স্বাগত হে নতুন পৃথিবী
উপন্যাস নাদিম নওশাদ মে ২০২৬
চারিদিকে ছমছমে পরিবেশ। নীরব, নিস্তব্ধ ও অগোছালো সবকিছুই। কিছুতেই যেন থামানো যাচ্ছে না প্রাণীগুলোর তাণ্ডব। মানুষের ভালো সত্তাগুলোকে ওরা শুষে নিচ্ছে আর তারপর মানুষ তার স্মৃতিশক্তি ভুলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরাও রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে প্রাণীগুলোর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে। রাতদিন এক করে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রাণীগুলোর সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য। তাদের সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে তত দ্রুত প্রাণীগুলোকে ঘায়েল করা সম্ভব হবে।
প্রাণীগুলো মানুষের মতোই দেখতে। কিন্তু কপালে ত্রিভূজাকৃতির একটা চিহ্ন, চাইনিজ বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন শিসো। চোখ দুটো বড় বড় ও লালচে। উচ্চতায় মানুষের থেকে সামান্য ছোট; মাত্র ৪ ফুট। আঙুলগুলো ছোট ছোট হলেও নখগুলো তুলনামূলক বড়। মাথার চুলগুলো পাতলা ও বাদামি রঙের। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মানুষ থেকে আলাদা করা মুশকিল।
প্রতিনিয়তই টিভির পর্দায় চোখ রেখে চলেছে তালহা। দশম শ্রেণিতে পড়–য়া তালহার চেখে কোনো ঘুম নেই। মাথায় শুধুমাত্র একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে-কীভাবে শিসোগুলোর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এমন অস্থিরতায় সে আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। একে একে ফোন করল আবরার, উমর, উসমান ও খালিদকে। এরা সবাই তালহার খুবই কাছের বন্ধু। তালহার মতো বাকিরাও খুবই চিন্তিত। সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল, বিকেলে প্রফেসর চাচুর বাড়িতে যাবে। তিনি একজন গবেষক। সারাদিনই ব্যস্ত থাকেন গবেষণা নিয়ে।
সবাই বিকেলে আল্লাহর নাম নিয়ে রাস্তায় বের হলো। দোয়া ইউনূস পড়তে পড়তে খুব সাবধানে চলে এলো প্রফেসর চাচুর বাসায়।
বাসায় ঢুকতেই দেখতে পেল যোবায়েরকে। যোবায়ের তালহার বড় ভাই। সবেমাত্র কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর মাস্টার্স পাশ করেছেন। এখন তিনি চাচুর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। যোবায়ের খুবই বুদ্ধিমান ও সাহসী। সব সময় তালহাদের উৎসাহিত করেন নতুন নতুন জিনিস তৈরি করতে।
চাচু ও ভাই আগে থেকেই গবেষণা করছেন প্রাণীগুলোকে নিয়ে। সামনের ন্যানোস্কোপে কয়েকটা চুল দেখতে পেল আবরার। আবরার অত্যন্ত মেধাবী। কতশত ডিটেকটিভ বই যে পড়েছে তার হিসাব নেই। সামান্যতম কোনো ঘটনাও ওর নজর এড়ায় না। চুলগুলো দেখার সাথে সাথে চাচুকে প্রশ্ন করল, এগুলো কী?
-এগুলো শিসোর চুল। চুল দিয়ে দিয়ে ঐ প্রাণীর ডি.এন.এ টেস্ট করা হয়েছে।
-যে টেস্ট দিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর বৈশিষ্ট্য, আকার, গঠন, প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারি সেই টেস্ট?
-হ্যাঁ। আমরা পরীক্ষা করে জানতে পারলাম, ওরা আসলে মানুষ।
-কীভাবে সম্ভব? ওরা এত অ্যাডভান্স টেকনোলজি ব্যবহার করছে, যা মানুষ কখনো কল্পনাও করেনি!
যোবায়ের বলল, আসলেই ওরা মানুষ। প্রায় ১০০০ বছর আগে ২০০৮ সালে ২০০ জন যাত্রী নিয়ে একটা স্পেসশিপ পাঠানো হয় পৃথিবী থেকে প্রায় ২০০ আলোকবর্ষ দূরে।
আবরার বলল, এতদূরে ওদের কীভাবে পাঠাল?
