কথা বলা নদী
তোমাদের গল্প মাসুদ রানা আশিক ফেব্রুয়ারি ২০২৫
দিহান ও আদিল সম্পর্কে চাচাতো ভাই। একই বয়স ওদের। এইতো সবেমাত্র দশে পড়ল। ওদের বাবারা একই জায়গায় থাকে না। দিহানের বাবার সরকারি চাকরির কারণে থাকতে হয় ঢাকায়। আর আদিলের বাবা গ্রামে থেকে জমি দেখাশোনা করে। প্রতি বছর দুই ঈদ ছাড়া তাই তাদের দেখা হয় না খুব একটা। তবে ইন্টারনেটের যুগ হওয়ায় মোবাইলে ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখা হয় মাঝে মাঝেই। এবার অবশ্য ঈদ নয়। নতুন ধান ওঠায় দিহানের জেঠু দাওয়াত দিয়েছে তাদের। দিহানের বাবাও বড়ো ভাইয়ের কথা ফেলতে পারেনি। তিন দিনের ছুটি নিয়েছে অফিস থেকে। তারপর পরিবার নিয়ে চলে এসেছে বাড়িতে। বাড়িতে খুব আনন্দ চলছে এখন। সবাই একসাথে খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা। এভাবে সবাই একসাথে খাওয়া ভুলেই গেছে আমাদের দেশের মানুষ। গ্রামকেও ভুলে যাওয়া শুরু করেছে এখন। সবাই এখন শহরমুখী। গ্রামের টান আর কেউ বুঝতে চায় না। সে যাই হোক, বেড়াতে এসে দিহান আর আদিল দুই ভাই বেরিয়ে পড়েছে বাইরে। গ্রামের হাওয়া কার না ভালো লাগে। এমন হাওয়া কি আর শহরে পাওয়া যায়? শহরে যেন দমবন্ধ করা পরিবেশ। গ্রামের অদূরে একটা নদী আছে। যমুনার শাখা নদী ওটা। নদীটা ছোট যমুনা নামে পরিচিত। খুবই টলটলে পানি নদীটার। দিহান যতবারই গ্রামে আসে ততবারই নদীটার পাড়ে যেয়ে নির্মল পরিবেশ উপভোগ করে। এই নদী থেকে মাছ ধরাও দেখেছে সে। তার জেঠু আদিলের বাবা জাল দিয়ে এই নদী থেকে বড়ো বড়ো মাছ ধরত। খুবই সুস্বাদু মাছ। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম দেখেছে দিহান। জেঠু এবার বাজার থেকে মাছ কিনে এনেছে। যে জাল দিয়ে মাছ ধরত জেঠু, সেই জালটা ঝুলে আছে বাড়ির দেওয়ালেই। দিহান আদিলকে জিজ্ঞেস করল, ‘এবার জেঠু জাল দিয়ে মাছ ধরল না কেন!’
আদিল ফোকলা দাঁত বের করে বলে, ‘বাবা তো এখন নদীতে মাছ ধরে না। বাজার থেকেই মাছ কিনে আনে। কেন ধরে না সেটা তো বলতে পারব না।’
দিহানের মনটা খারাপ হয়ে যায়। দুই ভাই এগিয়ে যেতে থাকে নদীটার দিকে। দিহান জানে নদীর পাড়ে গেলে এমনিতেই ওর মন ভালো হয়ে যাবে। নদী ওর কাছে মন ভালো করার ঔষধ। অনেক দূর হেঁটে আসে দুই ভাই। কিন্তু অবাক হতে হয় দিহানকে। কোথায় নদী! যেখানে নদী ছিল সেখানে খালের মতো একটা কী যেন। ওটা কি খাল, না কি ময়লা ফেলার ভাগাড়। কী যে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে ওখান থেকে! দিহান গন্ধ সহ্য করতে না পেরে নাকে হাত দেয়। ভাইকে বলে, ‘ভাই এখানে একটা যমুনার শাখা নদী ছিল না? তোর মনে পড়ে, এইতো বছর দুয়েক আগেও আমি আর তুই নৌকা নিয়ে ঘুরতাম নদীতে। কত মানুষ নদীতে মাছ ধরত। আমাদের গ্রামের হাটে তাজা তাজা মাছ পাওয়া যেত। সেই নদীটা কোথায় গেল বল তো ভাই?’
