চলনবিলের ভাসমান নৌকা স্কুল
ফিচার ড. রফিক রইচ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
তোমরা এদেশের চলনবিলের নাম শুনেছো নিশ্চয়ই। অনেক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিল তিনটি জেলা নিয়ে অবস্থিত। জেলা তিনটি হলো সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং নাটোর। বাংলাদেশের অন্যান্য বিল শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে গেলেও প্রায় সারা বছরই এই বিলে কম বেশি পানি থাকে। তবে বছরের সাত মাস প্রায় সব অংশেই পানিতে ভরাট থাকে। এতে করে পানিবেষ্টিত এ বিল অঞ্চলের অধিকাংশ স্কুল বন্ধ থাকে। ফলে তোমাদের মতো কোমলমতি শিশু-কিশোরদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যহত হতো। বাধাগ্রস্থ হতো। এমন অবস্থায় অনেকেই এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ভাবনা ভাবতো। কারো ভাবনা কেবল ভাবনার মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে। আবার কারো ভাবনা বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। এমনই একজন তরুণ যুবক রেজওয়ান। বাড়ি চলনবিল বেষ্টিত নাটোরের গুরুদাসপুরে। তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন ভাসমান স্কুল প্রতিষ্ঠার। যা পরবর্তীতে নৌকা স্কুল নামে অনেক সুনাম কুড়িয়েছে।
২০০২ সালে চলনবিল অঞ্চলের স্কুলের শিক্ষার্থীদের নির্বিঘœ লেখাপড়ার ব্যাপারে ভাসমান স্কুলের এই ভিন্ন সুন্দর চিন্তা তরুণ রেজওয়ানের মাথায় আসে। ঝরঝরে কাশফুলের মতো শুভ্র এই চিন্তা রেজওয়ানের মাথায় আসার পরে এটাকে উদ্গীরন করতে থাকে ক্রমাগত। প্রথমে তাঁর স্কলারশিপের মাত্র ৫০০ মার্কিন ডলার এবং একটি ল্যাপটপ দিয়ে এই ভাসমান স্কুলের যাত্রা শুরু করে। প্রথমেই একটি নৌকা স্কুল করে শিক্ষার্থী ও এলাকার অভিভাবকদের যারপরনাই সাড়া পান। প্রথম বছরে তিনি বিভিন্ন স্থানে ই-মেইল করতে থাকেন সাহায্য পাওয়ার আশায়। এক সময় তাঁর নতুন চিন্তার ভাসমান নৌকা স্কুলের ধারণা বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন নামের একটি বিদেশি সংস্থা দারুণ পছন্দ করে। আর সেখান থেকে পেয়ে যায় পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান। এরপর থেকে একের পর এক বাড়তে থাকে নৌকার তৈরি এই ভাসমান স্কুলের সংখ্যা। ভাসমান নৌকা স্কুলের ছাদে বসানো হয়েছে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল। সন্ধার পরও যাতে স্কুলের কার্যক্রম চালানো যায়, সেজন্য নেওয়া হয়েছে এ ব্যবস্থা। তোমাদের বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মতো নৌকা স্কুলের ভেতর শ্রেণি কক্ষ রয়েছে। রয়েছে পাঠাগার, কম্পিউটার ল্যাব। ভাসমান এসব নৌকা স্কুল কম্পিউটারসহ শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহৃত নানা ইকেট্রনিক্স ডিভাইস দ্বারা পরিপাটি করে সাজানো। এসব নৌকা স্কুলের দৈর্ঘ্য ৫৫ ফুট ও প্রস্থ ১১ ফুট। ত্রিশজন শিশু একসঙ্গে পড়ালেখা করতে পারে এখানে। স্কুলগুলোতে শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান পরিচালনা করা হয়। একটি নৌকা স্কুলে তিনটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের তিন সময় ভাগ করে ক্লাশ নেওয়া হয়। বর্তমানে শিশুদের পাশাপাশি মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাসহ অভিভাবকরাও কম্পিউটার ও নানা তথ্য প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হচ্ছেন এই ভাবনার প্রকাশ থেকে। রেজওয়ান এই স্কুল ভাবনার ধারণাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি স্বেছাসেবী সংগঠন। নাম স্বনির্ভর সংস্থা। এর চেয়ারম্যান রেজওয়ান নিজেই। এই সংস্থার নিয়ন্ত্রনে বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলে ২২টি ভাসমান নৌকা স্কুল ৬৬ শিফটে পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২০০ জন শিক্ষক কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ৭০জন নারী শিক্ষক। প্রতিদিন সকাল ৯ টায় পাঠ দান শুরু হয়ে শেষ হয় বিকেল ৪ ঘটিকায়। কখনো কখনো সন্ধ্যার পরও কার্যক্রম চলে। ভাসমান এই নৌকা স্কুলে প্রতিটির জন্য রয়েছেন ৩ জন শিক্ষক, একজন মাঝি ও একজন কম্পিউটার অপারেটর। প্রায় ২২টি ভাসমান এসব নৌকা স্কুল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাশ বের বের হয়ে বিভিন্ন স্কুল কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। কেউ কেউ করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরি বাকরি।
অসাধারণ এ উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন করায় রেজওয়ান ইতোমধ্যে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। দেশের জন্য বয়ে এনেছেন সুনাম ও সুখ্যাতি। বন্ধুরা এখন কিন্তু তাঁর এই স্কুল ভাবনা শুধু স্কুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা ভাসমান স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও কৃষি বিষয়ক ট্রেনিং সেন্টার। নেওয়া হচ্ছে আরো ভালো ভালো জনকল্যাণকর উদ্যোগ।
বন্ধুরা তোমরা তো জলবায়ু সম্পর্কে অনেকেই জেনে থাকবে। কোনো অঞ্চলের বায়ুর তাপমাত্রা, আদ্রর্তা, বস্তুর চাপ, বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত, ঝড়, বায়ুপুঞ্জ, মেঘাচ্ছন্নতা ইত্যাদির দীর্ঘদিনের সামগ্রিক রূপকে ঐ স্থানের জলবায়ু বা ক্লাইমেট বলা হয়। আর এগুলোর মানবসৃষ্ট কারণে যে পরির্বতন হয় তাকে জলবায়ু পরির্বতন বা ক্লাইমেট চেঞ্জ বলে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পানিতে তলিয়ে যেতে পারে আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপদ। তাছাড়া বন্যাকবলিত আমাদের দেশসহ অন্যান্য দেশের জলবেষ্টিত অঞ্চলে জীবন চালিয়ে নেওয়া একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে। তোমরা জেনে খুশি হবে চলন বিলের এই ভাসমান নৌকা স্কুলকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য একটি মডেল হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কৌতূহলী বন্ধুরা বর্তমানে এই ভাসমান নৌকা স্কুল ভাবনা জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, স্লোভানিয়াসহ অন্যান্য উন্নত দেশের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। তাছাড়া এই ধারণা নিয়ে চীন, কম্বোডিয়া, ভারত, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মতো দেশের চরাঞ্চল, নদ নদী ঘেরা অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় এই ভাসমান স্কুল চালু হয়েছে। বন্ধুরা তোমরাও বিভিন্ন নতুন নতুন ধারণা মাথায় নিয়ে নানা বৈচিত্রময় মানব সেবামুলক কার্যক্রম চালু করে দেশ, মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করতে পারো। বিখ্যাত হতে পারো।
আরও পড়ুন...