-মহাকাশে ওয়ার্মহোল আছে, যা মহাবিশ্বে যাতায়াতের জন্য শর্টকার্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবী তখন বসবাসের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। তাই পৃথিবীর বিকল্প হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু মানুষ পাঠানো হয় যার মধ্যে বিজ্ঞানী, কৃষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ সকল পেশার মানুষ ছিল। নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে যা যা লাগে আরকি! কিন্তু ১ আলোকর্ষ দূরত্ব পার করার পর স্পেসশিপের সাথে আর যোগাযোগ রক্ষা করা যায়নি। এরপর স্পেসশিপের আর কোনো খোঁজই পাওয়া যায়নি।
যোবায়েরের কথাগুলো সবাই হা করে শুনছিল। তালহা অবাক হয়ে জিজ্ঞেসা করল, ভাইয়া, আপনি এত তথ্য জানেন কীভাবে?
-৩০৩০ সালে এসে এমন ইনফরমেশন বের করা কি কোনো ব্যাপার? ডি.এন.এ টেস্ট করে যখনই দেখলাম শিসোদের জিনের গঠন মানুষের মতো, তখনই ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করে ফেললাম সব তথ্য।
উমর ও খালিদ দুজনেই দাঁড়িয়ে বলল, তাহলে আমরা যুদ্ধ করে ওদের পরাজিত করব। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসব।
-ওরা টেকনোলজিতে এতটা উন্নত হয়েছে যে, শক্তি দিয়ে হারানো যাবে না। হারাতে হলে ওদের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হবে।
উসমান তখন ভয়ে ভয়ে বলল, ওদের কে ধরতে যাবে! কাছে গেলেই তো নীল রঙের রে ছড়িয়ে মানুষের স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়। আমার ওপর যদি রে ছড়িয়ে দেয়, আর আমি যদি আব্বু আম্মুকে চিনতে না পারি?
আসলে উসমান একটু ভীতু। উমর তো মজা করেই বলল, উসমানের স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেলে আমরা সবাই মিলে পাগলাগারদে রেখে আসব।
চাচু বলল, যে করেই হোক একটা প্রাণীকে ধরে আমার ল্যাবে নিয়ে আসতে হবে। তা না হলে ওদের দুর্বলতাগুলো জানা যাবে না।
তালহা ও তার বন্ধুরা যোবায়েরকে ধরল। তালহা বলল, ভাইয়া, আমাদের একটা কিছু করতেই হবে। আপনি একটা উপায় বের করেন।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোবায়ের বলল, আবরার, টিভিটা অন করো। আমাদের প্রথমে ওদের গতিবিধি ভালোভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। হয়তোবা কোনো সূত্র পাওয়া যাবে।
আবরার টিভি অন করল। প্রায় ২ ঘণ্টা চেষ্টা করেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া গেল না। শুধু জানা গেল শিসোরা শিসের মাধ্যমে রে ছড়ায়। যোবায়ের বিরক্ত হয়ে বলল, নাহ! এভাবে হবে না। ওদের ঘায়েল করতে হলে কাছাকাছি হবে। ওখানে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।
যোবায়ের একাই যেতে চাইল। কিন্তু তালহা ও তার বন্ধুরাও ঘরে বসে থাকার বান্দা নয়। আসরের নামাজ শেষ করে শুরু হলো পরিকল্পনা।
উসমান বলল, ড্রোনের মাধ্যমে জাল দিয়ে একটা শিসোকে ধরে ফেললেই তো হয়।
উমর বলল, সাধে কি তোকে পাগলাগারদে রেখে আসতে চাচ্ছিলাম! এতই সহজ হলে সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স এতক্ষণে কয়েকশ শিসোকে ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠিয়ে দিত।
যোবায়ের বলল, হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। ওরা খুবই স্মার্ট। ড্রোনের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিকই ধরে ফেলবে। এতে আমাদের বিপদ বাড়বে।
সবাই গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। হঠাৎ তালহা বলল, যোবায়ের ভাইয়া, কোনোভাবে ওদের স্পেসশিপে যেতে পারলে সমস্ত তথ্য বের করে ফেলা যাবে।
-এটা খুবই ভালো প্রস্তাব। তবে অনেক বেশি বিপজ্জনক।
উসমান কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল, আমি ওদের এত কাছে যেতে পারব না। আমার হাত-পা কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যাবে!
