্বির ও শাইক। ওরা কোনোভাবে ওই দু’জনকে পালটা আক্রমণের সুযোগ দিতে চাইলো না।
লোক দুটো মাটিতে পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে।
তাদের একজন বললো, ‘কী ব্যাপার! তোমরা কারা? আর আমাদের এভাবে মারছ কেন?’
সাব্বির বললো, ‘আপনারা আমার বন্ধুকে ধরে এনেছেন। জঙ্গলবাড়িতে আটকে রেখেছেন।’
‘আমরা তো কিছু করি না। এখানে যা হয় সব তো চেয়ারম্যানের আদেশে হয়।’ বললো আরেকজন।
শাইক বললো, ‘এখন বলুন, আমরা কীভাবে জঙ্গলবাড়ি থেকে ওদের উদ্ধার করবো।’
গুণ্ডাদের একজন বললো, ‘সে তোমরা পারবে না। এখান থেকে তোমরা ফিরে যেতে পারবে না। চেয়ারম্যান তোমাদের গুলি করে মারবে।’
সাব্বির বললো, ‘আমরা পারবো ইনশাআল্লাহ। আপনি বলুন ভেতরে কতজন আছে?’
‘এ কথা তো আমরা বলব না।’ উত্তর দিলো তাদের একজন।
শাইক বললো, ‘দেখুন আপনারা যদি আমাদের সাহায্য করেন। আমরা আপনাদের কোনো ক্ষতি করবো না। আপনাদের ছেড়ে দেবো।’
‘তোমরা আবার আমাদের কী ক্ষতি করবে। তোমরাইতো এখান থেকে জীবিত ফিরতে পারবে না। চেয়ারম্যানকে তোমরা চেনো না।’ বললো একজন।
সাব্বির তখন বললো, ‘তাহলে আপনারা বলবেন না? ভেতরে কতজন আছে আর কীভাবে ঢুকলে কেউ বুঝতে পারবে না।’
তারা একসঙ্গে বললো, ‘না বলব না।’
এবার সাব্বির ও শাইক ওদের প্যান্টের বেল্ট খুললো। তারপর সেই বেল্ট দিয়ে চেয়ারম্যানের লোকদের হাত বাঁধতে গেল। তখনই ঘটলো আরেক বিপজ্জনক ঘটনা। সেখানে আরেকজন হাজির। সে এসেই সাব্বিরের পায়ে হকিস্টিক দিয়ে জোরে আঘাত করে। ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে সাব্বির। লোকটি আবার সাব্বিরকে আঘাত করতে যাবে তখনই শাইক ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গায়ের শক্তি দিয়ে লোকটার পিঠে ঘুষি মারলো। তাতেই ব্যথায় কাতরাতে থাকে। সে ঘুরে শাইকের দিকে তেড়ে আসে। আর শাইক নিচু হয়ে লোকটার দুই হাঁটুতে ঘুষি মারে। এবার আর লোকটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সেখানে উলটে পড়ে গেল।
এই সুযোগে শাইক লোকটার হাতের স্টিক কেড়ে নিয়ে তার মাথায় মারতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলে উঠলো, ‘আমাকে মেরো না।’
শাইক তখন বললো, ‘ঠিক আছে, মারব না। কিন্তু আমাদের বলুন ওই জঙ্গলবাড়িতে কীভাবে ঢুকলে কেউ বুঝতে পারবে না। আর ওখানে চেয়ারম্যানের কতজন লোক আছে।’
লোকটি বললো, ‘ওখানে চেয়ারম্যান ও তার ছেলে বল্টুসহ আরও কয়েকজন আছে।’
সাব্বির বাম হাত দিয়ে ডান পা চেপে ধরে রেখেছে। যেখানে হকিস্টিক দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। সাব্বির বললো, ‘আচ্ছা, ওদের কাছে কি কোনো অস্ত্র আছে?’
