সম্রাট আকবরের দুর্গ আগ্রায় একদিন
ভ্রমণ সীমান্ত আকরাম এপ্রিল ২০২৬
ঘড়ির কাঁটা ১টায় ছুঁইছুঁই। মাথার ওপরে খাড়া সূর্য। তপ্ত রোদের দুপুরবেলা। ট্যাক্সি এসে থামল আগ্রা ফোর্টের সম্মুখে। একে একে সবাই নামলাম গাড়ি থেকে। দুজন চলে গেল টিকিট কাউন্টারে। প্রচণ্ড গরমে হাঁপিয়ে উঠলাম সবাই। গেটের বাইরে অবস্থিত দোকান থেকে শীতল শরবত পান করে কিছুটা ক্রান্তি দূর করার চেষ্টা করলাম। এরপর একে এক প্রবেশ করি আগ্রা ফোর্টে। তাজমহল থেকে ২ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। সকালে বের হয়ে স্বপ্নের তাজমহল দেখা শেষে এবারের গন্তব্য সম্রাট আকবরের বীরত্বের আগ্রা ফোর্ট।
ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের তৈরি এই দুর্গ; যার আকর্ষণ তাজমহল থেকে কোনো অংশেই কম নয়।
তাজমহল রোডের দিকের মানসিংহ গেট। আগে গেটটির নাম ছিল ‘আকবর দরজা’। এ গেটের নিকটবর্তী বেশির ভাগ নান্দনিক স্থাপনা। উঁচু প্রাচীর আর বিরাট পরিখার সমাহারে সুরক্ষিত দুর্গ তৈরি করেছিলেন আকবর। এটাই মুঘলদের বসতবাড়ি। তাজমহলে শুয়ে থাকা মমতাজ ও সম্রাট শাহজাহানসহ অনেকেরই আবাসস্থল ছিল এই আগ্রা ফোর্ট। মোঘলদের অনবদ্য স্থাপনা। ১৯৮২ সালে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আচ্ছাদিত আগ্রা ফোর্ট। লাল ইটে মোড়ানো পথ বেয়ে লাল উঁচু প্রাচীরে ঘেরা প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। মূল গেট পেরিয়ে ঢালু পথ। অপ্রতিরোধ্য ও অজেয় এক দুর্গ। শত্রুপক্ষের কেউ ঢুকে পড়লেও রক্ষা ছিল না। প্রাচীরের গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে গরম তেল ও গরম পানি ঢেলে দেওয়া হতো। পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া সমতল ও ঢালু পথ মাড়িয়ে যেত। ফলে দুর্গ আর জয় করা সম্ভব ছিল না তখনকার শত্রুদের। তারপর আবারও গেট। প্রথমেই জাহাঙ্গীর মহল। এরপর যোধাবাঈয়ের মহল। তারপর দেওয়ান-ই-আম। এটাই হচ্ছে দরবার হল। এখানকার সিংহাসনে বসে শাহজাহান দেশ পরিচালনা করতেন ও প্রজাদের সঙ্গে মিলিত হতেন। দরবার হলে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বিশ্রাম নিই। কেউ কেউ আবার ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
নয়নাভিরাম ৪০ পিলারের উঁচু এই দরবার হল। পাশেই ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাতের জন্য নির্দিষ্ট ছিল দেওয়ান-ই-খাস। বহুমূল্যের ময়ূর সিংহাসন ছিল এখানেই। পরে সেটি লুট হয়ে যায় নাদির শাহের হাতে। তেহখানায় যাওয়ার সিঁড়ি রয়েছে কাছেই। প্রবল গ্রীষ্মে মাটির তলার ঠাণ্ডা ঘরে আশ্রয় নিত রাজপরিবার। যমুনা নদীর স্রােত বয়ে যেত নিচ দিয়ে। বেগমদের রাজগোসলখানা হচ্ছে শিশমহল। আগ্রা ফোর্টের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে এর শিশমহল। এখানে অসাধারণ ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। পানি গরম করার জন্য ল্যাম্প ব্যবহার করা হতো। মার্বেলের চেয়েও দামি আয়না দিয়ে খচিত শিশমহলের দেওয়াল। অজ¯্র কাচের প্রতিবিম্বে নান্দনিক দৃশ্য সৃষ্টি হতো শিশমহলে। সম্রাটের বিশ্রামঘরটির নাম খাসমহল। নারীদের জন্য নামাজ পড়ার মসজিদ রয়েছে এখানে। নাগিনা মসজিদ। পুরুষদের জন্য মোতি মসজিদ। সবই রাজকীয় আভিজাত্যে আর কারুকার্যে মোড়ানো।
আগ্রা ফোর্টেই বন্দি ছিলেন শাহজাহান। সন্তান আওরঙ্গজেব বন্দি করে রেখেছিলেন তাঁকে। নিজ প্রাসাদ থেকে তিনি দেখতে পেতেন যমুনার ওপারে তাজমহলকে। স্মৃতিচারণ করতেন প্রিয় সহধর্মিণী মমতাজকে নিয়ে। যমুনার তীরে নির্মিত ফোর্টটির নির্মাণশৈলীতে দক্ষতার ছাপ আছে। আছে চাতুর্যতাও। বাইরে থেকে বোঝা যায় না এর প্রবেশপথ কোনটি।
