প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ
স্মরণ শরীফ আবদুল গোফরান জুন ২০২৬
কবি ফররুখ আহমদ নির্মল মন নিয়ে ভালোবাসতেন প্রকৃতিকে। ফলে তিনি সবকিছুকে নিয়ে লিখেছেন ছড়া-কবিতা। তাঁর মন শিশুদের জন্য গভীর মায়ায় ছলকে ওঠে। ফলে শিশুদের জন্য তাঁর হাত থেকে ঝরে পড়ে মজাদার ছড়া-কবিতা, গল্প-নাটক।
শিশুসাহিত্য জগতে কবি ফররুখ আহমদ প্রথম আসেন পাখির বাসা নিয়ে। কবি বিচিত্র পাখপাখালির জগৎকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। পাখির বিচিত্র প্রসঙ্গ তাঁর শিশুসাহিত্যে ব্যাপক স্থানজুড়ে আছে। তিনি পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে যেমন কবিতার রাজ্যে ঘুরে বেড়াতেন, তেমনি ছড়া সাহিত্যেও ছোটদের সাথি করে নিতে ভুল করতেন না। তাঁর পাখিবিষয়ক ছড়াগুলো পাখির জীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গ শিশু-কিশোরদের ভাবিয়ে তুলেছে, আন্দোলিত করেছে। ফলে তিনি যেন প্রকৃতির অপার রহস্য “পাখির বাসা” নিয়ে হাজির হয়েছেন ছোট্ট শিশু-কিশোরদের মাঝে।
“পাখির বাসা” গ্রন্থে কবি সাত রঙা কবিতা নিয়ে উপস্থিত হন ছোটদের কাছে। পাখির বাসার বর্ণনা গানে গানে রূপ লাভ করেছে। যেমন-
আয়গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে
পাখির বাসা খুঁজতে যাবো একসাথে
কোন বাসাটা ঝিঙে মাচায়
ফিঙে থাকে কোন বাসাটায়
কোন বাসাতে দোয়েল ফেরে
মাঝরাতে।
রূপকথার কাহিনিতে রূপকথার রাজপুত্র-রাজকন্যা, কবির চোখে শাহজাদা-শাহজাদি। সিতারা ও শাহীন, ইতিহাসের বীরপুরুষ, নেতা, সাহসী নায়ক সম্পর্কে কবিতায় বর্ণিত হয়েছে।
“চলার গান”-এ দেশ ও জাতিবিষয়ক কবিতারাজি রয়েছে। দেশ ও জাতির মান, সবুজ পতাকা, আদর্শ, সম্মুখে চলার গান ইত্যাদি এতে রয়েছে।
শিশুসাহিত্য রচনায় কবি ফররুখ আহমদের ভাষা ও শব্দের ওপর আশ্চর্য দখল ছিল। ছন্দ ও শব্দচয়নে কবির পাণ্ডিত্য ছোটদের আনন্দের খোরাক জোগায়।
তাঁর শিক্ষাপ্রদ এসব রচনা ছোটদের ভাবিয়ে তোলে। জাগরণী গান গেয়ে শক্তি, সাহস ও বীরত্বের কথায় আন্দোলিত করেছেন ছোট শিশু-কিশোরদের মনকে। ফলে কল্পনার জগৎ বেষ্টন করে আছে তাঁর শিশুসাহিত্য।
কবি ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্যে প্রকাশিত তৃতীয় গ্রন্থ “ছড়ার আসর” ১ম খণ্ড। আমার মনে হয়েছে কবির সৃষ্টি শিশুসাহিত্যের মধ্যে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি এই শিশু ছড়াগুলো। কবির ছন্দে গাঁথা অধিকাংশ রচনাই হয়েছে গান, মিষ্টি গীতি ভাবনার রূপায়ণ। শব্দচয়ন, ছন্দ লালিত্য, সংগীতময়তা সকল দিক দিয়েই ফররুখ আহমদের শিশুদের জন্য রচিত ছড়া গতিময়, সমৃদ্ধ ও প্রাণচঞ্চল। তিনি কল্পরাজ্যে হলদি কোটার দেশে যান।
মেহেদি-পাতায় হাত রাঙান। সেখানে আছে সাঁঝের পরী, সোনার কাঠি-রুপার কাঠি, জন্তু-জানোয়ার, পশু-পাখি-এসব নিয়ে শিশুদের যে চিরচেনা জগৎ সেখান থেকেই কবি তাঁর ছড়ার পাত্র-পাত্রী নির্বাচন করেছেন।