লোকটি বললো, ‘হ্যাঁ, চেয়ারম্যানের কাছে একটি পিস্তল আছে। আর একটি রুমের মধ্যে অনেক অস্ত্র আছে।’
শাইক বললো, ‘আপনি কিন্তু বললেন না, কীভাবে গেলে কেউ বুঝতে পারবে না।’
‘পেছন দিকে একটি ভাঙা জানালা আছে। ওই জানালা দিয়ে ঢুকলে কেউ বুঝতে পারবে না। তবে বুঝতে পারলে কিন্তু অনেক বড়ো বিপদ।’ বললো লোকটি।
শাইক ও সাব্বির এবার লোক তিনটির দুই হাত পেছন দিকে বেঁধে ফেলল। তারপর বন থেকে কিছু লতা ছিঁড়ল। সেই লতা গিয়ে তাদের একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখলো।
চৌদ্দ.
খুব সাবধানে জঙ্গলবাড়ির পেছনের দিকে যাচ্ছে সাব্বির ও শাইক। ওরা এমনভাবে হাঁটছে যেন কোনো শব্দ না হয়। ডানা ঝাপটে পাখিগুলো উড়ে যাচ্ছে। ঝরা শিশিরে বনের ঘাসগুলো ভিজে আছে। মাঝে মাঝে পা স্লিপ করছে। তাই খুব সাবধানেই হাঁটতে হচ্ছে। আকাশ আগের চেয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে। রাতটাও শেষের দিকে। হয়তো একটু পরেই ফজরের আজান দেবে।
তাই ফজরের আগে কিছু করতে পারলেই ভালো। না হলে দিনের আলোতে ঝুঁকি বেশি হয়ে যাবে। সাব্বির পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিল, তখন ওর হাতটা ধরে শাইক। সাব্বিরের পায়ের আঘাতটা বেশ গুরুতর। ওর হাঁটতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।
ওরা জঙ্গলবাড়ির পেছনে পৌঁছেছে। এবার খুঁজে বের করতে হবে সেই ভাঙা জানালা। তবে খুব সাবধানে। ঝুঁকি নিতে হবে, কিন্তু সেটা সাবধানেই নিতে হবে। কোনো কারণে ধরা পড়ে গেলে বিপদ আরও বাড়বে। জঙ্গলবাড়ির পেছন দিকটা বেশ অন্ধকার। চাঁদের আলো ঠিক মতো এসে পৌঁছাতে পারছে না।
তখনই সাব্বির বললো, ‘ওইটা জানালা মনে হচ্ছে না?’
শাইক বললো, ‘সেটাইতো মনে হচ্ছে। চল তো এগিয়ে গিয়ে দেখি।’
ওরা সেদিকে এগিয়ে গেল। হ্যাঁ এখানে একটা ভাঙা জানালা। মানে জানালার একটা পাত নেই। তার মানে এটা সেই জানালা। ফাঁকা পাশটাতে মাকড়সা জাল বুনেছে। বোঝাই যাচ্ছে এদিকে কেউ খুব একটা আসে না।
‘চল এবার ভেতরে ঢুকি।’ বললো সাব্বির।
শাইক বললো, ‘আগে একজনকে ঢুকতে হবে। না হলে ওপাশে কেউ থাকলে দু’জনকেই ধরে ফেলবে। আমিই ঢুকি। কেউ না থাকলে হাত উঁচু করে ইশারা করবো। তখন তুই ঢুকবি।’ বলেই শাইক সাবধানে জানালার ওপর ওঠে। তারপর আস্তে করে ভেতরে লাফিয়ে পড়ে। এই ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এখানে কেউ নেই।
তারপর ও হাত উঁচু করে সাব্বিরকে ইশারা করলো। সঙ্গে সঙ্গে সাব্বির জানালায় উঠলো। তারপর ভেতরে লাফিয়ে পড়ে। কিন্তু বিপদ বাধে সেখানে। সাব্বির লাফ দিয়ে একটি ভাঙা চেয়ারে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হলো। সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ে পাশের ঘরে। তখনই চেয়ারম্যানের লোক চিৎকার করে, ‘কে ওখানে?’ তারপর দু’জন লোক টর্চ জ্বালিয়ে এ ঘরে আসে। তার আগেই ঘরের কোনায় রাখা একটি বাক্সের আড়ালে লুকিয়ে যায় সাব্বির ও শাইক।