সম্রাট শাহজাহান পছন্দ করতেন সাদা। তাই স্থাপনা নির্মাণে শ্বেতপাথর ব্যবহার করা হয়েছে বেশি। সম্রাজ্ঞী যোধাবাঈ ভবনটির নির্মাতা আকবর। এটি লাল। আকবর লাল রং পছন্দ করতেন বলে জানা যায়। আগ্রা ফোর্ট নির্মাণশৈলীতে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ রয়েছে। আগ্রা ফোর্টের দেওয়ালে দেওয়ালে কারুকাজখচিত নান্দনিক সব দৃশ্যপট।
একসময় এটি ছিল চৌহান রাজপুত্রদের অধিকৃত ইট-নির্মিত একটি দুর্গ। ১০৮০ খ্রিষ্টাব্দে গজনোভিদের বাহিনীর আওতায় চলে আসে এ দুর্গ। সিকান্দার লোদী (১৪৮৭ থেকে ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন) ছিলেন দিল্লির প্রথম সুলতান। যিনি দিল্লি থেকে আগ্রা এসে এই ফোর্টে বসবাস করেন। তিনি এখান থেকে দেশ শাসন করায় আগ্রা দেশের দ্বিতীয় রাজধানীর গুরুত্ব লাভ করে। সিকান্দার লোদী ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা ফোর্টে মৃত্যুবরণ করেন। তারপর তাঁর পুত্র ইব্রাহিম লোদীর অধিকারে এ দুর্গটি ছিল প্রায় ৯ বছর। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে ইব্রাহিম লোদী পানিপথে পরাজিত ও মৃত্যুবরণ করার পর আগ্রা ফোর্ট চলে যায় মুঘলদের অধিকারে। তবে লোদীদের সময়ে এ ফোর্টে পৃথক কটি রাজপ্রাসাদ, কূপ ও মসজিদ নির্মিত হয়।
‘কোহিনূর’ নামক বিখ্যাত হীরকসহ বিপুল পরিমাণ ধন মুঘলদের করায়ত্ত হয় আগ্রা ফোর্ট তাদের অধিকারে চলে আসার পর। ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা ফোর্টে স¤্রাট হুমায়ুনের রাজ্যাভিষেক হয়। ১৫৩৯ খ্রিষ্টাব্দে চৌসাতে তার পরাজয়ের পর তিনি আগ্রাতে পুনরায় চলে আসেন।
হুমায়ুন নামাতে কথিত আছে, নিজাম নামের এক পানি বহনকারী হুমায়ুনকে ডুবে মরে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করায় তাকে আগ্রা ফোর্টে অর্ধদিবসের জন্য রাজমুকুট পরিয়ে কৃতজ্ঞতাসূচক সম্মান প্রদর্শন করা হয় এবং এর স্মরণে মুদ্রাও প্রচলন করা হয়। ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে হুমায়ুন বিলগ্রামে পরাজিত হন। এতে আগ্রা ফোর্ট ৫ বছরের জন্য শেরশাহের অধিকারে চলে যায়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথে মুঘলরা চূড়ান্তভাবে আফগানদের পরাজিত করে এবং ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে তাদের দেড়শ বছরের নিরবচ্ছিন্ন শাসন কায়েমের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে।
মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনকাল ছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর (১৫৫৬-১৬০৫)। তিনি এটিকে তাঁর রাজধানীতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ‘বাদলগড়’ নামে ইট-নির্মিত আগ্রার এই ফোর্টকে জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখতে পেয়ে একে লাল বেলে পাথর দ্বারা পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। অভিজ্ঞ স্থপতিদের দ্বারা এ ফোর্টের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। বৃহদায়তনে বেশ স্থূলভাবে এ ফোর্টের সীমানা প্রাচীরের অভ্যন্তর ভাগ ইট দ্বারা নির্মাণ করে এর বহিরাংশে দেওয়া হয় লাল বেলে পাথর। ১৫৬৫ থেকে ১৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর পর্যন্ত চলে এ ফোর্ট পুনর্নির্মাণের কাজ। এ সময়ে প্রতিদিন প্রায় চার হাজার নির্মাণ শ্রমিক এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
আগ্রা ফোর্টের সম্মুখে সংরক্ষিত একটি বিরাট শিলালিপিতে উৎকীর্ণ আছে এর প্রকৃত ইতিহাস। এতে লেখা আছে, “আগ্রা ফোর্ট হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফোর্ট। বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের মতো মহামতি মুঘল সম্রাটগণ এখানে বসবাস করেছেন। এখান থেকেই তারা সমগ্র দেশ শাসন করতেন। সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও টাকশাল ছিল এখানেই। এ ফোর্টটি বিপুলসংখ্যক রাষ্ট্রপ্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রদূত, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ ও পর্যটক পরিদর্শন করেছেন। আগ্রা ফোর্ট ব্যতীত ভারতের অন্য কোনো ফোর্ট বা দুর্গের এতটা খ্যাতি নেই।”
ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের বর্ণনা মতে, “বাংলা ও গুজরাটি সুন্দর নকশায় আগ্রা ফোর্টে পাঁচ শতাধিক অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছিল, যার কিয়দংশ সম্রাট শাহজাহান সাদা মার্বেলে প্রাসাদ নির্মাণের প্রয়োজনে ভেঙে ফেলেছিলেন।” জানা যায়, আকবরসহ অন্যান্য মুঘল সম্রাট নির্মিত আগ্রা ফোর্টের অধিকাংশ অট্টালিকা ব্রিটিশ কর্তৃক সৈন্যদের ব্যারাক নির্মাণের প্রয়োজনে ধ্বংস করা হয়। ফোর্টের দক্ষিণ-পূর্বাংশে বড়জোর ৩০টি মুঘল স্থাপনা টিকে আছে।
‘দিল্লি গেট’, ‘আকবর গেট’ এবং ‘বেঙ্গল মহল’ নামে একটি প্রাসাদই এখন আকবরের অট্টালিকাসমূহের প্রতিনিধিত্ব করছে। দিল্লি গেটটি ছিল শহরমুখী। আরোহীসহ হাতীরূপী দুটি লাইফ সাইজের পাথর অভ্যন্তরীণ গেট স্থাপিত, যার নাম ‘হাতী-পল’। দিল্লি গেটকেই সম্রাটের আনুষ্ঠানিক প্রবেশের স্মারক হিসেবে নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ কর্তৃক ‘আকবর গেটে’র পুনঃনামকরণ করা হয় ‘অমর সিং’ গেট। এ গেটটি দিল্লি গেটের মতোই। এ দুটো গেটই লাল পাথরে নির্মিত। ‘বেঙ্গল মহল’ও তৈরি একই পাথরে, যা বর্তমানে ‘আকবরি মহল’ ও ‘জাহাঙ্গীর মহলে’ বিভক্ত।
আকবরের মৃত্যুতে ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরের সম্রাট হিসেবে রাজ্যাভিষেক হয় এই আগ্রা ফোর্টে। পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান ১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা ফোর্টে তাঁর রাজমুকুট পরিধান করেন। আগ্রা ফোর্টে সাদা মার্বেলে নির্মিত যত প্রাসাদ আছে সবই তাঁর গড়া। তিনি এ ফোর্টে মোতি মসজিদ, নাগিনা মসজিদ ও মিনা মসজিদ নামে সাদা মার্বেল পাথরে তিনটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সামুগড়ের যুদ্ধের পর সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব আগ্রা ফোর্ট ঘেরাও করেন এবং নদী থেকে এ ফোর্টের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেন। শাহজাহান কূপের পানি পান করতে না পারায় পুত্রের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। আওরঙ্গজেব তাঁর পিতা শাহজাহানকে কারাদণ্ড প্রদান করেন। এ দণ্ড ভোগ করতে হয় তাঁকে আগ্রা ফোর্টেই। ১৬৫৮ থেকে ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এখানেই ৮ বছর কারাবাস করেন শাহজাহান। মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ এখান থেকে নৌকাযোগে নিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের পাশে তাজমহলে সমাহিত করা হয়।
সম্রাট শাহজাহান মৃত্যুর পর আগ্রা তার আড়ম্বর ও জৌলুস হারায়। আগ্রা ফোর্টের আঠারো শ শতাব্দীর ইতিহাস হচ্ছে অবরোধ ও লুণ্ঠনের এক গদ্য কাহিনি। জাট ও মারাঠারা ছিল যে কাহিনির মুখ্য চরিত্রে।
আমরা একে একে আগ্রা ফোর্টের সবগুলো স্থাপনা দেখে নিলাম। আগ্রা ফোর্টের সর্বোচ্চ মহল থেকে সরাসরি তাজমহল দেখা যায়। সেখানে কিছুটা সময় অবকাশ নিলাম। অন্দরমহলগুলোতে এখনো বিভিন্ন নিদর্শন দৃশ্যমান। বিভিন্ন স্থাপনায় হেঁটে দেখতে দেখতে সবাই বেশ ক্লান্ত। এবার ফেরার পালা। দিল্লির অদূরে অবস্থিত ভারতের প্রাচীন জনপদ আগ্রার বুকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে সম্রাট আকবরের স্মৃতিময় বীরত্বে এই দুর্গ এখানো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কালের সাক্ষী এই আগ্রা ফোর্ট পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় একটি স্থান। স্মৃতিপাতায় চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের।
আরও পড়ুন...