আদিলের মা
তোমাদের গল্প নাসির উদ্দিন অক্টোবর ২০২৪
মাদরাসার শেষ ক্লাস। কারোরই ক্লাসে মন বসছে না। সবাই অধীর আগ্রহে বসে থাকে কখন যে ছুটির ঘণ্টা বাজবে। কিছুক্ষণ পর ঢংঢং ঘণ্টা বাজে। ছুটি হয়। সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে চলে যায় গেইটে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ওদের মায়েরা। ওরা ছুটে গিয়ে মায়ের কোমর পেঁচিয়ে ধরে। মায়েরাও ওদের আদর করেন। নিজের হাতে ওদের আইসক্রিম খাইয়ে দেন। তারপর ওদের নিয়ে চলে যান বাসায়।
আদিল পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অন্যদের মতো সে দৌড়ায় না, খুব আস্তে করে হাঁটে। পা চলে না তার।
আদিলের মা নেই। সে জানে তার জন্য গেইটে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না। তাই সবাই চলে যাওয়ার পর সে একা একা মাদরাসার গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার মন খারাপ থাকে।
আদিলের মা থাকতে প্রতিদিন তাকে মাদরাসায় পৌঁছে দিতেন। মাদরাসা ছুটি হলে তাকে আবার নিয়ে আসতেন বাসায়। ছুটি হওয়ার আগেই মা তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন মাদরাসার গেইটে। সেও এক দৌড়ে মায়ের কোলে যেত। মা তাকে দেখে প্রায়ই বলতেন, খুব খিদে পেয়েছে বুঝি, মুখটা এত শুকনা লাগছে কেন বাবা? এ কথা বলেই মা কোনো না কোনো খাবার দিতেন তার মুখে। সে মজা করে খেতো। তারপর রিকশায় মায়ের সাথে চলে যেত বাসায়। রিকশা থেকে যেন না পড়ে যায় সেজন্য তার মা তার সামনে হাত দিয়ে ধরে রাখতেন। রিকশাটা ধাক্কা খেলে মা তাকে খাবলে ধরতেন আর চোখ বড়ো করে বলতেন, এখনই তো পড়ে যেতি। শক্ত করে বসে থাকতে পারিস না। মা তাকে খুব সাবধানে নিয়ে আসতেন বাসায়। আদিল মাদরাসায় যাওয়া ও আসার সময় মায়ের সাথে অনেক গল্প করতো। হাসি তামাশা করতো। মা তার গল্প শুনতেন আর বলতেন মুখের খাবারটা আগে খেয়ে নে তো, এত ফটফট করিস না। সে তবুও কথা বলতো মায়ের সাথে। সে মায়ের সাথে অনেক দুষ্টুমিও করতো। মা কখনো রাগ করতেন না। মা তার মাথার চুল গুছিয়ে দিতেন। আদর করে গাল টিপে দিতেন। তার কপালে চুমু খেতেন। মা ছিলেন তার বন্ধুর মতো।
এখন প্রতিদিন ড্রাইভার এসে তাকে গাড়িতে করে নিয়ে যায় মাদরাসায়। গাড়িতে বসে সবাই আনন্দ করে। আদিল কোনো কথা বলে না। একদম চুপচাপ বসে থাকে। মন খারাপ থাকে তার।
বাসায় মা নেই। তাই মাদরাসা থেকে ঐ বাসাটায় ফিরতে তার একদম ভালো লাগে না। বাসায় ফেরার সময় মনে মনে বলে, গাড়িটা যদি নষ্ট হয়ে যেত। না, গাড়িটা নষ্ট হয় না। আবার বলে, গাড়িটা যদি কোথাও হারিয়ে যেত। না, গাড়ি হারায় না। ঠিক চলে আসে বাসার গেইটে। সে তখন সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় ওঠে। কলিং বেলটা টিপ দেওয়ার আগে মনে মনে বলে, বেলটা টিপলেই যদি মা এসে দরজাটা খুলতেন। কিন্তু দরজাটা খোলে তাদের ঘরের কাজের বুয়া সুলতানা।
