ইউরিস

সাইন্স ফিকশন তানজিদা নূর চৌধুরী ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে অবস্থান করছিলেন ড. তালহা। পৃথিবীর টিকিট কেটে অনেকক্ষণ ধরেই হাওয়ায় উড়ছেন। ড. তালহার কাছে অন্য কিছু বিরক্তিকর না হলেও অপেক্ষা করা খুবই বিরক্তিকর। কিন্তু আজ আর তেমন বিরক্ত হচ্ছেন না। কারণ স্পেসশিপ এসে গেলেই চলে যাবেন পৃথিবীতে। সেখানে তো আর ওড়া যায় না, তাই। অবশেষে ৪৫ মিনিট দেরি করে আসলো নিউ হরিজন স্পেসশিপ।

চোখের পলকেই চলে এলো পৃথিবীতে। এতদিন পর নিজস্ব পরিমণ্ডলে এসে যেন স্বস্তির নিশ্বাস নিলেন ড. তালহা। চারিদিকে সবুজে ঘেরা ছোট্ট ব-দ্বীপ, ওপরে নীল আকাশ। আল্লাহ যেন প্রকৃতির সব রূপ ঢেলে দিয়েছেন পৃথিবীর এই ছোট্ট ভূমিতে।

যাহোক, আর সময় নষ্ট করলেন না ড. তালহা। পা বাড়ালেন ঢাকার ঞঘঈ ঞড়বিৎ-এর নবম ফ্লোরের দিকে। সাথে করে নিয়ে চললেন ইউরেনাস থেকে নিয়ে আসা ‘ইউরিস’কে।


২.

ফাইলপত্র আর একগাদা মেডিসিন হাতে দ্রুত ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ করলেন ড. তানজিল। এতদিনে ইউরিসকে নিয়ে চালিয়ে যাওয়া গবেষণা অনেকটাই এগিয়ে গেছে ওদের। এবার আরও কিছু রিসার্চের জন্য ইউরিসকে জাগাতে হবে। বেচারা ইউরিসকে ইউরেনাসেই মেডিসিন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর এখনো সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মনে হচ্ছে রাতের ঘুম এখনো শেষ হয়নি। ওর মায়াবী ঘুমন্ত মুখ দেখে ড. তানজিলের মনে পড়ল মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী, “আমি ঘুমকে তোমাদের জন্য শান্তির উপায় বানিয়েছি।”

ড. তালহা ইউরিসের শরীরে কিছু দরকারি মেডিসিন প্রয়োগ করলেন। কিছুক্ষণ পর ইউরিস জেগে উঠল। তার ৫৬ পস দৈর্ঘ্যরে চিকন দেহ আর বড় বড় দুটো চোখ। কেমন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ড. তালহা ও ড. তানজিলের দিকে। ওরা দুজনেই তার দিকে দৃষ্টিপাত না করেই তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন।


৩.

ইউরিস জেগে ওঠার পর মনে হচ্ছিল অনেক ফ্রেশ। তবে এখন রাগে আর ক্ষোভে গজগজ করছে। ওর চিকন দেহে এমন রাগী চোখের চাহনি দেখে হাসি পায় ড. তালহার। ড. তালহার মুচকি হাসি দেখে রাগটা আরও বেড়ে যায় ইউরিসের। চেঁচিয়ে উঠে কিছু বলতে যায়, কিন্তু একি? ইউরিস কথা বলতে পারছে না! ইউরিস বুঝতে পারে এটা এই পৃথিবীবাসীর কাজ। এবার পৃথিবীবাসীদের ভীষণ ভয় পেয়ে যায় ও। দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে মনে মনে আওড়াতে থাকে আগের রাতের সব কথা।

মায়ের বকুনি খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ইউরিস। তার বাড়ি থেকে একটু দূরেই বরফের পাহাড়। সে পাহাড়ের গাঘেঁষে হেলেদুলে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ চোখের সামনে অদ্ভুত একটি মহাকাশযান দেখতে পায়। কৌতূহলী হয়ে সামনে এগোতেই যানটির দরজা খুলে যায়, আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে প্রায় ৫ ফিট ৮ ইঞ্চির একটি দু-পেয়ে প্রাণী। এমন প্রাণী সে আগে কখনোই দেখেনি। তাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে পা থেকে মাথা অবধি দেখতে লাগল। লম্বাটে চেহারায় প্লাস্টিকের গ্লাসের মতো চোখ দিয়ে ইউরিসের দিকেই তাকিয়ে আছে লোকটি। ইউরিস বুঝতে পারল, ওটা ভিনগ্রহের প্রাণী। লোকটি তার লম্বা চওড়া একটি হাত উঠিয়ে নিজের চোখ দুটো খুলে হাতে নিল। হতভম্ব হয়ে ইউরিস তাকিয়ে থাকল।

