শহীদ আবদুল্লাহর মা
জুলাই-গল্প জাফর তালুকদার জুলাই ২০২৬
আমাকে হয়তো চিনবেন না আপনারা। চেনার কোনো কারণও দেখি না! শুধু এইটুকু বলি, আমি জুলাইয়ে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা। আবদুল্লাহর মৃত্যু হলো এমন একটি দিনে যেদিন সরকার পতনের বিজয়ে ঢাকা মেতে উঠেছিল আনন্দ উল্লাসে।
২০২৪-এর আগস্টের ৫ তারিখ। মিছিলে মিছিলে ছেয়ে গিয়েছিল গোটা শহর। এই আনন্দ মিছিলে যোগ দিতে বিকেলে বন্ধুকে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল আবদুল্লাহ।
যাবার আগে কথা দিয়েছিল, সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে আসবে। কিন্তু মায়ের মনের শঙ্কা দূর হয় না। কেননা পুরো জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল আবদুল্লাহ। এর আগে জুলাইয়ের ১ আর ৪ তারিখ সে মিছিলে গিয়ে মার খেয়েছিল পুলিশের হাতে। কপালে ব্যথাও পেয়েছিল কিছুটা।
কিন্তু আজকের এই যাওয়া যে ওর শেষ যাওয়া হবে তা কে জানত!
আবদুল্লাহ ছিল শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বয়স ষোলো হলে কী হবে, ভারি মায়ের ন্যাওটা। যত খুনশুটি আর আবদার মায়ের সঙ্গে। এমন ভাব করত যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। গোসল, নখ কাটা, খাওয়া, ঘুমানো, কেনাকাটা-সবকিছুতেই মায়ের কাছে বায়না। কোচিং থেকে এসেই কফির ফরমাশ করত। বিরিয়ানি ছিল পছন্দের খাবার। ওরা দুভাই ঘুমাত আমার পায়ে মাথা রেখে। একটু রাগ করব সে জো ছিল না। অমনি আম্মা-মা ডেকে গলা জড়িয়ে ধরত। ওর ধারণা এভাবে দুই নামে ডাকলে মায়ের মন গলবে। এমন পাগল ছেলের সঙ্গে রাগ করে থাকা যায়!
আমরা থাকতাম আশকোনার আমতলায়। মায়ের বাড়ি ছিল একই পাড়ায়। সেদিন জাহিদ আর জিসানকে নিয়ে গিয়েছিলাম ওখানে বেড়াতে। ছোট জিসান একটু পরিপাটি স্বভাবের। এই নিয়ে খুঁচিয়ে মারত আদরের ছোট ভাইটিকে।
সেদিন আবদুল্লাহকে ওর মামা দোকানে আলু কিনতে পাঠিয়েছিলেন ১০০ টাকা দিয়ে। তা থেকে বেচে যায় ৩৫ টাকা। দুপুরে আলু-ইলিশ দিয়ে মজা করে ভাত খেল জাহিদ। আমিই মাছের কাঁটা বেছে তুলে দিয়েছিলাম মুখে। ওর মন পড়েছিল মিছিলে। কান খাড়া করে তড়পাচ্ছিল কেবল। বিকেলে শুরু হলো আনন্দ মিছিলে যাবার বায়না। মামার ৩৫ টাকা ফেরত না দিয়ে ওটাই গুঁজে নিল পকেটে।
পথে ওই টাকা দিয়ে কেক কিনে খেয়ে দুই বন্ধু চলে যায় উত্তরার দিকে। যাওয়ার সময় বন্ধুকে বলেছিল, ‘আগে মিছিলে গিয়ে মৃত্যু হলে শহীদের খাতায় নাম উঠত। এখন তো আর সে-সুযোগ নেই।’
ওদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। কিন্তু ফেরার নাম নেই ছেলের। মনে কেমন যেন কু ডেকে ওঠে। ফোন করে বলি, ‘কোথায় তুই? এই বুঝি সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরা!’
আবদুল্লাহ কথা রাখেনি।
উত্তরা আর্মড পুলিশ সদর দপ্তরের উলটো দিকে গলায় গুলিবিদ্ধ হয় আবদুল্লাহ। এই দেখে ওর বন্ধু ভয়ে এক ঘণ্টা দৌড়ে পালিয়ে আসে সেখান থেকে।
লোকজন ওকে ধরাধরি করে নিয়ে যায় উত্তরা মা ও শিশু হাসপাতালে।
তখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচেছিল আবদুল্লাহ।
ওর কাছ থেকে ফোন নম্বর নিয়ে যে ফোনটা এসেছিল সেটা ছিল একজন ডাক্তারের। সব শুনে পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিলাম হাসপাতালে।
কিন্তু ততক্ষণে শেষ হয়ে গেছে সব। বিপ্লব কেড়ে নিয়ে গেছে আমার কলিজার টুকরাকে।
আনন্দ মিছিল মুহূর্তে পরিণত হলো শোকের মিছিলে।
লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় বাড়ি। এলাকায় আবদুল্লাহ ছিল পরিচিত মুখ। সবাই ভালোবাসত সহজ-সরল এই মেধাবী ছেলেটাকে। তাকে হারানোর বেদনায় অশ্রুসিক্ত চোখে ছুটে আসেন কলেজের বহু শিক্ষক। ছাত্র। বন্ধু। আত্মীয়-স্বজন। রাত আড়াইটায় জানাজা হয় আবদুল্লাহর। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিন শ’র অধিক শোককাতর মানুষ।
আবদুল্লাহ কথা রাখেনি।
ও আমাকে বলেছিল সন্ধ্যার আগে ফিরে আসবে। কিন্তু এ কেমন ফিরে আসা! খুব রাগ করেছি বাবা। তোর বহু দস্যিপনা সহ্য করেছি। কিন্তু মাকে এমন নির্দয় কষ্ট দিয়ে কী সুখ পেলি পাগল ছেলে কোথাকার! সেদিন মিছিলে পরা তোর পাঞ্জাবিটা স্মৃতির স্মারক হিসেবে তুলে রেখে দিয়েছি না ধুয়ে। চোখের পানিতে ভেজা বলিশটা জড়িয়ে ধরে মনে হয় আগের মতো শুয়ে আছিস আমার কাছে। সেই ¯েœহময় অনুভূতি। সেই পরিচিত গন্ধ।
আসলে আমার কপালটাই মন্দ।
নাহলে ছেলেটা যেতে না যেতেই একূল-ওকূল সব হারাব কেন? এখন মনে হয় সবকিছুর বিনিময়ে যদি ফেরত পেতাম আমার আবদুল্লাহকে!
