ওরা এগারোজন
সাইন্স ফিকশন নিলুফা ইয়াছমিন এপ্রিল ২০২৫
তেরো বছরের ছেলেটি বিনোদের দিকে আঙুল তাক করার সাথে সাথেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ক্যামেরা চোখে রাফির ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগলো। এমন কোনো সিকোয়েন্স তো নাটকে ছিল না। এই ছেলে বা কোথা থেকে এলো? চিন্তায় ভাটা পড়লো রনকের চিৎকারে। রাফি দেখলো রনক বিনোদের পাশে বসে চিৎকার করছে। বিনোদের কোনো সাড়াশব্দ নেই। রাফি ছুটে গেল বিনোদের পাশে। এমন কিছু দেখার আশা করেনি সে। বিনোদ মারা গেছে! আকস্মিক এই ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফি, রনক এবং বিনোদ। সিনিয়রদের বিদায় উপলক্ষ্যে সামাজিক সচেতনতামূলক নাটক তৈরি করছিল তারা। রাফি ক্যামেরা হাতে শুটিং করছিল। তখনই এই ঘটনা।
রাফি অতিদ্রুত তার পরিচিত সিআইডি অফিসার অভিকে কল দেয়। অভি অতিদ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা বিনোদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাফি ও রনককে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে তাদের দু’জনের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। তারপর রাফির ধারণ কথা ভিডিও ফুটেজ চালু করে। ভিডিওতে অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা দেখা যায়। ছোট ছেলেটির হাতে কোনো বন্দুক ছিল না, শুধুমাত্র হাতের সাহায্যে খুনটা করে। এরপর দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করে। এত দ্রুত দৌড়ানো একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
ভিডিও থেকে ছেলেটির ছবি সংগ্রহ করে সব থানায় পাঠানো হয়। ভিডিওতে ওর হাতে ড্রাগনের ট্যাটু দেখা যায়। রাফি ও রনককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কয়েকদিন পর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেল বিনোদের মৃত্যুর জন্য দায়ী অতিরিক্ত রেডিয়েশন। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পরে বরিশালের সার্জেন্ট অভিকে জানায়, গতরাতে তারা একজন তেরো বছরের কিশোরকে ধরেছে। যার চেহারা বিনোদের খুনির মতো দেখতে। অভি দেরি না করে ওকে ঢাকায় নিয়ে আসে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ও তেমন কোনো উত্তর দেয়নি। অন্যদিকে এই ছেলেই খুনি কি না এ নিয়ে সন্দেহ হয় অভির। ভিডিওতে দেখা ছেলেটির হাতে ড্রাগনের ট্যাটু ছিল। এর হাতে ঈগলের ট্যাটু। এত তাড়াতাড়ি ট্যাটু বদলানো সম্ভব নয়।
অভি ছেলেটির মাথায় লাই-ডিটেক্টর হেলমেট পরিয়ে খুনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। দেখা যায় সত্যিই ও খুনটি করেনি। হিসাব মেলাতে পারে না অভি। চেহারার এত মিল কীভাবে হতে পারে?
