সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম যেভাবে কাজ করে
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির জানুয়ারি ২০২৬
কখনো কি এমন হয়েছে, তুমি তোমার বন্ধুর সাথে ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামে চ্যাট করছ কোনো বিষয় নিয়ে। আর কিছুক্ষণ পর নিউজফিডে দেখতে পেলে সে বিষয়েরই বিজ্ঞাপন অথবা পোস্ট। ধরো তোমরা কথা বলছিলে কোনো বই নিয়ে। তারপর দেখলে নিউজফিডে সেই বই সম্পর্কে অনেক অনেক বিজ্ঞাপন। আবার ফেসবুকে দেখা যায়, তোমার পরিচিত কাউকে ফ্রেন্ড সাজেশনে দেখাচ্ছে। ফেসবুক কী করে বুঝল যে ওই ব্যক্তি তোমার পরিচিত। এমন ব্যাপার-স্যাপার বর্তমানে অহরহ। হয়তো তখন তোমার কাছে ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হতে পারে, আবার বিস্ময়করও হতে পারে। আদতে এসব কিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে ব্যাখ্যা। যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমই করছে সবকিছু। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন : ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, লিংকডইন ইত্যাদির মতো অ্যাপে থাকে কিছু অ্যালগরিদম। যা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে নিউজফিড সাজায়।
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম জানার আগে অ্যালগরিদমের সংজ্ঞা জেনে নেওয়া যাক। অ্যালগরিদম হলো, কোনো সমস্যা সমাধানের ধাপে ধাপে নির্দেশাবলি। কম্পিউটার, গণিত কিংবা প্রোগ্রামিংয়ে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য ধাপে ধাপে সাজানো নির্দেশনাবলিই হলো অ্যালগরিদম। যেমন কোনো কিছু রান্না করতে গেলে নির্দিষ্ট রেসিপি অনুসরণ করতে হয়, যেখানে রান্নার প্রতিটি ধাপ দেওয়া থেকে। অ্যালগরিদমও ঠিক একইভাবে কাজ করে। এটি কম্পিউটারকে সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া বলে দেয়। অ্যালগরিদম শব্দটি এসেছে ফার্সি গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি থেকে। তিনি প্রাচীনকালে এক গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। যা প্রথম অ্যালগরিদম হিসেবে স্বীকৃত। তাই তাকে অ্যালগরিদমের উদ্ভাবক বলা হয়। তা ছাড়া আধুনিক যুগে চার্লস ব্যাবেজ এবং অ্যাডা লাভলেসের মতো গণিতবিদরা প্রাথমিক কম্পিউটারের জন্য যান্ত্রিক অ্যালগরিদম তৈরি করেছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তিতে অ্যালগরিদমের ব্যবহার অহরহ। যেমন : ইউটিউবে ব্যবহারকারীদের ভিডিও সাজেশন দিতে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, গুগল সার্চে ফলাফলগুলো সাজাতে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়। তেমনি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম হলো, নিউজফিড বা হোম পেজে ব্যবহারকারী কী দেখতে পাবে তা নির্ধারণ করে। বেশির ভাগ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হলো, ব্যবহারকারীদেরকে তাদের প্ল্যাটফর্মে স্ক্রল করতে ধরে রাখা। কারণ তারা তাদের বিজ্ঞাপন পরিবেশন করতে চায়। তারপর অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নেয় কোন কনটেন্ট ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রাখবে, যাতে তাদের বিজ্ঞাপন পরিবেশন করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমগুলো প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য সঠিক কনটেন্ট খুঁজে বের করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি ব্যবহারকারীর পছন্দ এবং আগ্রহের বিশ্লেষণ করে। এই সিস্টেমটি প্রধানত তিনটি কাজ করে। ব্যবহারকারীর সংকেত গ্রহণ করে, ব্যবহারকারীর আগ্রহ পর্যবেক্ষণ করে, ব্যবহারকারীর দেখা পোস্ট র্যাংক করে। অ্যালগরিদম মূলত সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। যেমন : ব্যবহারকারী কী পোস্ট করছে, কখন করছে, কোন শব্দ বা হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছে। আবার কোন পোস্টে কত লাইক, কমেন্ট বা রিয়্যাক্ট পড়ছে। লোকেরা পোস্টটি দেখার জন্য কত সময় ব্যয় করছে। তা ছাড়া ব্যবহারকারীর বিভিন্ন বিষয়েও নজর রাখে। যেমন : কাকে ফলো করছে, কী তার পছন্দ, তার লোকেশন কোথায় কিংবা কোন পোস্ট দেখছেন।
