ঈদের আগে

তোমাদের গল্প এম. এ জিন্নাহ মার্চ ২০২৫

আমরা সাত বোন পাঁচ ভাই। অবাক হচ্ছেন? না অবাক হবার কিছু নেই। কেউ যদি আমাদের কোনো ভাই-বোনকে জিজ্ঞেস করেছে- তোমরা কয় ভাই-বোন? সবারই জবাব একটা।

আমাদের বাবা-চাচা মিলে চার জন। দুই ফুপু আছেন। ফুপুদের বিয়ে হয়েছে দূরে। ফুপাতো ভাই বোনদের এ হিসাবে আমরা ধরি না। তবে ফুপুদের ছেলেমেয়েদের সাথেও আমাদের সেই ভাব। দাদা-দাদি এখনো জীবিত। যৌথ পরিবার আমাদের।

বড়ো বড়ো ডেকচিতে বাড়িতে রান্নাবান্না হয়। গিন্নি হচ্ছেন আমাদের বড়ো মা। খাবার নিয়ে যত রকমের ঘিনঘিন পিনপিন সব বড়ো মায়ের কাছে। আম্মু, মেঝো মা ও অন্যরা থাকেন সংসারের ভিন্ন কাজে।

হঠাৎ স্ট্রোক করে বড়ো চাচা মারা গেলেন। সেদিন বুঝতে পারলাম, দাদা থাকলেও নেপথ্যে আমাদের সংসারের আসল লোকটা ছিলেন বড়ো চাচা। একই বছরে সবাইকে হতবাক করে দুই দিনের ব্যবধানে দাদি ও দাদা সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন।

দাদা-দাদি মারা যাবার পরের দিন থেকেই আমরা টের পেতে শুরু করলাম, আমরা এখন আর সাত বোন পাঁচ ভাই না। জানতে শুরু করলাম জমিজমা কী। দু-তিনজন মিলে আলাদা রান্না করে আলাদা খেতে হয়। বাবা-মা আলাদা। ভাই-বোন সবাই আলাদা আলাদা। এসব দেখে আমরা প্রতিটি ভাই-বোনই অবাক হতে থাকলাম।

বলা যায় আমাদের যৌথ পরিবারের ওপর দিয়ে এক বছরের মধ্যে মহাপ্লাবন বয়ে গেল। আমাদের বাবা-চাচাদের তিনজনের আলাদা বাড়ি হলো। ভাগ করতে গিয়ে দাদার বিশাল সম্পত্তি হয়ে গেল খণ্ড খণ্ড। তাতে শুধু ছোট্ট একটা বাড়িই করা যায়। চাষবাসের জন্য কিছু আর থাকে না।

সেই বাড়ি হলো না শুধু বড়ো মায়ের। কারণ দাদার নিকট থেকে বড়ো চাচা বাদে বাকি তিন চাচা গোপনে সব জমি নিজেদের নামে লিখে নিয়েছেন। গোপনে কাজটি হলেও পরে আর গোপন থাকেনি। ফুপুদেরও কিছু দেওয়া হয়নি। দাদা-দাদি তখন অথর্বের মতো ছিলেন। আত্মীয়-স্বজন তখন এই জঘন্য অপরাধের জন্য বাবাসহ অভিযুক্ত তিন চাচাকে গালমন্দ করে দুই ফুপু ও বড়ো চাচাকে জমি ফেরত দিতে চাপ দিয়েছিল। কিন্তু বড়ো চাচাকে কোনোদিন এ বিষয়ে কথা বলতে শুনিনি। রান্না ঘরের বাইরে আরো একটা জগৎ আছে- সেটা সম্ভবত বড়ো মা জানতেনই না।

বড়ো চাচার দুই মেয়ে রিমু আর সিমু। রিমু আপু ছাড়া কোনোদিন ঘুমাইনি। বড়ো মা ছাড়া কোনোদিন খেয়েছি বলে মনে পড়ে না। অথচ এখন আমরা সবাই আলাদা।

শুধু বড়ো মা, রিমু-সিমু আপু পুরোনো বাড়িতে থাকে। জমিজমা ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এখন পুরোনো বাড়ি, ঘর-দরজা ভেঙে জমিজমা ঠিক করা হবে।

আমি তখনও অতশত বুঝি না। কয়েক দিন রিমু আপুর সাথে দেখা হয় না। হঠাৎ পুরান বাড়িতে গেছি। রিমু আপুকে দেখে আমার চমকে ওঠার মতো হলো। রিমু আপু আগের বছর এইচএসসি পাস করেছে। আজ রিমু আপুকে দেখে আমি ভয় পেয়ে গেছি। চোখের নিচ দিয়ে মনে হয় কালি লেপ্টে আছে। শুকিয়ে রিমু আপু কাঠ হয়ে গেছে। 

রিমু আপুরা ওদের মামা বাড়িতে চলে যাবে দু-এক বেলার মধ্যে। কতগুলো ব্যাগ কাপড়-চোপড় বাঁধাছাঁদা। সিমু আমার অনেক ছোট। কিন্তু সে চটপট করে কথা বলে। কোত্থেকে এসে বলা শুরু করলো, ‘হিমু আপু জানো? আমাদের এই বাড়িতেও জায়গা নাই; আবার মামা বাড়িতেও জায়গা নাই।’

‘কেন মামা বাড়িতে জায়গা নেই কেন?’

