তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
গল্প আহসান হাবিব বুলবুল মে ২০২৬
শাহজাদপুর উপজেলার রহমতপুর গ্রাম। এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া নদী। মেঠোপথ ফসলের মাঠ স্কুল-মাদরাসা মসজিদ-মক্তব সব মিলে ছিমছাম একটি গ্রাম। গ্রামের মাঝে সুউচ্চ একটি তালগাছ গ্রামটির অবস্থান জানান দেয়। তালগাছ আরও ছিল, এক এক করে সব হারিয়ে গেছে। এখন ওই একটিই টিকে আছে। দূর থেকে তালগাছটি চোখে পড়লে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত সেই কবিতাটি মনে পড়ে যায়-
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।
মনে সাধ কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়
একেবারে উড়ে যায়
কোথা পাবে পাখা সে!
সম্প্রতি এই গ্রামে এক বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে যায়। বজ্রপাতে তিনজন লোক মারা যায়। এদের মধ্যে একজন শিশুও ছিল। গ্রামের সবার চোখে-মুখে শোকের ছায়া নেমে আসে। মৃতদের জানাজা, দোয়া অনুষ্ঠান, প্রশাসনের লোকজনের ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য প্রদান-এসব কাজ নিয়েই কেটে যায় গেল মাসটি।
রতন আশিক ও ফরহাদ-ওরা তিন বন্ধু। গ্রামের হাইস্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। গত মাসটি ওরা এসব কাজে সময় দিয়ে কাটিয়েছে। শোক প্রকাশ করতে স্কুলও দুদিন বন্ধ ছিল। আজ বিকেলে ওরা এসে বসেছে স্কুল মাঠে, আলাপচারিতায় একটু সময় কাটাতে। ঘুরে ঘুরে সেই একই কথা উঠে আসে ওদের আলাপনে।
“কীভাবে বজ্রপাত প্রতিরোধ করা যায়। প্রশাসনের লোকজন তো বলে গেল বেশি বেশি তালগাছ লাগাতে। কিন্তু তালগাছ কীভাবে বজ্রপাত ঠেকায় তা তো জানা হলো না। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিই-বা কী!”
রতন বলল, বিষয়টি নিয়ে স্কুলের বিজ্ঞান স্যারের সাথে কথা বলা যেতে পারে।
আশিক বলল, ঠিক বলেছিস।
ফরহাদ বলল, প্রয়োজনে আমরাই উদ্যোগ নেব। ঘরে ঘরে গিয়ে তালের আঁটি (বীজ) সংগ্রহ করব। রাস্তার দু-ধারে বপন করব।
: শুনেছি একসময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ ছিল। সেসব কোথায় গেল!
: কোথায় আবার যাবে! মানুষ তো এখন সর্বভুক্ত হয়ে পড়েছে। দেখিস না, ইটভাটার জ্বালানি হচ্ছে গাছ। জমির উপরিভাগের মাটি যা নাকি খুব উর্বর, তা যাচ্ছে ভাটায়। মানুষ সামান্য কটা টাকা বেশি পাবে বলে মূল্যবান বৃক্ষ, জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে।
: প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেন হয় জানিস, আমরা যখন গাছ কাটি, নদী ভরাট করি, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলি তখন পরিবেশ দূষিত হয়। এর জের ধরে যত দুর্যোগ-মসিবত নেমে আসে। এই ধর বজ্রপাত, অতিবন্যা, রোগ-ব্যাধি ইত্যাদি।
: দোস্ত! তুই ভালো বলেছিস। আজ ওঠা যাক, সন্ধ্যা হয়ে এলো।
আজ স্কুলে তিন বন্ধু বিজ্ঞান ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করছে, স্যারের কাছ থেকে আজ তারা জানবে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি রোধে তালগাছ এত প্রয়োজন কেন?
বিজ্ঞান শিক্ষক ক্লাসে নিজ থেকেই প্রসঙ্গটা ওঠালেন। স্যার বললেন, বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপণের জন্য সরকারিভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেন? তোমরা কি জানো?
রতন বলল, না স্যার। সেটা তো আমরা জানতে চাই।
স্যার বললেন, শোনো, মেঘ ও ভূমির মাটির মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রক্রিয়ায় বজ্রপাত হয়, তাকে লাইটনিং স্ট্রোক বলে। লাইটনিং স্ট্রোকগুলো এর আশেপাশের নিকটতম টার্গেটে আঘাত হানে। তালগাছ অনেক লম্বা হওয়ায় এটি উক্ত স্ট্রোকের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। তাই ফসলের ক্ষেতে তালগাছ লাগানো হয়। যাতে বজ্রপাত হলেও কৃষক ও অন্য যারা মাঠে কাজ করে, তারা যেন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, বজ্রপাত যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, আমাদের উপকারও করে। তা হলো, বৃষ্টিপাতের সময় যে বজ্রপাত হয় তাতে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বাতাসের নাইট্রোজেন মাটিতে প্রবেশ করে, এতে মাটির গুণগত পরিবর্তন হয়। মাটির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি পায়। ফসলের ফলন বাড়ে।
তাইতো বলা হয়, মহান, আল্লাহ কোনো কিছুই নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। শুধু আমরা যদি আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারি তবে ক্ষতি থেকে বেঁচে থানা সম্ভব।
ফরহাদ বলল, স্যার, আমরা গ্রামের মাঠে-ঘাটে তালগাছ লাগাতে পারি।
স্যার বললেন, অবশ্যই সেটা করা যেতে পারে। তোমরা তরুণ, সে উদ্যোগটা তোমরাই নিবে বৈ-কি!
আজ আবার স্কুল মাঠে আড্ডা জমিয়েছে তিন বন্ধু। স্যারের লেকচারটা ওদের কানে বাজছে। রতন বলল, তাহলে বল কীভাবে আমরা উদ্যোগটা নিতে পারি।
আশিক বলল, এখন ভাদ্র মাস চলছে। এ মাসেই তাল পাকে। ঘরে ঘরে তালের রস, তালের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালের আঁটি সংগ্রহ করব। তারপর মুরুব্বিদের পরামর্শে কোথায় কোথায় বীজ বপন করা যায়, সেটা ঠিক করব।
ফরহাদ বলল, চমৎকার আইডিয়া! তেমনটাই হবে। তাহলে আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু করা যাক।
শুরু হয়ে গেল তিন বন্ধুর তালবীজ সংগ্রহের কাজ। প্রথম বীজ বপনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলো। উদ্বোধন করলেন, তাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনসুর আলী খান।
তিন বন্ধুর এই কাজের কথা শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলো। পৌঁছে গেল উপজেলা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তির কাছেও। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একদিন আসলেন গ্রামে, তিন বন্ধুর কাজ দেখতে। তিনি তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিলেন। তিনি তিন বন্ধুর সঙ্গে আরও কজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিয়ে একটি কমিটি করে দিলেন। বললেন, শুধু বীজ বপন করলেই হবে না। গাছের পরিচর্যাও করতে হবে। তিনি তাদের কাজের জন্য একটা আর্থিক অনুদান দিলেন।
বছরখানেকের মধ্যেই বপনকৃত বীজ থেকে চারা গাছ অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ বৃক্ষে পরিণত হলো। তিন বন্ধু এখন প্রতিদিন বিকেলে স্কুল মাঠে খেলাধুলা শেষে, সারা গ্রাম ঘুরে গাছগুলো দেখে, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করে বাড়ি ফেরে।
আরও পড়ুন...