কবি ফররুখ আহমদের চতুর্থ গ্রন্থ “নতুন লেখা।” এই গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। নতুন লেখা, রং তামাশা, সবুজনিশান, কিসসা শোনার সন্ধ্যা, রাসুলে খোদা। কবি এই গ্রন্থে প্রকৃতির বিচিত্র ভাবের সমারোহ ছন্দে, গানে, কল্পনায়, বাস্তবে যেমন প্রকাশ করেছেন, তেমনি দেশ-জাতি, সমাজ, ধর্ম, নীতির ব্যাখ্যাও করেছেন। ছোটদের মনোরাজ্যে তাঁর এক পুণ্যময় ছবি পরিস্ফুট করতে চেয়েছেন। অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে কবি সত্যের সন্ধান করেছেন। ফলে আল্লাহ-রাসূল ও মহাপুরুষদের মহৎ ভাবনা উৎসারিত হয়েছে তাঁর ছড়ার অনেক পঙ্কিতে। এ ছাড়া হাসি ও কৌতুকময়তা ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্যের এক প্রবলতম লক্ষণ।
ফুলকে কে না ভালোবাসে, ফুলের প্রতি ছোট-বড় সবারই হৃদয়ের টান রয়েছে। তবে বড়দের তুলনায় ছোটরাই ফুলকে বেশি ভালোবাসে। কবি ফররুখ আহমদ ফুলকে অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই ভালোবাসতেন। ফলে ফুলকে নিয়ে তাঁর অনেক লেখা। এসব নিয়ে তাঁর কাব্যগ্রন্থ “ফুলের জলসা”। এতে তিনি ফুলকে নিয়ে হরেক রকম ছড়া লিখেছেন। যেমন-
ঝুমকো জবা বনের দুল
উঠল ফুটে বনের ফুল
সবুজ পাতা ঘোমটা খুলে
ঝুমকো জবা হাওয়ায় দোলে
সেই দুলুনির তালে তালে
মন উড়ে যায় ডালে ডালে।
কবি ফররুখ আহমদের শিশুসাহিত্য এত অল্প কথায় প্রকাশ করা মোটেও সম্ভব নয়। এজন্য অনেক সময়ের প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তাঁর পাখির বাসা, হরফের ছড়া, চিড়িয়াখানা, ফুলের ছড়া, সাঁঝ সকালের কিসসা, ছড়ার আসর, পোকামাকড়, পাগলা ইন্জিন, দাদুর কিসসা, পাখির ছড়া, আলোক লতা, খুশির ছড়া, নতুন লেখা, রংমশাল, নয়া জামাত আমাদের শিশুসাহিত্যকে নতুন জগতের রাজপথের সন্ধান দিয়েছে। তিনি শিশুসাহিত্যের নয়া দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছেন।
কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। কিন্তু তিনি যে আমাদের সংগীত জগতেও অন্যতম গীতিকার ছিলেন তা অনেকেই জানেন না। তাঁর সব গানই রেডিও পাকিস্তান এবং রেডিও বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা কেন্দ্র থেকে দেশের বিখ্যাত সুরকারদের দ্বারা সুরারোপিত হয়ে বিভিন্ন শিল্পীদের কণ্ঠে প্রচারিত হয়েছে।
কবি ফররুখ আহমদ পেশাগত কারণে রেডিওতে কাজ করার সুবাদে ছোটদের জন্য প্রচুর গানও রচনা করেছিলেন। কবির লেখা বিশেষ বিশেষ কিছু গানের কথা আমি বলব। তিনি ছোটদের জন্য তিতুমীরের ওপর গান লিখেছিলেন-
দেশ বিদেশের ভাই-বোনেরা শোন,
শোন কান পেতে আজ ধীর,
জেহাদ হবে এই আশাতে
বাঁশের কেল্লা গড়েন তিতুমীর।
নাইরে সময়, সময় যে আর নাই
আয়রে সবাই বুক বেঁধে দাঁড়াই।
কবি ফররুখ আহমদ ছোটদের উপদেশ দিয়ে নানা ধরনের গান লিখেছেন, যে গান গাইলে সবার মন আনন্দে নেচে ওঠে। জাগরণের সৃষ্টি হয়।
তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে
খোদার মদদ ছাড়া,
তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে
নিজের পায়ে দাঁড়া।
পরের উপর ভরসা করে
ক্ষয়ের পথে যাসনে মরে,
তোরা ভয়ের পথে যা বাজিয়ে
জয়ের নাকাড়া,
খোদার মদদ পেয়ে যারা
হলো জাহান জয়ী
তারা মাড়িয়ে গেল মৃত্যুদুয়ার
রাত্রি তিমিরময়ী।
কবি ফররুখ আহমদ এমন মানুষই চেয়েছিলেন। যেসব মানুষ পেলে তিনি শান্তি রাজ্য গড়তে পারবেন। যে রাজ্যে মানুষ মানুষে কোনো তফাত থাকবে না। সত্যের নিশান পতপত করে উড়বে হাওয়ায়। সবুজ সবুজ স্বপ্নেরা খেলা করবে মানুষের মনের রাজ্যে, সেখানে বইবে শান্তির অনাবিল স্রােত। তাইতো তিনি আল্লাহর কাছেই সাহায্য চান।
আরও পড়ুন...