এক বিস্ময় বালকের কথা

খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ জানুয়ারি ২০২৪

শিশু বয়স শেখার বয়স। এই বয়সে শিক্ষা অর্জন করতে শুরু করে মানুষ। আর সেই শিক্ষাটা সারাজীবন কাজে লাগায়; কিন্তু মাঝে মাঝে কেউ এই বয়সেই এমন কিছু করে যা পুরো বিশ^কে চমকে দেয়। যে বয়সে হয়তো কোনোকিছু শিখতে শুরু করার কথা সেই বয়সেই কেউ বিশ^জয় করলে চমক তো লাগারই কথা।

এবার জানাবো তেমনই এক বিস্ময় বালকের কথা। নাম তার ইয়াইজ কান এরদায়ুমুস। বয়স মাত্র ১৩ বছর। বাড়ি তার তুরস্কে। (নামটা যেহেতু তুর্কি ভাষার, তাই উচ্চারণে গোলমাল হতে পারে। আশা করি তোমরা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে)

তো, কী করেছে এই ইয়াইজ কান! কেন তাকে বিস্ময় বালক বলা হচ্ছে? চলো খুলে বলা যাক। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সে দাবা খেলায় বিশ^জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। শুধু কি খ্যাতি, ইয়াইজ কান চলতি বছর দাবার সবচেয়ে বড়ো সম্মান গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করেছে। অর্থাৎ বর্তমানে সে বিশে^র সবচেয়ে কমবয়সি গ্র্যান্ডমাস্টার দাবাড়–।

শৈশবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকের কাছে দাবার বোর্ডের সাথে পরিচয় এই কিশোরের। এরপর পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের তত্ত্বাবধানেই চলেছে তার অনুশীলন। অন্য শিশুদের মতো শখের বসেই তার দাবা খেলার শুরু। এমনি করতে করতে এক সময় দাবাটাকে ভালোবেসে ফেলে সে এবং শিশু বয়স থেকে একের পর এক বিস্ময় উপহার দিতে থাকে।

মাত্র ৮ বছর বয়সে ২০১৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে তাক লাগিয়ে দেয় ইয়াইজ কান এরদায়ুমুস। সেই থেকে বিশ^ দাবা অঙ্গনে তার পরিচিতি শুরু হয়। পরের বছর জুনিয়র গ্রুপে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয় সে। একই বছর অনূর্ধ্ব-৮ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে তাক লাগিয়ে দেয় পুরো ইউরোপকে। হয়ে ওঠে ইউরোপ সেরা জুনিয়র দাবারু। ওই টুর্নামেন্টের আটটি ম্যাচের সবগুলোতে জিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় সে।

দাবায় তার এই প্রতিভা দেখে তুর্কি সরকার তার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়। তুরস্কের দাবা ফেডারেশন তার জন্য নামকরা কোচ নিয়োগ দেয় এবং তাকে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে মাত্র ১২ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব অর্জন করে সে। এই সময়ের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আরো কিছু শিরোপা জেতে ছেলেটি। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে তার রেটিং পয়েন্ট।

চলতি বছর এপ্রিল মাসে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় ইয়াইজ কান একই সাথে গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে খেতাব অর্জন করে এবং ২৬০০ রেটিং পয়েন্ট অতিক্রম করে। গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জনের দিন তার বয়স ছিল ১২ বছর ৯ মাস ২৯ দিন। এখানে বলে রাখা ভালো, ১২ বছর বয়সে এর আগে মাত্র তিনজন দাবাড়– গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করেছে। তবে কম বয়সি হিসেবে ২৬০০ পয়েন্ট অর্জনের রেকর্ডটি এককভাব তার দখলে। আবার বর্তমানে যেসব গ্র্যান্ডমাস্টার রয়েছেন, তাদের মধ্যে বয়সে ইয়াইজ সবচেয়ে ছোট।

দাবার নিয়ম অনুযায়ী গ্রান্ডমাস্টার খেতাব অর্জনের জন্য ২৫০০ রেটিং পয়েন্ট অর্জন করতে হয়। ২৭০০ রেটিং পয়েন্ট অর্জন করলে পাওয়া যায় সুপার গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব। সাধারণত কোনো খেলোয়াড় ২৬০০ রেটিং পয়েন্ট অর্জন করলে অনায়াসে বিশ্বের সেরা ১০০ দাবাড়–র তালিকায় স্থান করে নিতে পারেন। ইয়াইজ কান এরদায়ুমুস এই বয়সেই ঢুকে গেছেন বিশ্বের তুখোড় দাবাড়ুদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ইতোমধ্যেই যা দেখিয়েছে, তাতে সে যে ভবিষ্যতে আরো অনেক দূর যাবে সে ব্যাপারে কারো সন্দেহ নেই।

ইতোমধ্যেই তুরস্কের একটি ই-কমার্স কোম্পানি তাকে স্পন্সর করতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকজন গ্র্যান্ডমাস্টারের অধীনে কোচিং করেছে সে। এর মধ্যে শাখরিয়ার মেমেদিয়ারোভ নামের একজন কোচ বলেছেন, আমি আশা করছি ইয়াইজ কান ২৮০০ রেটিং পয়েন্টে পৌঁছতে পারবে এবং ভবিষ্যতে সিনিয়র পর্যায়ে বিশ^ চ্যাম্পিয়ন হবে।

তুরস্কের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় বুশরা প্রদেশে জন্ম এই বিস্ময় বালকের। ছোটবেলায় দাবার বোর্ডের সাথে যে সখ্যতা তার হয়েছে সেটাই আজ তাকে বিশ^ দরবারে বিখ্যাত করেছে। পাশাপাশি পড়াশোনাতেও দারুণ করছে ইয়াইজ কান। তার স্কুলের ফলাফলের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকছে তার নাম। 

গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করার পর যেদিন স্কুলে ফিরেছে সেদিন স্কুলের কয়েকশো শিক্ষার্থী তাকে করতালি আর স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে। এই ঘটনার একটি ভিডিও টুইটারে প্রকাশ করেছে তার স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের শিক্ষকরাও ইয়াইজকে নিয়ে গর্বিত। তারাও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