ওরা একজন

সাইন্স ফিকশন নুজহাত নওরিন জুন ২০২৪

এক.

৪০৫০ সালের পৃথিবী। উন্নতির ধারা অব্যাহত রেখে মানুষ জয় করেছে মঙ্গল। আবিষ্কার করেছে নতুন নতুন গ্রহ, উপগ্রহ। দেখা পেয়েছে সে সব ভিনগ্রহীদের- যাদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটা ছিল এক সময়ের কল্পনাতীত ব্যাপার। মানুষ এখন ছুটতেও পারে আলোর বেগে। তৈরি করেছে নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং মানুষরূপী রোবট। প্রযুক্তির এত সব উন্নয়ন কি মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে? না কি এই প্রযুক্তিই কাল হয়ে দাঁড়াবে মানব জাতির জন্য?

গম্ভীর মুখে হলরুমে ঢুকলেন বিজ্ঞানী আর.এম. হ্যারি। তাঁর পেছন পেছন ঢুকলো তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবট R.N.H.20105। ইন্টারন্যাশনাল অ্যারোনটিক্যাল এন্ড স্পেস রিসার্চ সেন্টারের অফিসে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। এতটাই নীরব সবকিছু; কারো নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে একজন বিজ্ঞানী গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন। এত নীরবতার ভেতরে এই ধরনের বিরক্তিকর আওয়াজ কেউ আশা করেননি। সবাই তাঁর দিকে এমন করে তাকালো যেন তিনি কোনো বড়ো ধরনের অন্যায় করে ফেলেছেন। বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন তিনি। তবে তাঁর অস্বস্তি বেশিক্ষণ থাকলো না। কারণ আবার সবাই চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি।

পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানীরা একত্রিত হয়েছেন। তাঁদের সকলের চোখেমুখেই চিন্তার ছাপ। ঘটনা বেশ গুরুতর। পৃথিবীর আকর্ষণ বল বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা কে কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। এমন চলতে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন অচল হয়ে পড়বে। চাঁদ পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়বে। পুরো পৃথিবীবাসী ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে খুব শীঘ্রই কোনো না কোনো ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বিজ্ঞানীদের প্রধান আর.এম. হ্যারির। বরং তিনি তাঁর নিজস্ব বিরক্তি প্রকাশ করতে ব্যস্ত। কপাল কুঁচকে চেয়ারে এসে বসলেন তিনি। দুটো কারণে আজ তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। প্রথমত তিনি আজ সকালে গবেষণাগারে বসে গবেষণা করছেন। এমন সময় তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবটটি ঠাস করে পড়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন না এমনটা হওয়ার কারণ কী। আজ কালকার রোবটদের শরীরে একটি বিশেষ ধরনের স্টেম সেল ইনপুট করে দেওয়া হয়। যাতে তাদের শরীরের কোনো অংশ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা নিজেরাই যেন তা তৎক্ষণাৎ ঠিক করে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হলে মানুষও অমরত্ব লাভ করতে পারতো। রোবটটির ক্ষেত্রে এমন কিছু যদি হয়েও থাকে তাহলে সে কয়েক মুহুর্তের ভেতর তা ঠিক করে ফেলতে পারবে। এতক্ষণ সময় তো লাগার কথা না। তাঁর এসব চিন্তা ভাবনার মধ্যেই রোবটটি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো আর হি-হি-হি করে হাসতে লাগলো। হ্যারি বেশ অবাক হলেন। তিনি বুঝতে পারছেন না তাঁর রোবটটির এমন করার কারণ কী।

- কেমন লাগলো স্যার আমার অভিনয়? মনে নেই আমাকে তৈরির সময় আপনি আমার ভেতর একটা অ্যাক্টিং স্কিল প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছিলেন। বলেই হি-হি-হি করে হাসতে লাগলো। তৎক্ষণাৎ তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ধমকে উঠলেন তিনি।

