টম্যাটো অব মার্স
সাইন্স ফিকশন শারমিন আক্তার জুন ২০২৬
কিশোর নিকোলাই বাবার ল্যাবের রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ টেকনোলজি সেকশনের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। তার চোখ নিবদ্ধ বাবার কাজে। ছোটবেলা থেকেই বাবার ল্যাবে যাতায়াত, তাই বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি তার আগ্রহ গভীর।
নিকোলাই অ্যাস্ট্রোনমির ছাত্র, কিন্তু তার স্বপ্ন আরও বড়-সে হতে চায় একজন অ্যাস্ট্রোবোটানিস্ট, যে মহাকাশে উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করবে।
তার বাবা, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ড. ব্রুস, টম্যাটো থেকে লাইকোপেন ও ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান নিয়ে গবেষণা করছেন। তার কাজ ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে বিশ্বজুড়ে।
একদিন লিথুয়ানিয়ায় তাদের ল্যাবে আসেন বাংলাদেশের স্পারসো (ঝঢ়ধপব জবংবধৎপয ধহফ জবসড়ঃব ঝবহংরহম ঙৎমধহরুধঃরড়হ)-এর মহাপরিচালক ড. আদনান। তার প্রস্তাব-বাংলাদেশের গবেষণা দলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ওঝঝ) একটি বিশেষ প্রকল্পে কাজ করতে হবে।
লক্ষ্য-মহাকাশে সবজি চাষ এবং পরবর্তীতে মঙ্গলগ্রহে তা প্রয়োগ করা।
নিকোলাইয়ের চোখে তখন স্বপ্নের ঝিলিক। সে বাবার সহকারী হিসেবে এই অভিযানে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়।
কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে।
শূন্য মাধ্যাকর্ষণে ভেসে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নিকোলাইকে অভিভূত করে। যেন এক নতুন পৃথিবী!
আইএসএস-এর বিশেষ বায়োডোমে শুরু হয় তাদের কাজ। বায়োডোম হলো এমন একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, যেখানে উদ্ভিদ ও জীব একটি কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্রে বেঁচে থাকতে পারে।
ড. ব্রুস টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে টম্যাটো, গাজর ও লেটুসের চারা তৈরি করতে থাকেন। নিকোলাই প্রতিটি ধাপ মনোযোগ দিয়ে শেখে।
একদিন ড. ব্রুস বললেন, ‘মঙ্গলগ্রহে গাছ লাগানো সহজ নয়। সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো তাদের বাঁচিয়ে রাখা।’
নিকোলাই দৃঢ়ভাবে বলল, ‘আমি পারব, বাবা।’
ড. ব্রুস মৃদু হেসে বললেন, ‘চেষ্টা করলে অসম্ভবও সম্ভব হয়।’
কয়েক মাসের পরীক্ষার পর অবশেষে সেই দিন এলো। তারা মঙ্গলগ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
লালগ্রহে অবতরণ করে নিকোলাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। চারদিকে লাল ধুলা, দূরে পাহাড় আর আকাশে কমলা আভা।
আগেই সেখানে একটি স্পেস টেন্ট ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ছিল থাকার ব্যবস্থা এবং পানি উৎপাদন প্ল্যান্ট।
এই প্ল্যান্ট তৈরি হয়েছে এক বিশেষ প্রযুক্তি দিয়ে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে পানি তৈরি করতে পারে। মঙ্গলের বায়ুম-লে যেহেতু ৯৫% কার্বন ডাই-অক্সাইড, তাই এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর।
প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল মাটি। মঙ্গলের মাটি সরাসরি চাষের উপযোগী নয়।
ড. ব্রুস মাটিকে পরিশোধন করলেন, ক্ষতিকর উপাদান সরালেন এবং প্রয়োজনীয় খনিজ যোগ করলেন।
তারপর একটি নিয়ন্ত্রিত গ্রিনহাউসে টম্যাটোর চারা রোপণ করা হলো।
দিন যায়, সপ্তাহ যায়। অবশেষে ফলাফল আসে। প্রথম কয়েকটি চারা শুকিয়ে গেল।
নিকোলাই হতাশ হয়ে বলল, ‘আমরা তো পারছি না!’
ড. ব্রুস শান্তভাবে বললেন, ‘বিজ্ঞানীদের কোনো কাজ ব্যর্থ নয়, তারা শেখে। তাই হতাশ হয়ো না।’
এই কথায় নতুন উদ্যম পেল নিকোলাই। সে আলো, তাপমাত্রা এবং পানির পরিমাণ নতুনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল।
এক সকালে গ্রিনহাউসে ঢুকেই নিকোলাই চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা! দেখো!’
একটি ছোট সবুজ চারা থেকে কুঁড়ি বের হয়েছে। ড. ব্রুস এগিয়ে এসে তাকালেন। তার চোখে আনন্দের পানি। ‘এটাই মঙ্গলের প্রথম টম্যাটো,’ তিনি বললেন।
দিন কয়েকের মধ্যে সেই কুঁড়ি লাল টম্যাটোতে পরিণত হলো। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীতে। মানুষ বুঝতে পারল, মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ে তোলার পথ শুরু হয়েছে।
নিকোলাই টম্যাটোটার দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই একটি সবজি মঙ্গলগ্রহে মানুষের ভবিষ্যতের গল্প লিখতে শুরু করল।
মঙ্গলগ্রহে টম্যাটো বেছে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণও ছিল। এতে আছে ভিটামিন, রোগ প্রতিরোধী উপাদান, এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধের ক্ষমতাও।
এই সাফল্যের পর তারা লেটুস, গাজরসহ আরও ফসল চাষের পরিকল্পনা করল।
রাতে মঙ্গলের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নিকোলাই বলল, ‘আমি একদিন পুরো মঙ্গলগ্রহকে সবুজ করে তুলব।’
ড. ব্রুস তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘মানুষের কল্যাণের জন্য তোমার এই চেষ্টা সফল হোক।’
লালগ্রহের বুকে ছোট্ট সেই টম্যাটোই হয়ে উঠল মানবজাতির নতুন আশার প্রতীক-টম্যাটো অব মার্স!
আরও পড়ুন...