একদিন সুলতানা দরজা খুলে কেমন জানি একটু মুচকি হাসি দিয়েছিল। তখন তার মনটা ধক করে উঠলো। তার মনে হলো কোনো রহস্য আছে। তাকে সারপ্রাইজ দিতে চায় বোধ হয়। সে এক দৌড়ে বাথরুম, কিচেনরুম ও বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখল মা এসে কোথাও লুকিয়ে আছেন কি না। নেই। তারপর সে দরজার চিপায়, খাটের নিচে, আলনার পেছনে মাকে খোঁজে। না কোথাও মা নেই। তারপর কাঁধের ব্যাগটা রেখে চুপ করে বসে থাকে। কষ্টে তার বুকটা ভেঙে যেতে চায়।
প্রায় দু’বছর হলো সে তার মাকে হারিয়েছে। এরপর সে আর মাকে মা বলে ডাকতে পারেনি। তার খুব ইচ্ছে করে মা বলে ডাকতে। তাই সে যখন একা থাকে তখন মাকে ডাকে।
সে মাকে চিঠি লেখে। ‘মা তুমি আসো না কেন? তুমি আমাকে ছাড়া কোথায় থাকো মা? কেমন করে থাকো, তোমাকে কতদিন হয় দেখি না। তোমাকে আমি আর জ্বালাতন করবো না। ঠিক তোমার কথামতো চলবো। তোমার জন্য খুব কষ্ট হয় আমার। তুমি চলে এসো মা।’ তবুও আদিলের মা আসেন না।
সে পরদিন মনে করে মা বোধ হয় তার চিঠির জবাব দিয়েছেন। কম্পিউটারটা অন করে খুঁজে। কিন্তু না কোনো জবাব আসেনি। তখন সে নিজেই চিঠির জবাব লেখে। চিঠিটা বারবার পড়ে। মনে হয় মা চিঠির জবাব দিয়েছেন। এভাবে সে প্রতিদিন মায়ের কাছে চিঠি লেখে, চিঠির জবাব লেখে আর পড়ে।
মা থাকতে তার বড়ো ভাই আরিফ তাকে খুব জ্বালাতন করতো। দুষ্টুমি করতো, এটা সেটা নিয়ে রোজ ঝগড়া করতো। মারতো। সেও খামছি দিতো ও থুতু দিত ভাইকে। এখন ভাই তাকে আর মারে না। আদর করে। মাদরাসা থেকে এলেই তাকে চকোলেট দেয় আর বলে, মায়ের জন্য চিন্তা করিস না। দেখছিস না, আমি তোকে আর মারি না, আমি আদর করি।
একদিন আদিলের ভাই তার জন্য একটি বেড়াল ছানা এনে দিয়ে বলে, এই নে তোর সঙ্গী। আদিল বেড়ালছানা পেয়ে তো মহাখুশি। নাম রেখেছে টুনি। টুনি তার ভালো সঙ্গী এবং মিষ্টি বন্ধু।
গত ঈদে আদিল দাদু বাড়ি যাওয়ার সময় টুনিকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। এজন্য গাড়িতে, বাড়িতে ও পথে কত লোকের কত কথা যে শুনতে হয়েছে তাকে। কেউ বলেছে ইশ্, শহর থেকে কোলে করে বেড়াল নিয়ে এসেছো, আরে বেটা খামচি দেবে তো। কেউ বলেছে বেড়ালকে এত আদর করতে নেই, এতে ডিপথেরিয়া রোগ হয়। সে কারো কথাই শোনেনি, ভয়ও পায়নি। সে টুনিকে অনেক আদর করে, ভালোবাসে। কারণ টুনির সাথে আদিলের একটা মিল আছে। আদিলের মতো টুনিরও মা নেই।
আরও পড়ুন...