উমর মুখ বাঁকাল, তা তো এখনই দেখতে পাচ্ছি। ওখানে গেলে তোর কাপড়ও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
যোবায়ের হাত নেড়ে বলল, আমরা দুটো গ্রুপে ভাগ হয়ে যাব। আমি, তালহা, আবরার আর উমর যাব স্পেসশিপের কাছে আর বাকিরা এখানে থেকে আমাদের ব্যাকাপ হিসেবে কাজ করবে। আমাদের কাজের ওপর নজর রেখে আমাদের সাহায্য করবে। আমরা কোনো বিপদে পড়লে ব্যাকাপ টিম আমাদের উদ্ধার করবে।
দুই.
পরিকল্পনামতো মাগরিবের নামাজ শেষে শুরু হলো প্রস্তুতি। তালহা, উমর আর আবরারকে যোবায়ের একটা করে সেইফটি নাইফ দিলো। এটা চাচু তৈরি করেছেন। শত্রু খুব কাছে চলে এলে এটা মাইন্ড কমান্ডের মাধ্যমে শত্রুকে আঘাত করে। আর যোবায়ের সাথে নিল তার কিট-বক্স। যোবায়েরের কিট-বক্সে আছে একটা টুইট-বাডি-যেটা আসলে একটি ছোট রোবট, যা কোনো রেকর্ড করা ভিডিও বা অডিও তথ্য নির্ধারিত স্থানে সিকিউরভাবে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমান সময়ে মানুষ তার সিকিউরিটি নিয়ে এত বেশি চিন্তিত যে, সবাই নিজস্ব একটা করে টুইট-বাডি তৈরি করে রেখেছে। আরও আছে হলোগ্রাফিক কম্পিউটার। সংক্ষেপে যাকে হলোকম বলে। ভয়েস চেঞ্জার চিপ দিয়ে যেকোনো প্রাণীর কণ্ঠের সিকোয়েন্স বের করে হুবহু নকল করা যায়। ক্যামেরা-ই দিয়ে সরাসরি ভিডিও ক্যামেরার মতো লাইভ ভিডিও কাউকে দেখানো যায়। একটা মাইক্রো-বি দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তে লাইট ব্যবহার করে কন্ট্রোল করা যায়। আরও কত কি! এগুলো যোবায়ের ও চাচুর প্রচেষ্টার ফল। সারাদিন এসব উদ্ভট জিনিস নিয়ে মেতে থাকাই তাদের কাজ। এসব আবিষ্কার সব সময়ই তালহাদের অনুপ্রাণিত করে।
এশার নামাজ শেষে তালহারা চুপিচুপি চলল স্পেসশিপের দিকে। স্পেসশিপের কাছাকাছি আসতেই সবাইকে থামিয়ে দিলো যোবায়ের।
-দাঁড়াও!
-কোনো সমস্যা, ভাই? আবরার জিজ্ঞেস করল।
-দাঁড়াও, আগে ভালো করে দেখে নিই, এখানে কোনো বিপদ আছে কি না। এমন অ্যাডভান্স স্পেসশিপে এত সহজে তো ঢুকতে পারার কথা না।
কিট-বক্স থেকে একটা স্ক্যানিং চশমা বের করে যোবায়ের স্পেসশিপের আশেপাশে স্ক্যান করল।
-যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। স্পেসশিপের চারিদিকে একটা রেড-জোন আছে।
-এটা কি কোনো সিকিউরিটি সিস্টেম?
-খুব সম্ভবত। স্পেসশিপের সুরক্ষার জন্য সিকিউরিটি সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করা হয়েছে।
উমর বলল, কী ধরনের সিকিউরিটি সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করা আছে, ভাই?