লোক দু’জন এসে কয়েকবার টর্চ জ্বালাল। কিন্তু কাউকে খুঁজে পেল না। তারপর একজন বললো, ‘হয়তো ইঁদুর হবে।’ এই বলে তারা আবার এ ঘর থেকে চলে যায়।
এতক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিল সাব্বির ও শাইক। লোক দুটো চলে যাওয়ায় একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিলো। ‘এবার কী করবি?’ প্রশ্ন করলো সাব্বির।
শাইক বললো, ‘ওই দরজা দিয়ে আমরা সাবধানে ওদিকে যাবো।’
‘কিন্তু ওখানে তো চেয়ারম্যানের লোক আছে।’
‘এখন আমাদের ঝুঁকি নিতে হবে। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবেন।’
তারপর বিসমিল্লাহ বলে ওরা ওই ঘর থেকে পাশের ঘরে যায়। পাশের ঘরে কেউ নেই। এখানে অনেকগুলো বক্স। সব থরে থরে সাজানো। এই ঘরের দরজা খোলা। বাইরে থেকে একটু একটু আলো এসে পড়ছে। সেই আলোতে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। সাব্বির একটি বক্স খুলে অবাক! পুরো বক্সে অস্ত্র সাজানো। ও শাইককে ডেকে দেখালো। তারপর ওরা আরও কয়েকটি বক্স খুললো। সবগুলো বক্সে থরে থরে নানারকম অস্ত্র সাজানো। এত অস্ত্র ওরা আগে কখনো দেখেনি। তাই দু’জনেই ভয়ে কাঁপছে।
ওরা আরেকটু সামনে যায়। দরজার পাশে গিয়ে উঁকি মারে। বোঝার চেষ্টা করে আশপাশে কেউ আছে কি না। কিন্তু কাউকে চোখে পড়ে না। দু’জনেই দরজার বাইরে পা রাখে।
সাব্বির বললো, ‘দেখ এখানে একটা তালা ঝুলছে। কিন্তু তালাটা খোলা ও সঙ্গে চাবি আছে।’
‘এটা আমাদের জন্য ভালোই হলো।’
‘কীভাবে ভালো হলো?’
‘আমরা অস্ত্র ঘরের রুমটা তালা মেরে দেবো। তারপর চাবিটা পকেটে রেখে দেবো। যেন ওরা সহজে এই ঘরে ঢুকতে না পারে। আবার অস্ত্র বের করতে না পারে।’
‘আরে, তোর মাথায় তো দারুণ বুদ্ধি।’
তারপর ওরা সময় নষ্ট করলো না। দ্রুত অস্ত্র ঘর তালা মেরে দিলো। তারপর চাবিটা পকেটে রেখে দিলো। ওরা আরও সামনে গেল। তখনই সাব্বিরের হাত লেগে কী যেন পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন শব্দ হলো। তাতেই নতুন করে বিপদ ঘনিয়ে এলো ওদের ওপর। চেয়ারম্যানের লোকগুলো সেখানে চলে আসে। সাব্বির ওদের ওপর হামলে পড়ে নিজেকে ছাড়াতে চায়। কিন্তু শক্তিতে পারে না।
শাইক এক কোণে লুকিয়ে থাকে। চেয়ারম্যানের লোকগুলো সাব্বিরকে ধরে নিয়ে যায়। সাব্বিরের দুই হাত বেঁধে চেয়ারম্যানের সামনে হাজির করে। চেয়ারম্যান সঙ্গে সঙ্গে ওর চোয়ালে সজোরে একটা থাপ্পড় মারে। এত বড়ো থাপ্পড় জীবনেও খায়নি ও। সাব্বিরের কানের মধ্যে শো শো করছে।
চেয়ারম্যান বললো, ‘এই বিচ্ছুটা আবার কে? এখানে কীভাবে এলো?’
