তাফতান আগ্নেয়গিরি
বিজ্ঞান মনির হোসেন মার্চ ২০২৬
তাফতান আগ্নেয়গিরি প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার বছর ধরে নিস্তেজ অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি আগ্নেয়গিরিটির জেগে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তাফতান আগ্নেয়গিরি দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে অবস্থিত ১২ হাজার ৯২৭ ফুট উচ্চতার একটি স্ট্র্যাটোভলকানো। ইউরেশিয়ান মহাদেশের অধীনে আরব মহাসাগরের ভূত্বকের অধঃপতনের ফলে তৈরি পাহাড় এবং আগ্নেয়গিরির মধ্যে এটি অবস্থিত। এটি লাভা ও ছাইয়ের স্তর দিয়ে গঠিত একটি খাড়া আগ্নেয়গিরি। বর্তমানে এতে সক্রিয় হাইড্রোথার্মাল সিস্টেম ও গন্ধযুক্ত সালফার-উৎপাদনকারী ফিউমারোল পাওয়া গেছে।
জিওগ্রাফিক্যাল রিসার্চ লেটার্সে প্রকাশিত নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের এই আগ্নেয়গিরিটি ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে এর চূড়ার কাছে ভূমি ৯ সেন্টিমিটার উঁচু হয়েছে। যা এখনো কমেনি। এটিকে আগ্নেয়গিরির নিচে গ্যাসের চাপ জমার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন গবেষকরা। এই বৃদ্ধি সামান্য মনে হতে পারে কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক। একটি নতুন গবেষণায় এই পরিবর্তন লক্ষ করা হয়েছে।
১১ হাজার ৭০০ বছর আগে শুরু হওয়া হলোকোন যুগে যদি কোনো আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত না করে থাকে, তবে সেটিকে বিলুপ্ত বলে মনে করা হয়। এই আগ্নেয়গিরির সাম্প্রতিক কার্যকলাপ বিবেচনা করে গবেষক পাবলো গঞ্জালেজ বলেন, “তাফতান আগ্নেয়গিরিটিকে এখন সঠিকভাবে বলতে গেলে ‘সুপ্ত’ হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে বলা যায়, তাফতান ‘নিস্তেজ’ না হয়ে ‘নিদ্রিত’ অবস্থায় আছে।”
মানুষের অস্তিত্বের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই আগ্নেয়গিরি কখনো বিস্ফোরিত হয়নি। বিজ্ঞানীরা ইনএসএআর পদ্ধতি ব্যবহার করে ভূমি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি একটি রাডার-নির্ভর পদ্ধতি, যা মহাকাশ থেকে মাটির গতিবিধি পরিমাপ করে। মোহাম্মদনিয়া ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির সেন্টিনেল-১ স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, চূড়ার কাছাকাছি ভূমি সামান্য উঁচু হয়েছে।
স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল প্রোডাক্টস অ্যান্ড অ্যাগ্রোবায়োলজির গবেষক পাবলো জে গঞ্জালেজ জানান, তাফতান একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে ক্রমাগত জিপিএস রিসিভারের মতো স্থলভিত্তিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজের সুযোগ নেই। এ কারণে এখানে মহাকাশ রাডার দিয়ে নজর রাখা হয়েছে
গনজালেজের তত্ত্বাবধানে থাকা গবেষক মোহাম্মদ হোসেইন মোহাম্মদনিয়া ২০২০ সালে স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করেছিলেন। তখন তাফতান তেমন সক্রিয় নয় বলে দেখতে পান। কিন্তু ২০২৩ সালে স্থানীয়রা সামাজিক মাধ্যমে আগ্নেয়গিরি থেকে গ্যাস নির্গমনের খবর দিতে শুরু করেন। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কাশ শহর থেকেও গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
মোহাম্মদনিয়া হিসাব করে দেখেছেন, এই উত্থানের কারণ লুকিয়ে আছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬০৮ থেকে ২০৬৭ ফুট নিচে। ঠিক কী ঘটছে তা জানা অসম্ভব, তবে কাছাকাছি ভূমিকম্প বা বৃষ্টিপাতের মতো বাহ্যিক কারণগুলোকে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ বলে মনে করেন না গবেষকরা।
এই স্বল্প গভীর স্থানে একটি হাইড্রোথার্মাল সিস্টেমে আগ্নেয়গিরির নিচে গরম পানি ও গ্যাস সঞ্চালিত হয়ে ভেতরে চলাচল করছে ও জমা হচ্ছে এ কারণে ধোঁয়া হতে পারে। আবার আগ্নেয়গিরির নিচে অল্প পরিমাণে ম্যাগমা স্থানান্তরিত হতে পারে, যার ফলে গ্যাসগুলো ওপরের শিলাগুলোতে বুদ্্বুদ হয়ে উঠতে পারে যা শিলা ছিদ্র ও ফাটলগুলোতে চাপ বৃদ্ধি করে এবং ভূমিকে কিছুটা উঁচু করে তোলে। বিজ্ঞানীরা শুধু ছাইয়ের মেঘকে প্রাথমিক সতর্কীকরণ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করেন না। তারা গ্যাস, তাপ ও মাটির গতিবিধির দিকেও মনোযোগ দেন।
তাফতান আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। গ্যাসের বিস্ফোরণ স্বল্প সময়ের জন্য নিচের দিকে বাতাস প্রবাহিত অঞ্চলের মানুষের চোখ, ফুসফুস ও ফসলের ক্ষতি করতে পারে।
ভবিষ্যতে এই আগ্নেয়গিরিটি কোনো না কোনোভাবে বিস্ফোরিত হবে। হয় জটিলভাবে, নয়তো শান্তভাবে। তবে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণের কোনো আশঙ্কা নেই। আগ্নেয়গিরিটি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
পাবলো গঞ্জালেজের মতে, এই গবেষণার লক্ষ্য মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা নয়। এটি কেবল ইরানের এই অঞ্চলের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সতর্কবার্তা, যাতে তারা বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ খুলে দেয়।
আরও পড়ুন...