-স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, আইডেন্টিটিফিকেশন ছাড়া কেউ ভেতরে যেতে পারবে না। এখন আমাদের জানতে হবে কীভাবে ওরা আইডেন্টিটিফিকেশন করে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট, রেটিনাল-স্ক্যান নাকি অন্য কোনোভাবে।
তালহা বলল, তাহলে এখন আমরা কী করব?
-আমরা ওদের ওপর নজর রাখব। দেখব কীভাবে ওরা ভেতরে প্রবেশ করে।
প্রায় দু-ঘণ্টা তিনজন শিসো ভেতরে গেল।
উমর বলল, কই, কেউ তো কিছু স্ক্যান করল না।
-আমি চাচুকে টুইট-বাডি দিয়ে একটা ভিডিও ম্যাসেজ পাঠিয়ে দেই। দেখি উনি কোনো ব্যবস্থা করতে পারেন কি না।
যখনই টুইট-বাডি ভিডিও ম্যাসেজটা নিয়ে উড়তে শুরু করল, দুজন শিসো ওটার দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। প্রথমে যোবায়ের কিছুটা ভড়কে গেলেও নিজেকে সামলে নিল। কিট-বক্স থেকে হলা কম বের করে টুইট বাডিকে একই জায়গায় ওড়াতে লাগল, যেন শিসোরা ওটার কাছে আসে আর সেই সুযোগে একজনকে ধরা যায়। আরও বের করল সেইফটি নাইফ। যোবায়ের অন্যদের লুকিয়ে পড়তে বলল। কেউ রাজি হলো না। তখন সে রেগে বলল, ও যধাব ধ ঢ়ষধহ. ঐরফব, যরফব.
আবরার বলল, আমরা তিনজন তিন দিকে যাব আর শিসোরা ভাইকে আক্রমণ করলে ওদের পালটা আক্রমণ করব।
আবরার সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে দিলো। উমরের দায়িত্ব পড়ল পেছনের শিসোকে আক্রমণ করা। ও সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল। যোবায়ের বাহবা দিয়ে বলল, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী উমর।
উমর বলল, দুটোকেই ঘায়েল করে ফেলব, ইনশাআল্লাহ।
তালহা ডান দিকে গেল যেন অন্য শিসোকে মাটিতে ফেলে দিতে পারে। আর আবরারের দায়িত্ব পড়ল শিসোকে মাটিতে ফেলার পর ঢেকে দেওয়া, যাতে কোনো রে ছড়াতে না পারে।
দোয়া-ইউনুস পড়তে পড়তে সেইফটি নাইফ সাথে নিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নিল তালহারা।
সবারই গা ছমছম করছে। হঠাৎ একটা শিসো সামনে থাকা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। বাকিটা আবরারের পাশঘেঁষে চলে গেল টুইট-বাডির দিকে। যখনই শিসোটা যোবায়েরের খুব কাছে চলে এলো, তখনই মাইন্ড কমান্ড দিয়ে ওর পায়ে নাইফ ঢুকিয়ে দিলো। সাথে সাথে উমর আল্লাহু আকবার বলে পেছন থেকে শিসোর ওপর লাফিয়ে পড়ে মাটিতে ফেলে দিলো। আবরার শিসোকে পর্দা দিয়ে ঢেকে দিলো। তালহা পকেট থেকে ক্লোরোফর্ম বের করে যোবায়েরকে দিলো। যোবায়ের ক্লোরোফর্ম শিসোকে শুকিয়ে দিলো। কিন্তু শিসোটা অজ্ঞান হলো না। এরপর আবরার শিসোর ঘাড়ে আস্তে করে আঘাত করলে ওটা অজ্ঞান হয়ে গেল। সবাই দ্রুত শিসোকে ল্যাবে নিয়ে এলো।
উসমান অবাক চোখে বলল, ওকে কোথায় পেলি। ধরলি কীভাবে?