তখনই সেখানে হাজির হয় বল্টু। বল্টু বললো, ‘বাবা, ও রাকিবের বন্ধু। মনে হয় বন্ধুকে বাঁচাতে এসেছিল। এখন সে-ও ফেঁসে গেছে।’
‘দুইটারে একসঙ্গে বেঁধে রাখবি। সকাল হলেই পাচার করে দিবি।’ বললো চেয়ারম্যান। বাবার কথায় বল্টু যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
সাব্বির কিছুই বলছে না। ও দেখলো সেখানে ইকবাল ও আতিক ভাইকে বেঁধে রাখা হয়েছে। সাব্বির চোখ ইশারা করে রাকিবকে বুঝিয়ে দিলো শাইকও এখানে আছে।
পনেরো.
শাইক বুঝতে পারছে না ওর এখন কী করা উচিত। রাকিব ও সাব্বিরকে ওরা বেঁধে রেখেছে। হঠাৎ ওর মাথায় একটি বুদ্ধি এলো। ও অস্ত্র ঘরের তালা খুললো। এবার ওই ঘরের মধ্যে বড়ো কোনো শব্দ করতে হবে। তারপর বাইরে যেতে হবে। শব্দ শুনে চেয়ারম্যানের সব লোকেরা ছুটে আসবে। তখনই বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেবে।
শাইক অস্ত্র ঘরের দরজা খুললো। তারপর সেখানে ঢুকলো। ও দুই দরজা অনেক জোরে দুই দিকে ধাক্কা মারলো। অনেক জোরে শব্দ হলো। শাইক এপাশের এক কোণে লুকিয়ে থাকে। তারপর ওদিক থেকে কে কে বলে চিৎকার করতে থাকে চেয়ারম্যানের লোক।
তারা চিৎকার করতে করতে এসে অস্ত্র ঘরে ঢোকে। প্রথমে তিনজন ঢুকলো। তাদের পিছু পিছু ঢুকলো বল্টু। ওরা অস্ত্রঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে। এই সুযোগে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয় শাইক। ওরা বুঝতেও পারল না দরজায় তালা লাগানো হয়েছে।
শাইক আর দেরি করে না। দৌড়ে জঙ্গলবাড়ির বারান্দায় চলে যায়। চেয়ারম্যান চেয়ারে বসে ফোনে কথা বলছিল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শাইক চেয়ারম্যানের চেয়ারে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। তাতে চেয়ারম্যান উলটে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ানোর আগেই শাইক জোরে একটি ঘুষি মারে। চেয়ারম্যান আর উঠতে পারে না। ও গিয়ে চেয়ারম্যানের পিস্তলটা কেড়ে নেয়। ওদিকে চেয়ারম্যানের লোকেরা বুঝতে পারছে না বাইরে কী হচ্ছে। ওরা অস্ত্র ঘরে শাইককে খুঁজছে।
শাইক দ্রুত রাকিব ও সাব্বিরের বাঁধন খুলে দিলো। তারপর শাইক চেয়ারম্যানকে চেয়ারের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ফেললো। সাব্বির গিয়ে আতিক ও ইকবালের বাঁধন খুলে দেয়। সেখানে আর যারা ছিল তাদেরও বাঁধন খুলে দিলো।
এরপর সাব্বির, শাইক, রাকিব, আতিক ও ইকবাল অস্ত্র ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ওরা গিয়ে দেখে চেয়ারম্যানের লোকেরা ওপাশ থেকে দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। একসময় ওরা দরজা ভেঙে ফেলল। তারা বের হলো। কিন্তু এপাশে লুকিয়ে ছিল সাব্বিরেরা। চেয়ারম্যানের লোকের বের হতেই আক্রমণ করে। তুমুল মারপিট হচ্ছে দুই গ্রুপের মধ্যে। কিন্তু চেয়ারম্যানের লোকের পেরে উঠছে না। একে একে ওরা বল্টুসহ চেয়ারম্যানের বাকি লোকদের বেঁধে ফেলল। সবাইকে বারান্দায় রাখা হয়েছে।