যেহেতু ও কোনো দোষ করেনি, তাই আটকেও রাখা যাবে না। ছেড়ে দেওয়ার আগে অভি ওর কিছু পরীক্ষা করতে চাইলো। প্রথমেই আইকিউ টেস্ট করা হলো। অবিশ্বাস্য! ছেলেটির আইকিউ লেভেল পূর্ণবয়স্কদের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। ওর সমস্ত শরীর পরীক্ষা করে দেখা গেল ডান হাতের তর্জনীতে বিশেষ ক্ষমতা আছে, যেটা দিয়ে ও রেডিয়েশন ছুঁড়ে নিমিষেই কাউকে হত্যা করতে পারে। ওর চোখ দিয়ে অন্ধকারেও দেখতে পায়। হাত-পায়ের পেশি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। অভি ব্যাপারগুলো রাফিকে জানায়। সাবধানতার সাথে ওরা এসব মিডিয়া থেকে লুকিয়ে রাখে।
রাফি ঢাবিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ালেখা করে। তাই এ ছেলেটির ব্যাপারে কৌতূহল অনুভব করলো। বিনোদের খুনির সাথে ওর সংযোগ থাকতে পারে ভেবে জিন সিকোয়েন্সিংয়ের চিন্তা করে। ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরের সাহায্য নিয়ে সে এ কাজটি করেও ফেলে। ছেলেটির জেনেটিক প্রোফাইল দেখে প্রফেসর রীতিমতো বিস্মিত হন। স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অভি ও রাফি মিলে একটা প্ল্যান করে। তারা এই ছেলেটিকে ছেড়ে দেয়। ওর গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য শরীরে গোপনে ট্র্যাকিং সিস্টেম লাগিয়ে দেয়। রাফি ওর পিছু নেবে ঠিক করে।
রাস্তায় বের হতেই ছেলেটির হাঁটার গতির সাথে রাফি পেরে ওঠে না। দ্রুতই সে ছেলেটিকে হারিয়ে ফেলে। এখন ট্র্যাকারই ভরসা। অভি সারাদিন ট্র্যাকারে দেখে, ছেলেটি বিভিন্ন অলিতে-গলিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এদিকে আততায়ীর হাতে খুনের খবর দিন-দিন বেড়েই চলেছে। একদিন দেখা যায় ছেলেটি একই স্থানে সারারাত অবস্থান করেছে। এর আগে কখনো একস্থানে পাঁচ মিনিটের বেশি থাকেনি। ব্যাপারটি অভির নজরে আসে। রাফিকে নিয়ে সে ওখানে যায়।
লোকেশানে দেখানো জায়গাটি চারতলা বাড়ি। ওরা দুদিন বাইরে থেকে নজর রাখলেও তেমন কিছু দেখলো না। নজরদারির জন্য গোপন ক্যামেরা সেট করে অভিরা চলে এলো। প্রায় একমাস পর এক রাতে সেই ছেলেকে আবার বাড়ির সামনে দেখা গেল। ও গেট দিয়ে বাসায় ঢুকলো। সবকিছু দেখে রাফি ও অভি তাড়াতাড়ি ওখানে চলে আসে। তারা দু’জন অবাক হয়ে দেখে, সেই ছেলেটির পরও আরো ১০ জন কিশোর সেই বাড়িতে ঢুকলো। ওরা দেখতে একইরকম। অভির হার্টবিট বেড়ে গেল। আজ কিছু করতে না পারলে সব হাতছাড়া হয়ে যাবে।
অভি তার ফোর্সকে নিয়ে ৩০ মিনিটের মাথায় সেই বাড়িতে প্রবেশ করলো। বাড়িতে কোনো দারোয়ান নেই। পুরো বাড়িতে আলো জ্বলছে। কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ ওপরে দোতলা থেকে গুনগুন শব্দ পেল তারা।
ওপরে বড়ো হলরুম। সাজানো একটি ল্যাব সেখানে। রাফি যন্ত্রপাতিগুলো চিনতে পারলো। তাদের ল্যাবে এই যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করে অভ্যস্ত। এখানকার সবগুলাই অত্যাধুনিক। পাশের রুম থেকে শব্দ পেয়ে ওরা সেদিকে এগিয়ে গেল। বাইরে থেকে লক্ষ্য করলো এগারো জন কিশোর সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাদের আদেশ দিচ্ছে। একটু সামনে যেতেই দেখলো সুন্দর একটি মেয়ে। হেসে হেসে ওদের সাথে কথা বলছে। রাফি মেয়েটিকে চিনতে পারলো। ওদের ডিপার্টমেন্টের বড়ো আপু নীলা। মেধাবী ও সম্ভাবনাময়ী ছিল। একটি দুর্ঘটনার পর নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে। কী হয়েছিল তা অবশ্য রাফি জানে না। এতক্ষণে নীলা ওদের দেখে ফেললো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বাচ্চাগুলো লাইন ভঙ্গ করে মেয়েটির গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। অভিরা কিছু বলার আগেই মেয়েটি ওদের দিকে আঙুল তাক করলো। তারা একটু ঝাঁকুনি অনুভব করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
