চখা-চখি পাখি

চিত্র-বিচিত্র মোমিন উদ্দিন এপ্রিল ২০২৫

মায়াবী পাখি চখা-চখি। দেখতে হাঁসের মতো হলেও এরা হাঁস নয়। পাখিটি চখা-চখি বা খয়রা চখা-চখি নামে পরিচিত। অহধঃরফধব গোত্রের এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম ঞবফড়ৎহধ ভবৎৎঁমরহবধ। হাঁসের গোত্রের হলেও এরা এক ধরনের পাখি।

চখা-চখি পাখির দেহের রং হাঁসের চেয়ে বেশ আলাদা। এদের পুরুষ পাখিদের বলা হয় চখা আর স্ত্রী পাখিকে চখি। এই পাখিদের বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। বন্ধনের এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে এদের নামকরণ হয় চখা-চখি।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া হয়ে চীন পর্যন্ত চখা-চখির বিস্তৃতি রয়েছে। আফ্রিকার উত্তর ও দক্ষিণাংশে এই পাখি দেখা যায়। মূলত ভুটান, মঙ্গোলিয়া এবং চীনের পাখিগুলো উপমহাদেশে ভ্রমণ করে থাকে।

শীতকালে বাংলাদেশের বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের হাওর ও নদ-নদীতে এদের দেখা যায়।

চখা-চখি সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী। এরা এ দেশের বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে আসে। এরা জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। এই পাখিরা ঘন ঝোপ, ঘাস অথবা আগাছা বিস্তৃত জলাশয় এড়িয়ে চলে। পলিময় উপকূল অঞ্চল, হাওর, নদ-নদীতে এদের বিচরণ।

পাখিটি সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ২৮ ইঞ্চি হয়। পাখার বিস্তৃতি ৫৩ ইঞ্চি এবং সর্বোচ্চ ওজন দেড় কেজি। ঠোঁট ৪.৩ সেন্টিমিটার, পা ছয় সেন্টিমিটার এবং লেজ ১৪ সেন্টিমিটার। এর বিরল সৌন্দর্য যে-কোনো মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে বাধ্য।

আকৃতিতে এরা হাঁস থেকে বড়ো। তবে রাজহাঁস থেকে একটু ছোট। শরীরের পালক উজ্জ্বল দারুচিনি রঙের, মাথা ফ্যাকাশে সাদা, উড্ডয়ন পালকগুলো কালো এবং ধাতব সবুজ। তবে পাখার গোড়ার দিকের পালকগুলো সাদা। লেজের পালক এবং ঠোঁট কালো রঙের। 

পুরুষ পাখিটি আকৃতিতে সামান্য বড়ো এবং গলায় কালো ব্যান্ড থাকে। দেহ মরচে-কমলা, মুখমণ্ডল সাদা, মাথা ও ঘাড় হলদে-বাদামি। ডানার উজ্জ্বল সবুজ রং ওড়ার সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্ত্রী হাসের মুখমণ্ডল বেশি সাদা, মাথা ফিকে ও গলায় মালা হয় না। 

এরা সর্বভুক পাখি। নরম কাদামাটি ও স্বল্প পানিতে খাবার খোঁজে। জলজ পোকামাকড় থেকে শুরু করে ছোট মাছ, ছোট ব্যাঙ, ধান, ঘাসের কচি ডগা সবই খায়। 

চখা-চখি জোড়ায় জোড়ায় থাকে এবং সারা জীবনের জন্য জুটি বাঁধে। আবার মাঝে মাঝে এদের বড়ো ঝাঁকেও দেখা যায়। পাখিটি নিশাচর, রাতে আহার খুঁজে বেড়ায় আর দিনে বিশ্রাম করে। তবে নিশাচর হলেও দিনের আলোয়ও বিচরণ করে।

এরা ডিম পাড়ে আট থেকে দশটি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ২৮ থেকে ৩০ দিন। স্ত্রী পাখি একাই ডিমে তা দেয়। পুরুষ পাখি বাসা পাহারা দেয়। ছানা উড়তে শেখে ৫৫ দিনে। বয়োপ্রাপ্ত হতে সময় লাগে প্রায় দুই বছর।

আমাদের দেশে চখা-চখির আগমন ঘটে নভেম্বর মাসে। মার্চের শেষের দিকে তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যায়। এরা প্রতি বছর আমাদের দেশে আসে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। কিন্তু কিছু শিকারির জন্য প্রতি বছরই কিছু পাখি মারা যায়।

বর্তমানে পৃথিবীতে এদের অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। সমগ্র পৃথিবীতে এই পাখির সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে এই প্রজাতির পাখি সংরক্ষিত হিসেবে রয়েছে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