সর্বকনিষ্ঠ শহীদ
গল্প কামরুল আলম জানুয়ারি ২০২৬
বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন আবুল হাসান। স্ত্রী সুমি আক্তার এসে পাশে দাঁড়ালেন। বললেন, এ্যাই! কী করছ এখানে। শুনছ না গোলাগুলি হচ্ছে।
হুমম। অনেক গণ্ডগোল হচ্ছে নিচে। দেখো না, কীভাবে নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের গুলি করছে পুলিশ।
দেখছি তো। শুধু পুলিশ না। ওই দেখো ওপাশে ছাত্রলীগের ছেলেরাও দা-কুড়াল নিয়ে এসেছে। ইশ! কত মানুষ মারা যাচ্ছে গো।
আবুল হাসান বাসার নিচে তাকালেন। সুমি আক্তারও তাকালেন নিচে। রক্তাক্ত হচ্ছে অনেকেই। পুলিশের গুলির মোকাবিলা করছে শিক্ষার্থীরা ইট-পাথর দিয়ে।
আয়কর বিভাগের উচ্চমান সহকারী আবুল হাসানের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের পুখুরিয়া গ্রামে। ভাড়া থাকেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকার একটি বাড়িতে। এগারোতলা বাড়িটির আটতলায় থাকেন তারা। দিহান মাতুব্বর ও আব্দুল আহাদ নামে তাদের দুটি ছেলে আছে। দিহানের বয়স এগারো চলছে। পড়ে ক্লাস সিক্সে। আর আব্দুল আহাদের বয়স চার চলছে। এখনও স্কুলে ভর্তি করেননি। প্লে গ্রুপে দিতে পারতেন। বাসায় অ-আ-ক-খ, এবিসিডি এগুলো শেখা প্রায় শেষ। ভাবছেন আগামী বছর ওকে নার্সারি শ্রেণিতে ভর্তি করে দেবেন।
আবুল হাসান ও সুমি আক্তার বাসার নিচের মারামারি দেখছিলেন। হঠাৎ আব্দুল আহাদ এসে দুজনের মাঝখানে দাঁড়াল।
বাবা, বাবা, মা...।
ছেলের ডাকে সাড়া দিলেন বাবা ওর দিকে না তাকিয়েই। বললেন, কী বাবা আব্দুল আহাদ? কিছু বলবে?
হ্যাঁ, বাবা। তোমরা কী দেখছ?
দেখছি...। এই তো বাবা মারামারি দেখছি।
মানুষ কেন মারামারি করে বাবা?
এরা দুষ্টুলোক। ছাত্রদের মারছে, বাবা।
দুষ্টুলোক ছাত্রদের কেন মারছ, বাবা?
তুমি এসব বুঝবে না, ঘরে যাও। বড়ো হয়ে সব বুঝতে পারবে।
বাবার কথায় ঘরে গেল না আব্দুল আহাদ। মাকে বলল, মা, তুমিও বলবে না আমাকে?
কী বলব, বাবা?
এই যে দুষ্টুলোক ছাত্রদের কেন মারছে?
এরা অনেক দুষ্টু, বাবা। এরা এমনি এমনি মারছ ছাত্রদের। ছাত্ররা সরকারের কাছে একটি দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু সেই দাবি সরকার পূরণ করেনি।
মা, সরকার কে? আমি সরকারকে আচ্চা করে বকা দেবো। তারা ছাত্রদের দাবি কেন মেনে নিচ্ছে না।
ছোট্ট আব্দুল আহাদের কথাগুলো শুনে বাবা-মা দুজনেই ওকে জড়িয়ে ধরলেন। চুমু খেলেন। তারপর আবার নিচের দিকে তাকাতে লাগলেন। সেও নিচের দিকে তাকাচ্ছে। একসাথে ছয়টি চোখ তাকিয়ে দেখছে বীভৎস মারামারির দৃশ্য।
কয়েকটি হেলিকপ্টারে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল ওপর দিকে। আবুল হাসান ও সুমি আক্তারের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। কারণ নিচের গগনবিদারী চিৎকার আর গুলির শব্দে হেলিকপ্টারের সাঁ সাঁ করা আওয়াজ কানে এসে পৌঁছাচ্ছে না। হঠাৎ শুনতে পেলেন আব্দুল আহাদের চিৎকার। ‘ও মা...’।
তাকিয়ে দেখেন আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে আব্দুল আহাদ। ভেবেছিলেন ছেলে বোধহয় মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।
ছেলেকে ধরে তুলতে গিয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় বাবা আবুল হাসানের। ওর চোখ, মুখ, মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। গুলিটা ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে মাথার ভেতরেই আটকে গেছে।
‘ও বাবা রে...’ বলে চিৎকার করে ওঠেন আবুল হাসান। সুমি আক্তার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছেন। পড়ার টেবিলে বসেছিল দিহান। বাবা-মা ও ছোটভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনে দৌড়ে এসে দেখে রক্তে ভেসে যাচ্ছে নিজের কলিজার টুকরা ছোটভাই আব্দুল আহাদ। কী করবে সে, এদিক-ওদিক ছোটোছুটি শুরু করল। মা সুমি আক্তার লুটিয়ে পড়েছেন মাটিতে। দিহান বুঝতে পারছে না কী হয়েছে? তাকিয়ে দেখল বাবা আব্দুল আহাদকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছেন। এতক্ষণে হুঁশ ফিরল দিহানেরও। তাইতো, যাই ঘটুক ওকে তো হাসপাতালে নিতেই হবে।
আবুল হাসান রীতিমতো দৌড়াতে লাগলেন আব্দুল আহাদকে কাঁধে নিয়ে। রক্তাক্ত ছেলেকে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসার পর অস্ত্রধারী গুণ্ডা বাহিনী এগিয়ে এসে তাকে বাধা দিলো।
কোথায় যাবেন? দেখছেন না গণ্ডগোল হচ্ছে।
আমার ছেলের গায়ে গুলি লেগেছে। আমাকে হাসপাতালে যেতে দিন। চিৎকার করে বললেন আবুল হাসান।
একদল পুলিশ বন্দুকের নল তাক করা অবস্থায় এদিক দিয়ে যাচ্ছিল। ওদের কানে ঢুকল আবুল হাসানের কথার শেষ অংশটুকু। হয়তো দয়া ঢুকল ওদের দিলে। তারা কাছে এসে বলল, এই মিয়া, কী হয়েছে?
