অপারেশন মাসাদা
উপন্যাস হারুন ইবনে শাহাদাত জুলাই ২০২৪
আগের কথা
ইসরাইলের বিমান হামলায় বিধ্বস্ত আল জাহারার স্কুলে আটকা পড়া সেই ১০ জন স্কুলছাত্র। তীক্ষè বুদ্ধির আমর, যোগ্য নেতা জায়াদ, খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদি, আত্মবিশ্বাসী হাম্মাদ, জায়নবাদবিরোধী নেটিভ ইহুদি ডেভিড- আল জাহারার স্কুলের ধ্বংসস্তূপ থেকে গাজীর বেশে ফিরেছে। ওরা সত্যি কি মুক্ত? না। এই ফেরা মানেই মুক্তি নয়। মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেমেছে গাজী ব্রিগেড। এখন একটাই কাজ। একটাই স্বপ্ন। স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। ওরা এ স্বপ্নের ছবি এঁকেছে অবরুদ্ধ স্কুলের ধ্বংসস্তূপে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাঁচার স্বপ্ন দেখেছে। গঠন করেছে বাঁচার আর আশার প্রতীক গাজী ব্রিগেড। মুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠাই এ ব্রিগেডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
আর নয় মুক্ত কারাগার
শুধু ফিলিস্তিন নয় পৃথিবীর এককালের সমৃদ্ধ জনপদ গাজা, আজ সবচেয়ে বড়ো মুক্ত কারাগার। না, শুধু গাজা নয় ফিলিস্তিনই একটি মুক্ত কারাগার। এই কারাগারের কাঁটা-তারের বেড়াজাল ভাঙার লড়াইয়ের সাহসী যোদ্ধা গাজী ব্রিগেড। ওরা আগ্রাসী দখলদার অপশক্তি ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ।
ওরা জানে ওদের লড়াই একমাত্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে নয়। পৃথিবীর সকল পরাশক্তির বিরুদ্ধে। এ লড়াই বেঁচে থাকার লড়াই। ফিলিস্তিনের লাখ লাখ নারী-শিশু ও মজলুম জনতাকে বাঁচানোর লড়াই। এ লড়াইয়ে জিততেই হবে।
গাজী ব্রিগেডের কিশোররা কি পারবে এ লড়াইয়ে জিততে? জিততে হলে কী করতে হবে? সেই দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিতেই বসেছে ওরা। তবে আজ কোনো অবরুদ্ধ স্কুলে নয়। ওরা বসেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার ধ্বংসস্তূপে।
প্রথমে মুখ খুলে জায়াদ, ‘আমরা জানি জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। শাহাদাতের মৃত্যু জীবনের শ্রেষ্ঠপ্রাপ্তি। কিন্তু এর মানে এই নয় আমরা উঁইপোকার মতো দলে দলে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেবো। মহান রবের কাছে আমাদের চাওয়া মুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন। তাঁর কাছে আমরা মুক্তভূমিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার তৌফিক চাই। আমরা ঈমান নিয়ে লড়তে চাই। স্বাধীন ফিলিস্তিনের বুকে ঈমান নিয়ে মরতে চাই।’
আমরকে কিছু বলতে ইশারা করে জায়াদ।
আমর শুরু করে, ‘আশা করি জায়াদের কথার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আমাদের ব্রিগেডের প্রত্যেক সদস্যকে চলতে হবে তীক্ষè বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগিয়ে খুব সাবধানে। আবেগ, উত্তেজনা ও উসকানিকে কোনোক্রমে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আল্লাহর সাহায্য কামনার সাথে সাথে দুনিয়াবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের কলা কৌশলগুলোও আয়ত্ত করতে হবে এবং তা কাজে লাগাতে হবে। নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি কী ভয়ংকর বিপদ থেকে আল্লাহতায়ালা আমাদের গাজী হিসেবে ফিরিয়ে এনেছেন। এভাবেই আল্লাহর সাহায্য সবসময় আমাদের ঘিরে রাখবে আমাদের আশা। তবে অবশ্যই আমরা সবসময় তার রহমত কামনা করবো প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর শেখানো ও দেখানো পন্থায়। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘প্রত্যহ সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার করে এই দোয়াটি পাঠ করলে কোনোকিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না। বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মায়াসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি, ওয়ালা ফিস-সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।’ আল্লাহর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনোকিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আমরা জানি হযরত আবু মুসা আশআরি (রা) বলেছেন, নবী করিম (সা) যখন কোনো সম্প্রদায় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করতেন তখন এই দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফি নুহুরিহিম, ওয়া নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম।’ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আল্লাহ যাকে রক্ষা করেন, কারো শক্তি নেই তার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করার।’
‘অনেক ধন্যবাদ, আমর। এরপর বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদিকে অনুরোধ করছি কিছু বলার জন্য।’
দলনেতা জায়াদের কথা শেষ হতেই আম্মার জায়েদি তার কথা শুরু করে, ‘অনুরোধ নয় কমান্ডার আদেশ করুন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে দায়িত্ব পালনের শপথ আমরা নিয়েছি, তা কত কঠিন। এজন্য আমাদের কত লড়তে হবে। জায়নবাদী শক্তির পেছনে আছে বিশ্বের সব পরাশক্তি। ওদের আছে আধুনিক মারণাস্ত্র। আমাদের গতি-বিধি পর্যবেক্ষণের শক্তিশালী গোয়েন্দা প্রযুক্তি। সবকিছু ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা আমাদেরও অর্জন করতে হবে।
ওরা এখন হিরো কিন্তু...
আল জাহারার স্কুলের ধ্বংসস্তূপ থেকে ইহুদি আগ্রাসী সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিজয়ীর বেশে ফিরে আসার পর সবাই এখন অন্য চোখে দেখে গাজী ব্রিগেডের সদস্যদের। গাজী ব্রিগেড এখন বন্ধুদের চোখে হিরো। কিন্তু ওরা নিজেরা তা মনে করে না। ওরা মনে করে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতেই তারা অসাধ্য সাধন করতে পেরেছে। হিরো হওয়ার মতো বড়ো কাজ এখনো করতে পারেনি। প্রিয় জন্মভূমি ফিলিস্তিন মানবতাবিরোধী জায়নবাদীদের আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত। প্রতিদিন শত শত শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ, নর-নারী জায়নবাদী ইহুদিদের বোমার আঘাতে শাহাদাত বরণ করছে। হাজার হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস করছে। হাজার হাজার বছর ধরে বংশানুক্রমে বসবাস করা ভূমিপুত্রদের বাস্তুহারা করে গড়ে তুলছে অবৈধ ইহুদি বসতি। এই আগ্রাসন বন্ধ করে, ওরা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে যেদিন সেদিনই হবে ওদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
জায়াদ তাদের সেই স্বপ্নের মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরে, ‘ফিলিস্তিনকে তিন ভাগে ভাগ করেছে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি। জায়নবাদীদের হাতে একটি অংশ তুলেছে। যার নাম দিয়েছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনের বাকি অংশও দুই ভাগে বিভক্ত। জর্দান নদী এবং ডেড সির পশ্চিম তীরের ৫,৯৭০ বর্গকিলোমিটার শাসন করছে ফাতাহ। তারা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সেবাদাস। বাকি মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা শাসন করছে ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী হামাস। তারা প্রতিষ্ঠা করেছে কুরআনের শাসন। আমরাও চাই মানুষকে মানুষের গোলামি থেকে মুক্ত করতে। অবিভক্ত স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন আমাদের লক্ষ্য। যেখানে সবাই এক আল্লাহর গোলামি করবে। মানুষ মানুষের গোলামি করবে না।’
‘আমরা সৌভাগ্যবান। গাজা আমাদের জন্মভূমি। আমাদের স্বপ্নের পক্ষের সরকার গাজা শাসন করছে।’ হাম্মাদ বললো।
‘এ কথা ঠিক। কিন্তু আমরা এখন ইসরাইলের বর্বর সেনাদের মূল টার্গেট।’ আমর বলে।
‘মানবতার শত্রুরা চারদিক থেকে আমাদের অবরুব্ধ করে রেখেছে।’ ডেভিড বলে।
‘বিনা উসকানিতে হামলা করে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে।’ হাম্মাদ আর চুপ থাকতে পারে না।
তার সাথে কণ্ঠ মিলায় আম্মার জায়েদি, ‘নারী, শিশু, বৃদ্ধরাও ওদের নিশানা থেকে বাদ পড়ছে না।’
‘শত্রুর জনশক্তি, সমরাস্ত্র সমরকৌশল, গোপন কোড জানার আগে অন্ধকারে লড়াইয়ে নামলে বিজয় আসবে না।’ আমর জায়াদের দিকে তাকিয়ে বলে।
‘অবশ্যই।’ সবাই একসাথে বলে।
‘তাছাড়া হামাসের আঞ্চলিক কমান্ডার ইয়াসিন হায়াতের সাথে আমাদের অবশ্যই যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।’ জায়াদের কথা শেষে আমর আবারও মুখ খুলে, ‘অবশ্যই। তা না হলে ভুল-বোঝাবুঝি হতে পারে।’
‘ঠিক। আমরা স্কুলের ধ্বংসস্তূপের বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর উনার প্রতিনিধি আলী মরতুজা এসেছিলেন। কমান্ডার ইয়াসিন হায়াতের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে আমাদের সাহসের প্রশংসা করেছেন। কমান্ডারের পক্ষ থেকে পাঠানো উপহার দিয়েছেন। আইডি কার্ডও দিয়ে গেছেন, যোগাযোগের জন্য।’ ডেভিড যখন কথাগুলো বলছিল ওর চোখমুখে খুশির ঝিলিক সবাইকে মুগ্ধ করেছে।
‘কিন্তু...’