এ কি লোকটার চেহারায় আরও দুটো চোখ! ওহো তার মানে আগের চোখ দুটো নকল! মনে মনে ভাবে ইউরিস। এ আবার কোন আজব প্রাণী? ও এবার বিরক্ত হয়ে তাকাল লোকটির দিকে। ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে। এমনিতেই মন খারাপ করে বাসা থেকে বাইরে এসেছে, এর মধ্যে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে দুই পায়ের অজানা প্রাণী।

দাদুর মুখে গল্প শুনেছিল ও, পৃথিবীবাসীদের আকৃতি নাকি এমনই হয়। সেখানে কিছু দুই পা-ওয়ালা প্রাণী নাকি চার পা-ওয়ালাদের গিলে খায়। ওদের জন্যই তো পৃথিবীতে এত অশান্তি, অনিয়ম আর যত বিশৃঙ্খলা। পৃথিবী প্রায় ধ্বংসের পথে।

ইউরিস ভাবে, এই লোকটা যদি পৃথিবীরই হয়, তাহলে ইউরেনাসে কী করছে? কী করে এলো? কেন এলো? আমাদের ইউরেনাসে অশান্তি সৃষ্টি করতে?

এসব ভেবে ভয় পেয়ে গেল ও। দৌড়ে পালাতে যাবে ঠিক এমন সময় কথা বলে উঠল লোকটা, ‘আসসালামু আলাইকুম, ইউরিস।’

থমকে দাঁড়াল ইউরিস। এ তো সুন্দর সম্ভাষণ! দাদুর মুখে শোনা পৃথিবীবাসীর গল্পগুলো মিথ্যে মনে হলো ওর।

নাহ! লোকটির কথায় এভাবে গলে গেলে চলবে না। মনে মনে ভাবে ও। লোকটি আবার কিছু বলার আগেই ইউরিস চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই পাজি লোক! কেন এসেছ এখানে? তোমাদের গ্রহটাকে একেবারে নষ্ট করে ফেলেছ, আর এখন আমাদের গ্রহের দিকে নজর পড়েছে? কী ভেবেছ? আমরা ছেড়ে দেবো?’

ইউরিসের কথা আটকে দিয়েই লোকটি বলে উঠল, ‘নো-নো-নো, মি. ইউরিস, আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে এখানে আসিনি। শোনো, আমি ড. তালহা। একটা জরুরি এক্সপেরিমেন্টের জন্য তোমার মতো জেন্টলবয়েরই তো হেল্প দরকার আমাদের। তুমি আমাদের সাহায্য করতে রাজি আছ, তাই না ইউরিস?’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ইউরিসের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ড. তালহা।

ইউরিসকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তার চওড়া হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। মাটির সাথে লেগে থাকা তার ছোট্ট দেহটা প্রায় ৫ ফুট উঁচুতে উঠে গেল। এবার জোরে জোরে চ্যাঁচাতে লাগল ইউরিস, ‘ছেড়ে দে আমাকে, পাজি ড. ছেড়ে দে...।’

নিজেকে আর ছাড়িয়ে নিতে পারল না ও। এক মজাদার সুগন্ধ নাকে পৌঁছালে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।


৪.

অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এলো ইউরিস। অনেক ফ্রেশ মুডেই ঘুম থেকে উঠেছিল ও। ভেবেছিল, স্বপ্ন দেখছে এতক্ষণ। কিন্তু আড়মোড়া ভাঙতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল চারিদিকে কাচের দেওয়াল বিশিষ্ট চারকোনা বাক্সের ভেতর। 

বুঝতে বাকি রইল না ও এখন পৃথিবীতে অবস্থান করছে। ওই ডক্টরদের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে ওর। কিন্তু কীই-বা করবে ও। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে গোটা এক্সপেরিমেন্ট রুমে চোখ বোলাতে লাগল ও। 

দূরে থাই গ্লাসের ওপারে দুটো ছায়া দেখতে পাচ্ছে ইউরিস। ওরা আর কেউ নয়, ড. তালহা ও ড. তানজিল।  ভেতরে আরও কিছু লোক আছে হয়তো।