দুই সপ্তাহও পার হয়নি তখন। ঘরে রীতিমতো শোকের মাতম চলছে।
এমন সময় কঠিন এক দুঃসংবাদে বজ্রপাত হলো মাথায়। চৌদ্দ বছরের ছোট ছেলে জিসানের ক্যান্সার ধরা পড়েছে।
যাকে বলে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা।
শোক ভুলে শুরু হলো হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। প্রাণঘাতী রোগে ওষ্ঠাগত হয়ে গেল ছেলের জীবন। ধারদেনার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে জলের মতো। কিন্তু এই মোটা খরচের জোগান হবে কেমন করে?
নানা ঘাট ঘুরে সংগ্রহ করা ৪৭-৪৮ লক্ষ টাকা বেরিয়ে যায় জিসানের চিকিৎসায়। এখনও এই ধকল বুকে শোকের পাথর বেঁধে সইতে হচ্ছে আমাকে।
আসলে পুরো সময়টাই তখন চলে গিয়েছিল আমার বিপক্ষে। না হলে ছেলে হারানোর মাত্র সাত মাসের মাথায় স্বামীও পরপারে চলে যাবেন কেন?
আবদুল্লাহ যেদিন মারা গেল ওদের বাবা ছিলেন গ্রামের বাড়িতে।
ছেলের অকাল মৃত্যুতে দারুণ ভেঙে পড়েছিলেন মানুষটা। বারবার আক্ষেপ করে বলতেন, ‘ছেলেটাকে রেখে গেলাম তোমার কাছে। তুমি একটু দেখে রাখতে পারলে না!’
কী জবাব দেবো এ কথার?
এই ঘটনার পর ক্ষোভে-দুঃখে চুপচাপ হয়ে যান মানুষটা। তৈরি হয় মানসিক দূরত্ব। কান্নাকাটি করে দিন পার করতেন সারাক্ষণ। এমনি করে সাত মাসের মাথায় হঠাৎ স্ট্রোক করে পরপারে ছেলের কাছে পাড়ি জমান দুঃখী বাবা।
স্বামীর মতো আত্মীয়স্বজনেরও অভিযোগের তির আমার বিরুদ্ধে। যে প্রবাসী চাচা-ফুফুরা আবদুল্লাহকে ¯েœহ মমতায় ভরিয়ে রাখতেন সব সময়, তারাও বদলে গেলেন রাতারাতি। যেন সব দোষ আমার! ওর চলে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। এই দুঃখ কোথায় রাখি?
না, আমার দুঃখ রাখার সত্যি কোনো জায়গা নেই। কাকে বলব আমার কষ্টের কথা! জুলাই শুধু আমার কিশোর ছেলেকে কেড়ে নেয়নি, নিয়েছে স্বামীকেও। এত বড় দুঃখ সামাল দিতে না দিতেই শুরু হলো পরিবারের শেষ অবলম্বন ছোট ছেলেটির মরণব্যাধি। জিসান এখনও অবিরাম লড়ছে অসুস্থতার সঙ্গে। কী হবে তার চিকিৎসার শেষ গতি?
আমি তো একজন মা। অসহায় নারী মাত্র। কে আমার ভাঙাচোরা জীবনতরীর হাল ধরবে? তবে কী আমিও শেষ পর্যন্ত খড়কুটোর মতো ভেসে যাব সংসার সমুদ্রের কালো জলের অথৈ ঘূর্ণিতে!
জুলাই বিপ্লবের হারিয়ে যাওয়া পরিচিত মুখগুলো এখনো আমাকে সাহস জোগায়।
আবু সাঈদ, মুগ্ধ, সৈকত, ফরহান, সাফকাত, রিয়া, রাসেল-কত জানা-অজানা নাম। এই বীরের কাতারে যুক্ত হলো শহীদ আবদুল্লাহর নাম। আমার হারানো মানিক।
আমি জুলাই বিপ্লবে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের গর্বিত মা ফাতেমা তুজ জোহরা। চিনতে পেরেছেন আমাকে?
আরও পড়ুন...