‘আমাদের মামারা যে খুব গরিব তাই। জানো, আমরা আব্বুর সাথে দেখা করতে যাব।’

‘তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ। আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলতে যাবে। আমিও আব্বুর সাথে কথা বলবো। রিমু আপু শুধু বাবাকে বলবে, ‘তুমি এত ভালো ছিলে কেন?’ আমি কী বলবো জানো?’

‘কী?’

‘বলবো, ‘আব্বু, তোমার কাছে কি আমাদের তিনজনের থাকার জয়গা হবে?’’

রিমু আপু সিমুকে একটা ধমক দিলো। আমাকে কাছে নিয়ে তার বুকের মধ্যে চেপে ধরলো। কিছুক্ষণ পর দেখি রিমু আপুর চোখের গরম পানি আমার কপাল বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। রিমু আপু একবার শুধু বললো, ‘সেজো আব্বুর সাথে  আমাদের দেখতে যাস।’

আমাদের একসাথে বড়ো হওয়া। যৌথ পরিবারের বিশাল বিশাল কর্মযজ্ঞের ভেতর আমাদের বিচরণ ছিল। পাওয়া না পাওয়া আমাদের খুব একটা স্পর্শ করেনি কোনোদিন। দাদা-দাদি মারা যাবার পর হঠাৎ আমরা এ কী ঝামেলার মধ্যে পড়লাম! আমার বাবাসহ তিন চাচা বলতে গেলে কেউ কারো সাথে কথাও বলছে না। 

বড়ো চাচার নামে জমি নেই, এখন দিয়ে দিলে সমস্যা কী? দাদার জমি তো! এ তো অন্য কারো কেনা জমি না। চার ভাই সমান ভাগ করে নিলেই তো হয়। ফুপুদেরটাও ঠিক করে দিক। আমাদের হুজুর স্যার বলেছেন, ‘ভাই-বোনের জমি থেকে কাউকে বঞ্চিত করা পাপ।’ আমার এ কথায় বাবা বললো, ‘তুমি এসবের কিছু বুঝবে না।’

আমি অবাক হলাম। আমার বাবাকে কোনোদিন সংসারে কোনো কাজ করতে দেখিনি। দাদার রেখে যাওয়া জমি ইতোমধ্যে এক প্লট বিক্রি করেছে। বাবা নাকি ব্যবসা করবে।

পুরোনো ঘর-বাড়ি ভাঙা হবে। কিন্তু রিমু আপুদের জন্য ভাঙা যাচ্ছে না। রিমু আপুর দু’জন মামা ঢাকায় থাকে। গ্রামে তাদের জমি নেই বললেই চলে। যেটুকুন ভিটে আছে সেখানে নামে মাত্র একটা ঘর আছে। তাতে দীর্ঘদিন ধরে কেউ বাস করে না। ঢাকায় দুই মামাই পোশাক কারখানায় কাজ করে। সেখানে রিমু আপুদের স্থায়ীভাবে থাকার বিষয়টা বেশ জটিল। 

এর মধ্যে রোজা এসে গেল। বড়ো মা কারো সাথে তেমন কিছু বলেন না। একদিন তিন চাচার প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের প্রতিবেশী মানিক চাচা বড়ো মাকে জানালো, আপনাদের পরিবারের সবার সিদ্ধান্ত- ঈদ পর্যন্ত সময়। এর মধ্যে বাড়ি খালি করে দিতে হবে। 

বড়ো মা শুনলেন শুধু। কিছু বললেন না। দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো। আটাশ রোজা শেষ। আমাদের সবার ঈদের কেনাকাটা ভালোই হলো। শুধু বড়ো মা, রিমু আপু, সিমু বাড়ি থেকে বের হয় না। এ নিয়ে আম্মু আব্বুকে একদিন বললো, ‘রিমু সিমুর বাবা নেই। আমাদের সবার জামা কাপড় কিনলে- ওদের দু’জনের দুইটা জামা কিনে দিলে হতো না?’ এ নিয়ে আম্মুর সাথে আব্বুর কিছুটা ঝগড়ার মতো হলো। আম্মু বললো, ‘টাকা পয়সা একবারেই নেই? মুখ বন্ধ রাখলে বুঝবো কীভাবে?’

শেষে আব্বু বললো, ‘আচ্ছা সময় তো আছে। আগামীকাল দেখা যাবে।’

আমি মনে মনে বেজায় খুশি। আম্মুকে ওদের জামার জন্য আমিই বলেছিলাম। সেই আনন্দে সূর্য ওঠার আগেই পুরান বাড়িতে দৌড় দিলাম। আব্বু যে ওদের ঈদের জামা কিনে দিতে রাজি হয়েছে! সেই খবরটা সবার আগে আমি দেবো না!

পুরান বাড়ির গেট, দরজা-জানালা সব খোলা। কোথাও কেউ নেই। মুহূর্তে পুরান বাড়ি মানুষের কোলাহলে পরিপূর্ণ হলো। কেউ কিছুই জানে না ওরা কোথায় গেল! সবার আসমান সমান জানার কৌতূহল, এত্ত সকালে ওরা কোথায় গেল? 

অনেক পরে প্রতিবেশী মানিক চাচা এলেন। তিনি খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘কালই তো ঈদ, ঈদের আগেই তাগো বাড়ি ছাড়ার কথা না!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