আমরের কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই বলে ওঠে, ‘কিন্তু কী?’
‘আমরা তো তাকে আমাদের গাজী ব্রিগেডের কথা বলিনি।’
আমরকে আশ্বস্ত করতে জায়াদ বলে, ‘তাতে কী? এখন বলবো।’
‘অবশ্যই বলতে হবে। তবেই উনি আমাদের খুদে এই ব্রিগেডকে বড়ো কাজে লাগাতে পারবেন।’
জলপাই বনে আজব সিঁড়ি
‘আসসালামু আলাইকুম। তোমরা দু’জন এসেছো। বেশ। চলো।’ আলী মরতুজা ওদের হাসিমুখে রিসিভ করে। কিছু দূর হাঁটার পর তিনজন একটি খোলা জিপে ওঠে। জিপটি স্বাভাবিক এবং সতর্কভাবে রাফার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আধাঘণ্টা চলার পর একটি জলপাই বাগানের সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে জিপটি আবার উল্টো দিকে চলতে থাকে।
ওরা তিনজন ধীরে ধীরে শান্ত পায়ে হাঁটছে। জলপাইয়ের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছোটো ছোটো পাখি মিষ্টি সুরে গান গাইছে। গান তো নয় যেন সুরে সুরে আল্লাহর মহিমার কথা বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সামনেই শীতল পানির নহর। নিঃশব্দে এঁকেবেঁকে স্বচ্ছ পানির ধারা বয়ে চলছে বাগানের শেষ প্রান্তে। আলী মরতুজা একটু থামলেন। পানিতে হাত দেওয়ার পর ঘটলো এক আজব ঘটনা। যার জন্য আমর ও জায়াদ প্রস্তুত ছিল না। নহর দুই ভাগ হয়ে গেল। মাঝে একটি আজব সিঁড়ি। আলী মরতুজার সাথে ওরা দু’জন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। অথচ ওদের শরীরে কোনো পানি লাগছে না। অথচ পানির কলকল শব্দ ঠিকই শুনতে পাচ্ছে।
সিঁড়ি থেকে নিচে নামার পর ওদের কানে ভেসে আসে মিষ্টি সুরে পবিত্র কুরআনের তেলাওয়াত। সামনে ছোটো একটি ঘর। ঘরের দরজা খুললেই ছোটো একটি কামরা। অস্ত্র হাতে চারজন দরজায় পাহারা দিচ্ছেন। আলী মরতুজাকে দেখে সালাম দিয়ে তারা দরজা খুলে দিলেন।
‘আসসালামু আলাইকুম।’ শান্ত অথচ একটি ভরাট কণ্ঠ। একজন হাত বাড়িয়ে দিলেন। ‘আমি কমান্ডার ইয়াসিন হায়াত।’
‘আমি আমর।’
‘আমি জায়াদ।’
‘তোমাদের কথা আমি আগেই জেনেছি। সত্যি। তোমাদের মতো সাহসী এবং বুদ্ধিমান সন্তান ফিলিস্তিনের মাটিতে যত জন্ম নেবে- আল্লাহর রহমতে আমাদের বিজয় তত সহজ হবে।’
‘আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। তিনিই আমাদের তৌফিক দিয়েছেন বলেই গাজী ব্রিগেড গঠন করতে পেরেছি। আপনার সাথে দেখা হওয়াটা আমাদের বড়ো সৌভাগ্য।’
‘আমি তো আল্লাহর এক নগণ্য গোলাম। এবার বলো তোমরা কীভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারবে। কমান্ডার ইয়াসিন হায়াতের কথা শেষে জায়াদ বলতে শুরু করে, ‘গাজী ব্রিগেডে আমরা ১০ জন আছি। আমাদের সাথে একজন খুদে বিজ্ঞানী এবং একজন মানবতাবাদী নেটিভ ইহুদি আছে।’
‘বেশ। ইহুদিদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন। তবে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর একত্ববাদ এবং আখেরাতে বিশ^াসী তাদের জন্য পবিত্র কুরআনে সুসংবাদও আছে। এমন অনেকেই ইসলামের আলোকে আলোকিত হয়ে দীনের খেদমত করেছেন যেমন : মুহাম্মদ আসাদ।’
‘আমরা মনে করি, শত্রুর জনশক্তি, সমরাস্ত্র ও কৌশল, গোপন কোড জানার আগে অন্ধকারে লড়াইয়ে নামলে বিজয় আসবে না।’
‘তুমি একজন দক্ষ জেনারেলের মতো কথা বলছো দেখছি। বেশ। তারপর?’
‘প্রথমে আমরা এই কাজটিই করতে চাই।’
‘তা কীভাবে?’
‘আমরা আর দশটা ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরের মতো ইট, পাথর আর গুলতি হাতে নিয়ে ওদের ট্র্যাংকের সামনে দাঁড়াবো না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শত্রুর জনশক্তি, সমরাস্ত্র ও কৌশল, গোপন কোডগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করবো। তারপর তা আপনাদের কাছে সরবরাহ করবো। এ কাজে আমাদের টিম আপনাদের সাথে কাজ করবে।’
‘তোমরা তো এখনো ছাত্র।’
‘হ্যাঁ। ছাত্র। আমরা লেখাপড়ায় ভালো করতে পারলেই তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান আমাদের হাতের মুঠোয় আসবে। তবে এখন থেকেই সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মিশনে সফল হতে হলে এখন থেকেই...’