উমর বলল, আমি কাঁধে করে নিয়ে এসেছি। তোর মতো ভীতুর কাজ না এটা। তবে যাই বলিস, প্রাণীটা এত হালকা, চল্লিশ বেশি হবেই না।
ওদের আলোচনায় যোবায়েরের মন নেই। সে কিছু একটা ভাবছে। কিছুক্ষণ পর বলল, আচ্ছা, টুইট-বাডির দিকে শিসোরা এভাবে ধেয়ে এলো কেন? একটা শিসো সামনে থাকা গাছে ধাক্কা খেলো আবার এত কাছে এসেও আমাদের ওপর রে ছড়াল না? ওদের রক্তের রং সবুজ। কোনো একটা সমস্যা নিশ্চয়ই আছে।
উমর ওটার কাঁধে দেখল কিছুটা সবুজ রক্ত লেগে আছে।
আবরার বলল, কিন্তু ওরা তো মানুষ। আর মানুষের রক্ত তো লাল।
যোবায়ের কিছু না বলে ল্যাবে চলে গেল আরও ভালো করে পরীক্ষা করার জন্য।
প্রায় চার ঘণ্টা পর যোবায়ের তালহাদের ডেকে ওঠালেন। ক্লান্তিতে সবার চোখেই ঘুম চলে এসেছিল।
-সবাই ওঠো। ফজরের আজান হয়ে গেছে। নামাজ পড়তে হবে।
সবাই উঠে ওজু করে নামাজ আদায় করল। যোবায়ের সবার জন্য কিছু রুটি, কলা আর খেজুরের ব্যবস্থা করল।
বিসমিল্লাহ বলে সবাই খাওয়া শুরু করল। খাওয়া শেষে শুরু হলো আলোচনা। যোবায়ের বলল, কিছু মজার বিষয় আইডেন্টিফাই করা গেছে।
তালহা বলল, কী কী?
চাচু ওদের আলোচনায় যোগ দিলেন, শিসোরা টেকনোলজিতে এতটা উন্নতি লাভ করেছে যে, তারা অলসতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এরা ভাষার পরিবর্তে ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে কথা বলে, খাওয়া-দাওয়ার পরিবর্তে এনার্জি-ক্যাপসুল খায়। হাঁটতে কষ্ট হবে তাই এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে, যার সাহায্যে গ্রাভিটি শূন্য থাকে ফলে শরীরের কোনো ওজন অনুভূত হয় না। হাত দিয়ে কাজ করার পরিবর্তে তারা স্বল্প দূরত্বের ম্যাগনেটিক চেম্বার তৈরি করার যন্ত্র বানিয়েছে, যা হাতের ইশারায় কাজ করে। শরীরের ভেতরের সবকিছু ঠিক রাখতে দেহে অনেকগুলো ন্যানো ও পিকো রোবট রেখেছে, যারা হার্টবিট ঠিক রাখে, রোগ-জীবাণু ধ্বংস করে। এ ছাড়া এরা হিমোগ্লোবিনের পরিবর্তে রক্তে ফ্যাক্টোগ্লোবিন ব্যবহার করা শিখেছে যার ফলে রক্তের রং সবুজ হয়েছে। ফ্যাক্টোগ্লোবিন ব্লাড-প্রেসার ঠিক রাখে আর কেটে গেলে রক্ত পড়াও দ্রুত বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া অনেকক্ষণ দম বন্ধ করে রাখলেও দেহে রক্ত প্রবাহের ঘাটতি হয় না।
উমর হাত নেড়ে বলল, সেজন্য আমার কাঁধে কোনো রক্ত লেগে ছিল না।
-এরা এতটা অলস হয়েছে যে, মনে রাখার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। তাদের ব্রেইন এখন কোনো কাজেরই না। সম্পূর্ণ আন-ইউজড।
