খানেওয়ালা
স্মৃতিকথা আবদুল হালীম খাঁ সেপ্টেম্বর ২০২৫
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ বেশ খেতে পারতেন। কবি-সাহিত্যিকদের বিভিন্ন বৈঠকে মাঝে মাঝে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। ইবরাহীম খাঁ সেসব বৈঠকে পাল্লা দিয়ে খেতেন। আগেকার দিনে যিনি বেশি খেতে পারতেন তার একটা সুনাম ছিল। এজন্য ইবরাহীম খাঁর একটা সুনাম ছিল। কেউ তাঁকে দাওয়াত করলে তাকে পৃথক চিন্তা করতে হতো। বড়ো এক পাতিল গোশত এবং এক পাতিল দই তাঁর জন্য আলাদা করে রাখতে হতো। কবি গোলাম মোস্তফা সবাইকে খাওয়ায়ে খুব আনন্দ পেতেন। একবার তাঁর বাসায় এক ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কয়েকজনের মধ্যে খুব পাল্লা চলল। ইবরাহীম খাঁর সঙ্গে কেউ কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। ড. শহীদুল্লাহ সাব মন্তব্য করলেন, উনি তো জাত পাঠান খাঁ-বেশি না খেলে জাত রক্ষা হবে না যে। অনুষ্ঠানের সবাই হাসতে লাগলেন। ইবরাহীম খাঁ বললেন-অল্পে সুখ-শান্তি নেই।
শের-এ-বাংলা ফজলুল হক ছিলেন সেরা খানেওয়ালা। তাঁর সঙ্গে খেতে পাল্লা ধরতে কেউ সাহস পেতেন না। একবার ইবরাহীম খাঁ তাঁকে ঠকিয়েছিলেন। বারোজন কবি-সাহিত্যিক একবার সুন্দরবন দর্শনে ঢাকা থেকে লঞ্চে যাত্রা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে ফজলুল হক, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং কবি আবদুস সত্তার ছিলেন। আবদুস সাত্তার সাব ড. আশরাফ সিদ্দিকী সাবকে নানা বলে ডাকতেন। নানার খাতিরে তিনি সাথী হয়েছিলেন।
যাত্রার শুরুতেই হক সাব বললেন-আমাকে আপনারা তো পানিপথে নিয়ে যাচ্ছেন, পথে খাওয়ার কষ্টে মারবেন না তো? একজন জবাব দিলেন-স্যার, খাওয়াতে মারব কেন? মোটাতাজা দুটো খাসি সঙ্গে নিয়েছি। একটা যাবার পথে আর একটা আসার পথে খাবেন। আর চিড়া, মুড়ি, গুড় তো আছেই। খাসির কথা শুনে হক সাব খুশি হলেন।
একটা খাসি জবাই করে নিলেন। যাবার পথে রান্না করা শুরু হলো। হক সাবকে ঘিরে বসলেন সবাই। তিনি তাঁর জীবনের মজার মজার গল্প শুরু করলেন। কীভাবে তিনি এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে তার মাজার হাড় ভেঙে দিয়েছিলেন, কীভাবে নারকেল গাছে উঠে পাঁচটি নারকেলের এক ঝোঁকা ছিঁড়ে এক হাতে নিয়ে নেমে এসে সেই নারকেল হাত দিয়ে গুছিয়ে ছাল তুলে ভেঙে খেয়েছিলেন ইত্যাদি বীরত্ব ও সাহসিকতার গল্প করছিলেন। সবাই তাঁর গল্প শুনে খুব আনন্দ পাচ্ছিলেন। এদিকে লঞ্চ সমুদ্রপথে ভোঁ ভোঁ শো শো করে ছুটে চলছে।
ওদিকে রান্নাঘরে গোশত রান্না হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে ইবরাহীম খাঁর নাকে গোশতের সুঘ্র্রাণ ভেসে এলো। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। সবার চোখের আড়ালে উঠে তিনি ঢুকলেন রান্নাঘরে। হেঁকে বললেন, কি গো, তোমাদের রান্না কত দূর হলো?
-এই তো হয়ে গেছে, স্যার।
-চেখে দেখেছ?
-না, স্যার। আপনি দেখেন।
-আচ্ছা দাও। চেখে দেখি।
-এই নিন স্যার-বলে একজন পাচক বড়ো এক থালায় গোশত তুলে দিলো।
ইবরাহীম খাঁ গোশত ফুঁ দিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। খেতে খেতে বললেন-বেশ ভালোই তো রান্না করেছ।
-আরও কিছু নেবেন, স্যার?
-খেতে বসেছি যখন, দাও। আর একজন পাশে থাকো।
ইবরাহীম খাঁ খেতে লাগলেন। তার পাশের পাচক বড়ো চামিচ ডুবিয়ে ডুবিয়ে গোশত তুলে দিতে লাগলেন। খাঁ সাব টপাটপ গোশতের টুকরোগুলো গিলতে লাগলেন। একসময় চামিচ ডেগের মধ্যে নেড়েচেড়ে দেখলেন গোশত আর নেই। আছে শুধু ঝোল আর হাড়।
হক সাব মজার মজার গল্প করে যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। এ সময়ে ড. আশরাফ সিদ্দিকী রান্নাঘরের খবর নিতে গিয়ে দেখেন, ইবরাহীম খাঁ সিনার একটা হাড় মুড় মুড় করে চিবিয়ে খাচ্ছেন। তিনি বললেন-আপনি একাই খাচ্ছেন?
ইবরাহীম খাঁ বললেন-আমি খাচ্ছি না তো, চেখে দেখছি। বসুন এবার সবাই একসঙ্গে বসে খাই।
হক সাব এতক্ষণে টের পেলেন ব্যাপারটা। তিনি এসে ঢুকলেন রান্নাঘরে। তিনি ইবরাহীম খাঁকে খেতে দেখে বললেন-খাঁ সাব, একাই খাচ্ছেন?
-না, না। আমি চেখে দেখছিলাম।
হক সাব ডেগের দিকে তাকিয়ে দেখেন সব গোশত সাবাড়। হাড় আর ঝোল ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি পাচকদের বললেন-সবটুকু রান্না করোনি?
-জি, সবটুকু রান্না করেছি।
-গোশত দেখছি না যে? দেখছি শুধু হাড়...
ড. শহীদুল্লাহ সব সময় খুব কম খেতেন। তিনি কী আর বলবেন। মুচকি হেসে বললেন-খাসিটায় শুধু হাড়ই ছিল। প্রিন্সিপাল সাবের হাতে ঐ যে হাড়ই দেখছি।
আরও পড়ুন...