ওয়ার্মহোল
সাইন্স ফিকশন তারেক হাসান খান জানুয়ারি ২০২৫
‘রাফসান, আপনার কী মনে হয়? কোন গ্রহ থেকে সিগন্যালটি এসেছে?’ দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন করল সাজিদ।
বিজ্ঞানী রাফসানের নেতৃত্বে চৌদ্দজন বিজ্ঞানীদের একটি টিম গবেষণা সেল তৈরি করেছে। আজ সকালে টিএম ৯৯ স্যাটেলাইটে একটি বেতার তরঙ্গ এসেছে। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু এই বেতার তরঙ্গ। মহাশূন্য থেকে বেতার তরঙ্গ শুধুমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণীরাই পাঠাতে পারে। আর স্যাটেলাইটটি একটি ফাঁকা স্থান থেকে আসা বেতার তরঙ্গ রিসিভ করে।
‘আমি হিসাব-নিকাশ করে দেখেছি এ তরঙ্গ কোনো গ্রহ থেকে আসেনি,’ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল রাফসান, ‘এসেছে চাঁদ থেকে সামান্য দূরের শূন্যস্থান থেকে।’
রাফসানের কথায় সবাই নড়েচড়ে উঠলো। ফাইয়াজ বললো, ‘এটা কীভাবে সম্ভব?’
‘আমি তরঙ্গের গতি, সময় ইত্যাদি হিসাব করে দেখেছি- আমাদের সবচেয়ে দ্রুতগামী স্পেসশিপ নিয়ে ওখানে যেতে চারদিন সময় লাগবে।’
কলম নাচালো সাজিদ ‘হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক মনে হচ্ছে। যারা পাঠিয়েছে নিশ্চয় তাদের ওয়ার্মহোল তৈরি করতে হয়েছে।’
‘মানে পাহাড়ের ভেতর দিকে রাস্তা তৈরির মতো ব্যাপার।’ টেবিলে থাবা দিলো হাবিব।
‘ব্যাপারটা অদ্ভুত!’ সাজিদ বললো।
‘এখন আমরা কী করব?’ ফাইয়াজের প্রশ্ন।
‘দ্রুত ওখানে পৌঁছে ওয়ার্মহোলটি শনাক্ত করতে হবে। হতে পারে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এটা ব্যবহার করে আমাদের সৌরজগতে আসতে চাচ্ছে।’ প্রস্তাবনা দিলো রাফসান।
ঠিক হলো রাফসানের ছেলে রাফিও যাবে তাদের সাথে। ২২ বছর বয়সি এ যুবক পড়ছে রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
হাতে মাত্র চার ঘণ্টা বাকি। স্পেসশিপে উঠানো হয়েছে ১৪ দিনের খাদ্যসহ মিশনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
স্পেসশিপটি চলতে শুরু করলো। যাত্রা শুরু করলো সেই সম্ভাব্য ওয়ার্মহোলের দিকে।
চারদিন পর তারা মহাশূন্যে একটি স্পেসশিপ দেখলো। এটা আরো আধুনিক মনে হলো। স্পেশশিপটা কাদের? পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো বিজ্ঞানী রাফসান ও অন্যরা। হঠাৎ স্পেসশিপের ক্যাপ্টেন আজহার সবাইকে ডাকলেন, ‘স্যার, দেখুন একটা ভিডিও বার্তা এসেছে।’
“আমি কর্নেল ইয়ান। তোমরা আমাদের থেকে দূরে থাকো। যত দ্রুত পারো এখান থেকে চলে যাও কারণ এটা আমাদের কেস। অন্যথায় আমরা তোমাদের ধ্বংস করে দেবো।”
বিজ্ঞানী রাফসান পিছু হটার নির্দেশ দিলো। পিছু হটতেই দেখা গেল সামনের শিপটা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে।
আঁতকে উঠলো ওরা। ক্যাপ্টেন তাড়াতাড়ি R.O.P. সিস্টেম চালু করে দিলো। এটার ফলে স্পেসশিপের দিকে কোনো ধ্বংসাবশেষ এলেও তা ১০ কিলোমিটার দূর থেকেই বিকর্ষিত হয়ে অন্যদিকে চলে যাবে। সামনের স্পেসশিপটি কেন ধ্বংস হলো বোঝা গেল না। কিন্তু এত দূর এসে কোনো সমাধান ছাড়া ফিরতে রাজি নয় রাফসান। মহাকাশযানকে আস্তে আস্তে করে ধ্বংসাবশেষের দিকে নিয়ে যেতে বললেন।
ধ্বংস হওয়া মহাকাশযানের কাছাকাছি এসে ক্যাপ্টেন রাফসানের নির্দেশে অগ্রসর হওয়া বন্ধ করে দিলো।
মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষের অর্ধেকটা ওদের দিকে আসছিল। তবে তা দশ কিলোমিটার দূর থেকেই বিকর্ষিত হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। চিৎকার করে উঠল রাফি, ‘বাবা! দেখো স্পেশশিপের খণ্ডাংশ একেবারে গায়েব হয়ে গেল।’
সবার চোখ মনিটরের দিকে। একটু পরেই আরেকটি ধ্বংসাবশেষ অদৃশ্য হয়ে গেল। এবার চিৎকার করে উঠলো সাজিদ, ‘ওয়ার্মহোল পাওয়া গেছে!’
