ভাইরাস

রহস্য গল্প খন্দকার নূর হোসাইন এপ্রিল ২০২৬

‘আরে আস্তে চালা! পড়ে যাচ্ছি তো!’ খেঁকিয়ে উঠল নাহিল।

‘ধরে বসে থাক। আজও ফিরতে দেরি হলে মা খুব মারবে।’ জবাবে বলল আদিল।

ক্রিকেট ম্যাচ শেষ করে বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে ওদের। ইতোমধ্যে মাগরিবের সময় পার হয়েছে। আজ আর কোনোভাবে মাকে বোঝানো যাবে না। তাই ভাঙা আর উঁচু-নিচু রাস্তার পরোয়া করছে না আদিল। সাইকেলের পেছনে বসে বেহাল অবস্থা নাহিলের। তীব্র শব্দে বেজে উঠল সাইকেলের ক্রিড়িং ক্রিড়িং বেল। জঙ্গলের রাস্তায় আবছা আলোয় সামনে কাউকে দেখা গেল। রাস্তা পার হচ্ছে। দূরত্ব খুবই কম। ব্রেক কষতে গিয়ে মনে পড়ল-দুদিন হলো ব্রেক নষ্ট হয়ে আছে। সাইকেলের হ্যান্ডেল ডানে সরিয়ে দিলো আদিল। শেষ রক্ষা হলো না। লোকটাকে মেরে দিলো সে। সাইকেলসহ দুজন পড়ে গেল রাস্তায়। উপুড় হয়ে রাস্তায় পড়ে গেছে অচেনা লোকটা। হাত থেকে ছিটকে পড়েছে একটা বাক্স। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার শব্দ পাওয়া গেল।

উঠেই তেড়ে গেল নাহিল, ‘এই মিয়া, দেখেশুনে চলতে পারেন না? দিলেন তো পোশাকটা নষ্ট করে।’

‘শাটআপ,’ ঠাণ্ডা কিন্তু কঠোর স্বরে বলল লোকটা। বাক্স হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে। ‘এটা সাইকেল, বাইক না। তোমাদের বেপরোয়া গতির জন্য আমার কিছু যন্ত্র ভেঙেছে।’

আদিল একদৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকিয়ে আছে। অপরিচিত লোক। বেশ অদ্ভুত। একই স্থানে আগেও পাঁচবার দেখেছে লোকটাকে। নাহিলের সাথে তর্ক করেই যাচ্ছে লোকটা। আদিল এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনার বাক্সে কী এত দামি জিনিস ছিল?’

থেমে গেল লোকটা। আর কোনো কথা না বলে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল।

‘ব্যাপারটা অস্বাভাবিক না?’ স্বগতোক্তির মতো বলল আদিল। জঙ্গলের দিকে দুধাপ এগিয়ে গেল সে।

‘এই আদিল, কী হলো তোর? কোথায় যাচ্ছিস?’

‘লোকটার গতিবিধি সুবিধার ঠেকছে না। আগেও তাকে এ রাস্তায় দেখেছি। আশেপাশের কোনো গ্রামের লোক না সে। চল পিছু নিয়ে দেখে আসি কোথায় যায়।’

‘কী যা তা বলছিস? তোর না দেরি হলে মা বকবে?’

‘এটা তার চেয়েও জরুরি। দেখছিস না, গ্রামে অজানা এক ভাইরাস অ্যাটাক করেছে। আমি নিশ্চিত, লোকটার বাক্সে কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছিল। নতুন ভাইরাসের সাথে এর যোগাযোগ থাকতে পারে।’

নাহিল কিছু বলল না আর। বাইসাইকেলটা ঝোপের মধ্যে রেখে জঙ্গলে নেমে পড়ল ওরা।

লতাপাতা নেই বলে দ্রুত এগোতে পারছে। নিঃশব্দে প্রায় দৌড়ে চলল দুই কিশোর। আবছা আলোয় সামনে কারো অবয়ব দেখে চলার গতি কমিয়ে দিলো। সেই লোকটা! হাতে বাক্সটা ধরে রেখেছে বলে দ্রুত এগোতে পারছে না। পথচলা দেখে বোঝা যায়-এ পথে নিয়মিত যাতায়াত আছে তার। দশ মিনিট পর বনে পুরো অন্ধকার নেমে এলো। আগন্তুক লোকটা একটা বাড়ির সামনে এসে থেমে গেল। বনের এ দিকটায় ওরা আসেনি আগে। অদ্ভুত বাড়িটা। ভেতর থেকে মৃদু আলো আসছে। চারপাশ ঘুরে দেখল ওরা। সবগুলো দরজা-জানালা বন্ধ। ‘চল, ভেতরে ঢুকি!’ আদিল প্রস্তাব দিলো।

‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?’ নাহিল চাপা গলায় বলল, ‘ভেতরে ঢুকে যদি বেরুতে না পারি?’