‘বেশ। ভালো। বুঝতে পেরেছি। আজ থেকেই কাজে লেগে যাও। তোমরা দেশ-বিদেশে আমাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করতে পারো। আমর তুমি তো কিছু বলছো না।’
‘আমাদের ব্রিগেডের কমান্ডার জায়াদ। তার কথাই আমার কথা। আমরা আরো বড়ো কিছু করতে চাই।’
‘অবশ্যই। উপযোগী বড়ো বড়ো কাজ তোমরা করবে। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে। কমান্ডের পক্ষ থেকে যে কাজ দেওয়া হবে, তা অবশ্যই বড়ো কাজ। তা তোমার কাছে যত ছোটোই মনে হোক না কেন। অবহেলা করবে না।’
‘উহুদের ঘটনা...।’
আমরের কথায় কমান্ডার ইয়াসিন হায়াত খুব খুশি হয়ে বলেন, ‘ঠিক। রাসূল (সা)-এর সিরাতের প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। তাই ভালোভাবে তা জানতে হবে। নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো বেশি বেশি পড়বে।’
‘আপনার উপদেশ অবশ্যই আমরা যথাযথভাবে পালন করবো।’
‘ধন্যবাদ। আলী মরতুজা তোমাদের কাজ বুঝিয়ে দেবেন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’
কথা শেষ করে কমান্ডার ইয়াসিন হায়াত পাশের রুমে চলে যান। টি ট্রলি নিয়ে আসে একজন সৈনিক। টেবিলে সাজানো খেজুরের হালুয়া, বাদাম আর লাল চা।
‘নাও। খেয়ে নাও।’ আলী মরতুজা ওদের বলেন এবং নিজেও নাস্তায় শরিক হন।
নাস্তা শেষে ওরা রুম থেকে বের হয়। না এবার আর কোনো জলপাই বন নয়। নেই কোনো নহরও, এ তো রাফাও নয়। নতুন আরেক শহর।
আলী মরতুজা বলেন, ‘আমরা এখন ওয়েস্ট ব্যাংক মানে ডেড সির পশ্চিম তীরে হেবরনের কাছে আছি।’
‘আল খলিল!’ আমর বিস্ময়ের সাথে বলে।
‘হ্যাঁ। আমরা এখন জেরুজালেমের ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম (আ)-এর স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র শহর আল খলিলে আছি।’
‘এ শহরের নাম ইসরাইল পরিবর্তন করে রেখেছে হেবরন, কিন্তু কেন?’ জায়াদ প্রশ্ন করে।
‘ওরা শুধু মুসলিম জাতি নয়, আমাদের ঐতিহ্যের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে নেমেছে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো এই হেবরন সিটির আরবি নাম আল খলিল, পুরো নাম খলিল আর রহমান অর্থাৎ রহমান মানে আল্লাহর বন্ধু। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে খলিল অর্থাৎ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।’
‘হ্যাঁ জানি।’ আমর ও জায়াদ একসাথে বলে।
‘তাঁর নামেই এ নগরের নাম। মজার বিষয় কী জানো?’
‘কী?’
‘ইংরেজি হেবরন শব্দটির ওরা নিয়েছে হিব্রু হেবার থেকে। যার আরবি অর্থ খলিল (বন্ধু)। ফিলিস্তিনের এই শহরে প্রায় দুই লাখ মুসলমান বাস করেন। কিন্তু প্রতিনিয়ত ইহুদিরা হামলা চালাচ্ছে। এই শহর দখল করতে ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
‘সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৩০ মিটার ওপরের এই শহরের বড়ো অংশ তো ওরা দখলে নিয়েছে? আমরা এখানে এলাম কীভাবে?’ আমর বলে।
‘তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর একটু পর দিচ্ছি। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর এখন দেবো না। আমাদের সাথে কাজ করতে করতে এমন অনেক কিছুই দেখবে এবং জানবে।’ আলী মরতুজা বলেন।
‘আচ্ছা এবার তাহলে প্রথম প্রশ্নের উত্তর...!’
জায়াদের কথা শেষে আলী মরতুজা বলেন, ‘হ্যাঁ। ১৯৬৭ সালের জুনে ছয় দিনের যুদ্ধের পরে, এর পশ্চিম তীরের বড়ো অংশ ইসরাইল দখল করেছে। তবে ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে একটি চুক্তির পর হেবরনের কিছু অংশ ফিলিস্তিনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। শহরের বাকি অংশ এখনো ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে আছে।’
আলী মরতুজার কথা শেষ হওয়ার আগেই একটি ফিলিস্তিন সরকারের এনওসি স্টিকার লাগানো একটি বুলেট প্রুফ লিমুজিন গাড়ি এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়।
ওরা তিনজন সাদা রঙের লিমুজিন গাড়িটিতে বসে। বসার পর পরই গাড়িটি চলতে চলতে ধূসর রঙের হয়ে গেল। হ্যাঁ এই গাড়িটি কিছুক্ষণ পরপর গিরগিটির মতো রং বদলায়। লিমুজিন দ্রুত গতিতে চলছে।
একটি বিষয় কিছুতেই আমর আর জায়াদ বুঝতে পারছে না। ওরা প্রবেশ করলো জলপাই বন দিয়ে, ফেরার পথে কীভাবে হেবরনে এলো। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না বলে ওরা চুপচাপ বসে থাকে। আমর আর জায়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে আলী মরতুজা বিষয়টি বুঝতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘তোমরা কী ভাবছো?’
‘মুজাহিদদের কত সতর্ক থাকতে হয়, তাই ভাবছি।’
‘শয়তানের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় আমাদের সতর্কতার বিকল্প নেই।’
‘দোয়া করবেন আমরাও যেন সতর্ক থাকতে পারি।’
‘অবশ্যই দোয়া করবো। তবে একটি কথা সবসময় মনে রাখবে, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমাদের একটি পদক্ষেপও সফল হবে না, সতর্কতার সাথে সাথে সবসময় তার সাহায্য কামনা করতে হবে। শত্রুদের ফাঁদ গোটা দুনিয়ায় জালের মতো ছড়িয়ে আছে।’
হঠাৎ বিপদের হাতছানি
‘শত্রু পিছু নিয়েছে,’ ড্রাইভারকে আলী মরতুজা বলেন, ‘সাবধানে সামনে এগিয়ে যাও। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।’
‘জি জনাব।’
‘এই গাড়িটি আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ। বুলেট প্রুফ। এর মানে আমরা নিরাপদ এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।’ আলী মরতুজা বলেন।
‘কেন?’ জায়াদ জানতে চায়
‘ওরা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই শনাক্ত করে ফেলতে পারে। ধ্বংস করতে পারে এমন আশঙ্কা নিয়ে পথ চলতে হবে।’
‘ঠিক। তাহলে উপায়?’
‘গাড়ির সমস্ত জিপিআরএস সিস্টেম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন আর মোবাইলগুলোও চলবে না। পশ্চিম তীর ধরে খুব সাবধানে চলতে হবে।’ করিডোর অতিক্রম করলেই আমরা নিরাপদে গাজায় পৌঁছাতে পারবো ইনশাআল্লাহ।’
দ্রুত গতিতে চলছে লিমুজিন। এখন গাড়ির রং লাল, অনেকটা পাহাড়ের মাটির মতো। কিছু দূর যাওয়ার পরই নাহাল অজ কিবুৎজ রোড। দখলদার ইহুদিরা এই রাস্তা তৈরি করে গাজাকে দুইভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে শত প্রতিবাদের পরও পরাশক্তিগুলোর সমর্থনের জোরে ইসরাইল নির্মাণ কাজ শেষ করেছে। গাজাবাসীর বুকের কাঁটা এই রাস্তা। এখানে সবসময় ইসরাইলি সেনারা টহল দেয়। গাজা ও ফিলিস্তিনবাসীর অবাধ চলাচলে বাধা দেয়। আলী মরতুজার লিমুজিন সেই পথ ধরেই যাবে। যেতেই হবে। কারণ সরেজমিনে প্রকৃত অবস্থা জানা জরুরি। ২০২৪ সালে ‘নাহাল অজ কিবুৎজ’ রোডের নির্মাণ কাজ শেষ করার পর থেকে ইসরাইলের দখলদার সরকারের পেট্রোল টিমের অত্যাচার বেড়েই চলেছে। এই রোড দিয়ে ইসরাইলি সৈন্যরা যখন-তখন বিনা বাধায় চলে যায় গাজার আল রশিদ ও আল সালাহ আল দীন সড়কে।
রাস্তার প্রবেশপথে হঠাৎ ব্যারিকেড। কোনো উপায় নেই। গাড়ি থামাতে বাধ্য হলেন ড্রাইভার। বন্দুক তাক করে এগিয়ে এলো দখলদার ইহুদি সৈনিকদের একটি দল। গাড়ির জানালা খুলে আলী মুরতাজা বললেন, ‘কী ব্যাপার?’
