সাইফের ফিরে আসা

তোমাদের গল্প জাকারিয়া আল হোসাইন ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সাইফ ছিল আমাদের গ্রামের গর্ব। ক্লাসের মেধাবী ছাত্র, সব শিক্ষকের প্রিয়। তার আসল পরিচিতি ছিল ফুটবল মাঠে। ফুটবল পায়ে নিয়ে সাইফ যখন দৌড় দিত, সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকত। এমন নিখুঁত পাস, নিপুণ গোল-যেন কোনো পেশাদার ফুটবলার। গত তিন বছর ধরে টানা তিনবার সে স্কুল টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড় হয়েছে। সে নিজেই ছিল দলনেতা, গোলদাতা।

শুরুতে সে খুব বিনয়ী ছিল, দলকে সম্মান করত। গোল করলেও বলত, ‘তোমরা না থাকলে এটা হতো না।’ কিন্তু ধীরে ধীরে সাইফ বদলে যেতে লাগল। তার ভেতরে এক অদৃশ্য দেওয়াল গড়ে উঠল। অহংকারের দেওয়াল। গোল দিলে পরে সে বলত, ‘আমি না থাকলে তোমরা একটা খেলাও জিততে পারতে না।’ নিজে পাস দিতে ভুল করলেও চিৎকার করত, ‘তোর মতো বোকা খেলোয়াড় দিয়ে আমার চলবে না!’

একসময় যারা তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল, তাদের দিকেও এখন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুঁড়ে দেয়। আমি, সজল, মারুফ ও জিহাদসহ সবাই সাইফের এমন পরিবর্তনে কষ্ট পেতাম। আমাদের সেই সাইফ, যে একসময় বল পেয়ে হেসে বলত, ‘ভাই, পাসটা দারুণ ছিল,’ এখন কেবল নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে।

একদিন স্কুল থেকে ঘোষণা এলো-চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে শহীদ ভাই-বোনদের সম্মানে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট’ আয়োজন করা হবে। আমাদের শহরে এই টুর্নামেন্টের একটা আলাদা গুরুত্ব ছিল-এটা শুধু খেলা নয়, এক অনন্য শ্রদ্ধার প্রতীক। আর এ বছরের পুরস্কার হিসেবে থাকবে লাল-সবুজ রঙের একটি চমৎকার ট্রফি।

সাইফ নিজের পছন্দের কিছু খেলোয়াড় নিয়ে দল গঠন করল। আমরা কেউই তার দলে সুযোগ পেলাম না। শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবেও যেন আমাদের আর কোনো মূল্য নেই। সাইফ স্পষ্ট বলল, ‘তোমাদের নিয়ে খেললে টিম দুর্বল হবে। আমি চ্যাম্পিয়ন হতে চাই, তাই ঝুঁকি নেব না।’

আমরা হতাশ হইনি; বরং ঠিক করলাম, আমরা নিজেরা দল গঠন করব। দলটির নাম রাখলাম ইখলাস। মানে আন্তরিকতা। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিজয় নয়, একে অপরকে সম্মান করে খেলা।

প্রতিদিন বিকেলে আমরা প্র্যাকটিস করতাম। কেউ স্লিপ করলে সাহায্য করতাম, কেউ ভুল করলে তিরস্কার নয়; বরং উৎসাহ দিতাম। আমরা জানতাম, ট্যালেন্টে আমরা সাইফদের সমান নই, কিন্তু আমাদের মধ্যে ছিল উৎসাহ আর একতা।

অবশেষে টুর্নামেন্টের দিন এসে গেল। গ্যালারিতে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক সবার চোখ মাঠে। স্থানীয় শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও এসেছেন। শহীদের নাম লেখা ব্যানার টাঙানো আছে মাঠের বাইরে। ফাইনালে মুখোমুখি ‘সাইফ একাদশ’ বনাম ‘ইখলাস একাদশ’।