ওরা তিন বন্ধু তিনজনকে জড়িয়ে ধরে। তাই দেখে আতিক ও ইকবালের চোখে পানি চলে আসে। আরও যাদের ওরা মুক্ত করেছে তারাও কাঁদছে।
তারপর চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনটা হাতে নিলো রাকিব। হেডস্যারের নম্বর মুখস্থ ছিল ওর। হেডস্যারের কাছে কল দিলো।
রাকিব বললো, ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার, আমি রাকিব। ইকবাল ও আতিক ভাইকে পাওয়া গেছে।’
এই রাতে এ খবর পেয়ে হেডস্যার তো মহাখুশি। স্যার বললেন, ‘ওয়ালাইকুম আস সালাম। কোথায় পেলি ওদের। আর তোরা নিরাপদ আছিস তো।’
রাকিব বললো, ‘স্যার আমরা নিরাপদ আছি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি পুলিশ নিয়ে ভোরে এখানে চলে আসুন।’
তারপর কীভাবে আসতে হবে বিস্তারিত জানিয়ে ফোন রাখলো রাকিব।
দূরের মিনার থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। জঙ্গলবাড়ির পাশেই পুকুর ছিল। সেখানে গিয়ে ওরা ওজু করলো। তারপর ফজরের নামাজ আদায় করলো। আর রাকিব ওদের ইমামতি করলো।
পাখি কিচিরমিচির করছে। চারদিকে ভোরের আলো ফুটেছে। জঙ্গলবাড়ির বনটা অসাধারণ লাগছে। একটু পরে পুলিশ চলে আসে। সঙ্গে হেডস্যার নিজে এসেছেন। হেডস্যার এসে সাব্বির, রাকিব ও শাইককে একসঙ্গে বুকের মধ্যে আগলে ধরেন। তারপর ওদের মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘তোরা আমার স্কুলের গর্ব। একদিন অনেক বড়ো হবি।’
ধুলিয়াপুর স্কুলে তিন দুরন্তের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। চারিদিকে শুধু ওদের প্রশংসা আর প্রশংসা। চেয়ারম্যানের জঙ্গলবাড়ি থেকে অনেক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এত বড়ো একজন অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়ায় জেলা পরিষদ থেকে ওদের দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে ধুলিয়াপুর স্কুলে একটি ফান্ড করা হয়েছে। যেসব ছাত্রছাত্রী বেতন দিতে পারবে না, ফরম ফিলাপ করতে পারবে না, তাদের ওই ফান্ডের টাকায় বেতন দেওয়া হবে, ফরম ফিলাপ করা হবে।
ও হ্যাঁ একটা কথা বলা হলো না, মনে আছে জঙ্গলে একটি লোক শাইককে চাবি দিয়েছিল। শাইক সেই সিন্দুক উদ্ধার করেছিল জঙ্গলবাড়ি থেকে। তারপর সেই সিন্দুক ওই লোকের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে। সিন্দুকে কী ছিল জানো? ওনার ছেলের জন্য একটা চেকবই, কিছু পোশাক আর কিছু খেলনা। চেয়ারম্যান ওই চেকবইটা ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। বাবা নেই জানার পর তার বাড়ির সবাই খুব কেঁদেছিল।
ছেলেটা শাইককে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। ওর চোখের পানিতে শাইকের জামাটা ভিজে যায়। ওই ছেলেটার নাম রাফসান। এখন রাফসানও ওদের বন্ধু। (সমাপ্ত)
আরও পড়ুন...