 - তোমাকে এটার অপব্যবহার করতে বলা হয়নি। ভুলে যেও না তুমি রোবট, মানুষ নও। মানুষ কোনোকিছুর অপব্যবহার পছন্দ করে। রোবট তা করে না।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো রোবটটি। তারপর বললো, কিন্তু আপানারা তো আমাদের মানুষের মতো করেই বানান। সাধারণ মানুষ দেখলে বুঝতেই পারে না আমরা মানুষ না কি রোবট। মানুষ যা যা করতে পারে তার সবই আমরা করতে পারি। বরং মানুষের চেয়ে আরো বেশি যোগ্যতা আছে আমাদের। আচ্ছা স্যার, মানুষ তো বিশ্বাসঘাতকতাও করে। আমি যদি কোনোদিন বিশ্বাসঘাতকতা করি আপনি কি অবাক হবেন?

চোখ রাঙিয়ে তাকালেন হ্যারি।

- তুমি রোবট, মানুষ নও। আর নিজেকে মানুষের চেয়ে বেশি যোগ্য মনে করো না। বলেই গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন তিনি। তিনি বুঝতে পারছেন না তাঁর সৃষ্ট রোবট এতটা শয়তান হচ্ছে কী করে। আসলেই কি তিনি বুঝতে পারছেন না। না কি বুঝতে চাইছেন না। যার কারণে তিনি খুবই বিরক্ত। 

দ্বিতীয়ত, তিনি ভিনগ্রহী প্রাণীদের উপস্থিতিতে বরাবরই বিরক্ত হন। তাদের এই উদ্ভট চেহারা দেখতে দেখতে তাঁর অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় প্রতিবারই এদের চেহারা দেখলে তাঁর বমি পায়। এদের কপালে দুটো ফুটো আছে। অনেকটা মানুষের নাকের মতো। মুখটা ত্রিভুজ আকৃতির। কান নেই। ইয়া বড়ো মুখ। হাসলে মুখ এক মাথা থেকে অন্য মাথায় চলে যায়। দাঁতগুলো বৃত্তাকার। চুল নেই। চোখ তিনটা বর্গাকৃতির। গায়ের রং রুপালি। যেখান থেকে মাথা শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই হাত গজিয়েছে। ঘাড় নেই। পা একটা, অথচ পায়ের পাতা দুটো। হাত-পায়ে আঙ্গুল নেই। সারা গায়ে মাছের মতো আঁশ। প্রথম দিন তো এদের দেখে অনেক কষ্টে বমি আটকে রেখেছিলেন। পরে বাড়িতে গিয়ে গড়গড় করে বমি করেছিলেন। এদের দেখতেও এক রকম। তিনি ভেবে পান না, এরা নিজেদেরকে আলাদা করে কীভাবে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা এরা যে-কোনো পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারে কোনো মাধ্যম ছাড়াই। এই যে এখন কথা বললে মানুষের ভাষাতেই বলবে। এই পরিবেশে বেঁচেও আছে কোনোকিছুর সাহায্য ছাড়াই। আরো একটা কারণে অবশ্য সে বিরক্ত। বিজ্ঞানীরা এদেরকে নিয়ে বেশি আদিখ্যেতা করে। কিছু হলেই সবার আগে এদেরকে জানাতে হবে। কেন? আমরা কি আমাদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারি না? তাঁর এসব চিন্তা ভাবনার ছেদ ঘটে বিজ্ঞানী এস.টি. টমিয়েলের কথায়। হ্যারির পরেই বিজ্ঞান সাম্রাজ্যে যার স্থান।

- স্যার, আপনি কি মোটেই এই বিষয়টি নিয়ে বিচলিত নন? হাত দিয়ে টেবিলের ওপর ভর দিলেন হ্যারি। দাড়িতে হাত রাখলেন।

- কী করতে বলছেন আমাকে?

