অলীক স্বপ্ন

তোমাদের গল্প মাহমুদ হাসান ফাহিম অক্টোবর ২০২৪

আম বাগানটা কেমন যেন নীরব হয়ে আছে। পাখিদের কিচিরমিচির রব নেই। সন্ধ্যা নামার আগেই কি দলবেঁধে বিদায় নিয়েছে ওরা? এমন নিরিবিলি পরিবেশ আজই প্রথম। প্রতিদিন বিকেলে ডায়াবেটিসের রোগীরা হাঁটতে আসে। বাগানের এক পাশে বড়ো বিল। অনেকে মুক্ত বাতাস খেতে আসে। হাঁটে আর গল্পগুজব করে বিকেল পার করে।

শাওন আর নাহিদ প্রতিদিন বিকেলে আসে এখানে। বাগানের চারপাশটায় একবার চক্কর দিয়ে বাসায় ফিরে যায়। আজ একাই এসেছে শাওন। আজকের পরিবেশটা তেমন ভালো লাগছে না ওর কাছে। সবকিছু কেমন নীরব হয়ে আছে। কোনোকিছু না ভেবে হাঁটতে থাকে ও। হাঁটতে হাঁটতে অনেক পথ এসেছে। দূরে দেখা যায় হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে কেউ আসছে। খুব দ্রুত আসছে। শাওন প্রথমে কিছুটা ভয় পায়। এমন নিরিবিলি পরিবেশে লোকটা আবার কোনো ক্ষতি করবে না তো! খুব কাছাকাছি আসার পর দেখে তার বন্ধু নাহিদ।

- নাহিদ, এদিকে কোত্থেকে এলে? 

- বড়ো আপুর বাসা থেকে। তোকে নিয়ে বিলে মাছ ধরার প্ল্যান করেছি। সন্ধ্যার পরে বিলে যাবো।

- সন্ধ্যা নামতে এখনও অনেক বাকি। চল বাসা থেকে নাশতা পানি খেয়ে তারপর আসি।

- নাহ, এখন খাওয়ার ইচ্ছে নেই। চল, আস্তে আস্তে বিলের দিকে যাই। যেতে যেতে সন্ধ্যা নেমে আসবে। 

সূর্য বিদায় নিয়েছে। চারদিক রাতের আঁধারে ছেয়ে গেছে। নৌকা ঘাটে বেঁধে জেলেরা বাড়ির পথ ধরেছে। সবাই বৈঠা নিয়ে গেছে সাথে করে। হাত দিয়ে নৌকা চালিয়ে বেশিদূর যাওয়া সম্ভব না। নাহিদ বললো- ব্যাপার না। আমি হাতে অনেক ভালো চালাতে পারি। নো টেনশন। তুই শুধু দেখবি, হাতে কেমনে কী করি!

দু’জনই উঠলো নৌকায়। নাহিদ নৌকার মাথায় বসে হাতে বৈঠা মারতে শুরু করলো। চোখের পলকেই নৌকা ওদের নিয়ে মাঝবিলে চলে গেল। নাহিদ আরও জোরেশোরে হাত চালাতে শুরু করলো। আর যেতে হবে না বলে শাওন ওকে থামাতে চাইলো।

- না, আর একটু যাই, তুই ব্যাগ থেকে জালটা বের কর।

আকাশ পরিষ্কার। চাঁদের আলোয় বিলের স্বচ্ছ পানির ঢেউ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শাওন ব্যাগ থেকে জাল বের করতেই নৌকাটা নড়ে ওঠে। ও চমকে যায়। পেছনে তাকিয়ে দেখে নাহিদ নেই। ভাবলো, নাহিদ পড়ে গেছে। নাহিদ নাহিদ বলে কয়েকবার ডাকলো। কোনো সাড়াশব্দ নেই। আশপাশে পানির নড়াচড়াও নেই। জোরেশোরে বাতাস বইছে। নৌকা ঘাটের দিকে ফিরে আসছে। নাহিদ চিৎকার করে ডাকছে- আমাকে নিয়ে যা, শাওন আমাকে নিয়ে যা!

শাওন বাতাসের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। ও যতই সামনে এগোতে চায় বাতাস ততই পেছনে নিয়ে যায়। সাঁতার কাটতে কাটতে নাহিদ নৌকার কাছে চলে আসে। ও নৌকার কিনারা ধরে উঠাতে গেলে নৌকা তলিয়ে যায়। ওরা দু’জনই এখন পানিতে। এখানটা অনেক গভীর। শাওন হাবুডুবু খেতে খেতে পাড়ের দিকে যাচ্ছে। পাড়ে চেয়ে দেখে নাহিদ  বসে বলছে- তাড়াতাড়ি আয়, আমি চলে এসেছি। শাওন কোনোমতে পাড়ে ওঠে। দেখে পাড়ে নাহিদ নেই। এবার বিলের ভেতর থেকে ডাকে- শাওন দাঁড়া, আমাকে নিয়ে যা!

ভয়ে শাওনের শরীর কাঁপছে। পশম দাঁড়িয়ে গেছে। লোমকূপ দিয়ে ঘাম বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ অদৃশ্য থেকে ভেসে আসে কান্নার সুর। নাহিদের কান্নার আওয়াজ। নাহিদ কাঁদছে। কিন্তু কোথাও দেখা যাচ্ছে না। শাওন চোখ বন্ধ করে বাড়ির পথে দৌড় দেয়। নাহিদ পেছন থেকে ডাকে- নিয়ে যা, আমাকে নিয়ে যা! কয়েকবার ডাকার পর ঢিল ছুড়তে শুরু করে। ঢিলের আঘাতে হোঁচট খায় তিনবার। ডান হাঁটুর চামড়া খসে রক্ত বের হয়। হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির আঙ্গিনায় এসে দাঁড়ায় শাওন। অবস্থা দেখে রাতারাতি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ইনজেকশনের সুঁইয়ের খোঁচায় ও লাফ দিয়ে ওঠে। চোখ কচলে দেখে সে তার রুমে ফ্লোরে শুয়ে আছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ও। কী থেকে কী হলো! ঘড়ি হাতে নিয়ে দেখে বিকাল চারটা বাজে। শরীরে চিমটি কেটে শাওন বলে- আমি তো রুমে আছি। তাহলে এসব কী দেখলাম! সবই অলীক স্বপ্ন!

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