‘ক্যাপ্টেন! শিপ থেকে আরো পেছনে যান, একটু আগে তাদের পরিণতি নিজ চোখে দেখেছেন।’
শিপকে পেছনে নিয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন। কোনোভাবেই ওয়ার্মহোলের আকার বের করা যাচ্ছিল না। তখন রাফি বললো, ‘আচ্ছা রেডিয়েটর দিয়ে আমরা রেডিয়েশন দেখছি না কেন?’
‘আরে তাইতো! এই সর্বশেষ প্রক্রিয়াটা দেখা দরকার নইলে সব বৃথা।’ সাজিদ বললো।
রেডিও অন করার পর মনিটরে কমলা রঙের বৃত্তাকার রেখা দেখা গেল। মাঝখানে হলুদ রং। কমলা দ্বারা বেশি আর হলুদ দ্বারা কম রেডিয়েশন বোঝাচ্ছে। মনিটরে ওয়ার্ম হোলটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিজ্ঞানীরা। সারা জীবন যেটাকে কল্পনা মনে হয়েছে আজ সেটা বাস্তবে ধরা দিলো।
সাজিদ বললো, ‘ওয়ার্মহোলের চারপাশে রেডিয়েশন বেশি আর আগের শিপটা আকারে বড়ো হবার কারণে শিল্ডের সাথে সংঘর্ষে বিস্ফোরিত হয়েছে।’
‘আমাদের আবিষ্কার শেষ। আমরা এখন ফিরে যেতে পারি।’ হাবিব বললো।
‘না, আমি ওয়ার্মহোলের ভেতর ঢুকবো। যারা যেতে চান আমার সাথে যাবেন।’ রাফি বললো।
‘তোমার মাথা খারাপ নাকি? ওখানে গেলে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে।’
‘কিছু হবে না। দেখলে না কীভাবে ধ্বংসাবশেষ ওটার ভেতর দিয়ে ঢুকলো। আগের স্পেশশিপটা আকারে বড়ো হবার কারণে ধ্বংস হয়েছে।’
‘তাহলে কীভাবে যাবো?’
‘সহজ। আমাদের ছোট শিপটা নিয়ে যাবো।’ সাজিদ বললো।
‘যদি ভেতরে আটকা পড়েন?’
‘ওয়ার্মহোল আলফা রশ্মি নির্গত করছে। এ রেডিয়েশন তো আমাদের গায়ে লাগবে না লাগবে শিপে।’
‘হ্যাঁ বাবা, আঙ্কেলের কথাই ঠিক,’ রাফি বললো, ‘যদি অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এটা ব্যবহার করে আমাদের ক্ষতি করে? তাই আমাদের দেখে আসা দরকার।’
‘কিন্তু...’ রাফসানকে শেষ করতে দিলো না রাফি, ‘আমি এ অ্যাডভেঞ্চারে যাবই। আমার প্রাণ গেলেও।’
‘শাটআপ!’
‘সমস্যা নেই স্যার, আমরা ফিরে আসবো।’
ছোট শিপে রাফি, বিজ্ঞানী সাজিদ, সহকারী ক্যাপ্টেন শান্ত, ফাইয়াজ আহমেদ ও হাওলাদার উঠে পড়লো। শিপ রেডি হয়ে গেছে। এক ঘণ্টা পর শিপটি ছেড়ে দিলো। ওয়ার্মহোলের দিকে এগোতে লাগলো। রাফসানের চোখ মনিটরে। রাফসান তার ছেলের জীবন নিয়ে শঙ্কিত। অন্যরা তাকে সান্ত¡না দিলো। ছোট শিপ Gm20 ওয়ার্মহোলে প্রবেশ করলো।
রাফসান মনিটরে দেখলো সামনে এগোতেই শিপটি গায়েব হয়ে গেল। শান্ত চালাচ্ছেন ছোট শিফটি। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডে তারা ওয়ার্মহোলটি অতিক্রম করলো। এরপর দেখলো নতুন একটি সৌরজগতে চলে এসেছে। শিপের মনিটরের মাধ্যমে দেখতে পেল সামনে একটি বড়ো নক্ষত্র এবং নক্ষত্রকে ঘিরে অনেকগুলি গ্রহ ঘুরছে। এগুলোর কাছাকাছি একটা জায়গায় বিশাল বড়ো একটা শিপ দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে সৌরজগতে অনেকগুলো গ্রহ একদম কালো দেখাচ্ছে। একটা গ্রহ পৃথিবীর মতো দেখতে। সেই গ্রহটার চারপাশে শনির বলয়ের মতো বলয় রয়েছে। ক্যাপ্টেন শান্ত শিপটি চালাচ্ছেন আর রাফি-সাজিদ-হাওলাদার-ফাইয়াজ মনিটরের দৃশ্যগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। হঠাৎ বিজ্ঞানী সাজিদ একটা পিস্তল ফাইয়াজের মাথায় তাক করলো। অন্যরা হতভম্ব। সাজিদ বললো, ‘সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা মতোই হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তোমাদের আমি এখানে নিয়ে এসেছি।’
রাফি অবাক হয়ে বললো, ‘আঙ্কেল এটা কী করছেন? আপনি আসলে কে?’