- আপনি বুঝতে পারছেন এই সমস্যার কারণে পৃথিবীর ওপর চাঁদ আছড়ে পড়বে। পৃথিবী তাদের আরো বেশি আকর্ষণ করছে। যা দিনের পর দিন বাড়তে থাকলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন হুমকির মুখে পড়বে। চাঁদ আমাদের আরো কাছে চলে আসবে, যা এই মুহুর্তেই খুবই ভয়ানক কিছু সৃষ্টি করতে পারে। পৃথিবীর আকর্ষণ বল যদি এভাবে বাড়তে থাকে মানুষ তো তাহলে কোনোকিছুই করতে পারবে না। পুরো পৃথিবী অচল হয়ে পড়বে।

চোখ বন্ধ করে ফেললেন টমিয়েল। তিনি আর কিছু ভাবতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে গলার স্বর নিচে নামালেন তিনি।

- মানুষ এখনো এ বিষয়ে অবগত নয়। মানুষ যদি জানতে পারে তাহলে কী পরিমাণ আতঙ্ক তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে আপনি ভাবতে পারছেন?

কিছুক্ষন চুপ থেকে নিরবতা ভঙ্গ করলেন হ্যারি।

- এটা কি প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে না?

- হচ্ছে। উত্তর দিলেন বিজ্ঞানী সিলভিয়া গোমেজ।

- তাহলে আমরা কী করতে পারি? হয় সম্পূর্ণ মানব জাতিকে একটি বসবাস উপযোগী নতুন কোনো গ্রহে নিয়ে যেতে হবে। না হয় এই আকর্ষণ বল কমাতে হবে। প্রথমত পৃথিবী ব্যতীত মানুষের বসবাস উপযোগী অন্য কোনো গ্রহ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি এবং এ ধরনের গ্রহ আবিষ্কারের বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে। এই অল্প সময়ে এ ধরনের গ্রহ আবিষ্কার হওয়ার চিন্তা করাও অযৌক্তিক। আর দ্বিতীয়ত এটা যেহেতু প্রাকৃতিকভাবেই হচ্ছে, তাই আমরা প্রাকৃতিক কোনোকিছুকে বাধা দিতে পারি না।

- অবশ্যই পারি। বাধ সাধলেন এক ভিনগ্রহী। হ্যারি শান্ত চোখে ভিনগ্রহীটির দিকে তাকালেন।

- আপনারা চাইলে আমরা আপনাদের সাহায্য করতে পারি। 

 চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন হ্যারি। ভ্রু কুঁচকে আরো একবার পরখ করলেন ভিনগ্রহীকে।

- আপনার নামটা জানতে পারি? আপনারা দেখতে একরকম। তাই চেনা মুশকিল।

হাসলো সেই ভিনগ্রহী। এদের হাসিটাও অদ্ভুত। হাসলে একটা ঘোৎ ঘোৎ শব্দ হয়। হ্যারির আবারো ঘেন্না পেল। তিনি অন্যদিকে ফিরে তাকালেন।

- আমার নাম হুইসান মুইস কুসুতাম।

নাম শুনে উপস্থিত সকলের হাসি পেলেও এই মুহুর্তে হাসিটা গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কেউই হাসিটা প্রকাশ করলো না। হ্যারি আবারো ফিরে তাকালেন ভিনগ্রহীটির দিকে।

- কীভাবে সাহায্য করবেন? গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বললেন হ্যারি।

- সেটা আমরাই করবো।

- আমরা জানতে পারবো না?

সিলভিয়া গোমেজের কথায় বিরক্ত হলো কুসুতাম। এদের বিরক্তি প্রকাশের ধরন অন্যরকম। বিরক্ত হলে কপালের ফুটো দুটো কুঁচকে যায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উত্তর দিলো কুসুতাম।

- না।

- আমাদের সমস্যা আপনারা সমাধান করবেন অথচ আমরা তা জানতে পারবো না কেন? 

হ্যারির দিকে ঘুরে তাকালেন কুসুতাম।

- আমরা আমাদের টেকনোলজি দিয়ে আপনাদের সাহায্য করবো। যা সম্পর্কে আপনারা অজ্ঞাত। আর আমরা আমাদের টেকনোলজি কারো সঙ্গে শেয়ার করি না। আপনি তা জানেন। তবে আপনাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ থাকবে। আমরা নিয়মিত সিগন্যাল পাঠাবো। যদিও আপনারা আমাদের কাজের কিছুই বুঝতে পারবেন না। অবশ্য আপনারা না চাইলে আমরা আপনাদের সাহায্য করবো না।