আদিল মুচকি হাসে দিহানের কথা শুনে। বলে, ‘তোর কি মনে হচ্ছে এটা খাল? নারে ভাই, এটাই সেই নদী। এখন আর নদী মনে হয় না। শুকনো খটখটে খাল মনে হয়। দেখ ভাই, নদী দখল করে কত বড়ো বড়ো বাড়ি উঠে গেছে।’
নদীটার দিকে তাকিয়ে দিহান কী যেন ভাবছিল। তখনই কে যেন কথা বলে উঠল, ‘দিহান-আদিল, তোমরা আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?’
‘শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু তুমি কে কথা বলছ? আমি তো তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।’ কিছুটা ভয় পেয়ে বলল দিহান।
‘আমি তোমার ভালোবাসার যমুনার শাখা নদী। তুমি যেটাকে এখন খাল বলছ। আসলেই আমি দিন দিন রুগ্ন হয়ে যাচ্ছি। মানুষদের অসুস্থ মানসিকতায় আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। দেখো দিহান, আমার কোলে সবাই ময়লা ফেলছে। সবাই আমাকে দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়েছে। ওই দূরে দেখো দিহান। ওখানে একটা কারখানা হয়েছে। কারখানার কালো ময়লাগুলো আমার পানিতে মিশে যাচ্ছে প্রতিদিন। আমার বুকে পরম নিশ্চয়তায় আগলে থাকতো যে মাছগুলো, সেগুলো এখন নেই। ওরা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। যে কয়টা বেঁচে আছে। সেগুলোও মরে যাওয়ার পথে। শুধু আমি না। আমার মতো এরকম কত নদী মারা যাচ্ছে দেশে সেই হিসাব তোমাদের কাছে নেই। এভাবে নদী মরে যাচ্ছে বলেই তো আমাদের পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে। ময়লার দুর্গন্ধে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে। আমার এখানে যারা এখন গোসল করছে তাদের শরীরে ঘা হচ্ছে। আমি পানি প্রবাহিত করতে পারছি না দেখে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। আমার বুকে কেউ আর নৌকা চালায় না। আমার পানি মুখে দিয়ে প্রশান্তিতে কেউ আর বলে না, আহা কত শীতল পানি। জানো দিহান, আমার খুবই কষ্ট হয়। আমাকে তোমরা মেরে ফেলছো। আমাকে মেরে তোমাদের কি উপকার হচ্ছে বলো তো? বরং একটা নদী মেরে ফেলে তোমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছো। আমাকে বাঁচাতে পারবে দিহান? আমি বাঁচতে চাই। তোমাদের উপকারে বাঁচতে চাই। দেশের পরিবেশ রক্ষায় বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচাও! আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’ নদী কাঁদতে থাকে। নদীর কান্না দেখে দিহান আর আদিলের চোখেও পানি চলে আসে। তাই তো নদীকে বাঁচাতে না পারলে দেশ ভালো থাকবে না। নদী অসুস্থ হওয়া মানে দেশ অসুস্থ হওয়া। কিন্তু ওরা তো ছোট। তারা কি পারবে সবাইকে বোঝাতে? অবশ্যই পারবে। দুই ভাই সিদ্ধান্ত নিলো যেভাবেই হোক গ্রামের মানুষদের বোঝাবে নদীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে। তাহলেই তো দেশটার অসুস্থতা একটু হলেও কমবে। বাড়ির পথে হাঁটতে থাকে ওরা। প্রথমে ওদের বাবাদের বোঝাতে হবে বিষয়টা।
আরও পড়ুন...