সৈনিকদের একজন এগিয়ে এসে বললো, ‘আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে। হামাসের একটি সশস্ত্র দল এদিকে আসছে।’
‘তাই বলে আমাদের হয়রানি কেন?’
‘আমরা গাড়িটি সার্চ করবো?’
‘সময় নষ্ট ছাড়া কোনো লাভ হবে না। এনওসি স্টিকার লাগানো থাকার পরও সার্চ। কথাটি আমরাও মনে রাখবো।’ আলী মরতুজার দৃঢ়তায় সৈনিকটি আর অগ্রসর হলো না। ব্যারিকেড তুলে দিতে ইশারা করলো। ড্রাইভার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলো। আমর ও জায়াদ এতক্ষণ চুপচাপ আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছিল।
‘আমরা আজ অনেক কিছু শিখলাম।’ আমরের কথা শেষে আলী বললেন।
‘হ্যাঁ বাস্তবজীবন থেকে শিক্ষা। যা বই পড়ে শেখা যায় না। আমি একটি বড়ো বিপদের পূর্বাভাস পাচ্ছি।’
‘কী?’
‘যে-কোনো সময় ওরা গাজা অবরোধ করবে। একটা অজুহাত খুঁজছে। ‘নাহাল অজ কিবুৎজ’ রোডটি নির্মাণ করেছে আমাদের বিপদ বাড়াতে। ওরা এই রাস্তা ব্যবহার করে ফিলিস্তিন, মিসর, লেবানন, ইরান, জর্ডান, কুয়েত সৌদি আরব, তুরস্কসহ মুসলিম বিশ্বের বন্ধুদের সাহায্য থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে নীলনকশা আঁকছে।’
‘কিন্তু কেন?’
‘ওরা জানে গাজার ক্ষমতায় আল কুরআনের আলোয় আলোকিত আল্লাহর সৈনিকেরা। তারা ঈমানদার। আর ঈমানদারদের ওরা খুব ভয় পায়। ওরা জানে একজন ঈমানদার মুসলমান বেঁচে থাকলেও ওদের ইচ্ছা পূরণ হবে না। আরব জাহানে ওরা দাজ্জালের শাসন কায়েম করতে পারবে না। তাই যে-কোনো মূল্যে এ ছোটো জনপদের সব মানুষকে হত্যা করে হলেও ওরা এর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চায়।’
‘ওরা তো চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে রেখেছে। আমরা অবরুদ্ধ। তারপরও এত ভয় পায় কেন?’
আমরের কথা শেষ হতেই জায়াদ দীপ্তকণ্ঠে বলে, ‘না আমরা আর অবরুদ্ধ থাকবো না। আর মুক্ত কারাগারে নয়। মুক্ত স্বাধীন গাজা মুক্ত স্বাধীন ফিলিস্তিন চাই আমরা।’
গাজা সিটির সালাহ আল দীন সড়কে চলছে ওদের লিমুজিন। একটি রকেট লাঞ্চার গাড়ির পাশ দিয়ে শাঁ করে চলে গেল।
‘এই তো শুরু হয়ে গেছে। সাবধান। এবার জিপিআরএস চালু করো।’
ড্রাইভার আলী মরতুজার নির্দেশ পালন করলেন কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে। সবার চোখ সামনের কম্পিউটার স্ক্রিনে। চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে হানাদার জায়নবাদী ইসরাইলের সাঁজোয়া যান। প্রতিরোধের জন্য হামাস যোদ্ধাদের দ্রুত বার্তা পাঠালেন আলী মরতুজা।
‘আমরা এখন কী করবো?’ জায়াদ আর আমরের কথা শেষ হওয়ার পর পরই ওরা নিজের আবিষ্কার করে পাতাল সড়কে। ওদের গাড়ি চলছে পাতাল সড়ক ধরে। জায়াদ আবার জানতে চায়, ‘গাজী ব্রিগেড এখন কী করবে?’
‘একটু অপেক্ষা করো। তোমাদের কাজ বুঝিয়ে দেবেন, কমান্ডার সোলাইমান সাইয়েদ। এই তো আমরা তাঁর দফতরের কাছাকাছি এসে গেছি। কিন্তু তাঁর নির্দেশ পাওয়ার আগে সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না।’ ড্রাইভার গাড়ি থামানোর পর প্রথমে আলী মরতুজা এরপর আমর ও জায়াদ গাড়ি থেকে নামে। মরতুজাকে অনুসরণ করে ওরা দু’জন হাঁটতে থাকে। না, বেশি দূর হাঁটতে হলো না ওদের। সামনের একটি দেওয়াল ফাঁক হওয়ার পর ওরা তিনজন সেখানে প্রবেশ করলো। এ অন্য জগৎ। সশস্ত্র হামাস যোদ্ধারা পাহারা দিচ্ছেন। আলী মরতুজাকে দেখে তারা ডান দিকে ইশারা করলেন। তিনি সেদিকে রাখা একটি ছোট্ট টুলে গিয়ে বসলেন। অন্য দুটি টুল দেখিয়ে আমর ও জায়াদকে বসার ইশারা করলেন।
‘আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম আসসালাম।’ বলে আমর ও জায়াদ দাঁড়িয়ে গেল।
‘তোমরা বসো।’ কণ্ঠস্বর শুনে জায়াদ আর আমর বুঝতে পারলো, উনিই সুলাইমান সাইয়েদ। শ্রদ্ধায় ওরা দু’জন বিগলিত হয়ে গেল।
‘তোমাদের সাহসিকতা, বুদ্ধি এবং সংকল্পের কথা আমি শুনেছি। কিন্তু তোমরা এখনো অনেক ছোটো। প্রশিক্ষণ ছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধ করা যায় না। তাছাড়া তোমরা তো ছাত্র। লেখাপড়া শেষ করার আগে একান্ত বাধ্য না হলে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের অনুমতি আমরা দেই না। তার মানে এই নয়, তোমরা কোনো কাজ করবে না। তোমাদের ব্রিগেড অবশ্যই স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখবে।’
‘কবে থেকে?’ জায়াদ জানতে চায়।
‘কবে থেকে নয়, এখন থেকেই।’ কমান্ডারের কথায় ওদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক খেলে যায়।
‘তাহলে আদেশ করুন!’ আমর বললো।
‘শোনো। শিক্ষাঙ্গনই হবে তোমাদের যুদ্ধক্ষেত্র।’ কমান্ডার বলেন।
‘তা কী করে হয়?’
‘আল জাহারার স্কুলে যেভাবে হয়েছে। লেখাপড়া করে নিজেদের আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি এবং ইসলাম ও সমরবিদ্যার জ্ঞানে নিজেদের সমৃদ্ধ করবে। ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন অপারেশন কাছ থেকে দেখবে। প্রয়োজনে সাহায্য করবে।’
‘কী করতে হবে আদেশ করুন!’ জায়াদ বললো।
‘আমাদের পরবর্তী মিশন ‘অপারেশন মাসাদা’।’
‘আমরা কী করবো?’ জায়াদ জানতে চায়।
‘অনেক কিছু করতে হবে। তোমরা প্রস্তুত তো?’