- না-না-না, আপনারা আমাদের সাহায্য করুন। উত্তেজিত হয়ে বললেন টমিয়েল। হ্যারি অবাক চোখে তাকালেন। তাঁর পরামর্শ ছাড়া এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত টমিয়েল নিলেন কী করে। টমিয়েলও তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি অপরাধী চোখে তাকালেন হ্যারির দিকে।

কুসুতাম আবারও হাসলো। সাথে সেই উদ্ভট শব্দ।

- সম্মানিত হ্যারি। আপনার অভিমত কী? জিজ্ঞেস করলো কুসুতাম।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন হ্যারি।

- আমার মতামতের প্রয়োজন নেই। বলেই সমাবেশ থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে তাঁর রোবট অ্যাসিস্ট্যান্ট। কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করলো হলরুমে। নীরবতা ভাঙলো কুসুতাম।

- তাহলে আমরা আমাদের গ্রহে ফিরে যাই। যত দ্রুত সম্ভব আমরা আপনাদের সাথে যোগাযোগ করবো। এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না ভিনগ্রহীরা। কুসুতামও মিলে গেল তার দলের সঙ্গে। এখন আর দেখে বোঝার উপায় নেই এদের ভেতর কে কুসুতাম।

- আপনি কাজটা ঠিক করেননি। বিজ্ঞানী হ্যারির অনুমতি ছাড়া এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি।

টমিয়েলকে উদ্দেশ্য করে বললেন সিলভিয়া গোমেজ। তাঁর কথায় বাধ সাধলেন বিজ্ঞানী জাভের বারকি।

- রাখুন আপনার অনুমতি। আগে পৃথিবী বাঁচুক, তারপর সব। আমি ভেবে পাই না এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীন মানুষ বিজ্ঞানীদের প্রধান হয় কী করে? কোনোকিছুতেই তাঁর কোনো খেয়াল নেই। অসহ্য।

তাঁর কথায় কেউই কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। যাতে সে বেশ অপমানিত বোধ করলেন। ভেবেছিলেন এই রেশ ধরে আরো কিছুক্ষণ বিজ্ঞানী হ্যারির সমালোচনা করবে। কিন্তু তার সে আশায় গুড়ে বালি ঢেলে দিলেন টমিয়েল।

- আজ এখানেই মিটিং শেষ। বলেই চলে গেলেন তিনি।

নিজের ঘরের জানালার কাছে বসে আছেন হ্যারি। সেই মুহূর্তে ঘরে এলো তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবট। 

- স্যার খবর আছে।

কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলেন তিনি। এরপর ঘুরে তাকালেন রোবটটির দিকে।

- তুমি যে আগের চেয়ে অবাধ্য হয়ে গেছো সেটা কি তুমি বুঝতে পারছো?

- মানুষের মতো, তাই না স্যার?

- ইদানীং মানুষের সাথে নিজের তুলনা দিতে শিখেছো। রুমে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হয় ভুলে গেছো? মানুষেরও এই জ্ঞানটুকু আছে। 

মাথা নিচু করে ফেললো রোবটটি।

- স্যার জার্নালিস্টরা মিটিং করতে চায়।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন হ্যারি। সেদিনের পর ১৫ দিন চলে গেছে। এ বিষয়ে তিনি আর মাথা ঘামাননি।

- জেনে গেছে?

- জি।

- সোমবার সকালে আসতে বলো।

- জি আচ্ছা। 

 রোবটটি চলে গেল। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন হ্যারি। মনে মনে আওড়ালেন, আমি জানি তুমি এখন সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।


দুই.

সোমবার সকালে জার্নালিস্টরা সবাই এসে হাজির হয়েছে। ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হ্যারিও এলেন। তবে আধাঘণ্টা পরে। এতে জার্নালিস্টরা অবশ্য কিছুটা বিরক্ত। 

- কী প্রশ্ন আছে বলুন। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন হ্যারি।

- স্যার, আমরা সকলেই পৃথিবীর সমস্যা সম্পর্কে অবগত। পৃথিবীর এই বিপর্যয়ে আপনারা কী করছেন?