‘তুই বুঝতে পারছিস না, পুরো গ্রাম বিপদের মুখে আছে।’ আদিলের চোখে দৃঢ়তা।

ওরা লোকটাকে গেইট পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে দেখল। দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিক করে বন্ধ হয়ে গেল।

বাড়ির পেছনের দেওয়ালটা কাঠের। নিচে ঘাসের মধ্যে একটি ঢাকনা দেখা গেল। পাতাল দরজা! সাবধানে সেটা সরিয়ে ফেলল ওরা। ভেতরে সরু রাস্তা। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল ওদের। ভেতরে ঢুকে ঢাকনাটা আবার বন্ধ করে দিলো। হামাগুড়ি দিয়ে একটি সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেল ওরা। সিঁড়ির মাথায় দরজা। ঠ্যালা দিয়ে খুলে ফেলল। ভেতরে নানা রঙের তরল পদার্থে ভর্তি বোতল, টেস্টটিউব আর কাচের বড় বড় বালতি। মসৃণ দেওয়াল। গুমোট একটা গন্ধ নাকে আসছে।

‘এটা তো পুরো ল্যাব!’ ফিসফিস করে বলল আদিল।

বিপরীত দরজার ওপাশে কারো পদশব্দ পাওয়া গেল। ওরা একটা টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ল। দরজা খুলে ঢুকল সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন টাকমাথা লোক। সঙ্গে আরও দুজন। একজন বনে দেখা সেই লোক।

‘স্যার, বাইরে থেকে আওয়াজ পেয়েছিলেন?’ বনের লোকটা জিজ্ঞেস করল। ওরা বিজ্ঞানীর সহকারী।

‘ওটা সাইকেলের শব্দ ছিল।’ বিজ্ঞানী লোকটার রক্ত হিম করা ঠাণ্ডা গলা। ‘আজ অনেক কাজ করতে হবে।’

‘চিন্তা নেই স্যার। পাশের রুমে প্রতিষেধক তৈরির ফরমুলাটা রেডি আছে।’ আরেকজন বলল।

নাহিলের চোখ কপালে। ‘ভাইরাসটা ওরা কি ইচ্ছে করেই ছড়িয়েছে?’ কাঁপা গলায় ফিসফিস করল সে।

আদিল চুপ করে টেবিলে রাখা বক্সের দিকে তাকিয়ে আছে। ঢাকনা খুলল লোকটা। ভেতরে কয়েকটা টেস্টটিউব, প্রতিটাতে কালচে-সবুজ তরল। ‘যাক, দুটো ভাঙলেও কাজ চলবে।’ হাসল বিজ্ঞানী, ‘আজ সফল হলে কেউ থামাতে পারবে না আমাদের।’

ছেলেরা বুঝল, এ লোক সাধারণ বিজ্ঞানী নয়-একজন অপরাধী। বিজ্ঞানী তার সহকারীদের তিনটা টেস্টটিউব নিতে বলল। একটা টেস্টটিউব থেকে সাদা ধোঁয়া উড়ছে। অর্থাৎ সময় খুব কম। ধোঁয়া মানেই পরীক্ষা করবে এখন।

‘কিছু একটা করে ওদের মনোযোগ সরাতে হবে।’ নাহিল বলল ফিসফিস করে।

আদিল একটা লোহার রড পেল টেবিলের পাশে। সেটা টানতে গিয়ে পাশের একটা বোতলে বাড়ি লাগিয়ে দিলো। নীরব পরিবেশে বিকট শব্দে কাঁচ ভাঙল। তিনজন বিজ্ঞানী চমকে উঠল।

‘কে ওখানে!’ চিৎকার করে উঠল একজন। ছুটে এলো টেবিলের দিকে। আদিল নাহিলকে টেনে নিয়ে পাশের দরজা পেরিয়ে এলো। ওটা একটা স্টোররুম। ভেতরে অন্ধকার, ক্ষীণ আলোয় লোহার দরজা দেখা গেল। বাইরে বেরোনোর পথ। ওরা দরজায় ধাক্কা দিলো। খুলল না। অন্যপাশ থেকে লক করা।

পেছন থেকে এগিয়ে এলো ভারী পদশব্দ। ‘পালাতে পারবে না বিচ্ছুরা!’ বনে দেখা লোকটার হাতে টর্চ আর পিস্তলের মতো কিছু।

‘দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন, আমরা ভুল করে ঢুকে পড়েছি,’ কাঁপা গলায় বলল নাহিল।

‘ভুল করে ঢুকেছ?’ কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল লোকটা, ‘তাহলে এই ভুলের মূল্য দিতে হবে।’

আদিলের চোখ কিছু খুঁজছিল। পেয়ে গেল একটি ধাতব পাত্র। হাতে নিয়েই ছুঁড়ে মারল লোকটার দিকে। অব্যর্থ নিশানা। হাঁটুতে লেগে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল সে। ওরা পাশের দরজার দিকে দৌড় দিলো। এপাশে নতুন একটি কক্ষ। একটিমাত্র দরজা ভেতর থেকে আটকে দিলো ওরা। কিছু সময়ের জন্য এখানে নিরাপদ থাকবে। এরমধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজতে হবে। ডেক্সে তিনটি কম্পিউটার। ওদের সাথে মোবাইল নেই। হঠাৎ কম্পিউটারের পাশে একটা ওয়াকিটকি দেখতে পেল আদিল। ‘এটা দিয়ে যোগাযোগ করা যায় কি?’