রাফি মিটমিট করে চোখ খুললো। দড়ি দিয়ে ওদের বেঁধে ফেলেছে। চোখ খুলতেই রাফিকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তারা অনুমতি ছাড়া কেন এখানে প্রবেশ করেছে।
রাফি প্রথম থেকে সব বলতে শুরু করে। সবকিছু শুনে নীলা গম্ভীর হয়ে গেল। ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো সে। একজন কিশোরকে আদেশ করলো, ‘সকলের বাঁধন খুলে দাও।’
এবার সে বিস্তারিত বলতে শুরু করলো। তার বাবা জজ। পরিবারে ছিল সে ও বাবা। আদালতের রায় বিপক্ষে যাওয়ায় কিছু লোকের হাতে জজ সাহেব খুন হন। এরপর সে একা হয়ে যায়। নানা প্রতিকূলতা আসে জীবনে। ভীষণ ভেঙে পড়ে সে। একসময় সে প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করে। খুনিদের শাস্তি দিতে ও ভবিষ্যতে খুন থেকে মানুষকে বাঁচাতে কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করে। সে এমন কিছু করতে চেয়েছিল যা তার মৃত্যুর পরও খুনিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। বাবার অঢেল টাকা দিয়ে সে উন্নত ল্যাব তৈরি করে বাড়িতে। গবেষণা করে নিজেই জিন কোডিং করে তৈরি করে ১১টি ক্লোন। ওরাই ১১টি কিশোর। ওরা স্বাভাবিক মানুষ থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী। ওরা অন্যায় দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের আলাদা কোনো সত্তা নেই, সবাই এক। ওদের তৈরির পর নীলা বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়। এজন্যই পত্রিকায় আততায়ীর হাত খুনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিদিন সবাই আলাদা থাকলেও মাসের নির্দিষ্ট দিনে ওরা নীলার কাছে আসে। আজ ছিল সেই দিন। ওদের নির্দিষ্ট সত্তা নেই, তাই নির্দিষ্ট নামও নেই। ওদের চেনার জন্য নীলা হাতে ভিন্ন ভিন্ন ট্যাটু করে দিয়েছে। নীলা ভেবেছিল ওরা তার সেরা আবিষ্কার হবে। আজ যখন রাফির কাছে শুনলো তার আবিষ্কারের কারণে বিনোদ নামের এক নিরীহ ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। বুঝে গেল মানুষের তৈরি কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। সাধারণ মানুষ থেকে কয়েকগুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ওদের মানবিক গুনাগুণ মানুষের সমতুল্য নয়। তাই সত্য ও নাটকের সামান্য তফাত তারা করতে পারেনি।
সবকিছু জানার পর অভি তার জন্য সমবেদনা জানায়। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নীলা অন্যায় করেছে। বাধ্য হয়ে সে নীলাকে গ্রেফতার করলো। কৌতূহলবশত নীলাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আমরা আপনার বাসায় ঢোকামাত্র রেডিয়েশনের মাধ্যমে আমাদের অজ্ঞান করে দিয়েছেন অথচ এই বালকটিকে জেলে আটকে রাখার পরেও সে কেন আমাদের ঘায়েল করে পালিয়ে যায়নি?’
‘আসলে এদের এমনভাবেই কোডিং করা হয়েছে। শুধুমাত্র অন্যের বিপদে তারা রেডিয়েশনের ব্যবহার করতে পারবে। নিজের জন্য কখনোই করবে না।’
অভি ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে না পারলেও রাফি ঠিকই বুঝতে পারে। মনে মনে চিন্তা করে, নীলা আপুর এই আবিষ্কার সত্যিকার কোনো ভালো কাজে প্রয়োগ করলে কতই না ভালো হতো!
কয়েকদিন পরের কথা-
নীলাকে আদালতে নেওয়া হয়েছে। আদালত মনে করে নীলার মানসিক অবস্থা পুরোপুরি ঠিক নেই। তাকে রিহ্যাবে পাঠানো হয়েছে।
আর এগারোজন? ওরাও ভালো আছে। তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার।
কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর নির্বাচিত
সায়েন্স ফিকশন
আরও পড়ুন...