তারুণ্যের স্বপ্নে বড় বাংলাদেশ

প্রচ্ছদ রচনা জয়নুল আবেদীন আজাদ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সুন্দর একটা গ্রহে আমাদের বসবাস, যার নাম পৃথিবী। এই পৃথিবীর একটি দেশ বাংলাদেশ। দেশের আলো-বাতাস, ফলে-ফুলে, বর্ষা-বসন্তে আমাদের বেড়ে ওঠা। দেশ কত কিছুই না আমাদের উপহার দিয়েছে। তাইতো দেশকে আমরা ভালোবাসি। এখন যদি প্রশ্ন করি, প্রিয় দেশটা আমরা কীভাবে পেলাম? দেশ কি নিজে নিজেই হয়ে গেছে, নাকি কেউ আমাদের উপহার দিয়েছে? দেশ সৃষ্টি মানুষের কাজ নয়; বরং স্রষ্টার। তাই মহান স্রষ্টাকে আমরা শুধু ভালোবাসব না, হব কৃতজ্ঞও। 

দেশের দিকে তাকালে চারিদিকে সুজন আর সৃজন, উৎপাদন আর উৎপাদন। মৌলিক সৃজন ¯্রষ্টার, আর প্রয়োজনের উৎপাদন মানুষের। এই যে ধান, গমসহ রকমারি ফসল-এগুলো কে ফলিয়েছে? আমরা তো সহজেই বলে ফেলি, কৃষক ফলিয়েছে। আসলেই কি কৃষক ফলিয়েছে? কৃষক অবশ্যই শ্রম দিয়েছে, সময় দিয়েছে, কষ্ট করেছে, কিন্তু কৃষক বীজ কোত্থেকে পেল? আর বীজ আর চারা বপন ও রোপণ করলেই কি ফসল হয়ে যায়? ফসল পাকতে কি আকাশের রোদ ও বৃষ্টির প্রয়োজন হয় না? কে আমাদের এগুলো দিয়েছেন? আবারো মহান ¯্রষ্টার দান ও অনুগ্রহের কথা আমাদের উল্লেখ করতে হয়। ফুল-ফসলের পাশে বন্ধুর মতো দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষ-লতা, পাখ-পাখালি। পাশে মানুষের ঘর, কোথাওবা পাখির বাসা। এখানে যেমন সৃজনের কথা, উৎপাদনের কথা আছে; তেমনি আছে গড়ার কথাও। মানুষ গৃহ গড়ে, পাখি গড়ে নীড়। গড়তে শুধু পরিশ্রম নয় লাগে জ্ঞানও। জ্ঞানের বিষয়টা মানুষের সাথে বিশেষভাবে জড়িত। কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা। কাজের জন্য মানুষকে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে বিচার দিবসে, তেমন দায় পশু-পাখির নেই। তাই মানুষের কাজ হতে হবে শুদ্ধ ও সংগত। শুদ্ধ ও সঠিক কাজের জন্য মানুষকে অর্জন করতে হয় জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে ফরজ করা হয়েছে মুসলিম নর-নারীর জন্য। অন্য ধর্মেও জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করা হয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষ সহজে মানুষ হয় না। কিন্তু মানুষ জন্মগ্রহণ করেই মানুষ হয়ে যায় না, মানুষ হওয়ার জন্য তাকে বহু গুণ অর্জন করতে হয়, এর জন্য প্রয়োজন হয় শিক্ষা।’ আজকাল অনেকে পেশাগত জ্ঞানকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, প্রকৃত মানুষ হওয়ার জ্ঞানকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। এমন খণ্ডিত বিবেচনার কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি করার পরও আমরা কাক্সিক্ষত শান্তির সমাজ পাচ্ছি না। অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, জুলুম-নিপীড়নে মানুষের সমাজ এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। আসলে শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত, অবয়বের মানুষকে প্রকৃত মানুষ করা। এ কারণেই হয়তো বহু আগে মহাকবি মিল্টন বলেছেন, Education is the hermonious developement of body, mind and soul. অর্থাৎ শরীর, মন ও আত্মার সুসামঞ্জস্য বিকাশই হলো শিক্ষা। শরীর, মন ও আত্মার ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশ হলেই একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারে। অথচ এ বিষয়ে এখন তেমন আলোচনা হয় না। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতার প্রভাবে এখন অর্থই শিক্ষার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে এখন মানুষ আর মানুষের জন্য নয়, অর্থের গোলামে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার লক্ষ্যে বিভ্রান্তি ঘটায় মানুষের সমাজ এখন আর মানবিক সমাজ নয়। এ বিষয়ে ছোটদের প্রশ্ন আছে; বড়রা, অভিভাবকরা সেই প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হবেন কী? মানুষ তো নৈতিক প্রাণী, অথচ মানুষ নৈতিক ভাবনাকে এখন অবজ্ঞা করছে। এই মানুষরাই আবার শিশু-কিশোরদের ভালো হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন, কখনো কখনো নৈতিকতার সবকও দিচ্ছেন। প্রাণহীন, আমলহীন এমন কাগুজে উপদেশে কোনো কাজ হবে কী? এ ক্ষেত্রে প্রকৃত উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ আত্মা। ‘তাজকিয়াতুন নফস’ তথা আত্মিক পরিশুদ্ধির বিষয়টি এখন আমাদের পরিবারে, সমাজে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? পরিবারে এই বিষয়টির চর্চা না হলে শিশু-কিশোররা শিখবে কোত্থেকে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তো আত্মশুদ্ধির তেমন কোনো পাঠ নেই।