‘ইনশাআল্লাহ আমরা প্রস্তুত।’
অপারেশন মাসাদা
স্কুল ভবন ভাঙার পর একটা নিরাপদ দূরত্বে অস্থায়ী কয়েকটি তাঁবুতে চলছে ওদের আল জাহারা স্কুলের কার্যক্রম।
ক্লাসের ফাঁকে একটি তাঁবুতে বসেছে গাজী ব্রিগেডের জরুরি সভা। ওদের এখন একটাই মিশন যে-কোনো মূল্যে অপারেশন মাসাদা সফল করতেই হবে, ওরা সবাই মনে-প্রাণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এ প্রার্থনাই করছে।
‘অপারেশন মাসাদা।’ জায়াদের মুখে মাসাদা শব্দটি শোনার সাথে সাথে ডেভিডের মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। বিষয়টি অন্যদের চোখ এড়ায় না।
‘কী ব্যাপার ডেভিড?’ আমর প্রশ্ন করে।
‘না মানে। মাসাদার সাথে জড়িয়ে আছে ইহুদিদের এক আবেগময় কাহিনী, বন্ধুরা, তা তো তোমাদের কারো অজানা নয়।’ ডেভিড বলে।
‘হ্যাঁ। এই সেই মাসাদা। সেখানে প্রায় এক হাজার ইহুদি রোমান সেনাদের হাতে বন্দি হওয়া থেকে বাঁচতে আত্মাহুতি দিয়েছে। দুই হাজার বছর আগের এ ঘটনা নিয়ে অবশ্য ভিন্নমতও আছে।’
জায়াদের কথা শেষে ডেভিড বলে, ‘হ্যাঁ। ভিন্ন মত আছে। কারণ ইসলামের মতো ইহুদি ধর্মেও আত্মহত্যা মহাপাপ। তাই অনেকেই মনে করেন। সেইদিন ইহুদি পুরুষ, মহিলা এবং শিশু নিজেরা আত্মাহুতি দেয়নি। রোমান সৈন্যরা মাসাদার দখল নিতে পবিত্র মন্দির ধ্বংসের পর তাদের হত্যা করেছে।’
‘তারা ছিলেন জায়োনিস্ট ধারার সিক্রারি ইহুদি সম্প্রদায়ের। তারা রোম স¤্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সেই বিদ্রোহের পরিণতি নিয়ে অনেক কল্পকাহিনীও প্রচলিত আছে।’ আমর বলে।
‘ইহুদি জাতির এই এক দোষ, তারা চুক্তিভঙ্গ ও বিদ্রোহ করে মানবসভ্যতার ইতিহাসকে বারবার রক্তাক্ত করেছে। মদিনার মতো শান্তিময় শাসনের বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র করেছে। বিদ্রোহ করেছে। সেই পরিণতিও...’ ডেভিড আবেগ আপ্লুত হয়ে যায়।
‘তোমার অনুভূতি আমরা বুঝতে পারছি। যদি...।’
জায়াদের কথা শেষ হওয়ার আগেই ডেভিড আবার বলতে শুরু করে, ‘আমি আহলে কিতাবধারী। জায়নবাদী নই। ইতিহাসের সঠিক পাঠ আমার জানা, তাই তোমরা আমাকে বিশ^াস করতে পারো। অবশ্য আমি গাজী ব্রিগেডকে জোর করবো না। কোনো সিক্রেট কাজ থেকে আমাকে দূরে রাখলে আমি কষ্ট পেলেও মেনে নেবো।’
আমর ডেভিডকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বন্ধু। তোমার প্রতি আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। বরং দোয়া করি, উম্মুল মুমিনিন সুফিয়া, বিখ্যাত স্কলার মুহাম্মদ আসাদের মতো আরো যারা আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতে ধন্য হয়েছেন, তিনি তোমাকেও সেই নিয়ামত দান করুন। অভিযানের আগে মাসাদা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে।’
‘ঠিক বলেছো, আমর। আমাদের মধ্যে কে সেখানে গিয়েছিলে।’ জায়াদের প্রশ্নে ডেভিড, আম্মার জায়েদি, হাম্মাদ হাত তুলে বললো, ‘আমরা।’
‘গুড। প্রথমে ডেভিড বলো।’
‘মাসাদা ইহুদিদের নিকট খুবই পবিত্র স্থান। দক্ষিণ ইসরাইলের একটি প্রাচীন দুর্গ এটি। দুর্গটির অবস্থান খাড়া মাসাদা পাহাড়ের ওপরের সমতল হেরোদ মালভূমিতে। জেবালে মাসাদার নামেই এই দুর্গের নামকরণ করা হয়েছে। এর পাদদেশে ডেড সি।’
এরপর জায়াদের ইশারা পেয়ে শুরু করে আম্মার জায়েদি, ‘মাসাদা ইসরাইলের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে একটি। বাইবেল চিড়িয়াখানার পরে পর্যটনের নিকট সবচেয়ে প্রিয় দর্শনীয় স্থান। তবে অভিযানের আগে জানা দরকার এর ভৌগোলিক অবস্থান।’
‘মাসাদার খাড়া পাহাড়ের ওপর সমতল মালভূমির মতো এই অঞ্চলের শীর্ষ প্রায় ৫৫০ মিটার ও ২৭০ মিটার আকৃতির একটি রম্বসের মতো। গোটা মালভূমিটিকে প্রাচীনকালে দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছিল, সেই সময়ের সিক্রিরি ইহুদিরা। তারা হেরোদ মালভূমির চারপাশে একটি প্রায় ৪ মিটার উঁচু প্রাচীর তৈরি করেছিলেন যার মোট দৈর্ঘ্য ১,৩০০ মিটার এবং উক্ত প্রাচীরটি অনেকগুলো টাওয়ার দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। দুর্গের মধ্যে ছিল গুদামঘর, ব্যারাক, অস্ত্রাগার, একটি প্রাসাদ এবং বেশ কিছু জলাধার। এসব জলাধারের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪০,০০০ ঘনমিটার। যেগুলো বৃষ্টির পানিতে পূর্ণ হতো। একদিনের বৃষ্টিপাতের পানিই ২ থেকে ৩ বছরের জন্য ১,০০০-এরও বেশি লোকের চাহিদা তারা এ পানি থেকে মেটাতে পারতো...’
‘বিজ্ঞানী তুমি তো অনেক কথাই বললে। এখন বর্তমান অবস্থা কী তাই বলো।’ জায়াদ খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদিকে বলে।
‘হ্যাঁ। বর্তমান অবস্থা জানা খুবই কঠিন কারণ এখন পর্যটকদের ওপর খুব কাড়াকড়ি করা হয়।’
‘কেন তারা হঠাৎ করে এত কড়াকড়ি করছে। গাজী ব্রিগেডের কাজ সেই বিষয়টি জানা। তারপর তা হামাসের কেন্দ্রীয় দফতরকে জানানো। কারণ মাসাদার অবস্থান গাজার খুব কাছে। ঐ উঁচু দুর্গে বসে ওরা কী করছে তা জানা জরুরি। গাজার নিরাপত্তার স্বার্থে।’
জায়াদের কথা শেষে হাম্মাদ বলে, ‘অবশ্যই। গাজার নিরাপত্তার স্বার্থে অবশ্যই আমাদের এ কাজ করতে হবে। তবে আমার মনে হয় এ মিশনে সবাই একসাথে অংশ নেওয়া ঠিক হবে না।’
‘অংশ আমরা সবাই একসাথে নেবো। তবে সবাই মাসাদায় যাবো না।’ আমরের কথায় সবাই একটু ধাক্কা খায়। চোখ বড়ো বড়ো করে ডেভিড বলে, ‘যাবে না, অথচ অভিযানে?’
