সোনালি অতীত

তোমাদের গল্প আব্দুস সাত্তার সুমন এপ্রিল ২০২৬

গ্রামের নাম ছিল ফাঁসিয়াতলা। চারিদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে কাঁচা রাস্তা। সন্ধ্যা নামলেই মাঠের দিক থেকে ভেসে আসত ঝিঁঝি পোকার সুর। এখন সেখানে মোবাইলের টাওয়ার উঠেছে, বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে চারিদিক। নব্বইয়ের দশকের সেই সোনালি দিনগুলোর মতো আলো আর কখনো ফিরে আসে না।

সেই সময়ের রাতগুলো যেন অন্যরকম ছিল। বিদ্যুৎ থাকত না, তাই প্রত্যেক ঘরে জ্বলত একেকটা লন্ঠন।

লন্ঠনের হলদে আলোয় দাদা-দাদিরা শীতল পাটিতে বসে থাকতেন, মাচার ওপরে মাটির হাঁড়ি, যেখানে নাতি-পুতির জন্য থাকত পাটিসাপটা পিঠা, তেলের বড়া, নারকেল নাড়–, মুড়ির মোয়া, খই-মুড়ি, বাতাসা, গুড় আরও কত কী!

চাঁদনি রাতে নানির কণ্ঠে গল্প-“এক ছিল রাজা, তার ছিল এক সোনা-রুপার আতশ পাখি।” গল্পটা শেষ হতো না, কিন্তু ঘুম আসত। লন্ঠনের আলোয় ছায়াগুলো নাচত, ঠিক যেন সেই রাজার পাখিটা জানালার বাইরে ওড়াউড়ি করছে।

দিনের বেলা ছিল অন্য জগৎ। স্কুলের ঘণ্টা বাজলে সবাই খালি পায়ে দৌড়ে যেত, টিফিনে মায়ের বানানো মুড়ি-মিঠাই বা লাল চিড়া। বৃষ্টির দিনে খালের ধারে ছোট্ট নৌকা ভাসানো ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ।

সাদা-কালো টেলিভিশনে কার্টুন দারুণ লাগত। আর রেডিও! ভোরে কুরআন তেলাওয়াত, তারপর চলতি খবর। রাতে নাট্যমঞ্চ।

বাবা বসতেন চেয়ারে, মা ধীরে ধীরে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। চারদিকে একটা শান্তি, একটা মায়া, একধরনের নীরব আনন্দ ছড়িয়ে থাকত। সেই গ্রামের প্রতিটা গাছ, খাল-বিল, নদ-নদী, প্রতিটা পথ যেন এখনো জানে-একটা প্রজন্ম ছিল, যারা মন খুলে হাসতে জানত, আবেগ-অনুভূতি ছিল অফুরন্ত। যারা বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে গেলেও খুশি হতো। যারা চিঠি লিখত বন্ধুর কাছে। বন্ধুত্ব মানে ছিল চিঠির খামে একটা শুকনো ফুল পাঠানো।

সবাই মিলে পুকুরপাড়ে গোসল করা, চুপটি করে প্রখর রোদের মধ্যে মাছ শিকার, সুযোগ পেলেই চড়–ইভাতি নিয়ে হইহুল্লোড়-এ পাড়ায় ও পাড়ায় সবাই মিলিত হওয়া, অবসরে মজার বই পড়া ছিল দারুণ আনন্দের।

শীতের দিনে উঠোনের মাঝে আগুন পোহাত। খেজুরের রসে পিঠাপুলি আর মা-খালাদের সারা রাত ধরে ঢেঁকি ছাঁটাইয়ের চালের গুঁড়ো, তৈরি হতো সকালে মজার মজার খাবার।

ধানের খড়কুটোর মধ্যে লুকোচুরি খেলা, কাঁঠালের আঠা দিয়ে ফড়িং শিকারের দুর্দান্ত এক অনুভূতি। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় জোনাকির পেছনে ছুটে চলা, রাতের বেলা ফলবাগান থেকে ফল পাড়া, বৈশাখ মাসে ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো-এ ছিল নব্বইয়ের দশকে ফেলে আসা দিনগুলো।

এখন সবাই ব্যস্ত। বাড়িতে আলো আছে, কিন্তু লন্ঠনের মতো উষ্ণতা নেই। ইন্টারনেট আছে, কিন্তু চিঠির মতো অপেক্ষা নেই। বন্ধু আছে অনলাইনে শত শত, কিন্তু একজন বন্ধু নেই যে বলবে-“চলো, নদীতে নামি।”

সেই ফাঁসিয়াতলা গ্রাম আজও আছে, কিন্তু সেই সোনালি অতীত?

না, সে তো এখন কেবল স্মৃতির ভাঁজে এক মিষ্টি গন্ধের মতো-যেমন ভেজা মাটির গন্ধ বৃষ্টির পরেও কিছুক্ষণ টিকে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় সময়ের স্রােতে।

শেষরাতে নানা-নানির সেই গল্পের ধ্বনি এখনো মনে পড়ে। আমাদের সেই সোনালি অতীত বোধহয় আজ তারা হয়ে আছে, যারা আমাদের স্মৃতির আকাশে চিরকাল জ্বলবে নিঃশব্দে এক লন্ঠনের মতো, যার আলো নিভে গেলেও উষ্ণতা রয়ে যায় হৃদয়ের গভীরে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