-তাহলে উসমানও কি ঐ গ্রহের প্রাণী? ও তো কখনো ওর ব্রেইন ব্যবহারই করে না।
উমরের কথায় সবাই হেসে উঠল। এরপর চাচু আবার বলতে লাগলেন, এরা মনে রাখার জন্য স্মৃতিশক্তির টি-সেলের পরিবর্তে কে-সেল তৈরি করেছে, যেটা এআই থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ওরা চোখে যা দেখে কে-সেলে তা রিয়েল-টাইম আপডেট হয়ে যায় এবং সেই অবস্থায় কি ডিসিশন নিতে হবে তা কে-সেল ঠিক করে দেয়। প্রতিনিয়ত কে-সেল নিজের অ্যালগরিদম আপডেট করে। ফলে প্রতিটি কাজই নিখুঁত ও নির্ভুল হয়।
আবরার বলল, সেজন্যই হয়তো আমার পাশঘেঁষে যাবার পরও আমার ওপর রে ছড়ায়নি। বরং ফ্রিকোয়েন্সিকে ফলো করে সামনে চলে গিয়েছিল।
-আরও আছে। এরা যে রে ছড়ায় তাতে কল্ব-রে থাকে, যা মানুষের ইমোশন ধরতে পারে এবং ক্যামো-ল্যাক্স নামক একটা ফিল্টার দিয়ে ভালো ও খারাপ সত্তাকে আলাদা করে। শিসোদের খুবই উন্নত একটা যন্ত্র আছে, যা ভালো সত্তাসমূহ সংগ্রহ করা ডি.এন.এ-কে শক্তিশালী ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে স্পেসশিপে পাঠিয়ে দেয়।
আবরার বলল, ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে কীভাবে ডি.এন.এ পাঠানো সম্ভব?
-হ্যাঁ সম্ভব। আসলে ধুলাবালি যেমন বাতাসে ভাসে, ঠিক তেমনই উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে ওরা ডি.এন.এ পাঠায়। ফ্রিকোয়েন্সিতে অনেকগুলো ছোট ছোট ভাগ থাকে যার প্রতিটাতে এক একটা টোকেন থাকে। প্রতিটা টোকেনে এক একজন ব্যক্তির রেটিনাল-স্ক্যান ও ভালো সত্তা থাকে, যাতে সবারটা একসাথে মিশে না যায়।
তালহা বলল, আমাদের যে করেই হোক স্পেসশিপে ঢুকতে হবে।
যোবায়ের তার কিট-বক্স থেকে মাইক্রো-বি বের করে পাঠিয়ে দিলো শিসোগুলোর ওপর নজর রাখতে। আসলে মাইক্রো-বি দিনের আলো ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে, যার জন্যে প্রাণীদের পক্ষে মাইক্রো-বিকে ধরা কঠিন।
কিছুক্ষণ নজরদারির পর তালহারা দেখতে পেল, স্পেসশিপে ঢোকার সময় শিসোদের গায়ে লাল রঙের আলো জ্বলছে। বোঝা গেল, এটাই ওদের আইডেন্টিফিকেশন ডিভাইস। যোবায়ের দাঁড়িয়ে বলল, আমি যাব ওদের স্পেসশিপে।
আবরার বলল, ভাই, আপনি তো ওদের ভাষা জানেন না। আটকা পড়বেন।
-আমি রাতে ওদের স্পেসশিপে যাব। এর মধ্যে চাচু নিশ্চয়ই ওদের ভাষা ডিকোড করে ফেলবেন।
চাচু বললেন, ইনশাআল্লাহ।
তিন.