‘মানে খুব সহজ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসে সহযোগিতা করবে। যারা স্পটে থাকবে, তারা কোনো বিপদে পড়লে সহযোগিতা করবে।’
খুদে বিজ্ঞানী আম্মার জায়েদির কথা শেষে জায়াদ বলে, ‘ঠিক। বিজ্ঞানীর টিমের সাথে কে কে থাকবে এবং কী লাগবে?’
‘স্পটে কে কে যাবে?’
হাম্মাদ প্রশ্নের জবাবে জায়াদ বলে, ‘ডেভিড আর আমর মাসাদা যাবে। পরে সবাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দেবো। আজকের মতো মিটিং শেষ।
মাসাদায় শিকারির জালে
ডেভিডের জন্য গাজা সীমান্ত অতিক্রম করা সহজ হলেও আমরের জন্য অত সহজ নয়। সীমান্ত চৌকিতে গিয়ে বিচিত্র সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো তাকে। কী এমন কাজ তার ইসরাইলে। ‘বন্ধুর সাথে ঘুরতে এসেছে’। এমন সহজ উত্তর মানতে রাজি নয় ইসরাইল সীমান্ত চৌকির সেনারা। তারা তাকে গাড়ি তুলে রওনা করলো। ডেভিড কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কি ফিরে যাবে? না ফিরবে না। সেও গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।
‘তুমি কেন? তোমাকে তো ছেড়ে দিয়েছি।’
‘বন্ধুকে রেখে আমি যাবো না।’
‘তবে চলো।’
‘কোথায়?’
‘মাসাদায় আমাদের তদন্ত সেলে।’ মাসাদা শব্দটি শোনার পর ওদের দু’জনের বুকের ভেতর ঢেউ শুরু হলো। কিন্তু কেউ কিছু বললো না। ওরা এখানে আসার আগে শুনেছে, মাসাদায় ইসরাইল একটি টর্চারসেল খুলেছে। সেখানে অনেক নিরীহ ফিলিস্তিনিকে আটকে রেখেছে। তাদের মুক্ত করতে হামাস অভিযান পরিচালনা করবে। কিন্তু তার আগে সেখানকার অবস্থান জানা দরকার।
আমর আর ডেভিড মাসাদায় শিকারির জালে। এ কথা কি গাজী ব্রিগেড জানে?
জায়াদ, হাম্মাদ আর আম্মার জায়েদি এখন আলী মরতুজার পাতাল অফিসে। সেখানে বসে মনিটরিং করছে আমর ও ডেভিডকে। ডেভিডের টি-শার্টের কলারে অপটিক্যাল চিপের মাধ্যমে সচিত্র বার্তা আসছে ওদের কাছে। ওরা ইচ্ছে করেই আমরের কাছে এমন কোনো চিপ রাখেনি। কারণ ডেভিড সন্দেহমুক্ত থাকলেও আমর থাকবে না। এটা ওরা জানে।
এক ঘণ্টার মধ্যে আমর ও ডেভিডকে নিয়ে সেনা জিপটি ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের মাসাদার দফতরে পৌঁছে যায়। ওদের দু’জনকে হাজির করা হয় আইডিএফের মাসাদার দফতরের প্রধান জেনারেল গুনিয়া বেনের সামনে।
‘এই পুচকেরা বলো তোমরা কী করতে...’
‘স্যার, ঘুরতে।‘ ডেভিড বলে।
‘তোমার সাথের মোহামেডান ছেলেটি কে?’
‘বন্ধু।’
‘জানো মোহামেডানরা কখনো বন্ধু হয় না?’
দু’জন সিপাই এসে আমরের চোখ বেঁধে ফেলে। জায়াদ এ দৃশ্য মনিটরে দেখে আম্মার জায়েদির দিকে তাকায়। আমর তাকে আশ^স্ত করে, ‘না ডেভিডের চিপ ধরা পড়ার মতো কোনো মেটালে তৈরি নয়।’
ডেভিড তার মনকে মানাতে পারে না সে আমরের পিছু নেয়। কিন্তু অন্য দু’জন সিপাই তাকে ধরে রাখে।
জেনারেল গুনিয়া বেন সৈনিকদের আদেশ করেন, ‘ওকে ভালো করে চেক করো। তারপর ঘুরে ঘুরে দেখাও ওদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমরা কী কী করছি। আর ওরা কি না আমাদের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব করে বেড়াচ্ছে।’
জেনারেল গুনিয়া বেনের আদেশে একজন ইসরাইলি সেনা অফিসার ডেভিডের সারা শরীর চেক করলো। কিন্তু সন্দেহজনক কিছু পেল না। না পাওয়ারই কথা, কারণ ওর শার্টের কলারে যে চিপটি লাগানো হয়েছে, তার উপাদান ও শার্টের বোতামের উপাদান একই। দেখতে কলারের দুটো বোতামের মতোই দেখাচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ডেভিডকে যত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আম্মার জায়েদি সবকিছু শুধু দেখছেই না রেকর্ড করেও রাখছে।
ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের মাসাদার দফতরটি নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। গুনিয়া বেন একজন দক্ষ জেনারেল। বিশেষ করে গোয়েন্দা কার্যক্রমে তার সুনাম ইসরাইলেই শুধু নয়, আমেরিকা ও ভারতের সেনাবাহিনীর দক্ষ কর্মকর্তারাও তার কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বিশেষ করে ইসরাইলের আধুনিক গোয়েন্দা প্রযুক্তি পেগাসাস যেসব দেশের সরকার ব্যবহার করছে, তাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে পালন করেন। তাদের কমপক্ষে তিন মাস এই মাসাদায় প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এ কারণে জেনারেল গুনিয়া বেন ইসরাইলের মিত্রদের কাছে এক পরিচিত নাম।
ঐতিহাসিক এ দুর্গ মাসাদা ২০০১ সালে ইউনেস্কোর তরফ থেকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করেছে। তাই এখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসেন। তাদের আগ্রহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার আকর্ষণে ২০০৭ সালে মাসাদা মিউজিয়ামের তরফ থেকে এই দুর্গ সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে যেমন সুবিধা আছে, অসুবিধাও কম নেই। সবসময় নিরাপত্তা হুমকি তাড়া করে অবৈধ ইসরাইলি শাসকদের। তাই আরব মুসলমান এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এখানে প্রবেশাধিকার খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেই কঠোরতার জালেই ধরা পড়েছে আমর। ডেভিড বিষয়টি খুব সহজভাবে নিতে পারছে না। আবার বেশি আবেগ দেখালে মিশনের ক্ষতি হতে পারে, এ কথা ভেবে আবেগকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় একজন উগ্র জায়নবাদীর মতো আচরণ করবে।
সে পরম ভক্তির সাথে দুর্গের দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করে। হেলে-দুলে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে থাকে, ‘শুরুতে, ঈশ্বর আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। প্রথমে পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য ছিল; পৃথিবীতে কিছুই ছিল না। অন্ধকারে আবৃত ছিল জলরাশি আর ঈশ্বরের আত্মা সেই জলরাশির ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারপর ঈশ্বর বললেন, ‘আলো ফুটুক!’ তখনই আলো ফুটতে শুরু করলো।’
‘বাহ! তুমি তো খুব ভালো ওল্ড টেস্টামেন্ট জানো।’ সৈনিকদের একজন বলে।
ওকে দুর্গ ঘুরে ঘুরে দেখানোর দায়িত্ব পাওয়া সেনা অফিসার দু’জনের আস্থা অর্জন করতে ডেভিডের খুব একটা কষ্ট হয় না। ডেভিড ইতোমধ্যেই ওদের নাম জেনে গেছে। একজনের নাম বেঞ্জামিন। বেঞ্জামিনের জন্ম ইসরাইলে না। ইউক্রেন থেকে ওর পরিবার ইসরাইলে এসেছে। বেঞ্জামিন যখন হাইস্কুলের ছাত্র, সেই সময় ওরা এদেশে এসেছে। অনেক স্বপ্ন অনেক আশা নিয়ে ওদের পরিবার ইসরাইলে এসেছে। আসার পর থেকেই ওরা দেখছে, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, হিংস্রতা। তাই আজ ওরা হতাশ। ডেভিডের সাথে কথা বলতে বলতে সে তার মনের কষ্টকথাগুলো লুকিয়ে রাখতে পারে না।
সে ডেভিডকে বলে, ‘ইউক্রেনের নাম শুনেছো?’