ইউরিস এবার কিছুটা সাহস নিয়ে মনে মনে ভাবে, ওরা আমাকে তুলে এনেছিল গতকাল রাতে, আর এখন তো সকাল হয়ে গেছে। আর কতক্ষণ এক্সপেরিমেন্ট করবে? কিন্তু ওর এসব ধারণা একেবারেই ভুল প্রমাণ করে দিলো পাশেই ফেলে রাখা ডেক্স ক্যালেন্ডারটি। ওকে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল ২ মার্চ, ২০২০, আর ক্যালেন্ডারটা বলছে, এখন ৯ জুন, ২০২৫। প্রায় ৫ বছর হতে চলল তার ইউরেনাস থেকে পৃথিবীতে আসা। 

এবার কান্না পেল ইউরিসের। আর কী মুক্তি পাবে পৃথিবীবাসীদের হাত থেকে? ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল ওর। চিৎকার দিয়ে কথা বলতে শুরু করল ও। আগে কথা বলতে না পারলেও এখন ভালোই বলতে পারছে।

‘আমাকে ছেড়ে দাও! আর কতক্ষণ আটকে রাখবে?’ অনর্গল প্রশ্ন করে যেতে লাগল ইউরিস।

ড. তানজিল এগিয়ে এলেন ইউরিসের দিকে। মোলায়েম স্বরে বললেন, ‘ইউরিস, আমাদের সবুজ পৃথিবীতে তোমাকে স্বাগত। দুঃখিত, তোমাকে এভাবে নিয়ে আসার জন্য।’

ইউরিস কী বলবে কিছুই বুঝতে পারল না। ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর এই প্রথম ওরা কথা বললেন ওর সাথে। ড. তানজিল জানালেন, ‘ইউরেনাসের পরিবেশ ও আবহাওয়া নিয়ে, সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের ওপর সেই পরিবেশের প্রভাব-এ সবকিছুর ওপর গবেষণা করার জন্য ইউরিসকে এখানে আনা হয়েছে। কাজ শেষে আবার ইউরেনাসে দিয়ে আসবে। ইউরিসের কোনো ক্ষতি করা হবে না এখানে।’

এবার ইউরিস কিছুটা শান্ত হলো। বুঝতে পারল, এই পৃথিবীবাসীদের বাধা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। তাই নিজের ভাগ্যের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকল ইউরিস।

বিশাল ল্যাবরেটরি রুমের চারিদিকে জটিল যন্ত্রাংশে ঠাসা। একঘেয়ে লাগছে ইউরিসের। তার চোখ পড়ল ডান দিকে বড় বন্ধ জানালার গ্লাসের ওপারে।

সুয্যিমামা সকালের সোনালি রোদ বিলিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর গায়ে। চারিদিকে সবুজ গাছপালা আর বড় বড় দালানকোঠা। পৃথিবীর আকাশ নীল, এর মধ্যে সাদা মেঘ উড়ে বেড়ায়। বিমুগ্ধ হয়ে দেখছে ইউরিস। এখানে ছোট্ট ছোট্ট প্রাণীরা ঠিক মহাকাশযানের মতোই ডানা মেলে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে।

হঠাৎ নড়াচড়ার শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়ল। ওর দিকেই এগিয়ে আসছেন ড. তানজিল। যন্ত্রাংশে ভর্তি কাচের বাক্সটিসহ তুলে ধরলেন তাকে চোখের সামনে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পর প্রবেশ করলেন ড. তালহা। চারিদিকে যন্ত্রাংশ দিয়ে সাজানো বেডে শুইয়ে দিলেন ইউরিসকে। তারপর বেড ল্যাবরেটরি রুমের জটিল যন্ত্রের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন।  

বুকে, বাহুতে ও পিঠে সুচের মতো কিছু বিঁধে গেল। ব্যথায় ককিয়ে উঠল ইউরিস। বিশেষ মেডিসিনের প্রভাবে আবার ঘুমিয়ে পড়ল ও।


৫.

পৃথিবীতে উৎসবমুখর পরিবেশে সেলিবব্রেশন হচ্ছে। পৃথিবীর সকল গবেষক আনন্দিত।

ইউরেনাস থেকে নিয়ে আসা ইউরিসের ওপর চালিয়ে যাওয়া এতদিনের প্রজেক্ট সম্পূর্ণভাবে সাকসেসফুল হয়েছে। আজই ইউরিসকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ইউরেনাসে। ঘুমন্ত ছোট্ট ইউরিসকে আলতো করে তুলে দেওয়া হলো স্পেসশিপে।

ইউরিসের চলে যাওয়ার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ড. তালহা ও ড. তানজিল। দুজনের চোখে-মুখেই খুশির আলোকচ্ছটা। ভাবলেন মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে কি কোনো কিছুই অসম্ভব থাকতে পারে?

কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