- কিছুই না।

- ঠিক বুঝতে পারলাম না স্যার। হ্যারির এই সহজ স্বীকারোক্তিতে অবাক হলো জার্নালিস্টরা।

- কিছুই না মানে কিছুই না। আমরা কিছুই করছি না।

- তাহলে কারা করছে?

- ভিনগ্রহীরা।

- বিস্তারিত জানাবেন প্লিজ?

- তারা তাদের প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের সাহায্য করছে। আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ রাখছি।

- তার মানে আপনারা আপনাদের টেকনোলজি দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারছেন না। স্যার, এটা কি আপনাদের অক্ষমতা নয়?

হাসলেন হ্যারি। এই মুহুর্তে তার হাসিটা বেমানান লাগলো সবার কাছে।

- আপনারা এই মুহুর্তেও মানুষকে কীভাবে প্যাঁচে ফেলা যায় সেই চেষ্টা করছেন। যাই হোক, অক্ষমতা ভাবলে অক্ষমতা, না ভাবলে অক্ষমতা নয়। আমি কখনোই প্রকৃতির বিরুদ্ধে করা কোনো কাজকে সাপোর্ট করি না। এখনো করছি না। কারণ প্রকৃতির বিরুদ্ধে করা কোনো কাজ ভালো ফল বয়ে আনে না। আজ হোক, কাল হোক পৃথিবী ধ্বংস হবেই। আমরা কেউ তা আটকাতে পারবো না। কিন্তু আমাদের সম্মানিত বিজ্ঞানীগণ প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে পৃথিবীকে বাঁচাতে ভিনগ্রহীদের সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আমার অনুমতি ছাড়াই। তাঁরাই এখন ভিনগ্রহীদের সাথে যোগাযোগ করছে। আপনারা তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। বলেই নিজের আসনে গিয়ে বসলেন তিনি। এরপর জার্নালিস্টদের সামনে এসে দাঁড়ালেন টমিয়েল। আসতে না আসতেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো তারা।

- আপনারা নাকি বিজ্ঞানীদের প্রধান আর.এম. হ্যারির অনুমতি ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু কেন?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিলেন বিজ্ঞানী টমিয়েল।

- আমার মনে হয়েছে ভিনগ্রহীদের কথায় রাজি হলে পৃথিবীকে বাঁচানো সম্ভব। যা আমদের দ্বারা সম্ভব নয়।

- তার মানে এটা কি আপনার একার সিদ্ধান্ত? অন্যরা এতে সহমত প্রকাশ করেননি?

- দ্বিমতও প্রকাশ করেননি।

- তাঁরা পরোক্ষভাবে আপনাকে সাপোর্ট করছে?

টমিয়েলের এবার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সামান্য কথাকে এরা অতিরিক্ত প্যাঁচাচ্ছে। তিনি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলেন না।

- অন্য প্রশ্ন করুন।

জার্নালিস্টরাও তাই করলো।  

- আপনারা কীভাবে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন? তারা কোন গ্রহ থেকে আপনাদের সাথে যোগাযোগ করছে?

- আমরা প্রতি মুহূর্তে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তারা সোলজার গ্রহের বাসিন্দা। ওখান থেকেই তারা তাদের স্যাটেলাইট ‘হাইকান নাসুমা’ থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখছে।

- তাতে কি আপনারা এই সমস্যার কোনো উন্নতি দেখতে পাচ্ছেন?

মুখটা চুপসে গেল টমিয়েলের।

- না।

- তাহলে কি এর শুধুমাত্র অবনতিই আপনারা দেখছেন? 

- এই মুহুর্তে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

- পৃথিবীর এই বিপর্যয় কি আপনাদেরই কোনো কাজের ফলাফল?

- জি না। স্যার হ্যারিও এই বিষয় নিয়ে বলেছেন, এটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে। বিজ্ঞান কিংবা সাধারণ মানুষ এর জন্য দায়ী নয়। আজ এই পর্যন্তই। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনোকিছুতে আতঙ্কিত হবেন না। নিশ্চয়ই আমরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবো।  

জার্নালিস্টরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়লো। এক্ষুনি গরমাগরম খবর ছড়াতে হবে। টমিয়েল হ্যারির পাশে গিয়ে বসলেন। 

- টমিয়েল।

- জি?

