স্বপ্নের দেশ

গল্প খন্দকার নূর হোসাইন জানুয়ারি ২০২৬

হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল রাকিবের সঙ্গে। সদা হাস্যোজ্জ্বল ছেলেটি এগিয়ে এসে কথা বলেছিল। সেদিন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। আমাদের ক্লাসে শিক্ষার্থী ছিল ৪০ জন। এর মধ্য থেকে আমাদের ক্লোজ সার্কেলে আরও যোগ হলো রবিন, তুষার ও অনিক। পাঁচজনের একটি টিম হয়ে গেলাম আমরা। এরপর থেকে খেলাধুলা ও সকল আনন্দে একসাথে থেকেছি। বিপদ কিংবা সংকটে কেউ কাউকে একা ছাড়িনি। আমাদের বন্ধুত্বটা ছিল এক অন্যরকম মজবুত দেওয়ালের মতো। অনেকেই আমাদের দেখে ঈর্ষা করত। তবে অন্য ক্লাসমেটদেরও আমরা যথেষ্ট সম্মান করতাম। তাদের প্রয়োজনে পাশে থাকতাম।

আমাদের পাঁচজনের মধ্যে অনিক মজার গল্পে আড্ডার পুরো সময়টা মাতিয়ে রাখত। তুষার ছিল প্রচণ্ড মেধাবী। ক্লাসের কোনো পড়া বুঝতে না পারলে আমরা ওর কাছেই সাহায্য নিতাম। রবিনের নেতৃত্বগুণ ছিল অসাধারণ। খেলাধুলা কিংবা কোনো সফরে নেতৃত্ব দিত ও-ই। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার জন্য সবাই ওকে পছন্দ করত। রাকিব ছিল ভীষণ মিশুক। মনভোলানো হাসিতে সবার সঙ্গে সহজেই ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলত। ওর কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া-ফ্যাসাদ হতো না। এদের সবার মধ্যে আমি ছিলাম একটু ইন্ট্রোভার্ট। তবে এই ছোট্ট দলটার সঙ্গে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে সেটাও কাটিয়ে উঠছিলাম। একটা সময় আমি একা নামাজ পড়তাম। পরে পাঁচজন মিলে মসজিদে যেতে শুরু করলাম। আমাদের সেই ক্যাম্পেইন ধীরে ধীরে পুরো ক্লাস থেকে স্কুলে ছড়িয়ে পড়ল।

পাঁচজনের দৃঢ় বন্ডিংয়ের কারণে পড়াশোনাতেও আমরা ভালো করতাম। কারও ক্লাসের পড়া তৈরি না থাকলে সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যেতাম। এমনকি এভাবে মারও খেয়েছি। পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফি কেউ ম্যানেজ করতে না পারলে সবাই মিলে ব্যবস্থা করতাম। এই চর্চা ধীরে ধীরে পুরো ক্লাস থেকে স্কুলে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ফলে সবার চোখে আমাদের একটা ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছিল।

২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময় আমরা ক্লাস ফোরে পড়তাম। তখন পাশের কলেজের বড় ভাইদের সঙ্গে আমরাও রাস্তায় নেমেছিলাম। দেখতে দেখতেই বছরগুলো পার হলো। আমরা হয়ে গেলাম দশম শ্রেণির ছাত্র। এত দিনে বাস্তবতা আর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একটা পরিণত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। হঠাৎ একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে টিভিতে দেখলাম-একজন বড় ভাই দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। পরক্ষণে পুলিশ গুলি করল। আবু সাঈদ ভাইয়ার সেই শাহাদাত আমাদের সবাইকে কাঁদালো। জানতে পারলাম, কোটা সংস্কার আন্দোলনের জন্য মাঠে নেমেছিলেন আমাদের বড় ভাইয়েরা। এরপর সেই বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন তুমুল বেগে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। পাশের কলেজের ভাই-বোনদের সঙ্গে আমরাও সেই আন্দোলনে যোগ দিলাম। এরপর যা ঘটল, তা আমি কোনো দিন ভুলব না।

প্রথম পাঁচদিন আমরা ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন করলাম। সবকিছু মোটামুটি ভালোই চলছিল। ষষ্ঠ দিন, কলেজ গেট থেকে মিছিল নিয়ে যখন বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম, তখনই রাস্তার পাশে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীরা নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ল। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আমার কানের পাশ দিয়ে একটি বুলেট সাঁই করে চলে গেল। মরিয়া হয়ে অন্যদের খুঁজতে লাগলাম। বাতাসে তখন আর্তনাদ আর আতঙ্কিত চিৎকার। খুব কাছ থেকে কেউ ‘বন্ধু’ বলে ডাক দিলো। কেউ পড়ে আছে। চিনতে একটুও কষ্ট হলো না। আমার স্কুলজীবনের প্রথম বন্ধু, সদা হাস্যোজ্জ্বল রাকিব কাতরাচ্ছে। ওর পাঁজরে গুলি লেগেছে। অন্যরাও ছুটে এলো আমাদের দিকে। রবিন দ্রুত একটি রিকশার ব্যবস্থা করল। হাসপাতালে ছুটলাম আমরা। রিকশায় কাঁপতে কাঁপতে রাকিব পানি খেতে চাইল। আমাদের কাছে পানি ছিল না। বুঝতেই পারিনি, সেটাই ছিল ওর শেষ আকুতি।

