ডিপসিক এআই জগতের নতুন দুয়ার

আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ মার্চ ২০২৫

তোমরা নিশ্চয়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্পর্কে জানো। বর্তমান বিশে^ এআই-এর কদর সব ক্ষেত্রেই। এআই দ্বারা পরিচালিত কিছু অ্যাপলিকেশন হলো Bard, ChatGPT, Gemini। এগুলোর মধ্যে ChatGPT-এর নাম আমরা সবাই কম বেশি শুনেছি, তাই না?

এআই সম্পর্কে প্রচলিত একটা ধারণা হলো, এআই-এর মডেল তৈরিতে প্রয়োজন বিরাট অঙ্কের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ। এআই ব্যবহৃত কোনো সফটওয়্যার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সাধারণত অনেক বেশি হয়ে থাকে। এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত প্রাথমিক পর্যায়ের চিপ (GPU) তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার। গবেষকরা ধারণা করেন, এচঞ-৩-এর মতো একটা বৃহৎ ল্যাংগুয়েজ মডেল তৈরিতে খরচ হতে পারে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

ChatGPT মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয় হবার পেছনে বড়ো একটি কারণ হলো, এটি মানুষের দৈনন্দিন কাজকে অনেক সহজতর করেছে। দৈনন্দিন যে-কোনো বিষয়ে ChatGPT কে জিজ্ঞাসা করলে সেই প্রশ্নের একেবারে নির্ভুল উত্তর দিতে সক্ষম ChatGPT। তথ্য সংগ্রহ, সংক্ষিপ্তকরণ, এমনকি ব্লগ পোস্ট লেখা পর্যন্ত ChatGPT এআই-এর সহায়তায় বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রের মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে।

তবে এবার এআই অ্যাপলিকেশনের দুনিয়ায় নতুন করে সাড়া ফেলেছে চাইনিজ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিপসিক। ২০শে জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখে ডিপসিক তার R1 ল্যাংগুয়েজ মডেল প্রকাশ করে। ডিপসিক একটি ওপেনসোর্স লাইসেন্সের মাধ্যমে তাদের ব্যবহৃত এআই মডেলগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ফলে যে কেউ খুব সহজেই বিনামূল্যে তাদের মডেলগুলো ব্যবহার করে নিজের সুবিধামতো এআই মডেল তৈরি করতে পারবে। 

ডিপসিক বাজারে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ডিপসিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাপেলের অ্যাপ স্টোরে শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছে। এত কম সময়ে ডিপসিক এত জনপ্রিয়তা লাভ করায় ভাটা পড়েছে আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজার মূল্যে। মাত্র দুই দিনেই Nvidia-এর একটি মার্কিন চিপ তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম ১৭% কমে যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। ভাবতে পারো! মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার হলে, সমস্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি কত হতে পারে! এক রাতেই মার্কিন শেয়ার বাজারের ক্ষতি হয়েছে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।

ডিপসিক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস  

২০২৩ সালে দক্ষিণ-পূর্ব চীনের হাংঝো শহরে লিয়াং ওয়েনফেং ডিপসিক প্রতিষ্ঠা করেন। লিয়াং বেড়ে উঠেছেন চাইনার গোয়াংডং প্রদেশে। গোয়াংডং-কে চায়নার সিলিকনভ্যালিও বলা যেতে পারে। তিনি চায়নার ঝেজিয়াং বিশ^বিদ্যালয় থেকে তথ্য ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ¯œাতক এবং তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। লিয়াং তার পেশাগত জীবন শুরু করেন একজন হেজ ফান্ড রাইজার হিসেবে। এরপর ২০১৬ সালে তিনি কয়েকজন বন্ধু মিলে হাই-ফ্লায়ার কোম্পানি গঠন করেন। এআই অ্যালগোরিদম ব্যবহার করে সবথেকে ভালো বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঠিক করাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। কয়েক বছরের মধ্যেই এটি ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় পুরো চায়নাতে। কিন্তু এটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা জনসাধারণের সাধ্যের বাইরে ছিল।

পরবর্তীতে লিয়াং এমন একটা এআই সিস্টেম বানানোর উদ্যোগ নিলেন যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের ভেতরে থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী লিয়াং ৯ জন পি.এইচ.ডি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে শুরু করেন তার ডিপসিকের যাত্রা। কিন্তু, ২০২১ সালে মার্কিন সরকার অত্যাধুনিক চিপ রফতানিতে চায়নার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, লিয়াং কম শক্তিসম্পন্ন চিপ দিয়ে এআই সিস্টেম বানানোর কাজ শুরু করে। অতঃপর, মাত্র ৫.৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করে লিয়াং ও তার দল তৈরি করে ফেলেন দুনিয়া কাঁপানো এআই মডেল DeepSeek V3 I DeepSeek R1।


ডিপসিক কীভাবে কাজ করে?

দি ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিপসিক মডেলগুলো ট্রেইন করার জন্য কম ডাটা প্রোসেসিং করতে হয়। অন্যান্য চায়নিজ এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কৌশলগুলো ব্যবহার করে ও নিজস্ব উদ্ভাবন ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা কম শক্তির চিপ ব্যবহার করেই ডিপসিকের কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করে। 

ডাটা প্রোসেসিং কমানোর পাশাপাশি ডিপসিক সময় ও কম্পিউটিং খরচ ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারে। ডিপসিক “mixture of expertise” নামক পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ পদ্ধতিতে ডিপসিক ও অন্যান্য এআই ডেভেলপার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে থাকে। ফলে বিশেষজ্ঞদের কম প্রশিক্ষণে বেশি ফল পাওয়া যায়।


কর্মদক্ষতা

ডিপসিক গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা ওপেন এআই (ChatGPT-এর স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান) এর কিছু শক্তিশালী মডেলের বিপরীতে ডিপসিকের R1 মডেল পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাদের ফলাফল অনুযায়ী ডিপসিক ওপেন এআই থেকে কোনো অংশে খারাপ ফল দেয় না। ডিপসিক ওপেন এআই-এর o1 মডেলের সমতুল্য কর্মদক্ষতা প্রদর্শন করেছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এমন কাজ দেওয়া হয়েছিল যেখানে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে এআই মডেলকে নিজে নিজেই কোনো কাজ সম্পন্ন করতে হতো, যেমন সফটওয়্যারের ত্রুটি খুঁজে বের করা।

বর্তমান বিশে^ এআই যেভাবে দাপটের সাথে প্রভাব বিস্তার করেছে, তাতে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে এআই-কে নিয়ে আসাকে অনেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। অনেকের মতে, এতে করে প্রযুক্তি জগতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং এআই সম্পর্কিত খরচ আরও কমে আসতে পারে। ফলে তৈরি হতে পারে এআই জগতের নতুন দুয়ার।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