- ওরা আমাদের টেকনোলজি সম্পর্কে অবগত, তাই না?

- হুম।

- আমরা জানি ওদেরটা সম্পর্কে? 

- না।

- কেন?

- ওরা বলেনি।

- আমরা বলেছি?

- না।

- তাহলে ওরা জানলো কী করে?

টমিয়েল ফিরে তাকালেন হ্যারির দিকে। দেখলেন তিনি চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তিনি সত্যিই জানেন না ভিনগ্রহীরা কীভাবে মানুষের টেকনোলজি সম্পর্কে জানলো।

- ভিনগ্রহীরা এসব জানা মানে মানুষের দুর্বলতা সম্পর্কে জানা। আমাদের সীমাবদ্ধতা জানা। তারমানে ওরা আমাদের দুর্বলতা কিংবা সীমাবদ্ধতা দুটোই জেনে গেছে। তাই তো টমিয়েল?

- জানি না স্যার। মাথা চেপে ধরে বসে রইলেন টমিয়েল।

- পৃথিবীকে বাঁচানো আর সম্ভব নয় টমিয়েল।

উঠে গেলেন হ্যারি। তাঁর যাওয়ার পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন টমিয়েল। 


তিন.

এক মাস পর। বিছানায় শুয়ে আছেন হ্যারি। তিনি উঠতে পারছেন না। বুঝতে পারলেন পৃথিবীর আকর্ষণ বল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যাকে বলে চরমমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়া। ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো তাঁর ফোনটি। অনেক কষ্টে ফোনটা উঠালেন তিনি।

- হ্যালো।

- স্যার, পৃথিবীর আকর্ষণ বল প্রতি মুহূর্তে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাঁদ আছড়ে পড়ছে পৃথিবীতে। ভিনগ্রহীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তারা কোনো সিগন্যাল পাঠাচ্ছে না। 

টমিয়েলের বিচলিত কণ্ঠেও টনক নড়লো না হ্যারির। তিনি ফোন কেটে দিলেন। না কাটেননি। পৃথিবীর সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কে করেছে? কারা করেছে? 

এরপর রুমে ঢুকলো তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবট। আশ্চর্যের বিষয় তার ওপর কোনো আকর্ষণ বল কাজ করছে না। তিনি অবশ্য বুঝতে পারছেন কেন তাঁর তৈরি রোবটের ওপর আকর্ষণ বল কাজ করছে না। কারণ এখন সে প্রায় অন্য গ্রহের প্রাণী। যে সকল পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে। 

- আমাকে যেতে হবে স্যার।

- কোথায়?

- তাদের কাছে।

- কাদের কাছে?

- যাদের হয়ে এতদিন কাজ করেছি।

- তুমি এতদিন তাদের হয়ে কাজ করেছো? হ্যারির মনে হলো তিনি জানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছেন। 

- জি। আমরা সবাই করেছি।

- সবাই?

- জি। আমাদের পুরো রোবট জাতিই তাদের সাহায্য করেছে।

হ্যারি চোখ বন্ধ করে রইলেন।

- আমি আসি স্যার? ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে। পৃথিবী কিছুক্ষণের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে।

- এসো।

রোবটটি চলে গেল। তিনি শুনতে পেলেন তাকে কেউ ডাকছে। তাঁর কাছে ডাকটা আস্তে আস্তে স্পষ্ট হলো।

- সম্মানিত বিজ্ঞানী আর.এম. হ্যারি। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?

- জি।

- আপনার কি ভয় হচ্ছে? 

- না।

- অপরাধবোধ হচ্ছে?

- হ্যাঁ

- আফসোস হচ্ছে?

- হ্যাঁ।

- কেন?

- জানি না।

- আপনি কি জানতেন এই ধ্বংসের পেছনে আমারই দায়ী? এটা প্রাকৃতিকভাবে হচ্ছে না?

- জি।

- তাহলে আপনারা প্রতিহত করেননি কেন? 