নিউজফিডে কোনো পোস্ট বা ভিডিও পৌঁছানোর আগে অ্যালগরিদম একে স্কোর করে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে যে, ব্যবহারকারী পোস্ট-ভিডিওটি দেখে লাইক কমেন্ট করবে কি না কিংবা সে কত সময় ধরে দেখবে। একে ফিড স্কোরিংও বলা যায়। ইউটিউব এবং ফেসবুক এই ধরনের সিস্টেম ব্যবহার করে। যখন ইউটিউবে আমরা কোনো বিষয়ের ওপর এক বা একাধিক ভিডিও দেখি, তখন ইউটিউব পরবর্তীতে আমাদের ঐ ধরনের ভিডিও ফিডে সাজেশন দেয়। ফিড স্কোরিংয়ের পর অ্যালগরিদম বিভিন্ন বিষয়কে র্যাংকিং করে। যেমন : ফিডে কোন কোন বিষয়ের পোস্ট বা কনটেন্ট দেখানো হবে।
একজন ব্যবহারকারীর তো একাধিক পছন্দের বিষয় থাকতে পারে। যেটি অধিক পছন্দের সেটি সবার আগে, তারপরে কম পছন্দের বিষয়-এভাবে র্যাংকিং করা হয়। একেক সোশ্যাল মিডিয়া একেক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ফিড র্যাংকিং করে। যেমন : ফেসবুক জনপ্রিয়তা, কনটেন্টের ধরন, সম্পর্ক, নতুনত্ব এসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ফিড র্যাংকিং করে। শুধু ফিড র্যাংকিং করে থেমে থাকে না সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। ব্যবহারকারীর প্রতিটি স্ক্রলিং, মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। তবে এখানে একটা বিষয় সব প্ল্যাটফর্মে একই-ব্যবহারকারী যদি কোনো বিষয়ের ওপর কনটেন্ট দেখা শুরু করে তবে কয়েক মিনিটের মধ্যে অ্যালগরিদম অভিযোজিত হয়ে যায়। ক্রমাগত সেই পছন্দের বিষয়গুলোই দেখায়। যার ফলে এক ধরনের লুপ তৈরি হয়। সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আঠালো মনে হয়। একে ‘ফিল্টার বাবল’ও বলা হয়।
প্রথমে একটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করেছিলাম-সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুর সাথে কোনো বিষয় নিয়ে মেসেজ করলে ফিডে সেই বিষয়ের বিজ্ঞাপন দেখায়। এটা কীভাবে সম্ভব। কোনো অ্যালগরিদম কি এখানে দেওয়া আছে নাকি সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আমাদের কথার মাঝখানে আড়ি পাতছে। অনেকে বলছে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের আড়ি পাতছে কিংবা কোনোভাবে আমাদের মন পড়ছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো বলে আসছে, তারা আমাদের ডিভাইসে আড়ি পাতে না; বরং অন্য উপায়ে ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে। স্ক্রলিং, ওয়েবসাইটে ভিজিটের তথ্য সংগ্রহ করে কুকিজ এবং ট্র্যাকারের মাধ্যমে। যেমন : যদি তুমি কোনো জুতার ওয়েসবাইটে ভিজিট করো তাহলে এই তথ্য তোমার আগ্রহের সংকেত হিসেবে ধরবে অ্যালগরিদম। তাই নিউজফিডে জুতার বিজ্ঞাপন দেখাবে। আবার যদি কোনো জুতার দোকানে গিয়ে জুতা কিনো বা অনুসন্ধান করো, তাহলে তোমার ফোন বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্কে সেই লোকেশনের তথ্য শেয়ার করে।
যাহোক, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করেই তার ফিড পরিচালিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের মতিভ্রমও ঘটতে পারে। যেমন : নিউজফিডে অপ্রাসঙ্গিক পোস্ট বা কনটেন্টও আসতে পারে। ভুয়া খবর ছড়াতে পারে। যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমানে অ্যালগরিদমগুলো অনেকাংশে ভুয়া খবর শনাক্ত করতে পারে। যদিও তা যথেষ্ট নয়।
আরও পড়ুন...