হাসপাতাল পর্যন্ত নেওয়ার আগেই ও শাহাদাত বরণ করেছিল। শেষবার দেখাতেও ওর মুখে সেই চিরচেনা হাসিটা ছিল। সেদিন জানাজার আগে আর আমরা ওর লাশটি দেখিনি। হাসিমাখা মুখটিই স্মৃতিতে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম।

পাঁচজনের একজন চলে গেল। একই দিনে আরও তিনজন শহীদ হলো। বাকি দুজন ছিল কলেজ শিক্ষার্থী। গল্পে আড্ডা মাতিয়ে রাখা অনিক গুরুতর আহত হলো। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষও রাস্তায় নেমে এলো। ৩৬শে জুলাই গণপ্রতিরোধের মুখে স্বৈরাচারের পতন হলো। সেদিনও অনিক হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমরা বিজয়ের শুভেচ্ছা নিয়ে ওকে দেখতে গেলাম। রাকিবের কবর জিয়ারত করে ওর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন স্বাধীনতার কথা বলে এলাম।

তিন মাস পর আহত অনিককে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেলাম আমরা। নতুন করে স্বাধীনতা হওয়া দেশে মুক্তভাবে চলাফেরা করতাম। তবে আগের মতো আমাদের আড্ডা আর কখনো জমত না। চারজন একত্র হলেই চোখ ভিজে উঠত। আমরা ক্লাসে রাকিবের জন্য একটি বেঞ্চ সব সময় ফাঁকা রাখতাম। পরীক্ষার সময়ও। ওর সম্মানে।

রবিনের নেতৃত্বে আমরা শোককে শক্তিতে রূপ দিতে শিখলাম। সারাজীবনের জন্য প্রতিজ্ঞা করলাম-শহীদ রাকিবসহ দুই হাজার শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করব। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। অন্যান্য ছাত্রদের সাথে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণসহ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিলাম।

কিন্তু কয়েক মাস যেতেই আমাদের স্বপ্নগুলো মলিন হতে শুরু করল। নতুন বাংলাদেশে অনেকেই অবৈধ সুবিধা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শহীদ পরিবার ও আহতরা হয়ে উঠল উপেক্ষিত। পুরোনো ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কেউ কেউ আবার চাঁদাবাজি শুরু করল। একদিন আমাদের স্কুলে একদল গুন্ডা এসে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে ১৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করল।

বন্ধুর শোক তখনও আমাদের কারও মন থেকে কাটেনি। এর মধ্যেই প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর এমন অন্যায় মেনে নিতে পারলাম না। রবিনের নেতৃত্বে পুরো স্কুল ঐক্যবদ্ধ হলো। শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দিলো রবিন। মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর। আমাদের সঙ্গে যোগ দিলো পাশের কলেজের শিক্ষার্থীরাও।

তৃতীয় দিন মিছিল শেষে ফেরার পথে রবিনের ওপর হামলা হলো। রাস্তার পাশে ছুরিকাঘাত করে ওকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল আততায়ীরা। স্থানীয় পথচারীরা দেখতে পেয়ে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। খবর পেয়ে আমরা ছুটে গেলাম। আবারও নতুন করে বন্ধু হারানোর আতঙ্ক বুকের ভেতর চেপে বসল। নতুন বাংলাদেশে আবার ঝরল বন্ধুর রক্ত।

তিন দিন পর রবিন চোখ খুলল। অবস্থা তখনও সংকটাপন্ন। খুব ক্ষীণ স্বরে কথা বলছিল। আমি কানের কাছে মুখ নিয়ে গেলাম। ও বলল, ‘আল্লাহ আমাকে কবুল করলে তোরা দেশের জন্য লড়াইটা চালিয়ে নিস। বল, পারবি?’

আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। চোখে অশ্রু। রবিন আর কিছু বলার আগেই আবার জ্ঞান হারাল। হাসপাতালের বাইরে সব অনিয়মের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠছিল। এক বন্ধুকে হারিয়ে অসীম কষ্ট বুকে নিয়ে আরেক বন্ধুর সুস্থতার জন্য রবের কাছে দোয়া করছিলাম। আমাদের বন্ধুত্বের ক্ষুদ্র মিছিলটি ছোট হয়ে এসেছে। চোখে ভাসছে রাকিবের ভুবন ভোলানো হাসি, রবিনের দৃঢ়সংকল্প। অনিক আর তুষারের দিকে তাকালাম। ওদের চোখেও একই দৃঢ়তা। হাতগুলো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠছে-সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে, একটি নতুন স্বপ্নের দেশ গড়ার অঙ্গীকারে। যে দেশ হবে সব সুনাগরিকের স্বপ্নের দেশ।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