‘কেন?’ ডেভিড পাল্টা প্রশ্ন করে।
বেঞ্জামিন বলে, ‘খুব সুন্দর দেশ। পৃথিবীর খাদ্যভাণ্ডার। সূর্যমুখীর বাগান মাইলের পর মাইল। কী যে সুন্দর সেই দৃশ্য। আর গম আর ভুট্টার কচিপাতা ভার মাঠ যখন বাতাসে দুলে মনে হয়, সবুজ সাগরে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আহ! বাতাসে ভরা থাকে সবসময় ফুলে গন্ধ।’
ডেভিড বলে, ‘তুমি জানো না, সেখানেও এখন যুদ্ধ চলছে।’
‘যুদ্ধ! যুদ্ধ! আর ভালো লাগে না।’
‘তাহলে কেন তোমরা যুদ্ধ করছো?’
‘তুমি কেন বোকার মতো প্রশ্ন করছো?’
‘ঈশ্বর আমাদের এ ভূমি দান করেছেন, তা উদ্ধার করতে।’
‘ঈশ্বরের দান যুদ্ধ করে কেন উদ্ধার করতে হবে?’
‘কেন আবার মুসলমানরা দখল করে আছে?’
‘মুসলমানরা কি অ্যাডাম-ইভের সন্তান নয়?’
‘তা কী করে হয়?’
‘ঈশ্বর অ্যাডাম-ইভের কিছু সন্তানদের এখানে পাঠিয়েছেন, তোমাকে পাঠিয়েছিলেন ইউক্রেন। কাউকে উচ্ছেদ করে নিশ্চয় ভূমি দখল করতে ঈশ্বর নিশ্চয়ই বলেননি।’
ডেভিডের কথার উত্তরে বেঞ্জামিন বলে, ‘তুমি অনেক ছোট্ট, তাই বুঝতে পারছো না।’
‘হতে পারে, তবে তোমরা কি জানো? তোমরা শুধু মুসলমানদের উচ্ছেদ করছো না, এ ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্র খ্রিস্টানরাও তোমাদের আগ্রাসনের শিকার। আমি তো ইহুদি...।’
এতক্ষণ ওদের দু’জনের কথা শুনছিল বেঞ্জামিনের সহযোদ্ধা আবরাম এবার সে মুখ খুলে, ‘তুমি মাসাদার কাহিনী জানো। এখানে আমাদের পূর্বপুরুষরা কত নির্যাতিত হয়েছে।’
ডেভিড বলে, ‘জানতেই তো এসেছিলাম, দেখতেই তো এসেছিলাম। কিন্তু হলাম বন্দি।’
আবরাম স্মিত হেসে বলে, ‘তুমি তো দেখছি বড্ড বোকা। তুমি বন্দি কে বলেছে?’
‘কে আর বলবে, আমি কি কিছু বুঝতে পারছি না, তুমি মনে করো। আমার বন্ধু আমর...’
‘ওর কথা ভুলে যাও।’
‘তা কী করে সম্ভব।’
‘যত দিন তা সম্ভব না হবে তত দিন ঈশ্বর তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন না।’
‘সারা পৃথিবীই ঈশ্বরের, যাকে তিনি যেখানে বসবাসের জন্য বৈধভাবে ব্যবস্থা করছেন, সেটাই তার জন্য প্রতিশ্রুত ভূমি। তিনি হত্যা, যুদ্ধের...।’
‘আর একটি কথাও নয়, তোমার অনেক পাকামো সহ্য করেছি আর নয়। এবার আমরা কী বলছি মন দিয়ে শোনো।’ আবরামের কণ্ঠস্বর শুনে ডেভিড বুঝতে পারে আর নয়, তাহলে ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে। এখন থেকে সুবোধ বালকের মতো ওদের কথার সাথে হ্যাঁ, হু বলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
‘ঠিক আছে।’
‘এই মাসাদার সাথে জড়িয়ে আছে এক রক্তাক্ত কান্নার ইতিহাস। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দুর্গের সামনে নাটকের মাধ্যমে সেই ইতিহাস পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা হয়। আজ তোমাকে তা দেখানো হবে। তার আগে চলো পুরো মালভূমিটা ঘুরে দেখা যাক।’
বেঞ্জামিন আর আবরামের সাথে ডেভিড বের হয়। কাঠফাটা রোদ। মালভূমির শক্ত শুকনো মাটির ওপর আঁকাবাঁকা দাগ দেখে মনে হয় কোনো শিল্পীর আঁকা ক্যানভাস। মাইলের পর মাইল জুড়ে কোনো জনবসতি নেই। নেই কোনো গাছপালা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মালভূমি। আর তার মাথায় এক প্রাচীন দুর্গ। ইসরাইলের মাসাদা মালভূমির ওপরের এ দুর্গের ঠিক নিচেই যে মাইলের পর মাইল বিস্তারিত ফাঁকা ভূমি- দেখে বোঝার উপায় নেই এটি এক সময় ছিল নীল পানিতে ভরা বিশাল এক সাগর। সময়ের বিবর্তনে তা শুকিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে বিচিত্র নকশা।
‘কী দেখছো?’ আবরাম জানতে চায়?
‘এই বিরান ভূমির এত ওপর দুর্গ কেন?’
‘এত উচ্চতায় এই দুর্গ তৈরি করার পেছনে এক ইতিহাস আছে।’ বেঞ্জামিন উত্তর দেয়।
এবার আবরাম শুরু করে সেই ইতিহাস বর্ণনা, ‘খ্রিস্টপূর্ব ৩০ শতকে শত্রুদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে রাজা হেরাদের আদেশে দুটি দুর্গ তৈরি করেছিলেন। এটি তারই একটি দুর্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই দুর্গে ছিল তিনটি ভাগ। এখনও রয়েছে ভাঙা অস্ত্রাগার, সেনাছাউনি, ধনভাণ্ডার, বিশালাকায় প্রাসাদ ও কুয়ো। ৬৮ খ্রিস্টাব্দে রোমানদের সঙ্গে বিদ্রোহ শুরু হলে একদল ইহুদি যারা ‘জিলট’ নামে পরিচিত, জেরুজালেম থেকে পালিয়ে এই দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। এই দুর্গই হয়ে উঠেছিল তাদের ঘাঁটি। ৭৩ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা এই দুর্গ চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং দীর্ঘ এক বছরের চেষ্টায় মালভূমির পশ্চিম দিকে বিশাল প্রাচীর ও মাটির ঢাল তৈরি করে দুর্গে পৌঁছানোর রাস্তা তৈরি করেছিল।’
‘তারপর?’
‘এক করুণ কাহিনী। দুর্গে বসবাসকারী ইহুদিরা রোমানদের হাতে আত্মসমর্পণের বদলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন এবং একে একে সবাই দুর্গের ছাদ থেকে ঝাঁপ দেন। কেবলমাত্র দু’জন মহিলা ও পাঁচজন শিশু বেঁচে ছিল বলে জানা যায়। ইহুদিদের এই আত্মহত্যার ঘটনাকে আজও সাহস, বীরত্ব ও শহিদের গৌরব এবং স্মৃতি বলে মানা হয়।’
‘অন্য দুর্গটি কোথায়?’