অভিভাবকদের দায়িত্বের কথা সহজেই বলা যায়, কিন্তু ছোটদের কি কোনো দায়িত্ব থাকতে নেই? ইতিহাসের পাতায় কিশোরদের, তরুণদের অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তাঁরা শুধু সমাজ গড়েনি, দেশও গড়েছে। পৃথিবীকেও দিয়েছে পরিবর্তনের নতুন বার্তা। এই প্রসঙ্গে আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। নবী হওয়ার আগে তারুণ্যেই তিনি সমাজ সংস্কারের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন, দাঁড়িয়েছিলেন মজলুমের পাশে। ‘হিলফুল ফুজুল’ তার বড় প্রমাণ। রাসূল (সা) সমাজের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। ৫৯১ সালে বাণিজ্য নগরী মক্কায় একটি ঘটনা বেশ তোলাপাড় সৃষ্টি করেছিল। মক্কার এক বড় ব্যবসায়ী ছিলেন আস ইবনে ওয়াইল। তিনি এক ইয়েমেনি ব্যবসায়ী থেকে পণ্য কিনেছিলেন, কিন্তু দাম পরিশোধ করেননি। মজলুম ইয়েমেনি ব্যবসায়ী তখন মক্কার নেতাদের কাছ ইনসাফ চাইলেন। নেতারা তখন আস ইবনে ওয়াইলকে দাম পরিশোধে বাধ্য করেন। এরকম জুলুম ও অপরাধপ্রবণতা থেকে মক্কার বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য মুহাম্মদ (সা)-সহ মক্কার নেতারা তখন একটি চুক্তি করেন, যার নাম ‘হিলফুল ফুজুল’। (মর্যাদাবানদের মৈত্রী) এর লক্ষ্য ছিল সমাজে ন্যায্য লেনদেন তথা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা। বহিরাগত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা তথা মজলুমের পক্ষে ভূমিকা পালন করা। রাসূল (সা) তখন মাত্র ২১ বছরের তরুণ। তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন ওই চুক্তি সম্পাদনে। ‘হিলফুল ফুজুল’ চুক্তি সম্পাদনে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন তখনকার বিশিষ্ট গোষ্ঠীপ্রধান আব্দুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে। রাসূল (সা) সেখানে সরব ভূমিকা পালন করেন। অনেক বছর পর রাসূল (সা) এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, ‘আব্দুল্লাহ জুদআনের বাড়িতে একটি চুক্তিতে আমি সাক্ষী ছিলাম, ইসলামের সময়ও যদি আমাকে এই চুক্তিতে ডাকা হতো, তাহলে আমি সাড়া দিতাম।’ এই ঘটনা থেকে আমরা সমাজ পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার শিক্ষা পাই। পরিবর্তনের অভিযাত্রায় বয়স কম না বেশি, সেটা মুখ্য নয়; এখানে ব্যক্তিত্বের বিকাশটাই আসল বিষয়। এভাবেই তরুণরা সমাজের মর্যাদাবানদের মাঝে নিজেদের খুঁজে পাবে। বাংলাদেশেও আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে তেমন চিত্র লক্ষ করেছি। বড়রা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও ফ্যাসিবাদের দৈত্যকে সরাতে পারেনি, কিন্তু তরুণরা যখন দ্রোহের ঝাণ্ডা নিয়ে সংগ্রামে যুক্ত হলো, তখন পতন ঘটল ফ্যাসিবাদের। আসলে তরুণরা যখন ন্যায়ের ঝাণ্ডা হাতে নৈতিক হয়ে ওঠে তখন দানবের পতন ঘটে, এটাই ইতিহাসের সত্য। শহীদ ওসমান হাদির হাতে তো তেমন পতাকাই আমরা দেখেছি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