ক্রিপ্টোগ্রাফি
আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ সেপ্টেম্বর ২০২৪
আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? আশা করি অনেক অনেক ভালো আছো। তোমরা কি জানো, আগেকার যুগে মানুষ তাদের গোপন তথ্য কীভাবে আদান প্রদান করতো? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। আগেকার দিনে মানুষ চিঠির মাধ্যমেই তথ্যের আদান-প্রদান করতো। কিন্তু চিঠিতে সাধারণভাবে কোনোকিছু লিখলে তো যে কেউ চিঠিটা পড়তে পারবে। তাহলে তথ্য নিরাপদ ও গোপনীয় থাকবে কীভাবে? তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, গোপনীয়, সুরক্ষিত করার একটা কৌশলের নাম হলো ক্রিপ্টোগ্রাফি। তোমরা কি কখনো ক্রিপ্টোগ্রাফির নাম শুনেছ? অনেকে হয়তো শুনে থাকবে। আবার অনেকের কাছে হয়তো শব্দটা নতুন। চলো, আজকে আমরা ক্রিপ্টোগ্রাফি সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য জানি।
ক্রিপ্টোগ্রাফি কী?
ক্রিপ্টোগ্রাফি শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ যাকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমভাগ হচ্ছে “Crypto” যার অর্থ হচ্ছে গোপন বা লুকানো (hidden) এবং পরের অংশ হচ্ছে “Graphy” যার অর্থ হচ্ছে লেখা। অর্থাৎ ক্রিপ্টোগ্রাফি হলো তথ্যকে নিরাপদ, গোপনীয়, সুরক্ষিতভাবে আদান-প্রদানের একটা কৌশল যা বিভিন্ন অ্যালগোরিদম ও প্রোটোকল ব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এ পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তি (sender) বিশেষ কোড ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তির কাছে কোনো তথ্য পাঠায় যা শুধুমাত্র প্রাপক ব্যক্তি (receiver) অর্থাৎ যার কাছে তথ্য পাঠানো হবে সেই বুঝতে পারে ও পড়তে পারবে। ফলে, কোনোভাবে যদি প্রেরক ও প্রাপকের বাইরে অন্য কেউ তথ্য জেনেও যায়, তবুও তথ্য পড়তে বা বুঝতে পারবে না।
ক্রিপ্টোগ্রাফিতে গাণিতিক বিভিন্ন সূত্র ব্যবহার করে সাধারণ একটা তথ্যকে অনেক জটিল ও বোঝার অনুপযোগীরূপে পরিবর্তন করা হয় যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমেই সাধারণ তথ্যে আবার রূপান্তর করা সম্ভব। বর্তমানে ক্রিপ্টোগ্রাফির বিভিন্ন অ্যালগোরিদম বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। যার মধ্যে- তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য যাচাইকরণ, ইন্টারনেটে ওয়েব ব্রাউজিং, ডিজিটাল সাইনিং ও ব্যাংক লেনদেনের মতো গোপনীয় লেনদেনের তথ্য অন্যতম।
ক্রিপ্টোগ্রাফির প্রকারভেদ
সাধারণত তিন ধরনের ক্রিপ্টোগ্রাফি হয়ে থাকে। সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি, অ্যাসিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি ও হ্যাশ ফাংশন।
সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি
সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফিতে প্রেরক (sender) ও প্রাপক (receiver) উভয়ই একটা নির্দিষ্ট কি (key) ব্যবহার করে তথ্য এনক্রিপ্ট ও ডিক্রিপ্ট করে। এ পদ্ধতিটি অনেক দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং সহজতর। কিন্তু যেহেতু প্রেরক (sender) ও প্রাপক (receiver) উভয়কে একটাই কি (key) দিয়ে তথ্য এনক্রিপ্ট বা ডিক্রিপ্ট করতে হয়, সেহেতু প্রেরক (sender) ও প্রাপক (receiver) উভয়কে কোনোভাবে কি (key) বিনিময় করতে হয়। এই পদ্ধতিতেই সাধারণত আগেকার যুগে কোনো গোপনীয় বার্তা আদান-প্রদান করা হতো। বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি সিস্টেমগুলো হচ্ছে : এ.ই.এস (অ্যাডভ্যান্স এনক্রিপশন স্টান্ডার্ড), ডি.ই.এস (ডাটা এনক্রিপশন স্টান্ডার্ড), আই.ডি.ই.এ (ইন্টারন্যাশনাল ডাটা এনক্রিপশন অ্যালগোরিদম) এবং আর.সি (রিভেস্ট সাইপার) ফ্যামেলি অব অ্যালগোরিদমস্।
অ্যাসিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি
অ্যাসিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফিতে একজোড়া কি (key) ব্যবহার করা হয় তথ্য এনক্রিপ্ট বা ডিক্রিপ্ট করার জন্য। এ পদ্ধতিতে একটি পাবলিক কি (public key) ও আরেকটি প্রাইভেট কি (private key) ব্যবহার করা। অ্যাসিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফিতে প্রেরক (sender) কাউকে তথ্য পাঠানোর জন্য পাবলিক কি (public key) ব্যবহার করে এনক্রিপশন করে থাকে। অপরদিকে, প্রাপক (receiver) তথ্য গ্রহণ করে প্রাইভেট কি (private key) দিয়ে ডিক্রিপশন করে থাকে। ফলে, পাবলিক কি সবার জানা থাকলেও প্রাইভেট কি যেহেতু প্রাপকের (receiver) কাছে থাকে, সেহেতু সেই শুধুমাত্র তথ্য ডিক্রিপ্ট করতে পারে। কিছু জনপ্রিয় অ্যাসিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি সিস্টেম হচ্ছে : আর.এস.এ (রিভেস্ট শামির অ্যাডলেম্যান), ডিফি-হ্যালম্যান, ই.সি.সি (ইলিপটিক কার্ভ ক্রিপ্টোগ্রাফি)
হ্যাশ ফাংশন
হ্যাশ ফাংশনে কোনো রকম কি (key) ব্যবহার করা হয় না। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যরে কোনো টেক্সটকে (text) একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যরে গাণিতিক মান-এ রূপান্তর করা হয়। এর ফলে কোনো টেক্সটকে পড়া একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিভিন্ন সিস্টেমে পাসওয়ার্ড এনক্রিপশনের জন্য হ্যাশ ফাংশন ব্যবহার করা হচ্ছে।
বর্তমানে ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পদ্ধতি ব্যবহারের অন্যতম সুবিধা হচ্ছে নিরাপদ তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়াও কোনো হ্যাকার আড়ি পেতে যদি কোনো ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি করে, তারপরও হ্যাকারের পক্ষে তথ্যগুলো বোঝা সম্ভব হবে না। ফলে তথ্য গোপনীয় ও নিরাপদ থাকে। এছাড়া, কোন ধরনের ব্যবহারকারী কী ধরনের তথ্য ব্যবহারের অনুমতি পাবে সেটাও ক্রিপ্টোগ্রাফি দ্বারা ঠিক করা সম্ভব। ক্রিপ্টোগ্রাফি বর্তমান বিশ্বের সাইবার নিরাপত্তার জন্য অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ক্রিপ্টোগ্রাফির বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ টেক্সটকে সাইফার নামক জটিল টেক্সট-এ রূপান্তর করা হয় যা তথ্য ও যোগাযোগ নিরাপদ করার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নতুন নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির বিরুদ্ধে ক্রিপ্টোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আরও পড়ুন...