সাজিদ রাফিকে ধমক দিয়ে বললো, ‘চুপ থাকো ছেলে। আমাকে শেষ করতে দাও।’
সাজিদ বলতে লাগলো, ‘আমি এই সৌরজগতের মানুষ। প্রায় ১০০ বছর আগে অন্য গ্যালাক্সিতে যোগাযোগের জন্য আমরা এই ওয়ার্মহোলটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু প্রথম এক্সপেরিমেন্ট ভুল হয়। এতে আমাদের সৌরজগতের অর্ধেক বাসিন্দা মারা যায়। আমাদের গ্রহ ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় আরেকটা এক্সপেরিমেন্টে আমরা সফল হই। ভাগ্য খারাপ। এ এক্সপেরিমেন্টের ফলে যে রেডিয়েশন নির্গত হয় তার প্রভাবে আমাদের সৌরজগতের সব গ্রহ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই আমি পঞ্চাশ বছর আগে এই ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে তোমাদের গ্যালাক্সিতে নতুন গ্রহ খোঁজা শুরু করি। ৫০ বছর ধরে তোমাদের এখানের সবকিছু জানাশোনা শেষ হয়েছে। এবার তোমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে তোমাদের ধ্বংস করে আমরা নতুন সভ্যতা গড়ে তুলবো।’
রাফি বুঝতে পারলো সাজিদ ওদের জিম্মি করে রাফসানের স্পেসশিপকে ব্যবহার করবে। সাজিদ তাদের স্বজাতির সাথে যোগাযোগ করলো।
রাফি যেখানে আছে দাঁড়িয়ে ছিল তার পেছনে একটা উইন্ডো বাটন ছিল। দ্রুত রাফি উইন্ডো বাটনে প্রেস করলো। সাথে সাথে ছোট স্পেসশিপের জানালা ও দরজা খুলে গেল। ভেতরের সব জিনিস বাইরে চলতে শুরু করলো। সাজিদ উইন্ডোর সামনে থাকার ফলে জানালা দিয়ে বাতাসের চাপে স্পেসশিপ থেকে বের হয়ে যায়। বাইরে মহাকাশের চাপের কারণে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। একই সময়ে রাফিও বের হয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখন হাওলাদার আবার উইন্ডোবাটনে প্রেস করে এবং সাথে সাথে স্পেসশিপের দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। রাফি প্রচণ্ড গতিতে বাইরে যাওয়ার সময় দরজার সাথে বাড়ি খেয়ে বেঁচে যায়।
ওরা ধাতস্থ হবার আগেই ক্যাপ্টেন শান্ত সবাইকে ডেকে বললেন, ‘বড়ো একটা স্পেসশিপ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।’
রাফি বললো, ‘তাড়াতাড়ি ওয়ার্মহোলের ভেতর দিয়ে ফিরে যেতে হবে এবং এটাকে ধ্বংস করে দিতে হবে।’
রাফি রাফসানের সাথে যোগাযোগ করে তাড়াতাড়ি একটা সুইসাইড মিসাইল রেডি রাখতে বলে।
শান্ত স্পেসশিপকে প্রচণ্ড গতিতে ওয়ার্মহোলের দিকে নিয়ে আসছে আর অন্যদিকে বড়ো স্পেসশিপ থেকে আরও দুটো ছোট শিপ বের হয়ে আরো প্রচণ্ড গতিতে রাফিদের স্পেসশিপের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। ঠিক তখন তারা ওয়ার্মহোলে প্রবেশ করে। ৩১ সেকেন্ড পর তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসে। ঠিক তখনই রাফির কথামতো রাফসান সুইসাইড মিসাইলটি ওয়ার্মহোলের ভেতরে পাঠিয়ে দেন এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ওয়ার্মহোলটি ধ্বংস হয়ে যায়। রাফি-রাফসান সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর ১১তম স্থান
অধিকারী সায়েন্স ফিকশন
আরও পড়ুন...