পরিকল্পনা অনুযায়ী যোবায়েরকে এশার নামাজের পর তালহারা বিদায় জানাল। যোবায়ের শিসোর সমস্ত ডিভাইস পরে নিল। চাচু শিসোদের ভাষা ডিকোড করে ভয়েস চেঞ্চার চিপে ইনপুট করে দিলেন। যোবায়ের চোখে ক্যামেরা-ই ও সাথে কিট-বক্স নিয়ে চলে গেল স্পেসশিপের দরজায়।
ভয়ে তার বুক কাঁপছে। মনে মনে বিভিন্ন দোয়া পড়ছে। অবশেষে স্পেসশিপের দরজা খুলে গেল। যোবায়ের দ্রুত ভেতরে চলে গেল।
ভেতরে ঢুকেই সে অবাক। এত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি-যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। যোবায়ের নিজেকে সামলে সবকিছু ক্যামেরা-ই দিয়ে রেকর্ড করতে লাগল।
সে দেখল, স্পেসশিপের কন্ট্রোল ওদের বিজ্ঞানীরা ভার্চুয়ালি করছে। হঠাৎ ওর নজর পাশের একটা ডাটাবেজে পড়ল, যেটা আসলে কে-সেল। ওর আর বুঝতে বাকি রইল না, কে-সেল আসলে একটাই, যা প্রতিটা প্রাণীর কাছে একটা করে কপি আছে। সমস্ত প্রাণীর ডাটা রিয়েল-টাইম আপডেট হয়ে একটি সেলে যায় এবং বাকিরাও সেই ডাটা পেয়ে যায়।
যোবায়ের চারিদিকে আরও দেখতে থাকে। সে তার ডানে একটা ছোট্ট বাক্স দেখতে পেল যেটাকে ওরা গ্রান্ট-ডাটা-সেল বলছে। সেখানেই ওরা ভালো সত্তাগুলোকে জমা করছে নিজেদের টি-সেলে ভালো সত্তা ব্রেইনকে আবার কার্যকর বানানোর জন্য। যাতে ওদের আবেগগুলো আবার ফিরে পায় ও প্রত্যেকেই শুধু ভালো মানুষ হিসেবে থাকতে পারে।
যোবায়ের সাথে সাথে নিজের হলোকম বের করে কে-সেলের ডাটাবেজের সাথে কানেক্ট করে নিলেন। কিন্তু গ্রান্ট-ডাটা-সেলের সিকিউরিটি বেশি হওয়ায় এর সাথে কানেক্ট করা সম্ভব হলো না। তবে কিছু ব্যাকডোর তৈরি করার চেষ্টা করল, যাতে ল্যাবে যেয়ে ভালো করে চেষ্টা করতে পারে।
এসব করতে গিয়ে রেড অ্যালার্ম বেজে উঠল। যোবায়ের বুঝল প্রাণীগুলো সিকিউরিটি থ্রেট অনুভব করছে। তাই দ্রুত বের হয়ে ল্যাবে চলে এলো।
যোবায়ের এসেই দেখল, চাচু সব রেডি করে রেখেছেন। উনি গ্রান্ট-ডাটা-সেলের ব্যাকডোর দিয়ে ডাটা-সেলের সাথে নিজের কম্পিউটার ভার্চুয়ালি কানেক্ট করলেন। বললেন, ওদের ঘায়েল করতে হলে আমাদের কে-সেল ও টি-সেল নষ্ট করতে হবে।
আবরার বলল, কিন্তু তাহলে তো ওরা ওদের স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলবে।
খালিদ বলল, ওদের টিকে থাকাই হুমকির মুখে পড়বে।
তালহা বলল, আমার মনে হয়, আমাদের ওদের টেকনোলজি ধ্বংস করে দেওয়া উচিত। তাহলে আবার ওরা পরিশ্রম করে, মেধা খাটিয়ে কাজ করা শিখে যাবে।
যোবায়ের বলল, হ্যাঁ, ওদের টেকনোলজি ধ্বংস করলে ওরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। কিন্তু তার জন্যে আমাদেরও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।
উমর বলল, মানে?
-আমাদের এন্টি-নেটওয়ার্ক ও এন্টি-ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক-ফিল্ড তৈরি করতে হবে, যাতে ফ্রিকোয়েন্সি ও ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।
উসমান বলল, তাহলে আমরা মোবাইল, টিভি চালাব কীভাবে? আমরা তো টেকনোলজির সুযোগ-সুবিধা ও উপকারগুলো থেকে বঞ্চিত হব।
-হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমরা এর ভালো ব্যবহারের তুলনায় খারাপ ব্যবহারই বেশি করছি। তোমরা দেখো, টেকনোলজি ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে মেরে ফেলা হচ্ছে। কত নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব হচ্ছে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। মনুষ্যত্ব, সামাজিক মূল্যবোধ তলানিতে ঠেকেছে। যদিও চিকিৎসা, কৃষিসহ অনেক ক্ষেত্রে টেকনোলজি অনেক অবদান রেখেছে, কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আমরাও এই প্রাণীগুলোর মতো হয়ে যাব।
তালহা বলল, আপনি ঠিক বলেছেন, ভাইয়া।
চার.