আবুল হাসান দ্রুতকণ্ঠে সব বললেন। তার কোলে ছেলের রক্তাক্ত অবস্থা দেখালেন। পথ থেকে সরে দাঁড়াল পুলিশ। গুণ্ডালীগের ছেলেদেরও সরে দাঁড়াতে বলল তারা।
বাবা আবুল হাসান রক্তাক্ত আব্দুল আহাদকে কোলে নিয়ে দৌড়াতে লাগলেন। গাড়ি বা রিকশা কিছুই নেই। গোলাগুলির স্থানটা একেবারে ফাঁকা। গুণ্ডালীগ ও পুলিশের গুলিবর্ষণের কারণে সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। রাস্তার ওপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আবুল হাসান সেদিকেই গেলেন। এই সময় আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা পাওয়ার আশা রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের পা-চাটা গোলামেরা কোনো সহযোগিতা করবে না এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। আন্দোলনকারীদের কাছাকাছি যেতেই কয়েকজন ছুটে এসে জানতে চাইল, কী হয়েছে?
আবুল হাসান সবটা দ্রুত খুলে বললেন। আন্দোলনকারীরা আব্দুল আহাদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। তাকে নিবিড় আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হলো। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানালেন, গুলি মাথার মধ্যে আছে। কিন্তু কোনো অবস্থানে আছে, তা বোঝার জন্য সিটিস্ক্যান করতে হবে। সিটিস্ক্যান করতে নেওয়া হলে আবার আইসিইউর যন্ত্রপাতি খুলে ফেলতে হবে। এতে শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে। তবে সিটিস্ক্যান করাও জরুরি।
কী করা যায়? কী করা উচিত? মারাত্মক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন আবুল হাসান। দিহান এসে বাবার পাশে দাঁড়াল। বলল, আমার ভাই বাঁচবে তো, বাবা?
দিহানকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন আবুল হাসান। তিনি ঠিক কত বছর পর এভাবে কাঁদছেন, স্মরণ করতে পারলেন না। নিজের আত্মীয়-স্বজন মারা যাওয়ার দৃশ্য দেখেছেন। চোখ টলমল করেছে, কিন্তু কাঁদেননি এভাবে। আজ নিজের ছোট্ট অবুঝ এই শিশু সন্তানটির কথা ভেবে নিজেকে অসহায় মনে করছেন তিনি। দু-হাত প্রসারিত করলেন হাসপাতালে ছেলের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে। মহান মাবুদের দরবারে দুটি কথা বললেন তিনি। হে আল্লাহ আমার ছোট্ট ছেলেটিকে তুমি সুস্থ করে দাও। আর যারা আমার এই ছোট্ট শিশুটির এ অবস্থা করেছে তাদের ধ্বংস করে দাও মাবুদ।
আল্লাহ আবুল হাসানের প্রথম দোয়া কবুল করলেন না। ছোট্ট আব্দুল আহাদকে তিনি নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। পরের দিন শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আব্দুল আহাদকে মৃত ঘোষণা করা হলো। মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে এর পরের দিন বিকেলে ওর মরদেহটি আবুল হাসানের কাছে হস্তান্তর করা হলো। তারপর অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভাঙার পুখুরিয়া গ্রামে চলে যান আবুল হাসান। বাদ মাগরিব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
ছেলেকে কবরস্থ করার পর আবুল হাসান আবারও হাত তুললেন আল্লাহর দরবারে। বললেন, হে দয়াময়। আমার প্রথম দোয়াটি তুমি কবুল করোনি। নিশ্চয় এর মধ্যে কোনো কল্যাণ রয়েছে। আমার দ্বিতীয় দোয়াটি তুমি কবুল করো। যারা আমার শিশু সন্তানটিকে হত্যা করেছে তাদের তুমি ধ্বংস করে দাও, ধ্বংস করে দাও, ধ্বংস করে দাও।
আবুল হাসানের দোয়া যেন আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এই ঘটনার দুই সপ্তাহের মধ্যেই খুনি শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। ধ্বংস হয়ে গেল খুনি ও খুনের মদতদাতারা।
আরও পড়ুন...