‘রোমানদের আক্রমণে আগুনে পুড়ে একটি দুর্গ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় দুর্গটির গায়েও বহু আঘাতের চিহ্ন আজও দেখতে পাওয়া যায়। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময় অবধি মাসাদা রোমানদের দখলে ছিল। এই সময়ই দুর্গের ভেতরে ওরা গির্জা তৈরি করেছে।’
‘এখানে আর কী আছে?’
‘এখানে আছে রহস্যময় ইওরাম গুহা। মাসাদা মালভূমির ১০০ মিটার নিচে ইওরাম গুহা। যেখানে সেই সময়ে ঢোকা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই গুহায় পাওয়া গেছে বহু গাছ। যেখানে সূর্যের আলো ঠিকভাবে পৌঁছায় না, সেখানে এত বছর ধরে গাছগুলো প্রায় আলো ও পানি ছাড়া কীভাবে বেঁচে ছিল সেটা এক রহস্য। এই গুহাতেই খোঁজ মেলে বার্লির বীজের, যার বয়স ৬০০০ বছর। এই বীজের ওপরেই গবেষণা চালিয়ে বার্লির আদি রূপের খোঁজ মেলে। কোনো জংলী বীজ নয়, জানা যায় এই ধরনের বার্লির চাষ ১০ হাজার বছর আগে করা হতো জর্ডান রিফ্ট উপত্যকায়।’
‘এগুলোর খোঁজ পেলে কীভাবে?’
‘হ্যাঁ। সবই প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। ১৮৩৮ সালে এডওয়ার্ড রবিনসন ও এলি স্মিথ প্রথম আবিষ্কার করেন মাসাদা উপত্যকা। স্যামুয়েল অলকট ও বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ডব্লু টিপিং প্রথম বার মাসাদা মালভূমিতে চড়তে সক্ষম হন। এরপর পুরাতত্ত্ববিদ সামারা গাটম্যানের নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালে প্রথম খনন শুরু করা হয়। ১৯৬৩-৬৫ সালে মাসাদা উপত্যকার খননকার্য শেষ হয়। জানা যায়, চরম শুষ্ক আবহাওয়ার জন্য প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এই উপত্যকায় কোনো জনমানুষের বসবাস ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে খননকার্যের মাধ্যমে এই দুর্গের বেশ কিছু বাড়ি, রাজা হেরাদের দুই প্রাসাদের ছবি, রোমান শৈলীতে তৈরি স্নানাগার, সিনাগগ উদ্ধার করা হয়।’
‘আর কী আছে?’
‘আরো আছে এক বিশালাকার কুয়ো। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব পূরণে এই বিশাল কুয়ো বানানো হয়েছিল। যেখানে পানি আনা হতো নিচের ‘ওয়াদি’ থেকে বানানো নালির মাধ্যমে। নিচের শুকনো উপত্যকায় যখন বর্ষাকালে পানি আসতো, তখন এই নালির মাধ্যমেই কুয়োয় এসে পানি জমতো। এই পানি বছরের বাকি সময় ব্যবহার করা হতো।’
ওরা তিনজন হাঁটতে হাঁটতে দুর্গের কাছাকাছি চলে এসেছে। দুর্গে ওঠার সিঁড়ির কাছে এসে ডেভিড জানতে চায়, ‘এখানে এমনভাবে মাটি কেটে ঢালু বানানো হয়েছে কেন?’
বেঞ্জামিন উত্তর দেয়, ‘এটি রোমানদের তৈরি। মাটির প্রাচীর, দুর্গে ওঠার ঢাল। বর্তমানে আমরা যে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছি এটি নতুন বানানো হয়েছে। তবে ইতিহাস অবিকৃত রাখতে এই মাটির ঢালু সিঁড়ি অক্ষত রাখা হয়েছে। দুর্গের নিচে তৈরি রোমানদের ৮টি সেনা শিবির ও আক্রমণের জন্য তৈরি ঢাল আজও সংরক্ষিত রয়েছে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই। এই স্থাপত্যগুলো দেখে পরিচয় পাওয়া যায় সেই সময়ের উন্নত কৌশল পদ্ধতির। ইউনেস্কোর তরফ থেকে ২০০১ সালে এই দুর্গ ও দুর্গের নিচের সৈন্য শিবিরগুলোকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।’
‘আচ্ছা। এটি সিনাগগ?’
‘হ্যাঁ। সিনাগগের ভেতরে পাওয়া গিয়েছে একটি মাটির পাত্রের টুকরো। যেখানে বেশ কিছু অক্ষর খোদাই করা ছিল। একে পুরাতত্ত্বের পরিভাষায় ‘ওস্ট্রাকন’ বলা হয়। এ ছাড়াও ‘ডিওটারনমি’ যা খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্টের পঞ্চম ভাগ এবং ‘বুক অব এজেকেই’ এই সিনাগগেরই মাটির নিচ থেকে পাওয়া যায়। যদিও এই পুঁথিগুলো মাটির নিচে পুঁতে রাখার কারণ আজও অজানা।’
‘আর কী পাওয়া গেছে?’
‘দুর্গের মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় ২৮টি কঙ্কাল, যার মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ২৮টির মধ্যে ২৫টি গুহার ভেতর এবং দুটি পুরুষ ও একটি নারীর কঙ্কাল স্নানাগার থেকে উদ্ধার করা হয়। নারী কঙ্কালের শুধুমাত্র মাথা উদ্ধার করা হয়েছিল। পুরুষ কঙ্কালগুলোও অসম্পূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যায়। মনে করা হয়, যারা পালাতে পারেননি, তাদের নৃশংসভাবে বলি দেয় রোমানরা। এই দুর্গ থেকেই পাওয়া যায় এক প্রাচীন খেজুরের বীজ, যার বয়স ২০০০ বছর। এই বীজ বপন করা হলে তার থেকে অঙ্কুরোদগমও হয়, যা পৃথিবীর সব থেকে প্রাচীন বীজের অঙ্কুরোদগম হিসাবে রেকর্ড গড়ে। মাসাদা উপত্যকা ও দুর্গে যাওয়ার জন্য দুটি পথ আছে। প্রথমটি পূর্ব দিকে সর্পিল পায়ে হাঁটা পথ, যা ডেড সি-র ওপর দিয়ে যায়। পশ্চিম দিকে রোপওয়ের মাধ্যমেও মাসাদায় পৌঁছানো যায়।’
ওদের সাথে অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছে ডেভিড। কিন্তু ওর মনে একটাই চিন্তা কেমন আছে বন্ধু আমর? কোথায় আছে? ওর সাথে কেমন ব্যবহার করা হচ্ছে? আবরামের কথায় ডেভিডের চিন্তায় ছেদ পড়ে, ‘বিকেলে লেজার লাইট ও সাউন্ড শো এবং রাতে থিয়েটার আছে।’
‘কী দেখনো হবে?’
‘যেখানে মাসাদা দুর্গের ইতিহাস অভিনয় করে দেখানো হয়।’
‘আমার বন্ধু আমরকে কি সেখানে দেখতে পাবো?’
‘রিমান্ড শেষে সন্দেহ মুক্ত হলে দেখতে পাবে।’
‘যদি সন্দেহজনক কিছু পাওয় যায়?’
‘তাহলে হয় তো আর কোনোদিনই দেখতে পাবে না।’
‘কী বলো?’
‘যা বলছি সত্যি বলছি, আর ভুলে যাবে না ওরা কোনোদিন আমাদের বন্ধু ছিল না।’
‘কেন?’
‘এত প্রশ্ন করে নিজের বিপদ ডেকে এনো না।’ বেঞ্জামিনের ধমকে ডেভিড চুপ হয়ে যায়।
(এই উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। যদি ঘটনা বা চরিত্রের সাথে
মিলে যায় তা কাকতালীয়। - লেখক)
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]
আরও পড়ুন...