প্রথমার্ধ শুরু হলো। সাইফ গোল করল এক দুর্দান্ত শটে। তারপর আরেকটা গোল। মাঠ কাঁপছে তার নামে। সে হাত তুলে চিৎকার করে বলছে, ‘এই হলো সাইফের খেলাধুলা!’ তার মুখভঙ্গি তাচ্ছিল্যময়, যেন আমাদের কোনো মূল্যই নেই।

আমরা একটু হতাশ হলেও হাল ছাড়িনি। আমরা জানতাম, খেলার আসল মানে শুধু গোল নয়; বরং গোল খেলার একটি অংশ।

দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হলো। আমরা নিজেদের খেলায় মন দিলাম। সজল এক নিখুঁত পাস দিলো জিহাদকে। গোল! ব্যবধান দাঁড়াল ২-১ এ। এরপর মারুফ বল ঠেলে আমাকে দিলো, আমি পাস দিলাম সজলকে। সে আরেকটি গোল করল। দুদলই এখন সমান।

মাঠে তখন টানটান উত্তেজনা। গ্যালারিতে অনেকে আমাদের নামে চিৎকার করছে, ‘ইখলাস! ইখলাস!’

শেষ এক মিনিট। আমি ডান প্রান্ত দিয়ে দৌড়ে এগিয়ে গেলাম, মারুফের একটা পাস পেলাম, বল ঠেলে দিলাম জিহাদের দিকে। জিহাদ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে বল ঠেলল জালে। আবারো গোল! ৩-২ গোলে এগিয়ে গেলাম আমরা। এমন সময় রেফারির শেষ বাঁশি বাজল। গ্যালারি ফেটে পড়ল করতালিতে। আমরা জিতেছি। ‘ইখলাস’ জিতেছে।

আমরা উল্লাস করছি, লাফাচ্ছি, চিৎকার করছি, একে অপরকে জড়িয়ে ধরছি। আর মাঠের কোনায় সাইফ চুপচাপ বসে আছে। সবার সামনে তার অহংকার মাটিতে মিশে গেছে। হঠাৎ যেন তার চোখে একটা আলোর ঝলকানি দেখা গেল, যা কোনো ট্রফির নয়, আত্মোপলব্ধির।

পুরস্কার বিতরণের মঞ্চে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো সেই লাল-সবুজ রঙের ট্রফি।

সজল যখন মাইকে দলের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলল, ‘এই জয় আমাদের সবার। আমরা একসাথে জিতেছি।’ তখন সাইফ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে পানি।

খেলা শেষে মাঠ খালি হতে লাগল। সবাই চলে গেলেও সাইফ রয়ে গেল মাঠের কোনায়। আমি, সজল, মারুফ আর জিহাদ মিলে ওর পাশে গেলাম।

সাইফ ধীরে ধীরে আমাদের দিকে তাকাল। তার চোখ লাল, মুখ থমথমে। নিচু গলায় বলল, ‘আমি হেরেছি শুধু খেলায় না। আমি হেরেছি বন্ধুদের কাছে, হেরেছি নিজের অহংকারের কাছে।’

তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।

সজল তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আজকের এই হেরে যাওয়াটাই তোর জীবনের সবচেয়ে বড় জেতা হতে পারে, যদি তুই বুঝতে পারিস।’

সাইফ তখন ফিসফিস করে বলল, ‘ভাই, তুই একদিন একটা হাদিস বলেছিলি না? আজ মনে পড়ছে।’

সজল শান্ত গলায় বলল, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’’

সাইফ মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি বুঝেছি। আজ থেকে আমি শুধু গোল দিতে শিখব না, বিনয়ও শিখব।’

তার সেই অনুশোচনায় আমরা কেউ কিছু বলিনি, শুধু জড়িয়ে ধরেছিলাম আমাদের সেই পুরোনো বন্ধুকে-নতুন রূপে ফিরে আসা এক সাইফকে।


আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