চাচু ও যোবায়ের চলে গেলেন সিনিয়র বিজ্ঞানীদের সাথে মিটিং করতে। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার মিটিং শেষ হলো। চাচু ল্যাব থেকে বেরিয়ে বললেন, আমরা সফল হয়েছি। সবকিছু তৈরি।
আবরার বলল, এখন কী হবে?
যোবায়ের বলল, প্রথমে আমরা ফ্রিকোয়েন্সি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে সব শিসোকে স্পেসশিপে নিয়ে আসব। এরপর কে-সেল-এ ঢুকে ডিলিট কমান্ড দিয়ে কে-সেল ডিলিট করে দেবো। এরপর গ্রান্ট-ডাটা-সেলের ব্যাকডোর দিয়ে ডাটা-সেলে ঢুকে টোকেনগুলো ডি-ট্রান্সফার করলে টোকেন মোতাবেক যার যার ভালো সত্তা প্রাণীগুলো নিয়েছিল তারা আবার তা ফেরত পেয়ে যাবে। এরপর ওদের স্পেসশিপকে ওদের গ্রহে ফেরত পাঠানো হবে। তারপর ফাইবোসন নামক ক্যাসো কণার মাধ্যমে ন্যাচারাল-ম্যাগনেটিক-ফিল্ড তৈরি করা হবে। ফলে ন্যাচারাল ফ্রিকোয়েন্সির বাইরে কোনো ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি করা সম্ভব নয়, যা এন্টি-নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া এন্টি-ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক-ফিল্ড তৈরি করা হবে পজিটো-ফিল্ড দিয়ে যেখানে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক-ফিল্ডের ইলেকট্রনকে পজিটো-ইলেকট্রন দ্বারা প্রশমিত করা হবে। এরপর কয়েক শ ব্লাকহোলের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পুরো গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে দেওয়া হবে এন্টি-নেটওয়ার্ক ও এন্টি-ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক-ফিল্ড। ফলে আমাদের আবার সবুজের মাঝে বসবাস করা শিখতে হবে।
উসমান বলল, তাহলে আমরা আর ভিডিও গেমস খেলতে পারব না?
উমর বলল, না! তখন মাঠে গিয়ে খেলব। শরীর-মন ভালো থাকবে।
খালিদ বলল, সবাই সবার বাড়িতে যাব। একে অপরের খবর রাখব। সকালে অ্যালার্মের বদলে পাখির ডাকে ঘুম থেকে উঠব।
আবরার বলল, মানুষ আবার সামাজিক জীব হিসেবে বাস করবে।
তালহা বলল, মানুষ তার আসল পরিচয় বুঝতে শিখবে।
কথামতো কাজ শুরু হলো। সারা পৃথিবীর নামিদামি বিজ্ঞানীরা একত্রিত হলেন। রেডিও-টেলিভিশনে বলে দেওয়া হলো টেকনোলজি তার চরম শিখরে পৌঁছেছে। এখনই সময় টেকনোলজিকে তার অন্তিম ঠিকানায় পৌঁছে দেবার। আগামীকাল থেকে পৃথিবীতে টেকনোলজির ব্যবহার থাকবে না।
সমস্ত কাজ শেষ হলো। চারিদিকে মৃদু হাওয়া বয়ে চলেছে। প্রকৃতি যেন তার বিজয়টা উদ্যাপন করছে। আজ থেকে সে ফিরবে তার আপন ঠিকানায়।
ফজরের আজান হচ্ছে। কিন্তু মাইকের কোনো শব্দ নেই, শোনা গেল সুমধুর কণ্ঠে নিঃসৃত সুরেলা আহ্বান। যোবায়ের সবাইকে বলতে লাগল, ওজু করে নাও। মসজিদে যেতে হবে তো।
সবার চোখ-মুখে প্রশান্তি। দেখে বোঝার উপায় নেই, দুদিন ধরে এদের চোখে কোনো ঘুম নেই।
চাচু সবাইকে বললেন, Welcome to the World of Nature!
আরও পড়ুন...