- আমরা আপনাদের টেকনোলজি সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। আপনারা আমাদের কীভাবে ধ্বংস করতে পারেন তার বিন্দুমাত্র ধারণা আমাদের ছিল না। আমার কিছু প্রশ্ন আছে। করবো? 

- জি।

- পৃথিবীর আকর্ষণ বল আপনারাই বাড়িয়েছেন?

- জি।

- তাহলে আমাদের কেন সাহায্য করতে চাইলেন? 

- নিঃসন্দেহে আপনারা বুদ্ধিমান প্রাণী। নিজেদের রক্ষা করতে কোনো না কোনো পদক্ষেপ আপনারা ঠিকই নিতেন। আপনারা যাতে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে না পারেন তাই আমরা আপনাদের সাথে প্রতারণা করেছি।

- ও আচ্ছা। 

- আপনি কি জানেন, আপনাদের সৃষ্টিই আপনাদের ধ্বংসের কারণ?

- জি জানি। 

- আমরা আপনাদের কেন ধ্বংস করতে পারছি তা জানেন?

- কেন?

- কারণ আপনারা ঐক্যবদ্ধ নন। আপনাদের মতামত ভিন্ন। আপনাদের সৃষ্টি ভিন্ন। আপনারা আলাদা মনোভাব পোষণ করেন। আপনারা নিজেরাই নিজেদের ছোটো করেন। আপনারা আপনাদের সৃষ্টিকেও আপনাদের মতোই স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক, আত্মকেন্দ্রিক তৈরি করেছেন। যা আপনাদের জন্যই বিপদ ডেকে এনেছে। আমরা আপনাদের ধ্বংস করতে পারছি। সম্মানিত হ্যারি, আপনি কি খুশি?

- জি।

- কেন?

- কারণ আপনারা আমাদের সৃষ্টিকে ধ্বংস করছেন না।

- ভুল ভাবছেন। 

- ভুল ভাবছি?

- জি। আমরা আপনাদের সৃষ্টিকে ধ্বংস করে নিজেদের মতো করে তৈরি করবো। ওরা সংখ্যায় হবে অনেক, কিন্তু হবে একজন। আমাদের মতো। 

- তোমাদের মতো?

- জি। আমরা সংখ্যায় অনেক। কিন্তু আমরা এক। আমাদের মনোভাব এক। কাজ এক। পদ্ধতি এক। আমরা অনেকে মিলে একজন। তাই তো সৃষ্টির সেরা জীবকে ধ্বংস করছি। যতদিন আমরা এক থাকবো, ততদিন আমাদের সৃষ্টিকুলের কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। আপনাদের সৃষ্টি আমাদের মতো তৈরি করে আমরা সংখ্যা বৃদ্ধি করবো। কিন্তু হবো একজন।

- আমাদের সৃষ্টি বাঁচিয়ে রাখলে কি তোমাদের খুব ক্ষতি হবে?

- জি। তাহলে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবো না। আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতির ভেতর ঐক্যতার অভাব হবে। যা আপনাদের মতো আমাদেরও ধ্বংসের কারণ হবে। 

- আচ্ছা।

- সম্মানিত হ্যারি, আপনি চোখ খুলুন এবং নিজেদের সৃষ্টি দ্বারা নিজেদের ধ্বংস দেখুন।

বিজ্ঞানী হ্যারি চোখ খুললেন। বুঝতে পারলেন পুরো পৃথিবী থরথরিয়ে কাঁপছে। সবই পৃথিবীর মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণের ফল। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। দেখলেন পৃথিবীর দিকে চাঁদ এগিয়ে আসছে। দেখা যাচ্ছে তার রুপালি আভা। আজ তার কলঙ্ক পৃথিবীর মাটিতে এসে পড়বে। ধ্বংস করে দেবে তারই গ্রহকে যাকে সে এতদিন কেন্দ্র করে ঘুরেছে। হ্যারি চোখ বন্ধ করে ফেললেন। চোখ থেকে দুই ফোঁটা শেষ অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।


কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর চতুর্থ স্থান অধিকারী সায়েন্স ফিকশন।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