‘হ্যাঁ, চেষ্টা কর!’

ওয়াকিটকিটা অন করলে ঘড় ঘড় শব্দ করল। আদিল বোতাম টিপে সিগন্যাল পাঠিয়ে দিলো। কোনো উত্তর এলো না। কিন্তু সিগন্যালের আলো একবার ঝলকে উঠল।

‘হয়তো ধরেছে কেউ!’ বলল নাহিল।

ওদের অবাক করে দিয়ে পেছন থেকে শোনা গেল বিজ্ঞানীর ঠাণ্ডা গলা, ‘তোমরা ভেবেছ, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করলেই পার পেয়ে যাবে?’ গোপন একটি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রধান বিজ্ঞানী। চোখে ভয়ংকর দৃষ্টি। ‘আমার কাজে নাক গলালে তার ফল ভালো হয় না।’ সে পকেট থেকে একটা রিমোট বের করল। ‘আমাদের এখানকার কাজ শেষ। এই ল্যাব এখন টাইমার মোডে আছে। ২০ মিনিট পর সব ধ্বংস হবে, সাথে তোমরাও। গুড লাক ইয়াং বয়েজ!’ কথা শেষ করেই সে দরজা বন্ধ করে দিলো।

মরিয়া হয়ে দুজন মিলে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, কিন্তু এক চুলও নড়াতে পারল না। ওদিকে সময় গড়াচ্ছে।

‘যেভাবেই হোক আমাদের বেরোতে হবে। ভাব! উপায় বের কর!’ চিৎকার করে বলল নাহিল।

ওপরে লোহার জালের ওপারে ভেন্টিলেশন বক্স দেখতে পেল আদিল। ওদিক দিয়ে বাতাস ঢুকছে। বেশ উঁচুতে। নিচে একটা চেয়ার রেখে নাহিল সেটায় উঠল। জালটা ধাক্কা দিয়ে নড়াতে পারল না। আদিল একটি লোহার বার খুঁজে নিয়ে দুই বাড়িতে জালটা ছিঁড়ে ফেলল। ঘড়িতে তখন ১২ মিনিট বাকি। জালটা মাঝখান থেকে ছেঁড়ার পর বাকি কাজ সারতে আরও ৮ মিনিট চলে গেল। আর মাত্র ৪ মিনিট সময় আছে। বাইরে থেকে বাতাস আসছে। বাইরে বেরিয়ে আসতে আরও ২ মিনিট চলে গেল। অন্য পাশটা ছাদের কোণে। মুক্ত বাতাসে চলে এলো ওরা। দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। সত্যিই ওদের ওয়াকিটকির সিগন্যাল ধরা পড়েছে! তাড়া দিলো আদিল, ‘ছাদ থেকে লাফ দে!’

‘উঁচু না?’

‘তবু নামতে হবে!’

দুজন মাটিতে পড়ল গড়িয়ে। নরম ঘাসে খুব বেশি ব্যথা পেল না। ‘শয়তানগুলোকে আটকাতে হবে!’ বলল আদিল।

বাড়িটার উলটো পাশে ছুটে গেল ওরা। ট্রাকে উঠে পড়েছে বিজ্ঞানীর খুদে দলটা। স্টার্ট দিয়ে গেইট পেরিয়ে গেল। পিছু পিছু চলল দুই কিশোর। জঙ্গল থেকে বেরোনোর রাস্তার মুখে দেখা গেল পুলিশের গাড়ি। বিজ্ঞানীর হাতে পিস্তল। পুলিশের লাউডস্পিকারে ভেসে এলো-‘অস্ত্র ফেলুন! পুরো জায়গা ঘিরে ফেলা হয়েছে!’

সহকারী দুজন আত্মসমর্পণ করল। ট্রাক থেকে নেমে প্রধান বিজ্ঞানী দৌড়ে জঙ্গলে ঢুকতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন আদিল তার সামনে এসে দাঁড়াল। ‘আপনার দৌড় এখানেই শেষ, মিস্টার!’

এমন সময় বিস্ফোরণের শব্দ-ধুঁউউউম! পুরো বাড়িটা উড়ে গেল।

হা-হা-হা করে হেসে উঠল দুষ্ট বিজ্ঞানী। ‘ভাইরাসের প্রতিষেধকও শেষ!’

পকেট থেকে একটি পেনড্রাইভ বের করল আদিল। ‘এই যে মিস্টার, ফরমুলাটি আমি হাতিয়ে নিয়েছি।’

হাসি মিলিয়ে গেল বিজ্ঞানীর। ক্রোধে ফেটে পড়ে তেড়ে এলো ওর দিকে। দুজন পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধরে ফেলল তাকে।

‘তোমরা ঠিক আছ?’ একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলো।

‘হ্যাঁ, কিন্তু স্যার, ওকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আপনার। দেরি করে বাড়ি ফিরলে মায়ের পিটুনি নিশ্চিত!’ আদিলকে দেখিয়ে বলল নাহিল।

হাসির রোল পড়ে গেল। হেসে উঠল আদিলও।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